somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্যক্তিগত কাসুন্দিঃ এটা কোন ভ্রমণ কাহিনী নয়

০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ৩:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অভিমানের মাত্রা বেশি হয়ে গেলে সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করে। ফাটল সামান্য থাকতেই যে কোন এক পক্ষকে আত্মসমর্পন করতে হয়। অভিমানের লাগাম টেনে ধরতে হয়। এক পক্ষ আত্মসমর্পন করলে অপরপক্ষকেও পজিটিভ থাকতে হয়। নচেৎ সম্পর্কের মৃত্যু অবধারিত। বিষয়টি আমরা দুজনই একইসাথে অনুভব করছিলাম হয়তো। তাই আমি যখন আঁখিকে ফোন করার কথা ভাবছিলাম তখন আঁখিই আমাকে ফোন করল,
-পায়েল, আমরা সিলেট যাব বেড়াতে। যাবি?
-কবে?
-গেলে আগামীকালের মধ্যে জানা।
-চাঁদা?
-হাজার তিনেক নিয়ে আয়। এরপরেও যদি লাগে ভাইয়া বুঝবে।
আমার হাতে তখন এক পয়সাও নেই। এক দিনের মধ্যে তিন হাজার টাকা দেওয়া আম্মার পক্ষেও সম্ভব না। বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিল, মাসের বাজার-সব মিলিয়ে বড় একটা অ্যামাউন্ট মাসের শুরুতেই খরচ হয়ে যায়। আমাদের স্কুল-কলেজে যাওয়ার যাতায়াত খরচ আলাদা করে রাখা হয়। আমরা হিসেব করে চলি। দৈন্যের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে হিসেব করে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমি টিউশনি করে প্রতিমাসে আট-নয় হাজার টাকা পাই, কিন্তু মাসের মঝামাঝি সময়ে তো আর কেউ বেতন দেয় না। টাকা-পয়সা চাওয়ার ক্ষেত্রে আমি আবার মুখচোরা। তাই কারো কাছে অগ্রিম চাইতেও পারি না। অনেক সময় ছাত্র-ছাত্রীরা এক মাসের বেতন আরেক মাসে গিয়ে দেয়, কিন্তু দুই মাসের একসাথে দেয় না। আবার অনেকে চার-পাঁচ দিন অনুপস্থিত থাকলে বেতন কেটে নেয়, কিন্তু আমি উচ্চ-বাচ্য করতে পারি না। লজ্জা হয়। এরকম অবস্থা সহ্য করতে না পারলে টিউশনি ছেড়ে দিই, তবু টাকার কথা বলতে পারি না। আমি আঁখিকে বললাম,
-আমার যাওয়া হবে না। তোরাই যা।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য টাকার সমস্যা মিটল। আম্মা কার কাছ থেকে যেন আড়াই হাজার টাকা ধার নিয়ে দিলেন। নিজ থেকে দিলেন আরও এগারোশ। সেই টাকা নিয়ে বোঁচকা বেঁধে চট্টগ্রাম চলে গেলাম। সেখান থেকে যাওয়া হবে সিলেট।

সংখ্যায় আমরা চার জন-আমি, আঁখি, তাসলি (তাসলিমাকে সংক্ষিপ্ত করে তাসলি), আর রোজি। তাসলি আর রোজি ওর ভার্সিটির বন্ধু। লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা একটা ট্রেনে করে আমরা সিলেট রওনা হলাম। সকাল নয়টায় রওনা হয়েছি, কিন্তু দিন গড়াচ্ছে তো গড়াচ্ছেই, সিলেট আর আসে না। কেউ গান শোনে, কেউ ঘুমায়, কেউ খায়। খাওয়া শেষে গান শোনে, গান শুনতে শুনতে ঘুমায়, ঘুম থেকে উঠে একেকবার একেকজন জিজ্ঞেস করে-
-এখনো সিলেট পৌঁছাই নাই?
আমি কৌতুক বলতে পারি না। তবু সবাইকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে একটা প্রয়াস নিলাম। কৌতুক বলে আমি নিজেই হাসি, আর কেউ হাসে না। তবু বলে যেতে থাকি। একসময় সবাই এক সঙ্গে হেসে ওঠে। আমি খুশি, কৌতুক তাহলে হিট করেছে অবশেষে। কিন্তু না, ওরা জানাল ছোট্ট একটা ছেলে আঁখিকে চোখ টিপ মেরেছে। তাই নিয়ে এতো হাসাহাসি। অর্থাৎ, সুস্থ ধারার কৌতুকে কারো আগ্রহ নেই। সবার আগ্রহ পুদিনা পাতায়, মানে এডাল্ট জোকস-ই সবাই শুনতে চায়। আমার আবার এসব জোকস এর ভান্ডার দূর্বল। তাই রণে ভঙ্গ দিয়ে আঁখিকে জিজ্ঞেস করলাম,
-আমাদের নিতে স্টেশনে আসবে কে?
-ভাইয়া আসবে।
-হোটেলে রুম বুক করা হয়েছে তো?
-এসব নিয়ে তুই কোন চিন্তাই করিস না। আমার ভাই সব ঠিক করে রেখেছে।

সন্ধ্যায় সিলেট পৌঁছালাম। স্টেশনে পনের-বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর সাইফুল ভাইয়ার দেখা পাওয়া গেল। প্রথমেই একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকলাম। দারুন স্বাদের চা খেয়ে সারা দিনের ক্লান্তি কিছুটা হলেও কমল। তবু যতবারই একটা নরম বিছানা আর কোলবালিশ কল্পনা করি ততবারই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসতে চায়। খাওয়া শেষে সাইফুল ভাইয়াকে বললাম,
-তাড়াতাড়ি হোটেলে চলেন। আমাদের বিশ্রাম দরকার।
সাইফুল ভাইয়া সবাইকে অবাক করে দিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন-
-রুম তো এখনো ঠিক করা হয় নাই। একটু ব্যস্ত ছিলাম।
আমার ইচ্ছে করছিল গলা ছেড়ে কাঁদি। আঁখির দিকে তাকিয়ে একটু মায়া হল। বেচারীর আত্ম-সম্মান একেবারে সুরমা নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে এমন অবস্থা। ও বলল,
-ভাইয়া, তুই আমার প্রেস্টিজ এভাবে পাংচার করে দিলি?
সাইফুল ভাইয়া আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন,
-আরে, ভাবিস না। এখানে আমার পরিচিত এক হোটেল আছে। চাকরীর শুরুর দিকে ওইখানে একমাস থেকেছিলাম। ম্যানেজার আমার পরিচিত। আমাকে খুব সম্মান করে। গেলেই সিট ঠিক করে দিবে।
গেলাম সেই হোটেলে। ভাইয়ার পরিচিত ম্যানেজার বললেন,
-আপনি তো মেয়ে নিয়ে হোটেলে উঠতে পারবেন না।
-কেন? এরা আমার বোন।
-সরি, আমরা তো আর জানি না সেটা। আমরা দম্পতি ছাড়া এলাউ করি না।
আঁখি বলল,
-ভাইয়া, তোর কোন বান্ধবী নাই? থাকলে খবর দে। তোর বউ পরিচয়ে আমাদের সাথে থাকবে।
তখন হাসাহাসির অবস্থা নাই। আমরা বোঁচকা-বুচকি নিয়ে একবার এই হোটেলে যাই, আরেকবার ঐ হোটেলে, কোথাও সিট পাওয়া যায় না। শেষে মেসের মতো একটা হোটেলে গিয়ে উঠলাম। তাসলিমা রুমে ঢুকেই বমি করে দিল। রুমের আসবাবে পরতে পরতে ধুলো জমে আছে। রোজি বলল,
-এখানে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না।
সাইফুল ভাইয়া বললেন,
-আমি একটু আসছি। তোরা দরজা বন্ধ করে বসে থাক।
ভাইয়ার কথামতো আমরা দরজা বন্ধ করে রুমের ভেতর বসে বসে শীতে কাঁপছি। ব্যাগ খুলে কেউ শীতের কাপড় বের করছে না। আঁখির মুখ থমথমে। কিছুক্ষন পর সাইফুল ভাইয়া ফিরে এসে সেখান থেকে উদ্ধার করলেন। অবশেষে ভালো একটা হোটেলে সিট পাওয়া গেল। ভাইয়া নিজের মেস ছেড়ে হোটেলে আমাদের রুমের পাশের রুম নিজের জন্য ভাড়া করলেন। মোটামুটি অভিজাত হোটেল। লোকেশন এবং নাম কিছুই এখন মনে করতে পারছি না। তবে এটা মনে আছে যে, সেখান থেকে মাধবকুন্ড ৮০-৮৫ কিলোমিটার ছিল। রাত্রে দারুন ঘুম দিলাম আমরা। সকালবেলা উঠেই মাধবকুন্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা। সাইফুল ভাইয়া আপ-ডাউন একটা ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া করে ফেলেছেন। শীতকাল হওয়ায় মাধবকুন্ডের ঝর্ণা সরু হয়ে এসেছিল। আশেপাশের এলাকায় কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে সাত স্তরের চা খেলাম। একেকটা স্তরের স্বাদ একেক রকম। তারপর দুপুরের খাওয়া। মাধবকুন্ড থেকে ফিরে এসে গেলাম শাহজালাল (রহঃ) এর মাজারে। প্রথম দিনটা ভালোই কাটল।

দ্বিতীয় দিন আমরা জাফলং গেলাম। হিমালয় থেকে নেমে আসা ‘মারি’ নদীর তীর ঘেঁষে শৌখিন জিনিসের বাজার গড়ে উঠেছে। বাজারে ঢুকে চারজনে চারটা হ্যাট কিনলাম। পার্ট মেরে ছবি তুলতে নাকি হ্যাট লাগবে। বাজার ঘুরে নদীর পারে এসে দাঁড়াতেই মন ভালো হয়ে গেল। দূরে মেঘালয়ের পাহাড়, এপারে বাংলাদেশের। স্রোতের সাথে হিমালয় থেকে গড়িয়ে আসা পাথর তোলার কাজ চলছে তো চলছেই। পাথর আনা-নেওয়ার জন্য সারি সারি নৌকা। তবে এসব কাজে যেসব মেশিন ব্যবহার করা হয় সেগুলোর একঘেঁয়ে শব্দ খুব বিরক্তিকর লাগছিল। নদীর জলে পা ডুবালাম একবার। বরফশীতল। আমি ভাবার চেষ্টা করলাম জায়গাটা নিস্তব্ধ হলে কেমন লাগত। ক্ষীনকায়া মারি নদীর ওপারে ছোট্ট বালির মাঠ। নৌকাযোগে নদী পার হলাম। বালির মাঠ পেরিয়ে একটা ভ্যান ভাড়া করলাম আমরা। ভ্যানে চড়ে খাসিয়া উপজাতিদের গ্রাম পেরিয়ে একটা ছোট্ট চা বাগানে এসে পৌঁছালাম। সাইফুল ভাইয়া বললেন,
-এখানকার চা বাগান তো শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের চাকর হওয়ারও যোগ্যতা রাখে না।
ভাইয়ার ভাষা ব্যবহারের কী ছিরি! সবাই হেসে উঠল। চা বাগানের ভেতর ঢুকব ছবি তুলতে, এমন সময় কয়েকটা ছেলে বলল,
-আপুরা, দেখে-শুনে পথ চইলেন।
তাসলি বলল,
-জ্বী। আমরা দেখে-শুনেই পথ চলি। আপনাদের এতো সাবধান বানী শোনার দরকার নেই আমাদের।
ছবি কয়েক স্ন্যাপ নেওয়া হয়ে গেছে। সবগুলো ছবি তুললেন সাইফুল ভাইয়া। সবাই বিভিন্ন পোজে ছবি তুলল। তারপর সাইফুল ভাইয়া গেলেন ক্যামেরার সামনে। আমি ক্যামেরা হাতে নিতেই ক্যামেরা নিচে পড়ে গেল। ছবি তুলতে গিয়ে দেখি শাটার অটোম্যাটিক্যালি একবার অন হচ্ছে, আরেকবার অফ হচ্ছে। একেক জন একেক বার গিয়ে ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়ে আসছে, আমিও ক্লিক করে যাচ্ছি। একটা ছবিও যে আসেনি সেটা আমি ছাড়া কেউ জানতেও পারল না। ক্যামেরাটা আমার। ক্যামেরা নষ্ট হওয়ার দুঃখে আমার চোখে পানি চলে এসেছে, কিন্তু সবার হাসি-খুশি মুখ দেখে চোখের পানি দেখাতে পারছি না। সে এক যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি।

বাগান থেকে বের হয়ে আসার পর বুঝতে পারলাম ছেলেগুলো কতো মহান ছিল। ওরা নিজেরা পরিস্থিতি জানত বিধায় আমাদের সাবধান করেছিল। সাইফুল ভাইয়া বললেন,
-কাঁচা গুয়ের গন্ধ পাচ্ছি কেন?
তাকিয়ে দেখি তাসলির ডান পায়ের জুতার সাথে...। তাসলি আমাদের মধ্যে সবচে ফ্যাশন সচেতন। বেচারী এভাবে নাজেহাল হল দেখে আমার একটু দুঃখই হচ্ছিল। আবার হাসিও আটকে রাখতে পারছিলাম না। আমি তাড়াতাড়ি হাত নেড়ে বললাম,
-আমি না, আমি না, তাসলি...।
সাইফুল ভাইয়া আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-তুই তো পুরা বাগান পরিষ্কার কইরা আসছস মনে হইতাছে।
নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি ঐ জিনিস আমার দুই জুতাতেই লেগে আছে এবং ব্যাপক পরিমানেই লেগে আছে। পৃথিবীর মানুষ কতো নির্মম। আমার উপর দিয়ে এতগুলো ফাঁড়া যাচ্ছে, আর সবাই দাঁত কেলিয়ে হেসেই চলেছে। যাই হোক, ঘাসের সাথে কোনরকমে জুতা পরিষ্কার করে ভ্যানে এসে উঠলাম। কিন্তু সাইফুল ভাইয়ার দেখা নেই। প্রায় মিনিট দশেক আমাদের বসিয়ে রেখে উনি ফিরে আসলেন। আঁখি বলল,
-কী ব্যাপার, তোর এতো দেরী হইল ক্যান?
সাইফুল ভাইয়ার সহজ উত্তর,
-একটা সিগারেট খেয়ে আসলাম।
আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল, সিগারেট-ফিগারেট কিছু না। জিনিস ভাইয়ার পায়েই হয়তো সবচে বেশি লেগেছে। কেউ তো আর খেয়াল করেনি। কিন্তু আমার সন্দেহের কোন প্রমাণ নেই বলে কিছু বললাম না। ফেরার পথে ভ্যান থামিয়ে খাসিয়া পাড়ায় ঢুকে কিছু ছবি তুললাম। এবার আমি আর ক্যামেরা বের করলাম না। বললাম,
-ব্যাটারীর চার্জ শেষ। তাসলির দামী মোবাইলে তোল।
অবশেষে তাসলির মোবাইলেই সব ছবি তোলা হল। সাইফুল ভাইয়া বললেন,
-আমরা এখন জিরো পয়েন্টে যাব। ওটাই সবচে সুন্দর জায়গা। ছবি ওখানেই সবচে ভালো আসবে।
আবার নৌকায় উঠতে হল। নৌকা চলছে চলছে, হঠাত কী কারনে জানি না, ওটা কাত হয়ে গেল। তাসলির হ্যাট পানিতে পড়ে গেল। সেই সাথে পড়ে গেলেন সাইফুল ভাইয়াও। আর আঁখি সাইফুল ভাইয়াকে না ধরে হ্যাটটা ধরার চেষ্টা করছিল। হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না। শেষে সবাই মিলে টানাটানি করে ভাইয়াকে তুললাম। আর একটুর জন্য সবাই মিলেই পড়ে যাচ্ছিলাম। জিরো পয়েন্টে গিয়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। সত্যিই সুন্দর। কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানির নিচে কাঁকর আর পাথর দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আছে প্রবাল। কিনার ছাড়িয়ে একটু দূরে গেলে পানির রঙ নীলাভ সবুজ দেখা যায়। দূর পাহাড়ের রাস্তা ধরে মাঝে মাঝে একটা-দুটা গাড়ি যাচ্ছে। পর্যটকেরা ইচ্ছে মতোন লম্ফ-ঝম্প দিচ্ছে। আমরাও লম্ফ-ঝম্ফ দিতে নেমে গেলাম। ঠিক হল চারজন লাফঝাঁপ দেবে, আর একজন ছবি তুলবে। প্রথমে স্ন্যাপ নেবে তাসলি।

ভ্যানিটি ব্যাগ খুলতে হল না, ওটা খোলা অবস্থাতেই পাওয়া গেল। নির্মম আরেক সত্য আবিষ্কৃত হল-ওর দামী মোবাইল হাওয়া হয়ে গেছে। আমার ক্যামেরাটা খুব বেশি দামী না হলেও মোটামুটি দামীই ছিল। আমার খালার কাছ থেকে মাগনায় পাওয়া। হয়তো ঠিক করতে পারব ঐ আশায় ছিলাম। তাই দুঃখটা একটু হালকা হয়ে আসছিল। কিন্তু তাসলির মোবাইল ফোন আসলেই দামী ছিল। ৫৫০০০ টাকার মোবাইল ফোন আমরা তখন কল্পনাই করতে পারি না। আমার একটা নকিয়া ৭২৩০ মডেল এর ফোন ছিল। ওটাই কতো আদরের ছিল। তাসলি বলল,
-মোবাইলটা আমার আপুর রে। দুলাভাই এর দেওয়া গিফট। আপু আমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।
আমরা বুঝি- হুম, দামটা আসলে মুখ্য না। একজন বন্ধুর মন ভয়ংকর খারাপ, এর মধ্যে আর ছবি তোলা যায় না। তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরে এলাম। রাতে সবাই আমার ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো দেখতে চাইল। আমি বললাম,
-ছবি উঠে নাই।
আঁখি ভ্রূ কুঁচকে বলল,
-হোয়াট!
-বলছি যে, কোন নতুন ছবি নেই ক্যামেরায়। চা বাগানের কোন ছবি নাই। তার আগেরগুলা তো পথে পথেই দেখলি।
আমি বিষয়টা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললাম,
-বাংলা কথার উত্তরে বাংলাই বলা উচিত।
-রাখ তোর বাংলা। why is there no new photo?
-ক্যামেরা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
-কখন থেকে?
-চা বাগানে যখন ছবি তুলতে গেলাম।
-ভাইয়ার তোলাগুলোও কি নেই?
-সেগুলো থাকতে পারে।
মেমোরি কার্ড বের করে ফোনে ইনসার্ট করার পর দেখা গেল, ভাইয়ার তোলা ছবিগুলোর দুই-একটা ছাড়া আর সবই ডেভেলপের অযোগ্য। তখন আমার উপর কী অত্যাচার যে শুরু হল সেটা বলে বোঝানো মুশকিল।



আঁখি বলল,
-তুই এতো বড় কুফা! জানলে তোরে আনতামই না। তোরে দিয়াই কুফা শুরু হইছে।
-আমার কী করার আছে বল। কুফা তো আর ফুপা না যে বলে কয়ে বেড়াতে আসবে।
-চুপ!
আমি বাধ্য মেয়ের মতো চুপ করে গেলাম। কোথায় আমার ক্যামেরাটা নষ্ট হয়ে গেছে তা নিয়ে একটু সমবেদনা প্রকাশ করবে, উল্টো বকাবকি করছে। আমি না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু তাসলিকে যেন ওর আপু চিবিয়ে খেয়ে না ফেলে তার একটা উপায় তো বের করতে হবে।

উপায় সে নিজেই বের করল। দোকান থেকে ছুরি, কটন, গজ, স্যাভলন, পেইন কিলার এগুলো কিনে আনল। তারপর বাম হাতের কব্জির একটু উপরে ছুরি দিয়ে এক পোঁচ দিয়ে দিল। লাল টকটকে রক্ত বের হয়ে আসল। আমরা ভাবলাম ও পাগল হয়ে গেছে। কী নৃশংস! আমি শিউরে উঠে বললাম,
-কীভাবে করলি এটা?
ও খুব সহজভাবে উত্তর দিল,
-জীবনে এক-দুই বার ব্লেড দিয়ে কে হাত-পা না কাটে বল? আমার অনেক ভালো প্র্যাকটিস আছে। সানোয়ারের জন্য কতো হাত-পা কেটেছি।
-হাত-পা কাটলে কি মনের মানুষকে কাছে পাওয়া যায়?
-উঁহু। যে আসার সে এম্নিই আসে।
আমরা ওর হাত ব্যান্ডেজ করে দিলাম।

পরদিন শ্রীমঙ্গল যাওয়ার প্ল্যান বাতিল করে আমরা বাসের টিকিট কাটলাম। সাইফুল ভাইয়া বাসে তুলে দিলেন আমাদের। বললেন,
-বাসে এক টানে চলে যাবি।
কিন্তু বাস ছাড়ার পর দেখা গেল, ট্রেন যেমনি লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা ছিল, বাস তারচে দ্বিগুন। ভীষণ নকিং হচ্ছিল। আমরা ভাবলাম, রাস্তা খারাপ। কিন্তু পুরো রাস্তা তো আর খারাপ হতে পারে না। তারচে ভয়ংকর কথা হল, রাস্তায় কয়েক বার বাস থেমেও গেল। আঁখি রেগে রেগে আমার দিকে তাকাচ্ছিল, যেন এর জন্যও আমিই দায়ি। আমি বললাম,
-এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? আমি কী করলাম!
-তুই কুফা।
-তুই মায়া হাজারী।
আমার কাছে ছিল পানির বোতল, আর আঁখির কাছে ছিল চিপস এর প্যাকেটগুলো। বোতল খুলে পানি খেলাম। কিছুক্ষণ পর আবার পিপাসা পেয়ে গেল। কিন্তু আবার খেতে গিয়ে দেখি কর্ক খুলে পানি সব নাই হয়ে গেছে। আঁখি আমার দিকে কঠিন চোখে তাকাল। আমি অসহায়ের মতো মুখ করে বললাম,
-বোতল তো আমি কোলে নিয়ে বসে থাকি নাই।
-দায়িত্ত্বজ্ঞানহীন।
কিছুক্ষণ পর চিপস খেতে গিয়ে দেখি একটা প্যাকেটও নাই। কোথায় গেল সব! আমি আঁখিকে বললাম,
-ওগুলো সব তো তোর কোলেই ছিল।
-আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে বাসের সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি পটেটো ক্র্যাকার্স, প্রাণ ডাল, চকোলেট, এমনকি আমাদের জুতাগুলো পর্যন্ত বাসের ঝাঁকুনির তালে তালে একের পেছন আর এক বাসের দরজার দিকে যাত্রা করেছে। সামনের দিকে বসে থাকা যাত্রীরা একটা একটা করে ছুঁড়ে ছুঁড়ে আমাদের কাছে ফেরত পাঠাল। ভাগ্যিস, জুতাগুলোও ছুঁড়ে দেয় নাই। ওগুলো পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে পাঠিয়েছে। অবস্থাটা একবার কল্পনা করে দেখুন।

চট্টগ্রাম পৌঁছে সবাই তাসলিদের বাসায় গিয়ে উঠলাম। তাসলি জানাল, মোবাইল ফোন গুন্ডা মার্কা কয়েকটা লোক ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। হাতাহাতি করতে গিয়ে হাতে ছোরার পোঁচও খেয়েছে। আমরা ওর হাতের ব্যান্ডেজ দেখালাম বাসার সবাইকে। তাসলির আম্মু আর আপু তখন এমন কান্নাকাটি শুরু করল যা আর বলার নয়। আন্টি বিলাপ শুরু করে দিলেন,
-ওরে, তুই কেন রে হাতাহাতি করতে গেলি...চাইছে দিয়া দিতি...ওরে, যদি পেটে পোঁচ দিয়া দিত তাইলে কী হইত রে...জীবনের থেকে কি ফোনের বেশি মূল্য নাকি রে...ওরে, আমার মেয়ের যদি কিছু হইয়া যাইত তাইলে কী হইত রে...
পোঁচটা একটু গভীর হয়ে গিয়েছিল। ও সারা রাত কোঁ-কাঁ করল। আঁখি বলল,
-মজা বুঝো এবার। সত্যি বললে একটু বকা শুনতা না হয়। উনারা তোমার হাতে পোঁচ দিয়ে দিত না তো আর।


শেষ কথাটা বলি। আমার সন্দেহই সত্যি ছিল। সে ট্যুর এর অনেক দিন পর সাইফুল ভাইয়া জানিয়েছিলেন, জিনিস উনার পায়েই সবচে বেশি লেগেছিল। কিন্তু আমরা কেউ বিষয়টা খেয়াল করিনি দেখে উনি চেপে গিয়েছিলেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০১৭ সকাল ১০:৩৩
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মানুষের মধ্যে এমন কেউ কী আছেন, যাঁরা AI-এর কাছে নিজেদের জ্ঞান, লেখার দক্ষতা কিংবা সৃজনশীলতার শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর ভয় পাচ্ছেন?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৪




এআইকে বলে ছিলাম- তুমি বলতে গেলে একটা গেদা বাচ্চার মত। এর মধ্যে অনেক মানুষ তোমাকে হিংসা করে। বিষয়টা কি?

উত্তরে এআই বলল- হা হা! আপনার কথাটা শুনে হাসি... ...বাকিটুকু পড়ুন

হুজুরের কি শরিয়াহ আইনে বিচার হবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১২


মুফতি মোহাম্মদ আলী কাসেমীর জন্য খারাপ লাগছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনার ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে প্রকাশ এবং এ নিয়ে লাইভ করার অভিযোগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=মনের হিংসা দূর করো রব=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:২৯


তবুও হিংসা এসে যায় কারণে অকারণে;
পারি না সামলাতে মন আমার - ইয়া রব,
নিতে পারি না সহজ করে কিছু
মনের কিনারে ভাঙ্গে হুড়মুড় স্বার্থের কলরব।

স্বচ্ছ মনের মানুষ কী করে হই,
সহজরে করে ফেলি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি প্রবাসীর মৃত্যুদন্ড ও রটানো গুজব

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২২

আপনি যে দেশে যাবেন, সেই দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাটা আপনার দায়িত্ব।
আমেরিকায় আপনি মদ কিনতে পারবেন। কিন্তু আপনার বয়স অবশ্যই ন্যূনতম ২১ হতে হবে। ইউরোপে হয়তো এই বয়সটা ১৮।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরো...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫২

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরোচ.....

বিপ্লবের লক্ষ্য কী- পরিবর্তন, নাকি প্রদর্শন?
বাংলাদেশে জেন-জি স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে; কিন্তু প্রশ্ন- স্বৈরাচার গেছে, স্বৈরাচারী মানসিকতা কি গেছে?
যে তরুণ প্রজন্ম গণতন্ত্র, অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে রাজপথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×