

অনেক অনেক দিন আগের কথা, ৭০ এর দশকের প্রথমের দিকের কথা বলছি, শীতের রাত পার হয়ে ঘন কুয়শায় ভোর সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারা একজন বালক বয়ষী ছেলের জন্য আসলেই প্রবল শক্তি আর সাহসের প্রয়োজন, আমার সেই প্রবল শক্তি বা সাহস কোনোটাই ছিলো না, আম্মা সাহস ও শক্তি দিতে চেষ্টা করতেন তার ভীরু ছেলেকে - মায়ের মন “প্রতিটি মা মনে করেন তার ছেলে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে রাক্ষস পিটিয়ে রাজকন্যা উদ্ধার করে আনবেন” আমার আম্মাও ব্যাতিক্রম ছিলেন না, বিছানা থেকে টেনে তুলে দিলে আবার লতানো গাছের মতো বিছানায় ঢলে পরতাম - আলস্যে ! দাদাজানকে হারিয়েছি খুব ছোটবেলায় তাই দাদাজানের খুব একটা স্মৃতী মনে নেই, তবে যখণ এই সাত সকালে ঘন কুয়াশায় দাদীজানের কর্তৃত্বপূর্ণ ভারী গলায় হুমকি ধামকি শুনতাম - বুঝতাম পৌষ হোক আর কারেন্টের শকের মতো ঠান্ডা শীতের মাঘ মাস - আজকে ঈঁদ - আজকে নির্ঘাত ঈঁদ !!! দাদাজান বৃটিশ সরকারের অধীনে সাব রেজিষ্টার ছিলেন, দাদাজান চলে গেছেন, তবে তার পরিবার সামলানোর জন্য দাদীজানকে দিয়ে গেছেন দাদাজানের বৃটিশ সরকারের অভিজ্ঞতা !!! দাদীজান আমাদের রানী এ্যলিজাবেথ !!!
পুকুরে গোসলের সময় এক ভাই আরেক ভাইকে বলতাম এইবার শীত পরেনি এইবার পরেছে জার, জারের দিনে ঈঁদ হয় ! - সারা বছরে ঈঁদের আর সময় গময় নাই !!! ঝকঝকে পরিস্কার তবে ভয়ংকর ঠান্ডা পানিতে কাঁপতে কাঁপতে গোসল সেরে দাঁতে দাঁত যখন টিঃ টিঃ টিঃ বাড়ি খাচ্ছে আর শরীরে শীতের দুলুনী, তখন সব ঠান্ডা, শীত আর জারের কামড় ভুলে যেতাম ঘন দুধের জ্বালের ঘ্রানে - পাকঘরে নিঃস্বাস ফেলার জো নেই মতো ব্যাস্ততায় আছেন আমার গ্রীন আম্মা-বড় চাচী, আমার আম্মা, ও পাখি আম্মা-সেজো চাচী, আর সবার অভিভাবক “দাদীজান” !!! - তিনি বটবৃক্ষ, যার ডালপালা লতাপাতা - আমাদের পরিবার ।
ছোটবেলার ঈঁদ খুব মন টানে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই দাদীজানের সামনে, দাদীজানের প্রিয় খাবার আর আমাদের কাছে অমৃত ঈঁদের দিনে রান্না করা হাতে কাটা সেমাই !!! - এই সেমাই - ঘরে বসে আম্মা, চাচী বানাতেন কখনো ফুফু কেউ যদি আসতেন তারা রাতভর বাড়ীতে পিঠা বানাতেন আম্মা ও চাচীদের সাথে - কি যে আনন্দের দিন ছিলো, আর কি যে খুশির দিন - সেই দিন আর ফিরে পাবার নয় । অনেক রান্না আর খাবারের মধ্যে হাতে কাটা সেমাই রেসিপিও আমার কাছে মনে হয় এই খাবার এই পৃথিবীর না, অন্য কোন ভুবনের, অন্য কোনো পৃথিবীর, অন্য কোনো দেশের যেখানে - কোনো নিন্দা নেই, নেই কোনো দন্দ, নেই দুঃখ, হতাশা - আছে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা ।
হাতে কাটা সেমাই রেসিপি (আধুনিক যুগের)
উপকরণ
২ কাপ চিনিগুড়া পোলাও চালের গুঁড়ো
সিকি চা চামচ লবণ
১ কাপ পানি
৩ কেজি তরল দুধ (প্যাকেট তরল দুধ না, গুড়ো দুধের তরল অথবা গরুর দুধ)
খেজুরের গুড় এবং চিনি স্বাদমত
১২টি কিশমিশ
৪টি এলাচ
৪ টুকরো দারুচিনি
১টি তেজপাতা
২ চা চামচ গোলাপজল
প্রণালী:
১। প্রথমেই সেমাই পিঠার খামি তৈরি করে নিবেন যেভাবে - এক কাপ পানিতে একটু লবণ দিয়ে ফুটিয়ে নিন। পানি ফুটে এলে এতে চালের গুঁড়ো দিন এবং খুবই কম আঁচে সেদ্ধ করুন ১০ মিনিট। এরপর খামিরটা একটি আলাদা পাত্রে নামিয়ে নিন এবং একটু ঠাণ্ডা হতে দিন। খুব বেশী ঠাণ্ডা করবেন না। হাতে ধরার মত গরম থাকতেই মেখে খামির তৈরি করে নিতে হবে ।
২। খামির থেকে ছোট ছোট কিছু অংশ আলাদা করে নিন। খামিরটাকে ভেজা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখুন যাতে একদম শুকিয়ে না যায়। এরপর ছোট অংশটাকে একটু চালের গুঁড়োতে মাখিয়ে লম্বা দড়ির মত পাকিয়ে নিন। এর থেকে হাতেই কেটে নিতে হবে সেমাই পিঠা।
৩। এই পিঠা থেকে সেমাই তৈরির জন্য দুধ ফুটিয়ে নিন একটি পাত্রে। কম আঁচে রেখে বারবার নাড়ুন। ১০ মিনিটে দুধ ঘন হয়ে এলে আঁচ বন্ধ করে দিন এবং দুধ ঠাণ্ডা হতে দিন।
৪। একটি পাত্রে এক তৃতীয়াংশ চিনি এবং দুই তৃতীয়াংশ গুড় মিশিয়ে নিন আপনার ইচ্ছেমত স্বাদের জন্য। অথবা ইচ্ছে করলে পুরোটাই চিনি বা গুড় ব্যবহার করতে পারেন। এই মিশ্রণে অল্প করে পানি মিশিয়ে নিন এবং চুলোয় বা ওভেনে গলিয়ে নিন। এরপর তা ঠাণ্ডা করে নিন।
৫। ঠাণ্ডা করা দুধের সাথে এই ঠাণ্ডা গুড় দিয়ে মিশিয়ে নিন। গরম দুধে গুড় দিলে ফেটে যেতে পারে তাই একেবারে ঠাণ্ডা করে মেশাবেন। এরপর এতে এলাচ, কিশমিশ, দারুচিনি, তেজপাতা ও একটু লবণ দিয়ে ফুটিয়ে নিন। দুধ ফুটে এলে এতে সেমাই পিঠা দিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে ১৫ মিনিট রান্না হতে দিন। এ সময়ের মাঝেই দেখবেন পিঠা সেদ্ধ হয়ে যাবে, দুধটাও বেশ ঘন হয়ে আসবে এবং সবশেষে গোলাপজল দিন। এ পর্যায়ে চুলা বন্ধ করে দিন, কারণ ঠাণ্ডা হলে আরো ঘন হয়ে আসবে তা।
এবার গরম সেমাই পিঠা পরিবেশন পাত্রে ঢেলে নিন। ঠাণ্ডা বা গরম দুই উপায়েই পরিবেশন করতে পারেন সেমাই পিঠা।
ব্লগের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা সাথে থাকার জন্য ।
ছবি: সার্চ ইঞ্জিন গুগল ।
উৎসর্গ: লেখাটি উৎসর্গ করছি প্রিয় কবি ভাই “সেলিম আনোয়ার” ভাইকে, যিনি নিজেরে মধ্যে অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী ভাইকে খোজে পান ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ২:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



