somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যা হারিয়ে যায়

১২ ই অক্টোবর, ২০০৬ দুপুর ১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যা হারিয়ে গেছে? বরং বলতে পারি সবই হারিয়ে গেছে। সব, সব কটা বই, ছেলেবেলা, ছেলেবেলা থেকে জমানো সমস্ত কিছু, বই আমার। হারিয়ে গেছে। কি যে ছিল আর কি ছিল না, হারিয়েছে সেই স্মৃতিও। হারিয়েছে প্রায় সব নাম। চরিত্র।


পড়তাম দস্যু বনহুর সিরিজের বই। সুদর্শন সুপুরুষ বনহুর। যাকে দস্যু বলে কেউ বুঝতেই পারতনা। থাকে সে কান্দাইয়ের জঙ্গলে। অসংখ্য ঘোড়া তার আস্তাবলে। রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে সে শহরে আসে তার প্রেমিকার সাথে দেখা করতে। তার সেই প্রেমিকার নামও হারিয়েছে। মাকে লুকিয়ে পড়তে হত সে সব বই। মা একবার দেখল কি বাজেয়াপ্ত। হারিয়েছে সব কটি বনহুর। বনহুরের বই প্রথম হাতে আসে দাদার মারফত। প্রথম বইটি সে পায় তার কোন এক বন্ধুর কাছ থেকে, আর তারপরের বইটি সে কিনে আনে। আমি তখন বেশ ছোট, বই কেনার মত বড় হইনি তখনও কিন্তু পড়া শুরু হয়ে গেছে দাদার কল্যাণে। অপেক্ষা করে থাকতাম কখন তার পড়া হলে আমি হাতে পাব বইটি। আর বইয়ের জন্য দাদাকে বেশ খোসামোদি করতে হত। পড়া হয়ে গেলেই সে বইয়ের আর কোন মুল্য থাকেনা তার কাছে, কিন্তু যেই আমি পড়ব বলে নিতাম অমনি হয়ে যেত সেই বইটা মহামুল্যবান। কোন কারণে তার রাগ হলেই কেড়ে নিত সে বইটি। আর সেই রাগ তার হরবখতই হত।


কুয়াশা, যে ছিল এক গোয়েন্দা। দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াত সে। রাতের অন্ধকারে কালো আলখাল্লা পরে ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিজের কাজ করত সে। সমাধান করত নানা সমস্যার। সেই বয়সে বেশ হিরো হিরো একটা ইমেজ তৈরি হয়েছিল। পেপার ব্যাক এর পাতলা পাতলা বই। একশর উপর বই ছিল কুয়াশা সিরিজের। সব কটা তো ছিলনা, তবে ছিল বেশ কিছু। হারিয়েছে সব। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। স্কুলের লাইব্রেরী থেকে এনে পড়ি আমলকীর মৌ, স্তব্ধতার কানে কানে। দিলারা হাশেমের বই। বই দেওয়ার আগে লাইব্রেরী স্যার জানতে চাইতেন অত মোটা বই নিয়ে তো যাচ্ছ, পড়বে তো? স্যারকে অনুরোধ করতাম যেন দুটি বই দেন, কিন্তু একটির বেশি বই পেতাম না হাতে। লাইব্রেরী ক্লাসে যাওয়া ছিল বাধ্যতামুলক। ক্লাসের অনেক মেয়েই ছিল যাদের অনিচ্ছা সত্বেও যেতে হত, সেরকমই দুটি মেয়ে ছিল আমার বন্ধু, তাদের সঙ্গে চুক্তি ছিল তারা বই নিয়ে আমায় দিয়ে দেবে। এভাবে একদিনে তিনটি বই পেয়ে যেতাম। এক সপ্তাহের জন্য। বাড়ি ফিরে সেদিন আর খেলতে না গিয়ে সেই বই নিয়ে সোজা পড়ার টেবিলে। উপরে পড়ার বই নিচে গল্পের বই। এই চালাকিটুকু করতে হত মায়ের জন্য।


আমলকীর মৌ বইটি আমি পরে কিনেছিলাম। ঐ সময়টাতে আমি এমন সব আত্মীয় বন্ধুর বাড়িতে বেশি যেতাম যাদের বাড়িতে বই আছে। একবার বই আনা আবার ফেরত দেওয়া। প্রায় প্রতিবারই একটা করে বই রেখে দিতাম। পরে খোঁজ হলে অবশ্য ফেরত দিতে হত। সে বড় দু:খের ব্যাপার হত। ঈদ সংখ্যা বিচিত্রায় প্রকাশিত উপন্যাস মিউরাল এর শুধু নামটুকুই আছে। হারিয়েছে গল্প,চরিত্ররা। ইমদাদুল হক মিলনের হে প্রেম। চরিত্রের নাম চেষ্টা করেও মনে পড়ছেনা। তখন, সেই ৮০ সালে বেশ অভিনব ষ্টাইলে লেখা হে প্রেম মুগ্ধ করেছিল। হারিয়েছে সেটি এবংপরপর কিনে ফেলা মিলনের সবকটি বই।


সাপ্তাহিক বিচিত্রা। প্রতিটি সংখ্যা কি যত্নে জমিয়ে রাখতাম। ঈদের এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল ঈদসংখ্যাগুলো। জন্মদিনে পাওয়া রুশদেশের উপকথা। ইভানের ছেলেবেলা। কাকার কাছ থেকে পেয়েছিলাম শেষের কবিতা। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের সবকটি খন্ড। শরত্ রচনাবলী। হারিয়েছে সব। তিনগুণ বেশি দাম দিয়ে কেনা সব পুজোসংখ্যা। ভারতীয় লেখকদের লেখা বইয়ের আকর্ষণ ছিল অন্যরকম। বেশি দাম দিয়ে কিনতে হত বলে বেশ অনেকদিন ধরে টাকা জমাতে হত আর তারপরে রাত জেগে সে বই পড়া। বিয়ের পরে বরের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম উপহার,বই। উত্তরাধিকার, সোনার হরিণ নেই, বাবলি। সেই প্রথম পড়ি বুদ্ধদেব গুহর লেখা। তারপর পরপর পড়েছি তার বেশ কিছু বই। ওর লেখা বেশ খানিকটা যেন মেলে আমাদের সেলিনা হোসেনের লেখার সাথে। উল্টোটাও হতে পারে। বইয়ের নাম,চরিত্রের নাম,গল্প কিছুই ঠিকঠাক মনে নেই তাই সঠিকভাবে বলতে পারছি না।


ফাইন্যাল পরীক্ষা শেষে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কাকিমার বাপের বাড়ি থেকে এনেছিলাম অশনী সংকেত। বইটি পড়ে এমন মনে হচ্ছিল যেন আমিও আছি এক দুর্ভিক্ষের দেশে। খাবার দেখে ভেবেছি, খাবার? কোথা থেকে এলো? দুর্ভিক্ষ চলছেনা! পিসির বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পেয়েছিলাম "এক রমনীর যুদ্ধ'। পিসতুতো ভাইয়ের ছিল সেটি। পড়ব বলে চেয়ে এনে আর ফেরত দেওয়া হয়নি।


প্রথমবার কলেজ স্ট্রিট যাই বাংলাদেশ থেকে আসা এক আত্মীয়ের সাথে। তাদের কিছু বই কেনার ছিল,রঙ কেনার ছিল। মনে আছে আমার সেদিন, সারাটা দিন আমার কেটেছে ঐ বইপাড়ায়। এ দোকান, ও দোকান ঘুরে ঘুরে। বই দেখে। নতুন বই। পুরনো বই। বেশ কিছু বই কিনেছিলাম। বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা। মেয়ে তখন ছোট, তাকে তার জ্যাঠিমার কাছে রেখে সারাদিন বই দেখে বেড়ানো। হারিয়েছি সেই বই এমনকি বইয়ের নামও।হারিয়েছে বিয়ের পরে স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া সব চিঠিপত্র। সেগুলো রাখা ছিল একটা বন্ধ আলমারীতে অন্য বেশ কিছু দরকারী কাগজ-পত্রের সাথে। বেশ কিছুদিন পর পরিষ্কার করার জন্যে আলমারী খুলতে দেখা গেল উইয়ে খেয়েছে ভেতরকার যাবতীয় কাগজ। চিঠি কি কেবলই চিঠি। চিঠি যায়, সঙ্গে নিয়ে যায় আরো অনেক কিছু।


ধীরে ধীরে বই পড়া কমতে লাগল সময়ের সাথে সাথে। বাড়ি যখন যেতাম, প্রায় সব বই'ই নিয়ে যেতাম সাথে করে। রেখে আসতাম আমার অন্য সব বইয়ের সাথে। একটা সময় এমন এলো আমার পড়া বলতে শুধুই খবরের কাগজ। দেশে আলমারীতে সাজানো আমার সব বই,ম্যাগাজিন। বহু বছর তারা ছিল আমার অনুপস্থিতি সত্বেও। এখন আর নেই। প্রায় চার বছর বিবিধ কারণে দেশে যাওয়া হয়নি, যখন গেলাম, গিয়ে দেখি সবকিছুই তেমনি আছে নেই শুধু আমার বই। যে আলমারীতে আমার বই থাকত এখন সেখানে বিভিন্ন জিনিসপত্র।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অবশেষে ভোট দেশে

লিখেছেন সামিউল ইসলাম বাবু, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০৬



আমার বয়সে(৩০+) আজও সরকার নির্ধারণ বা নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি।

এখন প্রায় কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। তবুও নানা অজানা কারণে বিভিন্ন অনিশ্চয়তা ভোট হয় কি হয়না। সেদিন এক স্থানীয় পাতি নেতার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহার এবং আমার পর্যবেক্ষণ

লিখেছেন জীয়ন আমাঞ্জা, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭

বিএনপির প্রতি আমার যথেষ্ট ভালোবাসা কাজ করে, এবং ভালোবাসা আছে বলেই আমি তার প্রতিটি ভুল নিয়েই কথা বলতে চাই, যাতে সে শোধরাতে পারে। আপনিও যদি সঠিক সমালোচনা করেন, সত্যকে সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

=যতই মোহ জমাই দেহ বাড়ী একদিন ঝরবোই=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৯



আমিও ঝরা পাতা হবো, হবো ঝরা ফুল,
রেখে যাবো কিছু শুদ্ধতা আর কিছু ভুল,
কেউ মনে রাখবে, ভুলবে কেউ,
আমি ঝরবো ধুলায়, বিলীন হবো,
ভাবলে বুকে ব্যথার ঢেউ।

সভ্যতার পর সভ্যতা এলো,
সব হলো এলোমেলো;
কে থাকতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা যেন পারষ্পরিক সম্মান আর ভালোবাসায় বাঁচি....

লিখেছেন জানা, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৪২



প্রিয় ব্লগার,

শুভেচ্ছা। প্রায় বছর দুয়েক হতে চললো, আমি সর্বশেষ আপনাদের সাথে এখানে কথা বলেছি। এর মধ্যে কতবার ভেবেছি, চলমান কঠিন সব চিকিৎসার ফলে একটা আনন্দের খবর পেলে এখানে সবার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালাদেশের নির্বাচনী দৌড়ে বিএনপি–জামায়াত-এনসিপি সম্ভাব্য আসন হিসাবের চিত্র: আমার অনুমান

লিখেছেন তরুন ইউসুফ, ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৩



বিভিন্ন জনমত জরিপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করে ৩০০ আসনের সংসদে শেষ পর্যন্ত কে কতটি আসন পেতে পারে তার একটি আনুমানিক চিত্র তৈরি করেছি। এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×