বেশ কিছু কালবৈশাখী হয়ে গেল এরই মধ্যে। সেও আবার ছোটখাটো নয়, বেশ বড়সড়, তোড়ে জোরে।
মাঝরাতে সেদিন শুরু হয় প্রচন্ড হাওয়া। সোঁ সোঁ শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। বসে থাকি চুপচাপ। বাইরের উথাল পাথাল বাতাস আছড়ে পড়ছে জানালায়, পলকা জানালা বেচারারা কাঁপছে থরথর। আর বিছানায় বসে আমিও। কাঁচ ভাঙার ঝনঝন শব্দে উঠে গিয়ে দেখি খাওয়ার ঘরের জানালার কাঁচ ঘরময়। বোধ হয় ছিটকিনি ঠিকঠাক আটকানো ছিল না! ভাঙা কাঁচ পরিষ্কারের চেষ্টায় না গিয়ে আবার এসে বসি বিছানায়। এবার ঘুরে ঘুরে দেখে নিয়েছি, সব কটা জানালা বন্ধ তো!
এইরকম সব ঝড়ের দিনে আম্মা আজান দেয়। আগে দাদি দিত। প্রথমে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করত, এই তোরা আজান দে রে! মসজিদ থেকে আজানের আওয়াজ কানে আসতো,কিন্তু দাদি ওতে স্বস্তি পেত না। ওঘরে বড় কাকাকে গিয়ে বলতো, আজান দে রে! আজান দে! কিন্তু বড় কাকার আজান দেওয়ার অপেক্ষায় দাদি থাকতো না। নিজেই আজান দিতে শুরু করে দিত। দাদা চুপ করে বসে থাকতো নিজের বিছানায়।
দাদি তাঁর এই ভয় সংক্রামিত করে দিয়ে গেছে আম্মার ভিতরে। এখন ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলেই আম্মা চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। কই রে তোরা, কে কী করছিস, আজান দে! আজান দেয় মসজিদের মুয়াজ্জিন, ওঘরে বড়কাকা আর আম্মা। চারপাশ থেকে আজানের আওয়াজ আসতে থাকে। ঝড়ের শব্দকে দাবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। ঝড়কে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। এক সময় ঝড় থামে। আম্মা স্বস্তি পায়, স্থির হয়ে বসে, বলে, ঐ দ্যাখ, সবাই মিলে আজান দিলে ঝড় থেমে যায়! আর আব্বা চুপ করে বসে থাকে বিছানায়, ঠিক যেমন করে দাদা বসে থাকত!
কোন গাছের ডাল ভাঙলো, কোন কচি চারাটা উপড়ে গেল জড়সমেত, সব আম কী ঝরে গেল! বেড়াটাও পড়ে গেল, সেদিনকেই তো দেওয়া হল! অন্ধকার রাতে ঝড়ের পর দাদি বড়কাকাকে সাথে নিয়ে বেরোত, হাতে বড় টর্চ। যেন এই মাঝরাতেই দাদি সব ঠিক করে দেবে! ঘুরে ঘুরে দাদি দেখত ঝড়ের রেখে যাওয়া চিহ্ন।
সময় চলে গেছে। যুগ কেটে গেছে। পুরনো মুখেরা সব কবরে শুয়ে। যাঁরা চলে গেছেন, তাঁরা নিজেদের রেখে গেছেন পরবর্তী প্রজন্মে। কেমন করে জানি না কিন্তু দাদা আর দাদি ভীষণভাবে রয়ে গেছেন আব্বা আর আম্মার ভেতরে।
( আজ বছর পয়লার দিনে লিখতে বসে তাঁদের কথা খুব মনে পড়ছে। আমার দাদা আর দাদির কথা। )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


