somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারত-ইরান সুসম্পর্ক: আবেগের উর্ধ্বে অর্থনীতি নির্ভর পররাষ্ট্রনীতির এক দৃষ্টান্ত

২৭ শে আগস্ট, ২০১৮ রাত ১০:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


উদীয়মান চীন ও অনিশ্চিত যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে সুক্ষ্ম সুতার উপর হেঁটে চলছে মৌদির অর্থনীতি। যেখানে আবেগের কোন স্হান নেই। মুনাফা ব্যাতীত ভূ-রাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে যে অনাগ্রহী চীনের পথ ধরেই এগিয়ে চলছে ভারত। তার সর্বশেষ নজির যুক্তরাষ্টের অবরোধের মাঝে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ-ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফের বৈঠক। পাশ্চাত্যের সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এবং তেহরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৮ মে ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে তার দেশকে বের করে নেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনর্বহাল করা হবে। এমন উত্তপ্ত পরিস্হিতিতে বিশ্ব নেতৃত্বের দৃষ্টি যখন এই বৈঠকের দিতক ঠিক সে সময়েই বাজ পাঠালেন সুষমা। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অন্যান্য দেশের চাপের মধ্য তৈরি হয়নি। যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কারো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না… আমরা জাতিসংঘ অবরোধকে স্বীকার করি, কোনো বিশেষ দেশের অবরোধকে নয়। আগেও আমরা মার্কিন অবরোধ মানিনি।’ তার নজিরও আছে অবশ্য সুষমাদের। অতীতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান, ভেনিজুয়েলা ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করেছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্র সরকার উত্তর কোরিয়ায় দূতাবাস বন্ধের অনুরোধ করলেও ভারত কর্ণপাত করিনি। এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার সময়ও ভারত সেদেশ থেকে তেল কিনেছে।

শুধু তাই নয়, ব্রিকসের দুই দেশ(ব্রিক্স হলো পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের: ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, আদ্যক্ষরের সমন্বয়ে নামকরণকৃত উদীয়মান জাতীয় অর্থনীতির একটি সংঘ) চীন ও রাশিয়ার পর এবার তাল মিলিয়ে চলতে ভারত বিন্দুমাত্র সংশয় রাখেনি। ভারত আরো বেশি এগিয়েছে এবং ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখবে। ইরান হলো ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী। তারা রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ইউসিওর মাধ্যমে রুপিতে মূল্য পরিশোধ করতে চায়। আগের মেয়াদের চেয়ে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ইরানের কাছ থেকে ভারত ১১৪ ভাগ বেশি তেল কিনেছে। যদিও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের পরিমাণ ১১৫ বিলিয়ন ডলার। আর ভারত-ইরান বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ১৩ বিলিয়ন ডলার।

কিন্তু তবুও কেন এতো ফিরিতি তাহাদের? এ বিষয়ে কথা বলে আইএমএফের পরিসংখ্যান। তাদের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হতে পারে এবং এর জিডিপি উন্নীত হতে পারে ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে তারা ফ্রান্স, ইতালি, ব্রাজিল ও রাশিয়া থেকে এগিয়ে থাকছে। প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য জ্বালানির খুবই প্রয়োজন। ফলে ইরানি জ্বালানি কেনা ভারতের জন্য জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। ভারত ও ইরানের মধ্যকার ব্যাপকভিত্তিক অংশীদারিত্বের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ কানেকটিভিটি করিডোর, ব্যাংকিং, বীমা, জাহাজ চলাচল এবং আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে ডলারকে এড়িয়ে রুপি ও রিয়ালে সবকিছু ব্যবহার করার সম্ভাবনা। ভারত-ইরান ইতোমধ্যেই ইউরো দিয়ে বাণিজ্য করছে। ফলে তারা মার্কিন ডলার এড়িয়েই বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারবে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে ইরানি পরমাণু চুক্তি বাতিলের বিষয়টিও ইইউ গ্রহণ করছে না বলেই ধরা যায়। ফলে ভারতের তেল আমদানিও চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের তোয়াক্কা না করে।
ভারত এখানেই থেমে থাকেনি। ভারত তার আলোচিত "পুবে তাকাও" নীতি বা "লুক ইস্ট" পলিসি ("Look East" Policy) অর্থাৎ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বৈদেশিক সম্পর্ক বিস্তারের কার্যকরী পরিকল্পনা নীতির সাথে সাথে ইরান-আফগানিস্তানের দিকেও নজর দিয়ে যাচ্ছে । এইভাবে ভারত তাকে একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করার সাথে সাথে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চীনের কৌশলগত প্রভাব খর্ব করার নিমিত্তেও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে। যেমন, চীনের আদলে কানেকটিভিটি রাজনীতিও শুরু করে দিয়েছে ভারত। ভারত-আফগানিস্তান-ইরান কানেকটিভিটি করিডোর নিয়ে নয়া দিল্লির অব্যাহতভাবে কাজ করে চলছে। ইরানের চাহাবার বন্দরে এ পর্যন্ত ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে ভারত । চাবাহার-জাহেদান রেলওয়ের নির্মাণকাজ চলছে। চাবাহার হলো ভারতীয় সংস্করণের নতুন সিল্ক রোড। এটি পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সাথে ভারতকে যুক্ত করবে। মূলত ২০১৬ এর মে মাসে চাবাহার বন্দরকে করিডর হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ত্রিপাক্ষিক চুক্তি করে ভারত। তাতে স্বাক্ষর করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি, আসরাফ গনি ও হাসান রৌহানি
যদিও সুষমা স্বরাজের এ বক্তব্য দেওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে ওয়াশিংটন থেকে রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ব্যাপারে ভারতকে সতর্ক করে দেয়া হয়। যদিও ওয়াশিংটন আগে এধরনের ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ব্যাপারে তাদের কোনো আপত্তি নেই বলে জানিয়েছিল। ভারত পুরোনো মিত্র রাশিয়া ও অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বুঝে শুনেই চলতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়ত ভারত এখন বাধার মুখে পড়তে পারে। চীনের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য এবং আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রভাব খর্ব করে ভারত তার প্রভাব বৃদ্ধি করতে যেয়ে এর আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা পেয়েছে। কিন্তু অর্থনীতি ও আস্হার সহিত বৈশ্বিক রাজনীতি স্বার্থে ভারত তার কাজ করে যাছে। এইতো আজ সোমবার রাশিয়ার কাছ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রথম চালান পেয়েছে ভারত। ভারতে গ্যাস-ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অংশ হিসেবে এই চালান আসলো। শুধু তাই নয় ভারত সরকার ‘রাশিয়ান হেলিকপ্টার্স’ ও ‘হিন্দুস্তান এরোনটিকস লি.’ (এইচএএল)-এর যৌথ উদ্যোগে রাশিয়ার কাছ থেকে ২০০ কামভ কা-২২৬টি এ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার ব্যাপারে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের চুক্তিটি অক্টোবরের মধ্যেই সম্পন্ন করার সকল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সুতারাং ভারতের কথা ক্লিয়ার। যেখানে অর্থনৈতিক ও আস্হার বিষয় জড়িত সেখানে তারা কাজ করে যাবে। এতে সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড়ো শক্তির তোয়াক্কা তারা না হয় করলো না!
ইরান সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এমন কঠিন অবস্থান শুধু যে মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতি নয় বরং বলা চলে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির স্বার্থে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের যে হারে মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে ইরানের মতো দীর্ঘদিনের সহযোগীকে ছেড়ে নতুন উৎস খুঁজতে যাওয়ার কোন মানে খুঁজে পায়না ভারত। কারণ, যখন মার্কিন অবরোধের মুখে কেউ ইরানের কাছ থেকে তেল কিনতে সাহস পায়নি তখন চীন ও ভারত ইরানের কাছ থেকে তেল কিনেছে। ইরানের বিরুদ্ধে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার সময়ও ভারত সেদেশ থেকে তেল কিনেছে। কম সময়ে সরবরাহে সক্ষম ইরান ভারতকে তেল পরিবহনের ব্যয় থেকেও ছাড় দেয়। বিশ্বে তেলের তৃতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক দেশটি তাহলে কেন ইরান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে? বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান-ভারতের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে ভিন্নতর উচ্চতায় উপনীত হয়েছে। উভয় দেশের দৃঢ়তায় দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ব্যবসা- বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে যার প্রভাব ছাড়িয়ে চলছে অনেক হিসেব-নিকেশ কে।
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে আগস্ট, ২০১৮ রাত ১০:৫০
৬টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৩৬

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

USB Charger এর ভেতরে লুকানো ক্যামেরার ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৬



স্বাধীনতা পরবর্তী, পচাত্তর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ক্যু হয়েছে দেশে। সামরিক বাহিনীতে সংঘাত। বহু সদস্য হতাহত। জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাঝা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



বর্তমানে জনসংখ্যার বিচারে 'বিহার' ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য।
বিহারের রাজধানী পাটনা। বিহার মূলত দরিদ্র অঞ্চল বলা যেতে পারে। এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ছিলো মূলত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ক্যাশলেস সোসাইটি এর জন্য কি পারফেক্ট?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



এটা বাংলা কিউ আর কোড। বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাবসায়ীদের বাংলা কিউ আর কোড বাধ্যতামূলক করেছেনভ এটার ভালো দিক ও খারাপ দিক দুইটাই আছে। বাংলাদেশের সিস্টেম, কারিগরি দক্ষতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×