বিগত এক বছর ধরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে বারবার নক করলেও সবাই বিষয়টি এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে চীন ও ভারতের স্বয়ং মায়ানমারের পক্ষে অবস্হান নিয়ে তাদেরকে সমর্থনের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকে ব্যাথিতই করেনি বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রশ্নের সন্মুখীন করে তোলে। মোদি সরকারের মায়ানমারের সাথে পরকীয়া প্রেম প্রকাশ হওয়ায় ঢাকার সাথে মূলত সম্পর্কের চিড় ধরো শুরু হয়। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গত ১০ মে মায়নমার গিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিত কয়েকটি সমঝোতা স্বাক্ষর হওয়ার পাশাপাশি নভেম্বরে নরেন্দ্র মোদি সফরের সময় রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নের জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদানের যে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন তা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা করলেন। এখানে বলে রাখা ভাল, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত উদ্বিগ্ন কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহি প্রবন রাজ্য নাগাল্যান্ড ও মনিপুরের সীমান্ত রয়েছে মায়ানমারের সাথে। উক্ত দুই রাজ্যের সক্রিয় কিছু জঙ্গি সংগঠন মিয়ানমারে আশ্রয় নেওয়ায় ভারত উদ্বিগ্ন।
এমন পরিস্হিতিতে ভারতের মায়নমারে সরকারের সাথে সুসম্পর্কটা জরুরী হয়ে পড়েছে। পক্ষান্তরে মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারতের সাথে তার প্রতিবেশী দেশগুলো চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ায় মায়নমারের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টিতে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকাটাও ভারতের জন্য বেমানান হয়ে যাবে। কারণ ভারতের চরম আপত্তি ও চোপের কারণে কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরী করতে ব্যর্থ হয়ে চীন তার প্রকল্প মায়ানমারে নিয়ে যায় এবং ইতিমধ্যে মিয়ামারের রাখাইনে কাওয়াকফু গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মান করেছে।
সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় যে মহুর্তে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে অস্হির সে সময়ে স্বয়ং ভারত আসামে অবৈধ বসবাসকারী বাংলাদেশীদের খুঁজে বের করার নামে জাতীয় নাগরিক তালিকা (National Register of Citizenship -NRC) নবায়ন করলো। বাদ পড়লো প্রায় দেড় কোটি মানুষ!। যাদের অধিকাংশই নাকি মহান স্বাধীনতার সময় এই পার থেকে যাওয়া। মুসলিম জনগোষ্ঠির বৃহৎ এ অংশের বিষয়ে যদি যথাযথ সুরহা না হয় তার চাপ পড়বে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের উপর। অনেকে এটাকে বলছেন মুসলিমদেরকে বাদ দেওয়ার জন্যই কংগ্রেসের ভোট ব্যাংকে অশান্তি সৃষ্টি করে পায়দা লুটতে মোদি সরকারের হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদী নীতির একটি কৌশল এটি। সবচেয়ে আর্শ্চয়ের বিষয় এটি করতে গিয়ে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি (৫ম) ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ এর পরিবারও বাদ পড়েছে তালিকা থেকে!
যাইহোক মূল কথা হলো পররাষ্ট্র নীতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হলো বাংলাদেশ খুব চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে তার স্বার্থের জায়গা থেকে। একদিকে দিল্লীর সাথে ঢাকার রক্তের সম্পর্কের টানপোড়ন অন্যদিকে টাকাওয়ালা চীনের মন রক্ষা করে চলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশ নীরবে তাদের থলে ভারী করতেছে। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যান এবং কিছু সমঝোতা চুক্তি করে আসেন। যার মধ্যে বেশ কিছু প্রকল্পে বিনিয়োগ ও ঋণ সহায়তা পোগ্রামের সাথে ছিলো দুটি সাবমেরিন ক্রয় বাবদ এক হাজার ৫৬৯ কোটি টাকার চুক্তি। যা নরেন্দ্র মোদি সরকার স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে নি। এর পরই ২০১৫ সালের জুনে নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফর করে বাংলাদেশের সাথে ২৪ টি চুক্তি স্বাক্ষর করেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো ২০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা দেওয়ার চুক্তি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুই দিনের সফরে আসেন যাতে ২৬ টি সমঝোতা চুক্তি হয় যার মাঝে ১২ টি ছিল ঋণ চুক্তি।
এখানেই শেষ নয়, এরপর বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারত সফর করেন এবং দুই দেশের মাঝে ৩৬ টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যার মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তিও ছিলো । সবচেয়ে হাস্যকর হলো পূর্বের দুই ধাপে ভারতের সহিত সম্পাদিত ৩০০ কোটি ডলারের চুক্তির মধ্যে ভারত মাত্র ৩৫ কোটি টাকা (ডলার নয়) ছাড় দিলেও পুনরায় অক্টোবরে আরো ৪৫০ কেটি ডলারের ঋণ চুক্তি সই হয় ।তাহলে মূল বিষয়টা কি দাঁড়ালো, বাংলাদেশ থেকে তারা দুই হাতে চুক্তি স্বাক্ষরিত করে নেওয়ার এক প্রতিযোগিতায় যেন নেমে পড়ে গেল। এর থেকে পিছিয়ে ছিলোনা রাশিয়াও।রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলারের ( প্রায় ৯২ হাজার ডলারের)সর্ব বৃহৎ চুক্তিটি ভাগিয়ে নেয় তারা সবার আগেই। সাথে সেনাবাহিনীর নিকট ৮ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র বিক্রি!।যদিও এর পূর্বে বাংলাদেশ সর্বদা চীন থেকেই অস্ত্র ক্রয় করতো এখনো বাংলাদেশের অস্ত্র ক্রয় চীন নির্ভর। এখানেও ভারতের সাথে মন খারাপ হয় বাংলাদেশের। ভারত চায় বাংলাদেশ অস্ত্র ভারত থেকেই সংগ্রহ করুক অথচ ভারত নিজেই অস্ত্র আমদানিকারক দেশ! আর এখন আমেরিকার সাথে ভারতের টানপোড়ন সৃষ্টি এ অস্ত্র ক্রয় কে কেন্দ্র করে। ভারত তার অস্ত্র ক্রয়ের জন্য রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল বরাবরই। এরই মধ্যে নয়া দিল্লি এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আলমাজ-অ্যান্টে করপোরেশনের সাথে আলোচনা করছে। গত ৩ এপ্রিল মস্কো বৈঠকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সিতারামন ও তার রুশ প্রতিপক্ষ জেনারেল সার্গেই শোইগো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তারা দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা নিয়েও কথা বলেন। এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ ক্রয়ের চুক্তিটির মূল্য আনুমানিক ৫.৫ বিলিয়ন ডলার (৩৯,০০০ কোটি ভারতীয় রুপি)। কিন্তু এতে বাধা আমেরিকা। ভারতের সাথে আমেরিকার ‘কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভাসারিস থ্রু স্যাঙ্কশনস অ্যাক্ট’ (সিএএটিএসএ) চুক্তি রয়েছে। এ চুক্তি আমেরিকা ভারতের ওপর প্রয়োগ করলে তা আমেরিকা-ভারতের জন্য ভাল বার্তা বয়ে আনবে না। কারণ সিএএটিএসএ-এর ২৩১ ধারাটিতে বলা হয়েছে, কোনো দেশ যদি রাশিয়া থেকে উচ্চমূল্যের সামরিক সরঞ্জাম কেনে, তবে তার ওপর অবরোধ আরোপ করা হবে। মজার বিষয় হচ্ছে রাশিয়া ইতোমধ্যেই চীনকে এস-৪০০ সরবরাহ শুরু করে দেওয়ায় দিল্লি চাচ্ছে চুক্তিটি তাড়াতাড়ি করে ফেলতে। কারণ এটা তার জন্য চালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।সব মিলিয়ে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক খারাপ হওয়া মানে তার পররাষ্ট্রনীতিতে আরো নানা সমীকরণের পরিবর্তন হয়ে যাওয়া!
এখানে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে ভারত ও চীনের দ্বন্দ্বের সুবিধা ভোগকারী দেশ হতে কি পারতেছে বাংলাদেশ?। তাদের এই প্রতিযোগিতায় মায়নমার যথেষ্ট সুবিধা আদায় করে নিতে পারলেও আমরা তি তা করতে সক্ষম হচ্ছি। ব্যবসায়ী বলি,কূটনীতিক বলি আর সশস্ত্র বাহিনী বলি গত ১০ বছর পূর্বেও সূচকে যেখানে আমরা মায়ানমারের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম এরই মধ্যে কি হলো এমন। মায়নমারের এ শক্তি অর্জনের উৎসটা আমাদের নিকট অনেকট সুষ্পষ্ট। অনেকটা ধরাশয়ী হয়ে গেলেও এখনো আমাদের সে সুযোগ আছে। তবে আমাদের সম্প্রতি ব্যাংকিং ব্যবস্হার মুনাফা সাবাড় করে ফেলার মতো সংকটের মধ্যে তারা আস্হা আনতে পারছে না। যাইহোক সে এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয় তবে পররাষ্ট্র নীতির সাথে এসব জড়িত ।
মূল কথা হলো ভারত-বাংলা সম্পর্কে মৌলিক পরিবর্তন হতে যাচ্ছে, যার সূত্র হচ্ছে চীন-ভারতের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের জগতে বাংলাদেশ প্রবেশ করে তার নিজের থলে বারি কতটুকু করতে পারছে না যা আছে তাও উজাড় করে দিচ্ছে অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক অসুস্হ প্রতিযোগিতার ফল নিজেদের ঘরে আনার স্বার্থে তা দেখার বিষয়।আন্তর্জাতিক মাঠে আমাদের এ খেলাটা আগে হয় নি । আমরা নবীন। এ খেলায় আমরা কতটুকু ভাল খেলতে পারছি বা পারবো তা নিয়ে জনগণের মুখোমুখি হচ্ছে কি রাজনৈতিক শক্তি গুলো? এগুলো নিয়ে কোন প্রকাশ্য আলোচনা এমনকি ভোটারদের মধ্যেও হচ্ছে না। সবাই ভোটের বাজারের সস্তা গুজব ও কাদা ছড়াছড়ি নিয়ে মাঠ গরম করে চলছে। হ্যাঁ, আমিও একটি রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী, কিন্তু আমি চাই আমাদের পররাষ্ট্র নীতির খেলায় আমার দেশ এগিয়ে চলুক। এ খেলা তারুণ্যকে বুঝতে হবে। তার জন্য সব রাজনৈতিক শক্তির নিকট তারুণ্যের জিঞ্জাসা বাড়াতে হবে (সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ। চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




