somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অব্যক্ত অশ্রুধারা

০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ ভোর ৫:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বন্ধু সোহেলের সাথে দেখা হয়েছিলো জার্মানি আসার সাপ্তাহ খানেক আগে। সারকারখানার এফ টাইপ বিল্ডিং গুলোর মাথায় তথা ব্যাচেলর হোস্টেলের পেছনের পাশ ঘেঁষে সরীসৃপের মতো একে বেঁকে চলা অপ্রসস্থ কাঁচা যে রাস্তাটি কলোনির মেইন গেটের সাথে গিয়ে মিশেছে তারই কোথাও ক্ষণিকের সাক্ষাত। দিগন্তের সোনালি লাল আভা মিলিয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। দূর থেকে ভেসে আসা স্ট্রিট ল্যাম্পের আধো আলো আর আধো অন্ধকারে বন্ধুর চেহারাটা স্পষ্ট দেখতে না পেলেও বছরের পর বছর ধরে দেখে আসা সর্বদা হাসিমাখা মুখ খানায় যে সেদিনও হাসি লেগে ছিল তা এখনও বেশ মনে আছে। ব্যস্ততার কারনে খুব একটা বেশী কথা বলা হয়নি সেদিন। এতটুকু মনে পড়ে, বিদায় বেলায় বন্ধুকে বলেছিলাম, “আল্লাহ্‌র উপর ভরসা রাখো। উনি চাইলে খুব তাড়াতাড়ি সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার সাথে মিলবে এমন কিডনি পাওয়া যাবে ইনশা আল্লাহ”। অতঃপর একটা দীর্ঘ আলিঙ্গন। দেখতে দেখতে প্রায় আড়াই বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো। সেটাই ছিল তার সাথে শেষ দেখা। এরপর আর কোনোদিন দেখা হয়নি তার সাথে। এই পৃথিবীতে আর হবে ও না।
.
ফেনী ছেড়ে কর্মস্থল ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবার ঠিক আগ মুহূর্তে হাসপাতালে দাদী কে দেখতে গিয়েছিলাম। চোখ বন্ধ করে প্রায় নিথর হয়ে শুয়ে ছিলেন হাসপাতালের বিছানায়। দাদীর পরনের সাদা শাড়ি আর হসপিটালের সাদা বিছানার চাদর যেন মিশে একাকার। ক্ষীণ শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে হালকা বুকের উঠানামা। মনে মনে বিগত জীবনের সাদাকালো ছবিগুলোকে কি আবারও রঙিন ফ্রেমে আঁকছিলেন কিনা জিজ্ঞেস করা হয়নি। আমি দেখতে এসেছি একথা কে যেন বলতেই উঠে বসতে চেয়েছিলেন। মানা করা সত্ত্বেও শুনলেন না। মেঝ ফুফুর হাত ধরে অনেক কষ্টে উঠে বসতেই কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আলতো করে কপালে একখানা চুমু দিয়ে বলেছিলাম, “চিন্তার কোনো কারন নেই। গতকাল রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি, আপনি সুস্থ হয়ে গেছেন। আল্লাহ্‌ চাইলে এবার সুস্থ হয়েই যাবেন। আগামী সাপ্তাহে আমি আবার আসবো ঢাকা থেকে, তখন আপনাকে আর হাসপাতালে দেখতে চাই না”। আমার কথা শুনে একটু করে হেসেছিলেন। মাথায় হাত দিয়ে দোয়া ও করেছিলেন। আমি বের হয়েছিলাম ঢাকার উদ্দেশ্য নিয়ে। ওই ছিল দাদীর সাথে শেষ কথা, শেষ দেখা। সেটাই ছিল শত সহস্র চুমুর শেষ চুমু। কয়েক ঘণ্টা পরই দাদী চলে গিয়েছিল দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক মিটিয়ে দিয়ে। অদ্ভুত একটা মিষ্টি গন্ধ ছিল দাদীর শরীরে। আজ পাঁচটি বছর হয়ে গেলো দাদী আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু আজও এলোমেলো কোনো রোদেলা দুপুরে কিংবা ক্লান্ত শেষ বিকেলে একটুখানি দমকা হাওয়ায় ভেসে আসে দাদীর শরীরের সেই মিষ্টি গন্ধ। কোথা থেকে যে আসে সেই হাওয়া তা আজও ভীষণ রহস্যময়। মিলিয়ে যাওয়ার আগেই প্রান ভরে নিয়ে নেই সেই হাওয়াটুকু। কে যেন কানে কানে বলে যায় তোর দাদীকে মনে রাখিস। ভুলে যাস না কখনও।
.
ভুলে যাই ও নি দাদীকে। খুব ছোট বেলায় নানা, নানিকে হারিয়েছি বলে তাদের স্মৃতি মনে পড়ে না খুব একটা। আর দাদাকে তো দেখাই হয়নি কখনও। তবে মনে পড়ে বুলবুল মামা আর মনির ভাইয়ের আব্বাকে। আমার বিয়ের দিন রাতে স্ট্রোক করেছিলেন মামা। দিন কয়েক পরই পৃথিবীর সাথে তিনি ও সম্পর্কছেদ করেন। মনির ভাইয়ের আব্বার মুখ খানা তো প্রায়ই চোখে ভাসে। দুরারোগ্য ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন দীর্ঘদিন। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবার আগে দেখা করতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম উনার সাথে। ছোট্ট মানুষটা যেন আরও ছোট্ট হয়ে গিয়েছিল। ছোট খাটো হলে ও খুব শক্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন চাচা। মনির ভাইয়ের পর ছেলে বলতে আমাকেই বুঝতেন। চার বছর বয়স থেকে চাচার সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আমার। আমাকে দেখেই অঝোরে কেঁদেছিলেন। খুব কষ্ট করে নিজের কান্নাকে রুদ্ধ করে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়েছিলাম তাড়াতাড়ি সুস্থ হবার। হননি। বাড়ি যাবার দিন যাত্রাপথে চাচার মৃত্যুর খবর শুনি।
.
জার্মানি। দিনশেষে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। সারাদিনের অসংখ্য উলট–পালট, প্রাসঙ্গিক–অপ্রাসঙ্গিক শত চিন্তা ভাবনার মাঝে কখন যে চরিত্রগুলো মনের গহীন থেকে মস্তিষ্কে চলে এসেছে বুঝতেই পারিনি। প্রায় ২০০ কিলোমিটার কিংবা তার ও বেশী গতি নিয়ে শা শা করে ছুটে চলছে জার্মানির রিজিওনাল এক্সপ্রেস ট্রেন ব্রাউনশোআইগ শহরের উদ্দেশে। দিনের আলো ফুরিয়ে যাওয়ায় জানালা দিয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলোকে আর চোখে পড়ছে না। সবকিছুই নিকষ কালো অন্ধকার। দূরের বাড়ি ঘর থেকে মিটমিট করে জ্বলা আলোর উৎসগুলোও পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। এ যেন একে অপরের সাথে মিলিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা।
.
মানুষের জীবনটা কেন এমন? কেন মানুষগুলো মিলিয়ে যায় আলোর উৎসগুলোর মতো? কিসের জন্য মানুষ মানুষকে ভালবাসে, মনে রাখে? কেন আপনজন চলে যাবার দৃশ্য সবসময় বেদনাবিধুর? ভাবতে ভাবতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম জানালার কাছ থেকে। গলার কাছে জমাট বাধা কষ্টগুলো কেন যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মাথা নিচু করে বসে রইলাম কোলের উপর রাখা ব্যাগের দিকে। অশ্রু সজল দুচোখ থেকে নীরবে নিজের অজান্তে কয়েকফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো ব্যাগের উপর। আলতো হাতের স্পর্শে চোখের পানি মুছে নিলাম নিজেই। যন্ত্রের দেশে কান্না যে বড় বেমানান। যন্ত্রের দেশে যে বাঁচতে হয় যন্ত্র হয়ে, আমাকে ও বাঁচতে হবে হাজারো ব্যস্ততা বুকে নিয়ে, বাঁচতে হবে হাসি ঠাট্টা, আনন্দ ফুর্তির মাঝে একমুঠো সুখের সন্ধানে। জীবনের ডায়েরি যে শুধু সামনের দিকেই এগিয়ে চলে। নতুন নতুন গল্প কাহিনী লেখা হয় পাতায় পাতায়। পেছনের পাতাগুলো শুধু রয়ে যায় ধুলো মলিন। কেউ উল্টানোর প্রয়োজন ও মনে করে না।
.
হে বিশ্বভ্রাক্ষণ্ডের মহান প্রতিপালক, আপনার কাছে আমরা আমাদের মৃত আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। হে পরম রহমতের বাদশাহ, আপনি তাদের সবাইকে কবরের আজাবের হাত থেকে রক্ষা করুন, আপনার বানানো জান্নাতে তাদের আবাসস্থল নিশ্চিত করুন। আমাদেরকে ও তার মধ্যে শরীক করুন। আমিন। ছুম্মা আমীন

Braunschweig, Germany থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ ভোর ৫:০২
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×