somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষ মানে মানুষ।

১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানুষ বলতে যদিও একজনকে বুঝানো হয়, তথাপি মানুষ মানে প্রাণীজগতের একটি প্রজাতি। মানুষ জাতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের পরেও একটি মহামানবজাতির অংশ। বিশ্বের সকল মানুষই তার স্বজন। সমগোত্রীয়। এমন বৈজ্ঞানিক সত্য জানার পরেও মানুষে মানুষে মৈত্রী সব সময় সম্ভব হয় না। প্রধানত রাজনৈতিক ও জাতিগত হিংসার কারণে মানব সমাজের একটি অংশ আরেকটি অংশকে হনন করতে চায়। শক্তি ও ক্ষমতার বলে হত্যা ও নিধনের চেষ্টা চালায়। রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে ফাঁসি দেয়, জেলে পাঠায়, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়। এমনটি যে কেবল আদি বা মধ্যযুগে হয়েছে, তা নয়, অতি আধুনিক বর্তমানকালেও বিশ্বের দেশে দেশে ঘটছে। আমাদের চারপাশে এবং চোখের সামনেই ঘটছে। অথচ এমনটি ঘটা মোটেও উচিত নয়; এমনটি ঘটার কথাও নয়। কিন্তু উগ্র রাজনীতিবিদগণ প্রতিনিয়ত হিংসা, বিদ্বেষ প্রচার করে জনগণকে বিষাক্ত করে ফেলে। জনগণকে উগ্রতার দিকে ঠেলে দেয়। মানুষকে বাধ্য করে প্রতিপক্ষ নিধনে। এসবই করা হয় এমন একটি রাজনৈতিক ফন্দিতে যে মানুষ ন্যায়-অন্যায় বোধ হারায়। হত্যা ও নিধনকেই মনে করে বৈধ। অপরাধকে মনে করে পুণ্য। এক বারও চোখ খুলে প্রকৃত ঘটনাটি দেখতে চায় না বা দেখতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ মানুষকে সব দেখতে বা জানতে দিতে চায় না। একটা প্রচ্ছন্ন গুজব, প্রচারণার প্রবল আচ্ছন্নতা ইত্যাদির দ্বারা এমনই একটি পরিবেশ আরোপ করা হয় যে, যুক্তি বোকা ও বোবা হয়ে যায় আবেগের তীব্রতার সামনে। নৈতিকতার কথা বলতে ভয় পায়। ন্যায়-অন্যায় বোধ বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এক প্রবল উন্মাদনায় সবাই তখন উগ্রতারই অনুসরণ করে। মানুষের আর্তনাদ শুনতে পায় না। সত্যের পরাজয় দেখতে পায় না। এ রকম অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি ও পরিবেশে প্রতিপক্ষের ক্ষুদ্র জাতি, দল বা ব্যক্তিকে নিধন ও নির্মূল করার উৎসব চলে।
এ রকম উগ্রতার বিকাশ, পৃষ্ঠপোষকতা ও চর্চার কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। প্রথমত ও প্রধানত যে কারণটির কথা বলা যায়, তা হলো, নিজের অপরাধ ও অপকর্মকে আড়াল করার প্রবণতা। মানুষের দৃষ্টি ও আগ্রহ সরিয়ে দেয়ার জন্য এমন উগ্রতা ও সেনসেশন তৈরি করা হয়। এর ফলে দুর্নীতি, অপকর্ম, স্বৈরতা চাপা পড়ে। মানুষ যুক্তিবাদী মনে নানা বিষয় ও কার্যক্রম বিচার-বিশ্লেষণ করার সুযোগ পায় না। সবাই তখন লেলিয়ে দেয়া ইস্যুর পেছনে পাগলের মতো ধাওয়া করে। হিটলার তার স্বৈরতা ও একনায়কত্ব কায়েমের প্রয়োজনে প্রবল জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছিল। জার্মান জাতি উন্মাদের মতো প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে নিধনযজ্ঞে লিপ্ত হয়েছিল। হিটলারের কুকর্মের দিকে নজর দেয়ার সুযোগ পায় নি। তলে তলে হিটলার যে দানবের মতো পুরো দেশ ও জাতিকে গ্রাস করছে এবং সমগ্র বিশ্বকে একটি ভয়াবহ বিপদের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে, সেটা অনুধাবণ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না; মানুষের মানসিকতাও ঠাণ্ডা মাথায় ভাবার স্তরে ছিল না। একই কাণ্ড করেছিল স্বৈরশাসক স্ট্যালিন। রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের উন্মাদনায় মানুষকে প্রচ-ভাবে ক্ষেপিয়ে দেয়া হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষকে নির্যাতন শিবিরে পাঠিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সমাজতন্ত্রের শত্রু নাম দিয়ে। বিরুদ্ধবাদী লিও ট্রটস্কিকে দূরদেশে হাতুড়ি দিয়ে মাথা থেঁতলে মেরেছিল ভাড়া করা হন্তারক পাঠিয়ে। তাৎক্ষণিকভাবে মানুষ ভেবেছিল সব কিছু ভালোর জন্যই করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে এমনই একটি বোধ ও ধারণাই প্রচার করেছিল স্বৈরশাসক। কিন্তু অচীরেই দেখা গেল, রাশিয়ায় মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে। আমলা ও সেনাপতিরা ফুলে-ফেঁপে ওঠছে এবং সমাজতন্ত্রের নাম ভাঙিয়ে স্ট্যালিন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো যথা, চেকোস্লাভাকিয়া, হাঙেরি, বুলগেরিয়া ইত্যাদিতে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দখল করে নিয়েছে। প্রবল অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক কাজকেও এক ধরনের উন্মাদনার মোড়কে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। অতএব মানুষ সাময়িকভাবে বোধ ও বিবেচনা শক্তি হারিয়েছিল এবং হত্যা-নির্যাতন, খুন-গুম, প্রতিপক্ষ নিধনকে মনে করেছিল বৈধ ও যৌক্তিক। পরবর্তীতে উত্তেজনা থিতিয়ে এলে সত্য উদ্ভাসিত হয়। স্ট্যালিন স্বৈরতন্ত্রের প্রয়োজনে অন্যায়ভাবে বহুজনকে নিধন করেছে মানুষের ভাবাবেগকে কৌশলে প্রভাবিত করে।
হিটলার বা স্ট্যালিনের মতো এমন কুকর্ম এখনো চলছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে। বহু শাসক সে পথ খুবই কৌশলে অবলম্বনও করছে। প্রতিপক্ষের ব্যক্তি, দল ও মানুষকে মারা হচ্ছে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে। ভুল ভাবে প্রভাবিত করার রাজনীতির আসল লক্ষ্য অবশ্যই মহৎ নয়, ব্যক্তি-দল বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের কুমতলবে পূর্ণ। যুক্তির বদলে জাতিগত, ধর্মগত, রাজনৈতিক আবেগগত উন্মাদনা সৃষ্টি গণতান্ত্রিক সুশাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বরং সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের মানুষ ও দলকে নিধনের একটি বহু-ব্যবহৃত ও বহু-চর্চিত অপকৌশল মাত্র। এই কৌশল অবশ্যই নিন্দনীয় এবং অকল্যাণকর। এই কৌশল কখনোই স্থায়ীভাবে কাজে লাগে না। সাময়িক ফায়দা এনে দেয় কুশাসকদের। মানুষের মানবিক চোখ এবং অন্তর্গত বিবেক জাগ্রত হলে পুরো কৌশলটিই পরাজিত হয়। মানুষ যখন দেখতে পায় তথাকথিত গণতন্ত্র, উন্নয়ন ইত্যাদি আসলে ছিল বাগাড়ম্বর এবং মিথ্যাচার, তখন কৌশলী স্বৈরশাসকদের পতন ঘটে। মানুষ যখন টের পায় যে, অপকর্ম আড়ালের জন্য আবেগ, উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে নিধন করা হচ্ছে, তখন রুখে দাঁড়ায়। মানুষ যে আসলেই শান্তি চায়, আইন চায়, নীতি চায়, সত্য চায় এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত-হানাহানি ও অন্যায় আক্রমণকারী হতে চায় না; এটাই পরম সত্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:০০
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জামায়াতের দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ রাজনীতি

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২২ শে জুলাই, ২০২৬ ভোর ৫:২৮


১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ‘জামায়াতে ইসলামী’ গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এটি ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধার্মিক কে অনুসরণ করুন ভন্ডকে নয় ।

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮

আমরা প্রায়ই নিজেদের ধর্মপ্রাণ জাতি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসি। কিন্তু প্রশ্ন হলো ধর্ম কি সত্যিই আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে পারছে, নাকি কিছু অসভ্য মানুষ ধর্মকে নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যাপাসিটি চার্জের পর এবার নজর খাম্বায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৩


বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই । বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালান কিংবা যেসব পরিবারে কেবল একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আছেন, তাদের মাসে প্রিপেইড মিটারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৫৯



কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদটি সংবিধানের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই বেশি হয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×