ছেলেবেলায় আমাদের গ্রামে পঞ্চরস পালাগান হত।লোকে বলত,আলকাপ।কলাকুশলী সকলেই আমাদের গ্রামের।কেউ চাষবাস করে,কারো ছোট্ট মুদির দোকান,কেউ-বা বাইশকোপের ফেরীওলা।তবে পঞ্চরসের আসরে তাদের চেহারা আলাদা হয়ে যেত।
হ্যাজাক লাইটের আলোয় গান।আমরা,যারা তখন কচিকাঁচা বড়দের সংগে যেতাম।মুগ্ধ হয়ে দেখতাম পালা।শুনতাম তাদের
বিস্ময়কর গান।
সেই পঞ্চরসের উদ্বোধনী সংগীত ছিল দুটি।প্রথমটি গাইত গ্রামের
কিশোর-রাখাল তমাল মাল।মেয়েদের পোষাক পরে সে ভক্তিভরে গাইত,হরি কী দিয়ে পুজিব তোমায়,কী আছে আমার!
দ্বিতীয় সংগীত কোরাসকন্ঠে গাইত পালাগানের সকল কুশীলব।
তারা গাইত,মাবুদ শেরদা হাজার গো সালাম তোমার দরগাতে।
গানটির মানে কী তা বুঝতাম না।তবে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করতাম,’মাবুদ’ নামের যে লোকটা পঞ্চরসের তবলা বাজায়,সে মিটিমিটি হাসত।
তখন থেকে মাবুদ নামটি আমার চোখে সম্ভ্রমের।সমবয়সী অভিনেতা,অভিনেত্রীরা যাকে হাজার সালাম জানায়,সে নিশ্চয় বিশেষ কেউ।অবশ্যই কিছু একটা ক্ষমতার অধিকারী।
অন্যসময়ে মাবুদ নামের লোকটা বাইশকোপ দেখিয়ে বেড়াত
গ্রামে-গ্রামে।একটা বড় কাঠের বাক্স,তাতে ক্যলেন্ডার পর-পর সাজানো থাকতো।দশ পয়সার বিনিময়ে ছোট-ছোট কাঁচের ফুটোয় চোখ রেখে আমরা ক্যলেন্ডারের ছবি দেখতাম আর শুনতাম তার মোহিনী ছন্দ,তারপেরে দেখা গেল,কুতুবমিনার চলে এল।বলা বাহুল্য সেটাই আমার প্রথম কুতুবমিনার দর্শন।
মাবুদের ছেলে আমার সমবয়সী,তারও একটা বিশেষ ক্ষমতা দেখেছি।কাকের বাসা থেকে ছানা পাড়ার নেশা ছিল তার।
কাকগুলো ওকে খুব ভাল করেই চিনত।রাস্তায় সে বের হলে
একঝাঁক কাক তার মাথার উপরে উড়ত,আর কা-কা-কা শব্দ করত।দু-একটা ঠোঁকরও মরত।
কথাগুলো মনে পড়ে গেল এক দরজির দোকানে।পানজাবির মাপ দেব বলে বসে আছি।পাশে বেনচে বসে থাকা লোকটা আমার ডান হাতটা খপ করে ধরল।হাতের তালুতে ফুটে ওঠা রেখা গুলো পর্যবেক্ষণ করল।আমি পাগল ভেবে চুপ করে বসে আছি।
আমার দিকে যখন সে তাকাল,দেখি,চোখ দুটো টকটকে লাল।গমভীরস্বরে বলল,সামনে বিশাল ফাঁড়া,একমাস ধরে দুটো করে রুটি কাকদের খেতে দেবেন,সকালবেলা।
আচমকা সে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় ছুটল।উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা দশচাকার লরি তার পাশ কাটাতে গিয়েও পারল না।লোকটা কা-কা-কা শব্দ করে পিচ রাস্তায় চেপটে গেল।সেই রক্তাক্ত দৃশ্য দেখে আমার কেন জানি,রাস্তায় মরে পড়ে থাকা কাকের কথা মনে হলো।
বৃত্তান্ত শুনে বউ বলল,কাজ নেই বাপু ঝামেলা বাড়িয়ে,রোজ ভোরে আমি তোমাকে দুটো করে রুটি তৈরী করে দেব।
প্রতিদিন ভোরে ছাদে উঠে রুটির টুকরো ছড়িয়ে দিই।
কাক আসে।খায়।চলে যায়।বছর চলে গেল।কাকগুলো আমাকে বেশ চিনেছে।
মায়ের অসুখ শুনে গ্রামে বাড়ি গেলাম।বউকে নিয়ে গেলাম না।
মাকে নিয়ে এসে নারসিংহোমে ভরতি করে দেব।দেখলাম,মা ভাল আছেন।
প্রতিদিন ভোরে ঘুমভাঙা অভ্যেস।হাঁটতে বের হলাম গ্রামের রাস্তায়।ছেলেবেলার কত স্মৃতি পিচঢাকা ধুলো হয়ে গেছে!
একটু খনি হাঁটার পর খেয়াল করলা,একদল কাক মাথার উপরে উড়ছে।ওরা কি আমাকে চিনতে পেরেছে।হবেও-বা।মুখে তো সবার কা-কা শব্দ!
মুদি খানার দোকান থেকে পাঁউরুটি কিনে ছড়িয়ে দেব।পকেটে
পয়সা নেই।হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরছি।পেছনে উড়ন্ত কাকের ঝাঁক।মুখে শব্দ,কা-কা।
আশেপাশে কেউ নাই।থাকলে হয়ত ভাবত,এই লোকটা বুঝি কাকের ছানা চুরি করেছে!
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ৭:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




