somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দবির আলীর সাদা স্বপ্নগুলো ( মিনি গল্প )

২৭ শে মে, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের আজকের গল্পের নায়ক দবির আলী , বয়স ৭০ । জামালপুর শহরের ওভারব্রিজের নিচে সস্ত্রীক ভিক্ষা করেন ১০ বছর ধরে । তার এটা দ্বিতীয় স্ত্রী । স্ত্রী বললে ভুল হবে, ভিক্ষাসঙ্গী। তার আগের স্ত্রী অনেক আগেই মারা গিয়েছেন । এখানে আসার পর তারা একসাথে ভিক্ষা করতে করতে একসময় বিয়ে করে নিয়েছেন । দুইজন একসাথে থাকলে অনেক সুবিধা হয় । যেইবার বড় বন্যাটা হল তারপর থেকে রৌমারিতে নিজের বাপ দাদার ভিটা ছেড়ে দবির আলী এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছেন । অবশ্য ভিটা বলাটা ঠিক না , কারণ ভিটা থাকলেতো বলা যায় , তিনি যখন সব ছেড়ে এসেছেন তখন ভিটার কোন ছিটেফোঁটাটিও ছিল না । সেই বারের বন্যায় কুসুমগঞ্জ চরের আর সবার বাড়ি ঘরের সাথে তার দোচালা ঘরটিরও ব্রহ্মপুত্র নদে করুন মৃত্যু হয়েছে । কিন্তু এই মৃত্যুতে দবির আলী একটুও কাদেনি শুধু ব্রহ্মপুত্রের উত্তাল জলরাশির দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল । তাকিয়ে থাকা ছাড়া তার খুব একটা কিছু করারও ছিল না । কারণ মানুষ হিসেবে আমরা যতই বড়াই করি না কেন , দিনশেষে আমরা সবাইযে আল্লাহর প্রতিই নির্ভরশীল সকল বিষয়ে । তিনিই হাঁসান তিনিই কাঁদান । কিন্তু দবির আলী জীবনে আর কখনো হাসতে পারবে কিনা তখন কেউ জানত না । তিনি যখন এই ওভারব্রিজের নিচে প্রথম বার এসেছিলেন তখন আশেপাশে এত দোকানপাট ছিল না । উত্তরপাশে চটের বেড়া দেওয়া একটা পানবিড়ির দোকান আর পূর্বপাশে উন্মুক্ত আকাশের নিচে তিনপাশে পায়া নড়বড়ে তিনটি বেঞ্চ ফেলা একটি লাল চায়ের দোকান । লাল চায়ের দোকান বললাম একারণে যে , তখন এখানে শুধু লাল চা ই পাওয়া যেত , যদিও এখন চারপাশে আধুনিক নির্মান সামগ্রী দিয়ে গড়ে উঠা চা স্টলগুলোতে দুধ চায়ের উপর কফি ছিটিয়ে দেওয়া চাফি সহ পাওয়া যায় ইনস্ট্যান্ট কফিও । দবির মিয়াও এখান থেকে কয়েকবার কফি কিনে খেয়েছেন । স্বাদটা মন্দ না , তার কাছে ভালই লেগেছে , কেমন যেন একটা পোড়া পোড়া গন্ধ নাকে এসে বাড়ি খায় প্রতিবার চুমুক দেওয়ার সময় । কিন্তু প্রতিদিন খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও
সব দিনই খেতে পারে না । ঐসব দিনই খায় যেদিন তার মরিচা ধরা স্টিলের থালাতে ধাতব মুদ্রাগুলোর ছড়াছড়ি থাকে । কিন্তু সে সবগুলো মুদ্রা একসাথে থালায় রাখে না , একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মুদ্রা জমা হওয়ার পর সে ওগুলো আলাদা করে তার কোমরের সাথে বাঁধা পুরাতন প্যান্ট কেটে বানানো ব্যাগটাতে রাখে । এর কারণ হল সে খেয়াল করে দেখেছে যে , থালা ভর্তি থাকলে মানুষজন তাকে ভিক্ষা না দিয়ে তার পাশের জনকে দেয় । ইনকাম বাড়ানোর জন্য একটু চালাকি আর কি । অন্যান্য পেশার মত ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়ার জন্য যেমন প্রতিনিয়ত বৈধ অবৈধ নানা পদক্ষেপ নিতে হয় , তেমনি তাকেও ইনকাম বাড়ানোর জন্য খুব সতর্ক থাকতে হয় । কারণ দুনিয়ার অন্যান্য জায়গার মত এখানেও তাকে প্রতিযোগীতার সম্মুখীন হতে হয় সব সময় । তার এই চালাকির বিষয়টি নিয়ে সে কখনো ভাবে নি যে , এটা ন্যায় না অন্যায় । হয়ত সে ভাবতেও চায় না । হতে পারে উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন পূরণের জন্য করা অন্যায় আর বেঁচে থাকার জন্য করা অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিদ্যমান । সে ঠিক করেছে আজ ইনকাম কম থাকলেও কফি খাবে কারণ তার আজ মন ভাল ।
আজ সকালে তার পাশের অন্ধ ভিক্ষুকটি তাকে বলেছে সরকার থেকে নাকি জরিপ করতে আসবে তাদের নিয়ে । দবির আলী ভাবছে এবার হয়ত একটা স্থায়ী ব্যবস্থা হবে তার জন্য । হয়ত এবার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে তার । তার এই স্বপ্ন নতুন না , বন্যায় বাড়ি ঘর ভেঙ্গে এখানে আসার পর থেকেই সে এই স্বপ্ন দেখে । অন্যান্য মানুষদের মত দবির আলীরাও স্বপ্ন দেখে তবে অন্যদের তুলনায় তাদের পার্থক্যটা হল যে , তাদের স্বপ্নগুলো একজায়গায় থমকে থাকে , কখনো বড় হয় না । স্বপ্ন পূরণ হলেতো বড় হয় , তাদেরটা যে পূরণ হয় না কখনো ।

একমাস পর ওভারব্রিজের নিচে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র , যে জায়গাটায় দবির আলী ভিক্ষা করতেন সেখানে মানুষজনের জটলা , দুর থেকে দেখে মনে হচ্ছে মারামারি লেগেছে । কাছে গিয়ে দেখা গেল ঘটনা সত্য , মারমারি ই লেগেছে ।মারমারি লেগেছে দবির আলীর বসার স্থানটি নিয়ে । যারা মারামারি করছেন তারাও এখানে ভিক্ষা করেন অনেকদিন ধরেই । দবির আলীর কথা পাশের চায়ের দোকানে জিজ্ঞাসা করতেই দোকানী বললেন দবির আলীতো সপ্তাহখানিক হলো মারা গিয়েছেন । হয়ত হঠাৎ করে দবির আলীরা একসময় এভাবেই পৃথিবী থেকে চলে যান , কিন্তু শুধু বেঁচে থাকে তাদের স্বপ্নগুলো দবির আলীর মত অন্য কারও হয়ে যা কখনো পূরণ হয় না।

বিঃ দ্রঃ এই গল্পটি পুরোটাই কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে । কিন্তু চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও ঘটনাগুলো বাস্তব।

সাকিব
২৬শে মে, ২০১৮
রাত ৩টা ৫।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মে, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:২২
৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভ্রমণব্লগ: আলোছায়ার ঝলকে এক অপার্থিব যাত্রা”

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬

মালয়েশিয়া আমার বেশ পছন্দের একটি দেশ। আমার জীবনের একটি অংশের হাজারো স্মৃতি এই দেশে। একটা সময় ছিল যখন এই দেশ ছিল আমার সেকেন্ড হোম।‌ এখন ও আমার আত্নীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোরআন-হাদিস মানতে বলার ওয়াজ একটি ভুল ওয়াজ

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২



সূরা: ৯ তাওবা, ১২২ নং আয়াতের অনুবাদ-
১২২। আর মু’মিনদের এটাও উচিৎ নয় যে (জিহাদের জন্য) সবাই একত্রে বের হয়ে পড়বে। সুতরাং এমন কেন করা হয় না যে, তাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ

লিখেছেন বিপ্লব০০৭, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭



মানুষ আসলে কী?

Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোনো হে রাষ্ট্র শোনো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০২


নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×