তখন গিয়েছিলাম ঢাকা। সে বহুদিন আগের কথা। সময়টা ২০০০ সাল ছিলো। যেহেতু শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে আমার আজন্ম উৎসাহ তাই এক বন্ধুকে নিয়ে চলে গেছিলাম জাতীয় যাদুঘরে। না অমুল্য রত্ন, প্রত্ন দেখতে নয়। তবে মুল্যহীন কিছু দেখিনি।
বাংলাদেশের খুব নাম কামানো এক চিত্রশিল্পী। খ্যাতিমান বলতে বিবেকে বাঁধে তাই বললাম না। তিনি হাশেম খান। চারুকলার বন্ধুরা বলতো হাশেম স্যার। ছোটবেলায় পাঠশালার বইয়ের অলংকরনে তার নাম দেখে দেখে বড় হয়েছি। তো হাশেম খানের চিত্র প্রদর্শনী। উচ্ছাসের শেষ নেই। বন্ধু বেজায় বিরক্ত। বলে, কিসব অগার ঠ্যাং, বগার ঠ্যাং রং তুলির আঁচর পুরো সময়টাই নষ্ট। আমি বলি বন্ধু এসবের নাম আর্ট। আর্ট বুঝতে হলে আরো পড়াশুনা করতে হবে। খুব সমঝদার হতে হয়। তুমি বন্ধু এখনো ঐ লেভেলে যেতে পারোনি। বিষয়টা একটু হাই লেভেলের। বন্ধুর চেহারা লাল হয়ে যায়।
এক মনে ছবি দেখে যাচ্ছি আর নিজে নিজে এইসব হিবিজিবির ইন্টারপ্রিট করছি। তারমাঝে হঠাৎ দেখি তুলকালাম কান্ড। হন হন শন শন করে কিছু লোক জাতীয় যাদুঘর মিলনায়তনে ঢুকে মোটামুটি ধাক্কা না দিলেও ভাবটা এরকমই ছিলো। মন্ত্রী আসছেন, মন্ত্রী আসছেন। মন্ত্রী আসছেন হ্যাঁ মন্ত্রীকে দেখতে পাচ্ছি। মন্ত্রীকে দেখে একটু নড়ে চড়ে দাঁড়ালাম। আহা হা মরি মরি মন্ত্রী নিজেই চলে এসেছেন শিল্পের মূল্যায়ন করতে। বাহ আমাদের মন্ত্রীরাতো খুব ভালো। শিল্প সমঝদার। মন্ত্রী মহোদয়ের শিল্পজ্ঞান বোঝার জন্য কাছাকাছি যাওয়ার চেস্টা করে দেখি ওমা শুধু কি মন্ত্রী মহোদয়!! সাথে জনা ছয়েক চামচাও আছে।
চামচা বেষ্টিত তৎকালীন ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যিনি বর্তমানে যোগাযোগ মন্ত্রী। কেউ কেউ বলে ফাটা কেস্ট। কাজের চেয়ে কথায় বেশী পারদর্শী। চাতুরীপূর্ন কথার চটুল এক বাচাল অর্বাচীন। একপাশে সয়ং শিল্পী হাশেম খান। আমিতো আনন্দে আটখানা। রথী মহরথী সবাইকে একসংগে দেখতে পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। তবে আরেকপাশে লুৎফুর রহমান রিটন। রিটনের ভক্তও কি কম ছিলাম! ছোটদের তারকালোক সম্পাদক ছিলো তখনো সে। তিনাকে দেখে পারলেতো লাফ দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলি আমাকে নিয়ে একটা ছড়া লিখেন প্লিঈঈঈজজজ।
মন্ত্রী মহোদয় সারি সারি চিত্র দর্শন করছেন। আর রিটন সাহেব বলেন স্যার এই ছবিটা আপনার ড্রইং রুমের জন্য। আরেকটার সামনে গিয়ে বলছেন স্যার এটা আপনার বেডরুমে খুব মানাবে। আমিতো মহা বিরক্ত। হয়তো পরের ছবিটার সামনে গিয়ে বলবে স্যার এটা আপনার বাথরুমের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে। এভাবে ছবিগুলোর সামনে যাচ্ছেন আর রিটন সাহেব একেকটা ছবি কোথায় কোথায় ফিট হবে তার বর্ননা করছেন। ঠিক এইভাবে মোট ৩০/৩৫ টি কিংবা তারও বেশী ছবি ক্রয় করলেন মন্ত্রী মহোদয় ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রলায়ের বিভিন্ন অফিস ও দপ্তরের জন্য। এটাকে ক্রয় করা, না ক্রয় করানো হলো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না তখন। হয়তোবা মিউূয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং।
তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত যে ছবিটি ছিলো তা হচ্ছে একটি জানালা কিংবা দরজা সাইজের ছবি যেটা শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষনের অনুকরনে অংকন করা হয়েছে। ছবিটার সামনে তারা ৪/৫ মিনিট ছিলেন। লূৎফর রহমান রিটনের মুখে তখন আবেগ মিশ্রিত বক্তব্য। স্যার এই ছবিটা আমরা রিজার্ভ করে রেখেছি মন্ত্রনালয়ের জন্য। এটা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন সবাই কিন্তু আমরা কারো কাছে বিক্রি করিনি, কারন আমরা জানি আপনি এটা মন্ত্রনালয়ে জন্যই নিবেন। ছবিটির মূল্য ছিলো মাত্র ১০/১২ লাখ টাকার মতো (সঠিক দাম এই মূহুর্তে মনে পড়ছেনা। কারো জানা থাকলে ইনবক্স করুন প্লিজ)। আমি অবাক হয়ে গেলাম ছবি বিক্রির জন্য কিভাবে দালাল লাগিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন শিল্পী নামের একজন ভন্ড। ছবি গুলো যতটা না আঁকা হয়েছে তার শিল্পভাব প্রকাশের জন্য তার চেয়ে বেশী প্রকাশ পাচ্ছে বানিজ্যিক লোভ লালসা।
আমি সেদিন ঠিক অতটা না বুঝলেও আজ বুঝতে পারছি। কি নির্লজ্জ, লোভী আর শঠ আমাদের শিল্পী সমাজের কিছু লোক। যারা নির্ধিদ্বায় বিক্রি করে দিতে পারে নিজের সম্ভ্রম। আজ জয়নুল আবেদীন বেঁচে থাকলে নিশ্চয় লজ্জায় কুঁকড়ে যেতেন। আমি এর পর থেকে যে ছবিটির দিকেই তাকাচ্ছিলাম সেই ছবিটিতেই লোভী কুকুরদের লালা দেখছিলাম। সবচেয়ে দামী ছবিটিতে সবচেয়ে বড় কুকুর দেখছিলাম। দেখছিলাম ছবির ভেতরে শুধু টাকা আর টাকা। দেখছিলাম ছবিগুলোর মধ্যে শুধু লোভ লালসা আর দূর্নীতি। আমি সেদিন ছবির ভেতরের ছবিকে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে শিখেছিলাম।
তার অনেকদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে চারুকলার এক বন্ধুর সংগে কথা হয়েছিলো এ বিষয়ে। বন্ধুটি বলেছিলো। শিল্প-টিল্প এসব কিছুই নয়। আসল হচ্ছে নেটওয়ার্ক ও চাটুকারীতা। তোমার নেটওয়ার্ক/লিংক ভালো থাকলে খারাপ ছবি এঁকেও তুমি কোটিপতি হতে পারবে আর নেটওয়ার্ক/লিংক খারাপ থাকলে ভালো ছবি এঁকেও তুমি সংসার চালাতে পারবে না। তুমি যদি কোন রকমে বেঙ্গলে বা এরকম নামকরা এক্সিবিশন সেন্টারে একটা প্রদর্শনী করতে পারো তাহলে কেল্লাফতে। বেঙ্গল তার লবি (রিটন) গ্রুপ দিয়ে ঢাকা শহরের ধনীলোকদের কাছে তোমার ছবি বিক্রি করিয়েই ছাড়বে। তবে বেঙ্গলের কমিশনটাও কটকটা। তবে এক্ষেত্রে মন্ত্রীর মতো কাউকে ফিটিং দিতে হলে হাসেম স্যারের মতো দলান্ধ চামচা হতে হবে। তবে একবার যদি মন্ত্রী-সচিব টাইপ কাউকে ফিটিং দিতে পারো তাহলে এক প্রদর্শনীতেই লাইফ সেটল্ড। আর জীবনেও ছবি আঁকা লাগবে না। আমি তাকে বলেছিলাম চামচা রিটনের কমিশনটা কত হতে পারে? সে জানিয়েছিলো ৯৬-২০০১ আওয়ামী শাসনামলে হাশেম স্যার ছবি-টবি ইত্যাদি থেকে আয় করেছেন প্রায় ৮ কোটি টাকা। শুধু ঐ বিশেষ প্রদর্শনী থেকেই করেছে ১ কোটি টাকারও বেশী তাহলে এবার বুঝে নাও রিটনের দালালীর কমিশনটা কত হতে পারে। তবে এখানে আরো অনেক গ্রুপ ও ব্যাক্তির স্বার্থও জড়িত থাকার সম্ভবনা আছে।
এদিকে মিজারুল কায়েস নামের এক ব্যাক্তি পররাস্ট্র সচিব থাকাকালীন সময়েও পররাস্ট্র মন্ত্রনালয়ের নাম করে বিভিন্ন দেশে অবস্থিত হাই কমিশন ও এ্যামবাসির জন্য কয়েক কোটি টাকার ছবি কিনে হাশেম খানের মতো দুচার জনকে কোটিপতি বানিয়ে দিয়েছেন। তার বিরোদ্ধে অভিযোগ এই শৈল্পিক দূর্নীতিতে তিনি সরাসরি জড়িত।
দূর্নীতি ও অবৈধভাবে টাকা কামানোর এই দারুন পন্থার নাম হাচ্ছে "শৈল্পিক দূর্নীতি। আমাদের তথাকথিত মান্যবর ও মাননীয় শুওরের বাচ্চারা দেখিয়ে দিচ্ছেন কিভাবে এই শৈল্পিক দূর্নীতি করতে হয়। অথচ প্রতিবাদ করার কেউ নাই। কলুর বলদ আমরা সাধারন মানুষ ডুবন্ত নৌকার ভয়েই অস্থির থাকি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



