বেশীর ভাগ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখব, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিদ্্বন্দ্বিতা দ্্বি-দলীয়, এমনকি বহুদলের অস্তিত্ব থাকলেও দলগুলো শেষমেশ দুই মেরুতে একাট্টা হয়ে নির্বাচন করে। ভালোমতো খেয়াল করলে দেখব দেশ, রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভিন্নতা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশের মেরুকরনের মধ্যে মিল খুবই বেশী। যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে শুরু করা যাক, প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল, ডেমোক্র্যাটিক এবং রিপাবলিকান পার্টি। ক্লিনটন, কার্টার, কেনেডি ডেমোক্র্যাট আবার নিক্সন, রিগান, বড় ও ছোট বুশ রিপাবলিকান। ইরাক এবং আফগান যুদ্ধের কারনে বাংলাদেশীদের মধ্যে রিপাবলিকান বিরোধীতা এখন খুবই বেশী, তবে কেউ যদি এই দুই পার্টির এজেন্ডা ভালোমতো খেয়াল করে, তবে বাংলাদেশীদের কয়জন ডেমোক্র্যাটদের সাপোর্ট করতে পারবে সন্দেহ আছে। যেমন বুশ সমকামীতা বিরোধী, গর্ভপাত বিরোধী, ডারউইনের তত্ত্ব বিরোধী, স্টেম সেল রিসার্চ বিরোধী। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা সমকামীতা, গর্ভপাত, স্টেম সেল সবগুলোই সমর্থন করে। কিছুদিন আগে বুশের দলবল চেষ্টা করেছিল ডারউইন বিরোধী ধর্ম ভিত্তিক ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে দিতে, শেষমেশ অবশ্য কোর্টের বাধার কারনে এ যাত্রা সফল হয় নি। রিপাবলিকান পার্টির মুল শক্তি রেড স্টেটগুলোর ধর্মভীরু মানুষ। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের শক্তি লিবারেল মার্কিনীরা, বিশেষকরে বড় শহরগুলোতে। বেশ মজা পাই যখন বাংলাদেশ থেকে আসা জামাতী, বা মুসলিম লীগ (অথবা বিএনপি) সাপোর্টাররা এখানে এসে রাতারাতি মুক্তমনাদের (ডেমোক্র্যাট) সাপোর্টার বনে যায়, অনেকের কাছে জানতে চেয়েছি তারা সত্যিই ডেমোক্র্যাটদের এজেন্ডা সমর্থন করে কি না। বেশীরভাগ ইহুদীরা ডেমোক্র্যাট পার্টি সমর্থন করে, ক্লিনটন বা জন কেরীর দলের সাথেই ইসরায়েলের সম্পর্ক বেশী ভাল, গত কয়েক দশকের ইতিহাস ঘাটলে দেখবেন বুশের দল (রিপাবলিকান) বরাবরই পাকিস্তান, সৌদি আরবকে সমর্থন করে, একাত্তরেও নিক্সন বাংলাদেশের বিরোধীতা করেছিল। সে যাই হোক, বৃটেনের দিকে খেয়াল করলে দেখব ওখানেও মুল দুটি দল, লেবার পার্টি তুলনামুলক ভাবে লিবারেল (যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটদের মতো বলা যায়), আর রয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি (রিপাবলিকান পার্টির মতো)। যদিও ব্লেয়ারের সামপ্রতিক অবস্থান একটু ভিন্ন। ভারতের দিকে তাকালে দেখব ওখানেও একইরকম চেহারা, একদিকে অসামপ্রদায়িক কংগ্রেস ও সমমনা দলবল, অন্যদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি, শিবসেনা ইত্যাদি। আমার যতদুর মনে আছে বিজেপি এসেও পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন শুরু করেছিল, পরিস্কার মনে করতে পারছি না, সম্ভবত ওঝাতত্ত্ব, জ্যোতিষশাস্ত্র, রাশিচক্র এসব অধিবিদ্যা ঢোকানের চেষ্টা চলছিল।
তো দেখা যাচ্ছে সব দেশেই চিত্রটা মোটামুটি কাছাকাছি, একদিকে জাতীয়তাবাদি, ধর্মভিত্তিক দল, অন্যদিকে তুলনামুলক কম জাতীয়তাবাদী, ধর্মের সাথে সম্পর্কহীন (অথবা অসামপ্রদায়ীক) দল, যাকে বলে একটু উদারমনস্ক দল। ভুল বুঝবেন না, উদারমনস্ক দল মানে এই দলের নেতারা ব্যাক্তিগত ভাবে উদার তা কিন্তু নয়, বরং ব্যাপারটা হচ্ছে নতুন মত, ভিন্নমতের প্রতি তাদের মনোভাব উদার হওয়ার কথা। ব্যাক্তি হিসেবে দেখলে বেশীরভাগ সময় সামপ্রদায়িক মনোভাবের লোকেরা নিজের সমপ্রদায়ের লোকের বিপদে আপদে অনেক বেশী আন্তরিক ভাবে সাহায্য করে, অসামপ্রদায়ীক নিরপেক্ষ লোকের চেয়ে। আমার মনে আছে 2004 ইলেকশনের পরে মার্কিনীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কেন বুশকে ভোট দিলেন, ইরাক যুদ্ধের অবস্থা তো ভালো না, এমনি বুশের ঘোষিত weapons of mass destruction-ও তো ইরাকে পাওয়া যায় নি, বেশীর ভাগের উত্তর ছিল তাদের কাছে যুদ্ধের চেয়ে family value বেশী গুরুত্বপুর্ন মনে হয়েছে। নো ওয়ান্ডার, সমকামীতা সমর্থক জন কেরীর কাছে ফ্যামিলি ভ্যালুর গুরুত্ব বোঝাই যায়। আরেকটা ব্যাপার, সব দেশেই সংখ্যালঘুরা সচরাচর উদারপন্থিদলকে সমর্থন করে যেমন ভারতে কংগ্রেস, বৃটেনে লেবার পার্টি, আমেরিকায় ডেমোক্র্যাটিক দল,এর মান এই নয় যে সংখ্যালঘু হলেই সে উদারমনস্ক, বরং উলটোটাই অনেকসময় সত্য। এজন্যই ঘোর মুসলিম লীগ সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রে পা দিয়েই ডেমোক্র্যাট বনে যায়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে সংখ্যাগুরুদের কারা এই উদারপন্থি দলগুলোকে সমর্থন করে, লঘুরা না হয় উদারতার সুযোগ নেয়, কিন্তুরা গুরুরা কেন? লক্ষ্য করুন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে টিভি সিনেমার নায়ক নায়িকা থেকে শুরু করে, মোটামুটি যারা শিল্প-সাহিত্য চর্চার সাথে জড়িত তারা বেশীরভাগ উদারপন্থি দলের সমর্থক, এর বাইরেও আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ইত্যাদি। এছাড়া কসমোপলিটান শহর বা রাজ্যগুলোতে (যেমন ক্যালিফোর্নিয়া বা নিউ ইয়র্ক)ও সমর্থকদের সংখ্যা বেশী। অন্যদিকে ছোট শহর, গ্রামাঞ্চলে, বা যারা রেগুলার চার্চে যায়, স্বল্প আয়ের লোকজন, ধর্মভীরুদের মধ্যে রিপাবলিকান বেশী। বাংলাদেশ বা ভারতের দিকে তাকালেও চিত্রটা কাছাকাছি।
কিন্তু কোন পন্থা ভালো, উদারপন্থা না জাতীয়তাবাদ? এই প্রশ্নের সম্পুর্ন উত্তর সভ্যতার এ মুহুর্তে দেয়া কঠিন, আরও পরে হয়ত টেকনোলোজির আরো উন্নতির পরে দেয়া যাবে। আর দশটা প্রানীর মতো মানুষ হিসেবে আমরাও territorial, ছোটবেলা ভাইবোনের সাথে, আমার খেলনা, আমার বই, আমার জুতা দিয়ে শুরু, এবং এর দরকারও আছে, সারভাইভালের জন্য নিজের টার্ফ ডিফেন্ড করা খুবই গুরুত্বপুর্ন। জাতি হিসেবে আত্মসম্মান , অহংকার না থাকলে একক "জাতি" হিসেবে উন্নতি করা মুস্কিল। বেশীরভাগ মুক্তিযুদ্ধ জাতীয়তাবাদের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। দেশপ্রেমের মুলে আছে দেশ ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। 1945-1990তে যুক্তরাষ্ট্রের অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে তাকালে দেখব, আমেরিকান হিসেবে তাদের একাত্বতা বেশ গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা নিয়েছে। "সামপ্রদায়ীকতা" শব্দটা শুনতে অনেক সময় খারাপ লাগে, তবে অনেক মানবীয় গুনাবলী এর সাথে জড়িত, নিজ সমপ্রদায়ের অন্য সদস্যদের জন্য সহমর্মিতা, আন্তরিকতা, নিজের বিশ্বাসে নিঃশর্ত সমর্পন এসব সামপ্রদায়ীকতার সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। আমার তো ধারনা passion শব্দের সাথে জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক আছে, প্যাশন বেশী ঘন হয়ে হয়তো মৌলবাদের জন্ম দেয়। তবে বেশীর ভাগ রিপাবলিকান বা বিজেপি সাপোর্টারকে ঠিক মৌলবাদি বলা যায় না। ব্যাক্তি হিসেবে বিচার করতে বললে একজন সামপ্রদায়ীক লোক, একজন উদারমনস্ক লোকের চেয়ে ভালো না খারাপ এই জাজমেন্ট করা অসম্ভব। আসলে ব্যাপারটা মোটেই ভালো-খারাপ সম্পর্কিত নয় বরং বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোনের পার্থক্য।
দিনে অন্তত একবার ব্লগ পড়তে আসি কারন মানব সমাজের এই বড় বিভাজন আর বগারদের বিভাজন আপাতদৃষ্টিতে একই মনে হয়। ধরা যাক যারা উদারপন্থি বা মুক্তমনা বলে দাবী করেন এরা হচ্ছেন "ক" দল, আর যারা মুক্তচিন্তাকে গুরুত্ব দিতে চান না, অথবা দিলেও নিজের বিশ্বাসের চেয়ে কম মনে করেন তারা "খ" দল। আসলে পুরোপুরি নিরপেক্ষ কেউ নেই, যেমন পুরোপুরি "ক" বা পুরোপুরি "খ" পাওয়াও কঠিন বা হতো সম্ভব নয়। যেটা হয় তা হলো ক বা খ এর দিকে আপেক্ষিক অবস্থান, যেমন কেউ হয়তো 75% ক আর 25% খ, ইত্যাদি। ক দল ঘেষা মনে হয় শোমচৌ, দীক্ষক, অপ বাক, মুখফোড়, রাসেল, হিমু, হযবরল, তীরন্দাজ , অরুপ এদেরকে আবার খ দল ঘেষা মনে হয় নিয়মিত ব্লগার/মন্তব্যকারীদের মধ্যে আস্তমেয়ে, সাদিক, কালপুরুষ, ওয়ালী, ইত্যাদি; মহুয়ামঞ্জুরীর ব্যাপারটা নিশ্চিত না, খ এর উপশাখা গুলোর মধ্যে বিরোধ খুব তীব্র থাকে। তবে পৃথিবীর মানুষের মধ্যে খ দলের লোক অনেক বেশী। কারন অবশ্য সহজ, আমরা জন্মাই খ হিসেবে কেউ কেউ পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা, বুদ্ধিবৃত্তিক কারনে আস্তে আস্তে ক এর দিকে বেশী সরে যাই, আর বাকীরা হয়তো এই দুরত্ব অতিক্রম করি না , করতে পারি না অথবা করাটাকে গুরুত্বপুর্ন মনে করি না। অনেকে পরিবার থেকে অনেক সাহায্য পেয়ে থাকেন, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটা যথেষ্ট নয়। কিন্তু ক দল যদি সংখ্যায় কমই হয় তবে এদের চিৎকার এতো শোনা যায় কেন, অন্তত এই ব্লগে। এখানে ক আর খ দলের লেখা খেয়াল করলে দেখবেন কোথায় যেন একটা সুক্ষ পার্থক্য আছে, লেখার মান, বক্তব্য, তথ্য ভিত্তি এবং যুক্তিতে। ক দল আমার ধারনা তাদের রিসোর্সের সুবিধা নিচ্ছে, ক দল সব জায়গায়ই এটা করছে, বিশ্ব রাজনীতিতেও তাই, মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মোটামুটি ভাবে এদের দখলে, অবিশ্বাসে বাংলাদেশের পত্রিকা লক্ষ্য করুন, এদের পক্ষপাতিত্ব পরিস্কার হবে।
আশা করি ব্লগে অন্তত ক, খ এর কেউ যেন বিজয়ী না হয়, যতদিন না হবে ততদিন দিনে বারকয়েক অ্যাড্রেস বারে সামহয়্যার ইন টাইপ করব।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




