আমি লিখেছিলাম আমাদের জেনেটিক ইভ আফ্রিকায় দেড় লাখ বছর আগে ছিলেন, এই তথ্যের ভিত্তি আফ্রিকা সহ সারা পৃথিবীর বিভিন্ন মানুষের জিন বিশ্লেষন করে পাওয়া উপাত্ত। মজার ব্যপার হচ্ছে আফ্রিকা ছাড়া বাকীদের জিন থেকে যদি most recent common ancestor বের করা হয় তাহলে এই নতুন জেনেটিক ইভের বয়স হবে 70- 90 হাজার বছর। আফ্রিকার বাইরে আমরা যারা আছি, তারা আসলে খুব বেশিদিন আগে আলাদা হই নি এবং সবার একটাই উৎস। যদিও এই নিয়ে বিতর্ক আছে যে মানুষ সিনাই উপদ্্বীপ বরাবর এসেছে না সোমালিয়া - ইয়েমেন হয়ে আফ্রিকা থেকে বের হয়েছে।
যাহোক মাইটোকন্ড্রিয়াল ডি এন এ-র ওপর ভিত্তি করে যদি genetic tree তৈরী করি তাহলে এর মুল হবে আফ্রিকায় 150 হাজার বছর আগে, মোটামুটি 18 টি বড় শাখা পাওয়া যাবে, শাখাগুলোকে বলা যেতে পারে ইভের মেয়ে (সরাসরি মেয়ে না হলেও, মেয়ের মেয়ের ... মেয়ের মেয়ে তো অবশ্যই)। বিভিন্ন শাখা বিভিন্ন সময় বের হয়েছে, সুতরাং ইভের মেয়েদের নিজেদের মধ্যে বয়সের পার্থক্য হাজার হাজার বছর। আমাদের যে কেউ এই আঠারো জনের কারো না কারো বংশধর। ভারতে সবচেয়ে বেশী দেখা যায় M* গ্রুপ, এর আরও অনেক শাখা প্রশাখা আছে। আবার আমেরিকার আদিবাসীরা প্রায় সবাই A,B,C,D এর কোন না কোনটা থেকে এসেছে। আশ্চর্য জনক হচ্ছে এগুলো সবই এশিয়াতেও আছে, যার অর্থ দাড়াচ্ছে native american রা সুদুর অতীতে এশিয়া থেকে আমেরিকা গিয়েছে। কিভাবে গিয়েছে এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর হলো Ice Age এর সময় বেরিং প্রনালী পার হয়ে। তবে B গ্রুপের বংশধররা সমুদ্্রপথেও গিয়ে থাকতে পারে। ইউরোপের প্রায় সবাই H,J,K,T,U,V,X এর কারো না কারো বংশধর। ইভের এই সাত মেয়ের নামকরনও করা হয়েছে ইতোমধ্যে Helena, Jasmine, Katrine, Tara, Ursula, Velda, Xenia। দেড়শ পাউন্ডের বিনিময়ে http://www.oxfordancestors.com জেনেটিক টেস্ট করে কেউ ইভের কোন মেয়ের বংশধর তা বের করে দিচ্ছে (শুধুইউরোপিয়ানদের জন্য)।
Y Chromosome এর ওপর ভিত্তি করে ছেলেদের জেনেটিক ফ্যামিলি ট্রি করা হলে আপাত দৃষ্টিতে এর দশটি প্রধান শাখা। এখানে বলে রাখা ভালো জেনটিক্সের এই অংশ দ্্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে নতুন নতুন গবেষনা এবং আবিস্কারের কারনে, এজন্য অদুর ভবিষ্যতে ইভ, আদমের ছেলে মেয়ের সংখ্যা পরিবর্তন, পরিমার্জন হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আদমের দশ ছেলের বড় তিনজনের বংশধর কেবলমাত্র আফ্রিকাতে পাওয়া যায়, তৃতীয় ছেলের বংশধররা কোন এক সময় এশিয়াতে মাইগ্রেট করে বাকী শাখা গুলোর জন্ম দিয়েছে, যারা পরবর্তিতে পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যদি পুরো ছবিটা বোঝার চেষ্টা করা যাক। এখানে উল্লেখ্য মাইটেকন্ড্রিয়াল শাখা গুলো হচ্ছে মেয়েদের ধারা বরাবর, অন্যদিকে Y-Chromosome ধারা হচ্ছে ছেলেদের বরাবর, আশ্চর্যজনক হলেও সত্য বিভিন্ন দেশে ছেলে এবং মেয়েদের ধারায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। যেমন ভারতীয় উপমহাদেশে M গ্রুপের মেয়েদের ধারা থাকলেও এর সমসাময়িক M130 বা M174 পাওয়া যায় না। বরং পাওয়া যায় তুলনা মুলকভাবে আধুনিক M20 ছেলেদের গ্রুপ। এই অসামঞ্জস্যতার কারন পরিস্কার নয়, হতে পারে M20 দলের লোকেরা 30 হাজার বছর আগে যখন ভারত আক্রমন করেছিল তখন উপকুলে বসবাসরত আদিবাসী পুরুষদেরকে মেরে ফেলেছিল, তাড়িয়ে দিয়েছিল বা অন্য কোন ভাবে বংশবিস্তার থেকে বিরত রেখেছিল। অন্যদিকে আদিবাসী মেয়েদেরকে স্ত্রী, উপপত্নী বা স্রেফ দাসী হিসেবে গ্রহন করে তাদের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করেছে (যোদ্ধারা সচরাচর নিজেদের মেয়ে সহ আক্রমন করে না, তাই যুদ্ধের পর এরকম সংকট অস্বাভাবিক নয়)। বর্তমান ভারতীয় জনগোষ্ঠি অনেকক্ষেত্রেই আদিবাসী নারী এবং পরবর্ত ী কালে বিভিন্ন সময়ে আসা পুরুষদের বংশধর। এই আক্রমন কারীরাই কি পরে দ্্রাবীড় নাম নিয়েছে? এর উত্তর এ মুহুর্তে নিশ্চিতভাবে আমার জানা নেই, ভারতে জেনেটিক মার্কারের বিন্যাস নিয়ে গবেষনা চলছে, পরবর্তিতে চেষ্টা করব শুধু উপমহাদেশ নিয়ে একটি লেখা দিতে।
মাইটেকন্ড্রিয়াল ইভের (মেয়েদের ধারা) তিনটি প্রধান এবং পুরোনো শাখা কেবল আফ্রিকাতে পাওয়া যায়, L1 সবচেয়ে পুরোনো পশ্চিম এবং সাব-সাহারান আফ্রিকাতে বেশী দেখা যায়, L2 আফ্রিকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মধ্যে আছে, আফ্রিকা থেকে যারা বের হয়ে এশিয়াতে যায় নি এরা তাদের বংশধর। L3 যদিও শুধুমাত্র আফ্রিকাতে (পুর্ব) দেখা যায়, কিন্তু আফ্রিকার বাইরের সমস্ত মানুষের উৎস L3 থেকে বের হওয়া শাখা M এবং N (70 থেকে 80 হাজার বছরের পুরোনো)। অন্যদিকে Y-Chromosome (ছেলেদের ধারা) এর দুটি পুরোনো শাখা M91, M60 এখন শুধু আফ্রিকাতে আছে, M91 জেনেটিক আদমের সরাসরি উত্তরাধিকারী, অন্য সব গ্রুপের মুল, (উদাহরন San Bushmen, Hadza)। এরকম আদিবাসী সমাজ এখনও আদিম click language ব্যবহার করে। আরেকটি আফ্রিকান গ্রুপ M168 যা হচ্ছে আফ্রিকার বাইরের সমস্তমানুষের পুর্বপুরুষ। M168 এর সবাই যে আফ্রিকা থেকে বের হয়ে এসেছে তা নয় (যেমন M2), সাব সাহারান আফ্রিকার বেশীর ভাগ লোক এই দলের।
mtDNA (মেয়ে) অনুযায়ী আফ্রিকার বাইরের মানুষের একটি প্রধান শাখা হচ্ছে M, যার বহু উপশাখা আছে। M এবং তার শাখাগুলো ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিন পুর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, পুর্ব এশিয়া, সাইবেরিয়া, এবং আমেরিকাতে বিস্তৃত, তবে ইউরোপে পাওয়া যায় না। এতে বোঝা যায় আফ্রিকা থেকে বের হয়ে এসব মানুষ ভারত মহাসাগরের উপকুল বরাবর এশিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর মানে এই নয় যে রাতারাতি বা দু-এক জেনারেশনেই এই বিস্তৃতি হয়েছে, বরং অনেকটা এরকম যে যদি প্রতি জেনারেশন গড়ে 5 মাইল দুরে বসতি স্থাপন করে (খাদ্য, বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধার জন্য) তাহলে 1000 জেনারেশনে তারা 5000 মাইল ছড়িয়ে পড়বে। নিশ্চিত ভাবেই এরা শিকার করে বা ফলমুল সংগ্রহ (hunter-gatherer) করে যাযাবর জীবন ধারন করত , (যেহেতু কৃষিকাজের উদ্ভব তখনও হয় নি), সুতরাং প্রতি জেনারেশনে 50 মাইল বিস্তৃত হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। অনুরুপ ছেলেদের (Y-Chrom) ধারা হচ্ছে M130, M174 (M168 থেকে বের হয়েছে)। দুটি ধারাই মোটামুটি ভাবে 50,000 বছর পুরোনো, ভারত মহাসাগরের উপকুল বরাবর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। আন্দামান নিকোবরের অধিবাসী, শ্রীলংকা, মালয়শিয়া, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা হচ্ছে উদাহরন। তবে এখানেই শেষ নয় M130 পরবর্তিতে এশিয়ার প্রশান্তমহাসাগরীয় উপকুল বরাবর (জাপানীজ Ainu), আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
পুরোনো M168 এর (ছেলে) আরেকটি উপশাখা হচ্ছে M89। আফ্রিকার বাইরের লোকদের 90% এই শাখার অন্তর্গত, উপকুল দিয়ে না গিয়ে এরা আরব উপদ্্বীপ হয়ে তৃনভুমি বরাবর উত্তর দিকে যাত্রা করেছিল। এর একটি শাখা M201, এখন খুব কম পাওয়া যায়, খুব সম্ভব এরা সিন্ধু উপত্যকায় বসবাস করত, অন্য একটি শাখা হলো M170 মধ্য প্রাচ্য থেকে 20 হাজার বছর আগে ইউরোপের বলকান (যুগোশ্লাভিয়া ইত্যাদি) এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। আরেকটি শাখা M172 মধ্যপ্রাচ্য থেকে উত্তর আফ্রিকা (মিশর, লিবিয়া) এবং দক্ষিন ইউরোপে (ইটালী, স্পেন) 10-15 হাজার বছর আগে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় উপশাখা হচ্ছে M9, 40 হাজার বছর আগে উত্তর ইরান বা কাস্পিয়ান সাগরের আশেপাশে এই দলের লোকেরা বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে উত্তর গোলার্ধে বসবাস রত বেশীর ভাগ মানুষ এই দলের বংশধর (অধিকাংশ ইউরোপিয়ান, উত্তর ভারতীয়, পুর্ব এশীয়, এবং native american)।
ভারতে এই দলের মুল শাখা M20 আগেই উল্লেখ করেছি, এরা মোটামুটি 30 হাজার বছর আগে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে (পাকিস্তান, আফগানিস্থান বরাবর) উপমহাদেশে প্রবেশ করে। M9 এর আরেকটি বড় শাখা হচ্ছে M175 যারা আনুমানিক 35,000 বছর আগে steppes তৃণভুমি বরাবর (দক্ষিন সাইবেরিয়া) হয়ে দুর প্রাচ্যে প্রবেশ করে। বর্তমান পুর্ব এশিয়ার 80% এর বেশী লোক M175 দলের বংশধর। এর দুটি উপশাখা হলো M4 (দক্ষিন পুর্ব এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া) এবং M122 (চীন, তাইওয়ান), দুটোই আনুমানিক 10 হাজার বছরের পুরোনো, প্রাপ্ত তথ্যে মনে হয় এদের মাধ্যমে পুর্ব এশিয়াতে ধান চাষ ছড়িয়ে পড়েছিল।
M9 এর আরেকটি উপশাখা M45 যারা 35-40 হাজার বছর আগে বর্তমান কাজাখস্তান, উজবেকিস্তানে বসতি স্থাপন করে, প্রায় সমস্ত ইউরোপিয়ান এবং অধিকাংশ native american এই দলের বংশধর। 30-35 হাজার বছর আগে পশ্চিম মুখি উপদল M173 ইউরোপের দিকে বসতি স্থাপন করে। অসংখ্য প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন আছে এ সময়ের। এদের উপদল M343 পশ্চিম ইউরোপে (ইংল্যান্ড, স্পেন, আয়ারল্যান্ড ইত্যাদি) সর্বাধিক দেখা যায়।
M45 এর অন্য উপশাখা M242 পুর্ব দিকে সাইবেরিয়ায় বসতি স্থাপন করে। 15-20 হাজার বছর আগে এদেরই বংশধররা বেরিং প্রনালী পার হয়ে আমেরিকায় এসেছিল। আরেকটি অদ্ভুত শাখা হচ্ছে LLY22G যারা সম্ভবত মধ্য সাইবেরিয়া থেকে ফিনল্যান্ড, উত্তর স্ক্যান্ডিনেভিয়া ( saami people), রাশিয়া তে ছড়িয়ে পড়েছে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এবং IBM এর যৌথ উদ্দ্যোগে Genographic প্রজেক্ট এই human journey-এর রহস্য উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
একটা বড় সামাজিক উপসংহার দেখা যাচ্ছে বর্ন ভিত্তিক race যতটা গভীরে প্রোথিত হওয়া উচিত ছিল, জিনতত্ত্ব বলছে ব্যাপারটা আসলে ততটা নয়। তুলনাটা অনেকটা চিনি এবং লবনের মতো, দেখতে কাছাকাছি হলেও গঠনে অনেক আলাদা, আবার চিনি এবং গুড় দেখতে ভিন্ন হলেও গঠনে মিল আছে ইত্যাদি। মানুষের বাহ্যিক পার্থক্য মুলত গত 40-50 হাজার বছরের বিবর্তনের ফসল, জিনতত্ত্ব আমাদের জানতে সাহায্য করছে কিভাবে এবং কখন আমাদের এই পরিবর্তন হয়েছে। আশ্চর্যজনক হলো পুরো পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থেকেও মানুষ এখনও এক প্রজাতি অথচ মধ্য আফ্রিকার একই জঙ্গলে দুই প্রজাতির শিম্পাঞ্জী আছে। তবে সব সময়ই যে মানুষের একটি প্রজাতি ছিল তা নয়, যেমন ইউরোপে 28,000 বছর আগেও নিয়ান্ডারথাল মানুষ ( Homo neanderthalensis) ছিল, নিয়ান্ডারথাল কেন বিলুপ্ত হয়েছে তা নিয়ে বিতর্কআছে, হতে পারে আধুনিক মানুষের সাথে প্রতিযোগিতায় পারে নি, অথবা মানুষ হয়তো গনহত্যার মাধ্যমে ওদের নিশ্চহ্ন করে দিয়েছে, (নিয়ান্ডারথাল নিয়ে পরে লিখব)। আরেকটি প্রজাতি হচ্ছে Homo floresiensis, মাত্র 13,000 বছর আগেও এরা ইন্দোনেশিয়াতে বেচে ছিল। এমনও হতে পারে কোন ইন্দোনেশিয়ার কোন রেইন ফরেস্টে এরা এখনও বেচে আছে।
পুরোনো লেখা ঃ
1. Click This Link
2. Click This Link
3. Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০০৬ বিকাল ৩:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



