somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প- আদ্ভুত আগন্তক

১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কান্নার সুরের মতো একঘেয়েমি একটা শব্দ কান অবশ করে দেয় শহরবাসীর। হৈরৈ কিছু শব্দ-অনেকগুলো বাচ্চার বিশ্রী আনন্দ কোলাহল নববসন্তের এই দুপুরকে ভারি করে তোলে।অনবরত এগিয়ে আসছে শব্দটা আবাসিক এলাকার দিকে। তীব্রতর হতে হতে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় শান্তিমানবদের।
ঘুম ভেঙ্গে কেঁদে ওঠে একটা শিশু। “ওলে বাবা লে, বাবুটা আমার উঠেছে রে...” বলতে বলতে ছুটে যায় স্নেহময়ী।
ভাতঘুম- যেটা তার নিত্যদিনের অভ্যেস, দুপুরে একটা ঘুম না দিলে জীবনটাকেই বড় ব্যস্ত আর পানসে লাগে তার- থেকে জেগে ওঠেন শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব রহিদুল সাহেব। কাপাল কুঁচকে গেছে। সারাদিন সিগারেট খাওয়া তেতো মুখ থেকে অধিকতর তেতো কথাই বের হয়।
কৌশিক নিশিতার সাথে কথা বলছিল। তারও মনোযোগ নষ্ট হয়,”রাখো তো একটু, নিচে দেখে আসি কিসের শব্দ হচ্ছে।”
“কিসের শব্দ হয় হোক, তোমার তাতে কি?” ওপার থেকে উত্তর ভেসে আসে।
“আরে এক মিনিট, আমি উপরে উঠেই ফোন দিচ্ছি, রাখো প্লিজ” বলে নিচে নেমে যায় সে।
আনারুল প্রোফেসর তখন সৈয়দ হকের টানটান রগরগে একটা গল্পের কেবল দ্বিতীয় পাতায় এসেছেন; শব্দে পড়ার ব্যঘাত হওয়ায় “এই শালারা কি লাগাইছে” বলে বইটা মুদে রেখে বারান্দায় এসে দাঁড়ান।
দুপুর তখন সূর্যের মধ্য যৌবনের কৃপায় ডানপিটে। মৃদু শিমুলগন্ধী বাতাসে কোকিলের কালো ডাক ক্যানভাসে পাগলা কোন শিল্পীর তুলির মতো ভেসে বেড়ায় বাঁশঝাড়, মান্দার, কৃষ্ণচূড়া, হইড্ডা আর চাকগুয়া’র পাতায়। সরসর করতে করতে পিচরাস্তার উপর দিয়ে হেঁটে যায় ঢোঁড়াসাপ একটা, তার দেহের ডোরাকাটা হলুদ আর কালোয় বালির চিকমিক।
ওদের বাড়ির বুড়িটা যার দুই মেয়ে এখনো অবিবাহিত বলে প্রোফেসর আব্দুল আনারুল আর রহিদুল সাহেব খুব চিন্তিত- তার ছোট নাতি বাউরির পিছনে ছোটে আর তার পিছনে পিছনে ছোটে বুড়ি। শোনা যায় তার কণ্ঠ থেকে, “হারে বাউরি’ত পরলে বাতের বিষ হয়, কুত্তার বাচ্চা থামেও না।” নাতি যে তার প্রথমা মেয়ের দ্বিতীয় সন্তান তার কথা কানে না নিয়ে বিপুল বেগে ছুটতে ছুটতে সেই কলাহলের কাছে চলে যায়। বাউরিটা হটাত হারিয়ে গেলে নাতি অবাক হয়ে আগন্তকদের যারা কিনা এই কলাহলের জনক তাদের দিকে তাকায়। বুড়িও হতবাক হয়ে যায় ওদের কাণ্ডকারখানা দেখে। “দিনদিন কতো কি দেখমো” বলে এগিয়ে যায় শব্দের দিকে- কলাহলের দিকে। আগন্তক দুইজন যেন হেমিলনের বাঁশিওয়ালা- চারদিক থেকে টেনে নিচ্ছে সব ইঁদুর নাকি শিশুদের।
নিচে এসে কিছুই দেখতে না পেয়ে আবার নিশিতাকে কল করে কৌশিক।
“আমি তোমাদের বাড়ির সামনে যাচ্ছি। ঘর থেকে বের হয়ে আস।”
শব্দটা ক্রমশ জোরালো হয়- মনে হয় এগিয়ে আসছে এদিকে। একবার ভাবে দেখেই যায় কি হচ্ছে। পরমুহূর্তেই মনে হয়, “কি হয় হোক আমার তাতে কি”। এই কথা ভাবা শেষ করার আগেই সে ভিড়টা দেখতে পায়। চোখ আটকে যায় আগন্তকদের দিকে নাকি আগন্তকদ্বয়ের দিকে।
সেও ভিড়ের একজন হওয়ার জন্য এগিয়ে যায়।
আনারুল সাহেব বারান্দায় এসে কিছু দেখতে না পেয়ে আবার বইয়ে মনোনিবেশ করেন।
অদ্ভুত আগন্তকদ্বয়ের পোশাকও অদ্ভুতভাবে পরিহিত। দুইজনেরই মাথায় হ্যাট। রংচটা হ্যাটের মাঝে একটা সিল মারা; খুব সুক্ষ বলে কারো চোখে পরে না। লম্বা ঢোলা প্যান্ট আর কোট পরে তারা যখন হাটে অদ্ভুত ঝুমুর ঝুমুর শব্দ হয়।
এই ঝুমুর ঝুমুর শব্দের টানে নাকি তাদের ব্যতিক্রম চালচলন আর কাজের জন্য ওদের পিছনে ছুটতে থাকে খাল পাড়ের বস্তির ছেলেরা।
আগন্তক দুই’জন মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ওদের ঝাড়ি দেয় দুইএকবার। ওরা কিছুদূর পিছিয়ে যায়, আগন্তকেরা চলতে থাকলে পিছনের ছেলেরাও ওদের অনুসরণ করে।ছেলেগুলোর আওয়াজের কারণে ওদের কাজ ব্যহত হয়।
আগন্তক দুইজন রাস্তাটা যেখানে লাঙলের ফলার মতো ৪৫ ডিগ্রি বাঁক নিয়ে জলঢাকার দিকে চলে গেছে সেখানে মান্দার গাছের নিচে দাঁড়ায়। মান্দারের লাল লাল তরুণরঙা ফুল কিছু ফুটে কালো আর কিছু ফুটতে শুরু করেছে, বুলবুলি পাখি একটা ডেকে উঠলে তার দিকে তাকিয়ে হাত নারে একজন, উড়ে গিয়ে কড়াই গাছের সাড়ির ঘন ধুলিময় সবুজে হারিয়ে যায়। কান খাড়া করায় আপনা থেকেই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তাদের। ছেলেরা যারা তাদের পিছনে ছুটছিল তারা মানুষ দুজনের দিকে খেয়াল করে নিঃশব্দ হয়ে যায়- ওরা বুঝতে পারে আগন্তকেরা কিছু একটা শোনার চেষ্টা করছে কিংবা খুঁজছে।
হাসি ফুটে ওঠে বয়োজ্যেষ্ঠ আগন্তকের ঠোঁটের কোনে- জ্যৈষ্ঠ মাসের বাতাসে তুলো যেন- সামান্য বাতাসেই মিলিয়ে যায় নীল আকাশের রোদেলা রঙে। ছেলেদের কেউ অদ্ভুত হাসিটা তার দেখতে পারে না। তারা ওর হটাত অতিরিক্ত গম্ভীর হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে।
জ্যেষ্ঠ আগন্তক অপরজনকে কি যেন বলে। সে তার থলে ঠেলে একটা ইঞ্জেক্সান বের করে ওর হাতে দেয়।
তারপর ওরা রহিদুল সাহেবের বাগান বাড়িতে ঢুকে পরে। ছেলেরা এবার আর ওদের অনুসরণের সাহস করে না। তারা রদ্ধশ্বাস অপেক্ষা করে আগন্তকদের বের হওয়ার অপেক্ষায়।
নিঃশব্দে ওরা বাগানের ভেতর হাঁটতে থাকে, পায়ের নিচে ভেঙ্গে যায় ঝরা আমকাঁঠালের শুকিয়ে যাওয়া পাতা। ওরা দেখতে পায় তাদের লক্ষ বস্তু।
কুকুরটা তখন শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হটাত গলায় শক্ত কিছু অনুভুত হওয়ায় ককিয়ে ওঠে। চীৎকার করার সময় পায় না। তার আগেই তার সারা দেহ কম্পিত করে ব্যথা বয়ে যায় বন্যার জলের মতো মসৃণ। কুঁকড়ে যায় জন্তুটার দেহ।
সাঁড়াশির মাথায় কুকুরটাকে নিয়ে বেড়িয়ে আসে আগন্তক দুজন।
মৃত কুকুরটাকে দেখে আনন্দিত হয়ে ওঠে বস্তির ছেলেরা। কিন্তু তারা শব্দ করার সাহস পায় না। মৃত কুকুরটাকে রাস্তার ধারে ফেলে রেখে আবার হাঁটতে থাকে আগন্তকেরা।
কেউকেউ পরীক্ষা করে কুকুরটা মরেছে কি না। ঘৃনায় নাক কুঁচকে যায় কারো কারো।
আবার অদ্ভুত শব্দ করতে করতে ওরা হাটা শুরু করে। চারিদিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে এগোয়; মাঝে মাঝে কোনকোন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে কি আছে দেখার চেষ্টা করে।
কুকুরগুলো বুঝে যায় ওদের মারার জন্য দুইজন যম এসেছে। তাই ওরা বাড়িগুলোর পিছনের ভুট্টা ক্ষেতগুলোয় লুকোয়। ওখান থেকে ভুকতে থাকে তারস্বরে। ভুট্টার গাছগুলো ব্যাংকারের মতো কাজ করে।
সিগারেট ধরায় একজন। কাঁধে সাড়াশি, লম্বা পাতলুন আর অদ্ভুত স্টাইলে সিগারেট খাওয়ার জন্য তাকে ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হয়। লোকটা সিগারেট খাওয়ার সময় চোখমুখ কুঁচকে আনছে, তারপর নাক দিয়ে ধোয়া বের করার সময় ভোঁস করে শব্দ বের হচ্ছে যেন। প্রতিবার ধোয়া ছারার পর কালো কুচকুচে ঠোঁটগুলো জিহ্বা দিয়ে চেটে নিচ্ছে।
বুড়িটা জিগ্যেস করে কনিষ্ঠজনকে, “কয়ডা কুত্তা মারলেন বাহে আইজকে?”
লোকটার মুখে হাসি ফুটে ওঠে, খোঁচাখোঁচা দাড়িওয়ালা গালে ভাঁজ পরে একটা। “দশটা”- বলার সময় সাদা দাঁত চিকচিক করে ওর।
“তোমরা কি সরকারি লোক হা বাহে?” বুড়ির জিজ্ঞাসা যেন শেষ হয় না।
এবার হাটা থামায় লোকটা। আবার মুখ কুঁচকে সিগারেটে টান দিয়ে ভোঁস করে ধোয়া ছেড়ে বলেন তিনি, কণ্ঠে কৌতুক খেলা করে, “হামরা হামার লোক”। বলে আবার অদ্ভুত গতিতে হাটা শুরু করেন।
আনারুল সাহেবের বাড়ির সামনে এলে আগন্তকেরা এলে তিনি ওদের দেখে যতপরনাই অস্বস্তি বোধ করেন; এদের চেহারা দেখে তার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে; “কি কি...কি চাই” বলে খকিয়ে ওঠেন তিনি। তার হাত থেকে সৈয়দ হকের “ফিরে আসে” বইটা পরে যায়। তার দেহ যেন অবশ হয়ে আসে।
জ্যেষ্ঠ আগুন্তুকের থেকে চোখ ফিরিয়ে কনিষ্ঠজনের দিকে নিয়ে যান- দেখেন তিনি অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন; চোখে চোখ পরলে সেখানে তিনি নক্ষত্র দেখতে পান- লক্ষ মাইল বেগে যেন সেটা তার দিকে ছুটে আসছে। আগুন্তুক চোখ সরিয়ে তার কাঁধে নিয়ে গেলে তার মনে হয় ছুটন্ত নক্ষত্রটা পাশ কেটে চলে গেল- স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন আনারুল সাহেব। তবু ভয়ে কণ্ঠ শুকিয়ে যায়।
জ্যেষ্ঠ আগুন্তক তার এরকম ভয় পাওয়া প্রশ্ন শুনে মোটেই ঘাবড়ান না, যেন তিনি জানতেনই এমনটা হবে।
“আপনার বাড়িতে কুকুর আছে, স্যার? আমরা কুকুর মারি”
“ না না, কোন কুকুর নাই......কোন কুকুর নাই” নাকেমুখে উত্তর দেন আনারুল প্রোফেসর।
আগুন্তুক বারান্দার কাছ থেকে সরে আসেন। তার স্ত্রী আওয়াজ শুনে ঘর থেকে বেড়িয়ে এসেছে। কুকুর মারার কথা শুনে চোখ ঝলমল করে ওঠে তার।
“আছে, একটা আছে... আমার সাথে আসেন” বলে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান আগুন্তুকদের। আনারুল সাহেব বিব্রত বোধ করেন। তাকিয়ে দেখেন তার দিকে অনেক গুলো হাড়হাভাতে ছেলেমেয়ে চোখ আটকে রেখেছে। তার চোখ স্বভাবতই বড় হয়ে যায়। সরে যায় ছেলেমেয়েগুলো। ওরা চলে গেলে নিজেকে বড় অসহায় আর একা লাগে। অকারণেই আশেপাশে তাকান- রক্তের শীতল স্রোত একটা বয়ে যায় পঁয়ত্রিশ বছর বয়সি মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে।
একটা নিহত কুকুর নিয়ে আগন্তক দুইজন বের হয়ে আসে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে কুকুরের ফাঁক করা মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। কুকুরটার জিহ্বা বেড়িয়ে এসেছে- মৃত লালায় রোদ পরে প্রতিফলিত হচ্ছে।
“দশটা টাকা দেন স্যার, বিড়ি খাব”- বলে বারান্দার সিঁড়িতে বসে পরে জ্যেষ্ঠজন।
আনারুল সাহেব হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে ২০ টাকার একটা নোট নিয়ে আসেন।
“স্যার, ১০ টাকা তো নাই”- বাঁকা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পকেটে খুচরা খুঁজতে খুঁজতে বলেন আগুন্তুক।
“না না লাগবে না খুচরা, যান”।
তাড়াতাড়ি ওদের তাড়াতে পারলেই বাঁচেন তিনি।

২
কৌশিকের যেন ঘোর লেগে যায়, পায়ের গড়ালিতে পাহাড়ের নিশ্চলতা অনুভব করে সে। পিঁপড়ের মতো সরসরানি পা থেকে সারা দেহে ছড়িয়ে পরে। বুকের ভেতরে ছটফটানি খাঁচাবন্দী পাখির।
ফ্যানের সাথে আটকে আছে দেহটা, মাফলারের চ্যাপ্টা দড়িতে ভর করে, দুলছে যেন- হাওয়ায়?
তখনো যে মেয়েটা ঝাড়ু দিতে আসে, আসেনি- কিন্তু পাশের বাড়ির টয়লেটের দরজা খোলা নাকি বন্ধের ধাতব কর্কশ ধ্বনি কানে আসে। বাবা-ছেলে তাকিয়ে আছে ঝুলে পড়া দেহের দিকে। কৌশিক বুঝছে না কিছু। কান্না পাচ্ছে কী? গলার কাছে কিছু একটা অনুভব করতে চায় ও। সরসরানি, ভার ভার লালা কি একদলা কফ। খুঁজে পায়না ও। কিন্তু চোখগুলো শক্ত হয়ে গেছে ও বুঝতে পারে। ঠোঁট কাঁপতে থাকলে বাবা কাঁধে হাত রাখেন- ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলে। এই সময়ে বাবার শরীরে, কথায় সান্ত্বনা থাকার বদলে তীক্ষ্ণ অনুরোধ দেখতে পায় ও। বাবা মায়ের নিথর পায়ে হাত দিলে নড়ে যায় দেহটা, ঘুরতে থাকে বাউরির বাতাসে পড়া ঘাস পাতার মতো। বাবা দেহটাকে নামানোর কোন চেষ্টা না করে অপেক্ষা করতে থাকেন লোক সমাগমের।
মায়ের মুখ কোনদিন এতো ঘাড় উঁচু করে দেখেনি ও, নিচ থেকে বড় বেঢপ দেখাচ্ছে নিষ্পাপ মুখটা, লালা শুকিয়ে মাছি উড়ছে মুখে।
এতো করে বাবার নিষেধ শর্তেও একসময় উচ্চস্বরে চীৎকার করে ওঠে ও। বাবাকে বড় অসহায় মনে হয়। তারপর বিড়ালের মতো বাবাও কাঁদতে থাকেন। অনেক লোকের আগমনে চিরনির্জন বাড়িটা ফুটবলে খেলার মাঠ হয়ে যায়। বাবা বিলাপ করতে থাকেন।
পায়ের গড়ালিতে পাহাড়ের নিশ্চলতা অনুভব করে কৌশিক। পিঁপড়ের মতো সরসরানি পা থেকে সারা দেহে ছড়িয়ে পরে। বুকের ভেতরে ছটফটানি খাঁচাবন্দী পাখির। লোকদুটোর চোখে কাল সাপ দেখতে পেয়ে নিজের ভেতরের আগুনে ঘি ঢালে সে।
লোকদুটোও তাকে একদৃষ্টে দেখছে। তারপর মাথা নাড়ে বয়োজ্যেষ্ঠ জন। কৌশিকের চোখে সম্মতির চিহ্ন।
কৌশিকের পিছনে পিছনে তারা বাড়ির অন্দরে ঢুকে যায়। ছেলেমেয়েরা শোরগোল শুরু করে; কেউকেউ আনারুল সাহেবের বাড়ির সামনের মৃত কুকুরটাকে কোথায় পুতে ফেলতে হবে সে সম্পর্কে বিস্তর গবেষণা করতে থাকে।
দরজা লাগিয়ে দেয় কৌশিক। ওর বাবার এতো দিনের পোষা কুকুরের যেটা তিনি ফিলিপাইন থেকে এনেছিলেন আর খাইয়ে তেল মাখিয়ে সিংহের মতো বানিয়েছেন এবং অতিথির চোখে যা বিশেষ মর্যাদার প্রতীক- শেষ চীৎকার শোনা যায়। শিক্ষিত কুকুর হলেও রাস্তার কুকুরের ভুকভুকানি থেকে তা আলাদা করার বিন্দুমাত্র উপায় কেউ খুঁজে পাবে না।
৩
পরদিন ভোর হওয়ার পরপর, যখন সূর্য উঠি উঠি করছে- কিন্তু আড়মোড়া ভাঙার অলসতার কারণে বিছানায় চুপ করে আছে; দুইএকটা টুনটুনি ও গান্ডারি ছাড়া আর কোন পাখি ডাকার জন্য জেগে ওঠেনি, অল্পের জন্য জামাত মিস করে কিছু তরুণ দাড়িওয়ালা হুজুর আর এলাকার কিছু ছেলে যাদের পরীক্ষা সামনে, শেষ ফাল্গুনের বাতাসেও শীতের আমেজ বলে গা শিরশিরিয়ে ওঠে মর্নিং ওয়াক করতে থাকা মাঝবয়সী আত্মঘষিত তরুণদের, আর গরম কিছু আনেনি বলে দোষারোপ করে- কিন্তু কাকে করে হয়তো তারা নিজেও জানে না- তখন আনারুল সাহেবের স্ত্রী, কৌশিক আর রহিদুল সাহেবের পুত্রবধূ ব্যাপারটা বুঝতে পারে; কিছুক্ষণ পর যখন সূর্য অলসতার কারাগার ভেঙ্গে বেড়িয়ে এসেছে, আর কাকের কা কা ডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেছে প্রায় সবার, অনেক লোক জমায়েত হয় তাদের বাড়িতে।
আনারুল সাহেবের স্ত্রী তার স্বরে কাঁদে, আর কেন আল্লাহ্‌ ওর কপাল এমন ভাবে পুড়িয়ে দিল তা জানতে চায়। কৌশিক চুপচাপ শেষকৃত্য করে যায়- তার মুখে কোন ছায়া- বিষাদের বা আনন্দের- পাওয়া যায় না। রহিদুল সাহেবের পুত্রবধূ আর ছেলেরা মুদারায় কান্নার কোরাস গায়। সারা শহরে নীরবতা নেমে আসে এলাকার গণ্যমান্য ও যাদের ঋণ শোধ করতে পারবে না কোনদিন শহরবাসী তাদের অভুত ও রহস্যজনক মৃত্যুতে।
সপ্তাহ ব্যাপি শোক পালিত হয়- জাতিয় পতাকা অর্ধনিমিত রাখা হয়। চারিদিকে- বেতারে, অনলাইন আর মুদ্রিত পত্রিকায়, শহরের স্থানীয় চ্যানেলে তাদের সম্মানে চারদিন আনন্দানুষ্ঠান বন্ধ থাকে।
শুধু বস্তির পাড়ের মানুষ, বুড়িটা আর যারা বেতার টেলিভিসনে কোন দিন জায়গা পায়না, আর সভ্য হতে পারে না কিংবা হয়না কোন মহাসভার- তারাই নীরব থাকে, শোক কিংবা আনন্দ কোনটাই তাদের কণ্ঠে, ভাবে, চালচলনে প্রকাশিত হয় না।
৪
সূর্যের আলো হেলে পেয়ারা গাছের পাতায় পরে প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাদিয়ে দিচ্ছে, বাতাসে গ্রীষ্মের আগমনী বার্তা ঘষিত। খাল পালের বস্তির ছেলেরা অদ্ভুত সে দুইজন আগন্তকের পিছনে কোলাহল করছে। তাদের পরনে ময়লা কোট আর মাথায় খুব সুক্ষ, প্রায় দেখা যায় না এমন সিলা মারা হ্যাট, কাঁধে সাঁড়াশি- ঠোঁটমুখ কুঁচকে সিগারেট টানতে টনাতে, ঝুমুর ঝুমুর শব্দে মুখরিত করে চারপাশ তারা হেঁটে যাচ্ছে।
বুড়ি, তরুণী, তরুণ, কিশোর তাদের জিগ্যেস করছে, “আপনারা সরকারি লোক?”
হাস্যোজ্জল মুখে কখনোবা গম্ভীর হয়ে ওরা উত্তর দেয়, “হামরা হামার লোক।”
10th February to 12th February, 2015
১৮টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দরজা ভাঙ্গে যে রাষ্ট্র।। দ্বীপ সরকার

লিখেছেন দ্বীপ ১৭৯২, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪০



দরজা ভাঙ্গে যে রাষ্ট্র

একদা এক রাতে-
রাষ্ট্র, কড়া নাড়তে নাড়তে দরজা ভেঙ্গে
ঢুকে পড়লো
আমি নিথর,নিস্তব্ধ এক জনগণ
বললাম,আমি ভয় পাচ্ছি
রাষ্ট্র হাসতে হাসতে ভাঙ্গা দরজা দিয়ে
এক পা দুই পা করে,লোকালয়ে মিশে গেলো

রাষ্ট্র কি ভয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

জগন্নাথবাসীগণ, আমার কথা শুনছেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

জগন্নাথবাসীগণ,
আপনাদের গরু কোরবানি যদি হযরত জাবের (রাঃ)-এর মতো
নবীজীর সম্মানে হয়ে থাকে, তাহলে মোবারকবাদ।
আর, শুধু প্রতিবাদ দেখাতে একটি অবলা পশুকে হত্যা করে থাকলে,
তার জন্যে খোদার দরবারে বিচার দিলাম।
...বাকিটুকু পড়ুন

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×