সেলিব্রেটি জিনিসটা এখন ঘরে ঘরে পয়দা হচ্ছে। প্রতি পাড়ায় অন্তত একজন করে তো আছেই। সেলফি সেলিব্রেটি, সেলিব্রেটি লেখক, দেশপ্রেমিক, বিশ্বপ্রেমিক ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে প্রতিভা চেনার একটা বড় মাধ্যম এই ফেসবুক। আচ্ছা, আপনি কি ভাবতেও পারতেন আগে, ঐ ছেলেটা যে আগে নাকের সর্দি সার্টের হাতায় মুছত, সে এতো সুন্দর প্রেমের গল্প লেখে? আর আপনার ফ্রেন্ড “রবিউল”, যে কিনা “হ্রাস”কে উচ্চারণ করত “হেরাস”, সে এতো ভাল কবিতা লেখে? সে কি ছন্দ-অনুপ্রাস তার কবিতায়! আমি তো মুগ্ধ!
তো ব্যাপারটা হল কীভাবে সেলিব্রেটি হবেন। হাবু সাবু যদি হতে পারে, আপনি পারবেন না কেন? আপনার কি নাই? থুড়ি, আমি বলতে চাইলাম, “আপনার কী নাই?” (ই-কার আর ঈ-কার লক্ষণীয়)
যাই হোক। তার মানে এটাই দাঁড়ায় সবাই এক চান্সে সেলিব্রেটি হতে চায়! সহজে সেলিব্রেটি হওয়ার জন্যই তো এই পোস্টে আসা, নাকি?
অবশ্য এর একটা খারাপ দিকও আছে। সেটা পরের বিষয়। এখন গোপাল ভাঁড়ের একটা গল্প শুনুন। সেটা অবশ্য সহজে ধনী কীভাবে হওয়া যায় সেটা নিয়ে। ঐ হোল, সহজে ধনী হওয়াও যা, সেলিব্রেটি হওয়াও তা। যে কৃষ্ণ সেই কেষ্ট।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভার ভাঁড় গোপাল। আপনারা হয়ত জানেন যে এই রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাতেই কবি “ভারতচন্দ্র রায়গুনাকার” কাব্য চর্চা করতেন। তার সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য “অন্নদামঙ্গল”। সে পরের বিচার। তো ভাঁড় হিসেবে গোপালের নাম ছড়িয়ে পরেছে দেশময়। এদিকে মারাত্মক তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কারণে অনেকেই তার কাছে মাঝেমাঝে কানপোড়া নিতে আসে। গোপাল দিতেও কার্পণ্য করে না।
তো একদিন এক বালক এলো গোপালের কাছে। গোপাল তখন সদ্য গোসল সেরে টাক মাথায় তেল দিচ্ছে।
গোপাল সেই লাফাঙ্গাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “তো বল বৎস, তোমার কী সমস্যা”
বালক গোপালকে বলল, “সমস্যা তো একটাই বস, আমার টাকা নেই। আপনি তো সবাইকে জ্ঞান দিয়ে বেড়ান, তো আমাকেও একটু বাতলে দিন তো কীকরে সহজেই, একেবারে বীনা পরিশ্রমে অনেক টাকার মালিক হওয়া যায়!”
গোপাল কিছুক্ষণ ভাবল। বলল, “এটা তো খুব সহজ ব্যাপার। কিন্তু আমি তো এই মহামূল্য তত্ত্ব তোমাকে এমনি এমনি দিতে পারি না। তবে তুমি আমাকে ১০০ টাকা দিলে আমি বলতে রাজি আছি।”
“তা না হয় দেব। এখন আপনি বলুন, আমাকে কী করতে হবে।”
“তাহলে শোন বাছা” বলে, গোপাল চান্দিচেলামাথায় একবার হাত বুলিয়ে বলতে লাগল।
“শোন তুমি একটা সাইনবোর্ড তৈরি করে টাঙ্গিয়ে দাও বাজারে। সেখানে লেখা থাকবে, “এখানে সহজ উপায়ে ধনী হওয়ার কৌশল বাতলে দেয়া হয়। ফি ১০০ টাকা”। তারপর দেশেবিদেশে, জলে ডাঙ্গায়, পথে প্রবাসে সবখানে ছড়িয়ে দাও এর কথা। কে না ধনী হতে চায়, বেকুব ছাড়া? সবাই দেখবে ছুটে আসছে তোমার কাছে। এভাবে যদি ফর্মুলা বলে দিয়ে টাকা নিতে পার তবে দেখবে অল্প দিনেই ধনী হয়ে যাবে। কোন পরিশ্রম ছাড়াই”
একথা শুনে বালক গোপালের পা ছুঁয়ে সালাম করে চলে যাচ্ছিল, গোপাল দেখে বলল, “আরে বাছা, যাচ্চো কোথায়? আমার ১০০ টাকা দিয়ে যাও!”
এবার ভাবুনতো, এটা কী ধরনের পোস্ট?
আচ্ছা গোপালের গল্প বললাম যেহেতু আরও কয়েকখানা বলি। গোপাল এমনি এক চরিত্র যে ওর গল্প শুনতে কারো আপত্তি থাকার কথা না। আপত্তি থাকলে এখুনি দূরে গিয়ে মরেন, আপনার আর সেলিব্রেটি হওয়ার দরকার নেই।
তো একদিন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় ঠিক হোল যে পরদিন সবাই পিকনিকে যাবে। খুব সকালে উঠতে হবে। সক্কাল সক্কাল না বেরুলেই সব মাটি।
গোপাল বাড়ি এসে গিন্নিকে বলল, “গিন্নি, কাল সকাল সকাল যেতে হবে। সূর্য উঠলেই ডেকে দেবে, ঠিকাছে?”
গিন্নি বলল, “অকে”
কিন্তু গিন্নি ডেকে দেবে কি গোপাল নিজেই ঘুম থেকে উঠে পড়ল মাঝরাতেই। উঠেই বলল, “দেখত গিন্নি, সূর্য উঠেছে কিনা”
গিন্নি বলল, “আ মল যা, সূর্য উঠবে কি! এখনও তো বাইরে অন্ধকার”
গোপালের মাথায় রাগ চেপে গেল। সে বলল, “অন্ধকার তো কি হয়েছে? বাতিটা নিয়ে গিয়েই দেখনা, সূর্য উঠেছে কিনা!”
আরেকটা বলি? না থাক। অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট। তার চেয়ে গোপাল ভাঁড়ের ১১১ হাসির গল্প পড়ে ফেলুন। হার্ড কপি পেলে তো কথাই নেই, কিনে ফেলতে দ্বিধা করলে আপনার পাপ হবে। আর যদি পিডিএফ চান তবে, আমার বই ডট কমে আছে, ডাউনলোড করে ফেলুন।
তো আমরা এখন গোপাল ভাঁড় থেকে আবার ফেসবুকে ফিরে আসি। প্রথমে কমেন্টের কথা বলব না লাইকের? আচ্ছা আগে কমেন্টের কথাই বলি। কারণ কমেন্ট ব্যাপারটা সামুতেও আছে।
১ম উপদেশ- বুঝেশুনে কমেন্ট করুন!
কমেন্ট যে কতো গুরুত্বপূর্ণ সেটা সেলিব্রেটি মাত্রই জানেন। আপনার পোস্টে একটা কমেন্ট মানেই সেটা আপনার ফ্রেন্ডদের হোম পেজে চলে যাওয়া! আর কমেন্ট করাটাও একটা বড় ব্যাপার। সবাই কমেন্ট করতে পারে না। যেমন আমিই ভাল পারি না। সেজন্যই আমি এখনও সেলিব্রেটি হতে পারলুম না। অবশ্য তাতে কোন সমস্যা নেই। কে না জানে যে, যারা ভাল খেলতে পারে না, তারাই ভাল কোচ হয়। ম্যারাদোনা প্লেয়ার ভাল ছিল বটে কিন্তু কোচ হিসেবে? আর দুঙ্গা? পারল ফেডারেশন কাপ এনে দিতে? সুতরাং আমার উপদেশ বিফলে যাবে না, গ্যারান্টি!
এবার দেখুন, আবালের মত কমেন্ট করলে কী হয়।
১। আমি বেছে বেছে রমণীকুলকেই রিকু পাঠাতাম আগে। (এখন ভদ্র হয়ে গেছি)।
তো এক বালিকা পিক আপ করলো। অসাধারণ পিক। ভাগ্য খারাপ যে আমার প্রিন্টার নেই। থাকলে ছবিটা প্রিন্ট করে চুমু খেতাম। বুঝতেই পারছেন, সেই চেহারা। মনে মনে বললাম, “রুপ ইত্না সাদাপান, তো কিত্না ছুন্দার হোগা মান”! এগুলো সব মনের কথা। এতো ভাল পিক, কমেন্ট করতেই হোল। কবি বলেছেন, সুন্দরের প্রশংসা না করলে, সৌন্দর্য সৃষ্টিই বন্ধ হয়ে যাবে। ( ভুয়া কথা- আমি যদি সুন্দরী মেয়ের পিকে কমেন্ট না করি তবে কি বাপমায়েরা সুন্দরী মেয়ে পয়দা করা বন্ধ করে দেবে?)
সে যাই হোক, কমেন্টে লিখলাম- “পরে না চোখের পলক, কী তোমার রুপের ঝলক!”
আহা! কী কাব্যিক কমেন্ট! কিন্তু ফলাফল?
ব্লক!
২
আমার এক ফ্রেন্ড প্রপিকে শহীদ আফ্রিদির ছবি। কমেন্ট করলাম, “ভাই, যে দেশ আমাদের এতো অত্যাচার করেছে, ত্রিশ লাখ নিরপরাধ মানুষ হত্যা করেছে সেই দেশের প্লেয়ারের ছবি করলেন প্রপিক! বিবেকে বাঁধল না?”
রিপ্লাই দিল, “ভাই খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না।”
জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, আপনার বোন আছে?”
“কেন ভাই?”
“না ভাই, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম, সমস্যা না থাকলে বলুন”
“আছে”
“বোন আছে না সমস্যা আছে?”
“বোন আছে”
এবারে লিখলাম, “আচ্ছা ভাই ধরুন, আমি আপনার বোনকে রেপ করলাম। এদিকে ধরুন আমি খুব ভাল ক্রিকেটার। হঠাৎ করে জাতীয় দলে চান্সও পেয়ে গেলাম। প্রথম ম্যাচেই করলাম সেঞ্চুরি। আচ্ছা, ধরুন এনে দিলাম বিশকাপও। তারপরেও কি আপনি আমার ফ্যান হবেন? তখন কি বলতে পারবেন, “খেলার সাথে রেপটেপ মেশাবেন না? রেপ করেছে করেছে, খেলে তো ভাল, নাকি?” বলবেন একথা?”
ফলাফল- ব্লক!
উপদেশ- অযথা জ্ঞান দেবেন না।
কমেন্ট নিয়ে মেলা কথা বললুম। এবারে কমেন্ট নিয়ে রম্য শুনুন একটা।
রাজা শ্রী রামচন্দ্রের লাখ লাখ ফলোয়ার। রাজা তো- হবেই। তো তিনি একবার স্ট্যাটাস দিলেন।
রাজা শ্রী রাম is thinking about dream!
‘কাল রাতে একটা চমৎকার স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম রাবণ ব্যাটা তালগাছে চড়ছে। বিশাল বড় তালগাছে। চড়তে চড়তে পপাত! ধরাস করে মাটিতে পড়ল!
আমি হনুমানকে বললাম, “যা ব্যাটাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে আয়”
হনুমান এসে বলল, “সমুদ্রে ফেলার আর দরকার নেই। শালা অলরেডি মরে ভূত”
জাম্বুমান কমেন্ট করল- “তাহলে রাবণ ব্যাটা সত্যিই মরেছে। রাজার স্বপ্ন মিথ্যে হতে পারে না। কাভি নেহি!”
বিভীষণ- “রাজার স্বপ্ন মিথ্যা হতে পারে না, পারবে না”
বাকি ফলোয়ারেরাও কমেন্ট করল- “পারে না, পারে না”
এদিকে লক্ষ্মণ আবার স্ট্যাটাস দিয়ে দিল। “রাবণ ব্যাটা মরেছে। চাই কি? ফুর্তি কর, ফুর্তি কর”
রাজ্যে আনন্দের ফোয়ারা বয়ে গেল। আনন্দম আনন্দম।
এদিকে কিছুক্ষণ পর খবর এলো, রাবণ রামরাজ্য আক্রমণে আসছে। তার রথ দেখা দিয়েছে।
সকলে বলল, “রাবণ ব্যাটা তবে মরেনি। ব্যাটার কৈ মাছের প্রাণ!”
সাথে সাথেই জাম্বুমান স্ট্যাটাস দিয়ে ফেলল, “সব শালার ঐ হনুমানই মাটি করল- তখন ব্যাটাকে সমুদ্রে ফেলে দিলেই ল্যাঠা চুকে যেত। তা না, শালা বিদ্যে জাহির করতে গেছে- “রাবণ মরে ভূত”
বিভীষণের কমেন্ট- “চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে-“
হাজার হাজার ফলোয়ার কমেন্ট করল- “ঐ হনুমানই সব শেষ করে দিল। ব্যাটারে শূলে চড়ানো উচিৎ”
এদিকে আবার লক্ষ্মণের স্ট্যাটাস- “ফাক ইউ হনুমান”
সেখানে কে একজন আবার কমেন্ট করেছে- “ও তাইলে আমার ফ্রেন্ডলিস্টে অন্তত একজন গে আছে!”
উপরের লেখাটা সুকুমার রায়ের নাটক “লক্ষ্মণের শক্তিশেল” থেকে মেরে দেয়া। আসল গল্পটা নাটকের কোন জেনারের মধ্যে পরে জানি না। ওটা নিঃসন্দেহে ‘সুকুমার জেনার’। পড়ে ফেলুন নাটকটা। ওটা না পড়লে জীবন “ষোল আনাই মিছে’’
উপদেশ- কমেন্ট করুন। প্রচুর কমেন্ট করুন। দরকার হলে ইমো মারুন। মাঝে মাঝে এরকম কমেন্ট করবেন- “মামা লাইক কমেন্ট দুইটাই করলাম। মনে রাখিয়ো। আর বাকি যারা আছে তাদের বলছি, লাইকার হলে এড দাও। 3G গতিতে একসেপ্ট করা হবে। আনলাইকাররা দূরে থাকো”।
সেলিব্রেটি মানেই লাইক। আপনাকে লাইক কামাতেই হবে যেকোন উপায়েই হোক। উপরে একটা নমুনা দিলাম। ট্রাই করে দেখতে পারেন। হয়ত বলতে পারেন, “ভাই এটা লাইক ভিক্ষা হয়ে গেল না!”
আমি বলব, “দেয়ার ইজ নো ফেয়ার ইন লাইক এন্ড ওয়ার”। লাইকের জন্য আপনাকে দরকার হলে তাতেন্দা তাইবু হতে হবে! মাইরি বলছি এভাবে ১ মাস চালিয়ে যেতে পারলে আপনি সেলিব্রেটি হয়ে যাবেন। বিফলে মুল্য ফেরত।
আরেকটা উপায় আছে অবশ্য। সেটা ভিক্ষা না। সৎ উপায়। এটা হোল, দেশপ্রেমিক হয়ে যাওয়া। দেখবেন ফেসবুকে যত সেলিব্রেটি আছে সবাই দেশপ্রেমিক। নয়ত হয়ে যান, লুতুপুতু গল্পকার। বাঙালি লুতুপুতু গল্প যত পড়ে বইয়ের পৃষ্ঠা যদি তত পড়ত, তবে আজ ঘরে ঘরে বিদ্যাসাগর জন্ম নিত। কী বললেন? লুতুপুতু গল্প আপনার আসে না? আরে সে জন্যই তো আমি আছি। আর আমিও যদি ঠিকমতো শেখাতে না পারি তবে রেডিওমুন্নার পেজ নিয়মিত ভিজিট করুন। (সামুর প্রেমের গল্পগুলোও দেখতে পারেন)
নিচে একটা লুতুপুতু গল্প দিলাম। ভাল লাগলে লাইক দিতে ভুলবেন না যেন! লে ছক্কা-
“আচ্ছা, রুবাইয়াৎ মানে জানেন?”
সোহেল ম্যাসেজটা পাঠিয়ে বসে আছে। সিন। রিপ্লাই দেবে সন্দেহ নেই। ও এ ব্যাপারে বেশ এক্সপার্ট। হাই হ্যালো টাইপ ম্যাসেজ দিলে কেউ ফিরেও তাকায় না। ও নিজেই দেয় না অনেকসময়- মেইল হলে তো কথাই নেই, রিপ্লাই তো দেবেই না, পারলে আনফ্রেন্ড করে দেয়।
রুবাইয়াৎ নামটা অনেকদিন ধরেই ফ্রেন্ডলিস্টে আছে। এতদিন চোখে পরেনি। কীভাবে পরবে? পাঁচহাজার ফ্রেন্ডের ভিড়ে রুবাইয়াৎ তো দূরের কথা ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাসও হারিয়ে যাবে।
এই ব্যাপারটা সূর্যোদয়ের মত সত্য যে, প্রত্যেক মানুষ নিজের নামকে ভালবাসে। করিম মিয়াকে, “ভাই একটু দেখবেন প্লিজ” বললে যে কাজটা হবে না, সে কাজটা চুটকির মধ্যে হয়ে যাবে যদি বলেন, “করিম ভাই, একটু দেখবেন, প্লিজ”। তো সোহেল প্রথম ম্যাসেজটার বিষয়বস্তু হিসেবে নামকেই রাখল।
“আচ্ছা, রুবাইয়াৎ মানে জানেন?”
“আম্মম্ম, ঠিক জানিনা, দাদু রেখেছিল”
এটাই চেয়েছিল সোহেল। এখন রুবাইয়াৎ নিয়ে অন্তত কয়েকটা ম্যাসেজ বিনিময় হবে। অবশ্য ও নিজেও জানত না “রুবাইয়াৎ” মানে কী! কিছুক্ষণ আগে গুগোল থেকে জেনেছে। আসলে নতুন কারো সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে, ‘কোথায় পড়ে, কী করে’ ইত্যাদি ইত্যাদি জানতে চাওয়া বেশ বিরক্তিকর। একঘেয়ে ব্যাপার। তারচেয়ে কোন বিষয় নিয়ে কথা হলে ভাল হয়। তারপর পরস্পরের ব্যাপারে এমনিতেই জানা যাবে।
“আমি জানি”
“কী?”
“বললে আমি কী পাব?”
রুবাইয়াতের চেহারা খারাপ না। চোখগুলো শিশিরের মত, একফোঁটা। অবশ্য এর কতোটা সফটওয়ারের ক্যারামতি তা বোঝার উপায় নেই।
প্রপিকে লাইক দিল সোহেল।
“আপনি কি কোন কিছুর আশায় আছেন নাকি?”
“তা তো আছিই” মনে মনে বলে সোহেল।
“আমি তো আর মহাপুরুষ না যে কিছু আশা করব না”।
সোহেলের ইচ্ছে হল লিখে, “মহাপুরুষ না হই, পুরুষ তো!”
“কী আশা করেন?”
“আচ্ছা বাদ দেন। আপনি বোধহয় নামের অর্থ জানতে চাচ্ছেন না?”
“(হাসির ইমো) আমি তো চাচ্ছিই। আপনিই তো বলতে চাচ্ছেন না!”
“খালি খালি তো আর জ্ঞান দেয়া যায় না। তখন আবার বলবেন, ‘খালি জ্ঞান দেয়’”
“প্যাচায়েন না তো। জানলে বলুন মানে কী”
মেয়ে হেব্বি স্মার্ট। ভালই। স্মার্টই দরকার।
“বাব্বা, রাগ দেখাচ্ছেন?”
“না না সরি সরি। বলুন প্লিজ...প্লিজ”
“এতো করে যখন বলছেন, তখন তো বলতেই হয়। কিন্তু বিনিময় অবশ্যই লাগবে”
“আচ্ছা। এখন বলুন তো”
সোহেল রিপ্লাই দিতে একটু সময় নিল। মুখে মুচকি হাসি।
“রুবাইয়াৎ মানে হল চার লাইনের কবিতা”
“ও। আপনি জানেন কি করে?”
“না না, জানতাম না তো। আপনার নাম দেখে ডিকশনারি থেকে বেড় করলাম”
“দেখলেন তো আমার জন্য আপনার একটা জিনিস শেখা হয়ে গেল! (ইমো)”
এই তো ট্রাকে এসেছে। এবারে একটু সামলে খেলতে হবে। সামান্য ভুলেই ভেস্তে যেতে পারে।
“শেখার জন্য তো অর্থ বেড় করিনি”
“তাইলে কিসের জন্য করেছেন?”
“ঐ যে বললাম, প্রতিদান”
“ও আচ্ছা”
“আপনি কিন্তু প্রমিজ করেছেন যে আমাকে এইটার বিনিময়ে যা চাই তাই দেবেন!”
“এতো তাড়াতাড়ি বিনিময়ের কথা বলাটা ঠিক হল না” মাথায় চাটি মারার ইচ্ছে করছে ওর। আচ্ছা যা হওয়ার হয়ে গেছে। এটা নিয়ে ভেবে লাভ নেই।
“প্রমিজ করেছিলাম বুঝি? কিন্তু যা চাইবেন তাই দেব- এটা কীভাবে সম্ভব”
“সম্ভব। কারণ আমি তো আর চাঁদ চাইব না। অবশ্য আপনি চাইলে এনে দেব”
“রোম্যান্টিক! তো দিন চাঁদ এনে”
“মানে?”
“এই যে বললেন, আমি বললে চাঁদ এনে দেবেন! তো এখন দিন!”
“আপনি এতো নিষ্ঠুর কেন বলুন তো!”
“নিষ্ঠুর কখন হলাম”
“নিষ্ঠুর নন?”
“অবশ্যই না”
“এই যে বললেন, চাঁদ এনে দিতে! আপনাকে চাঁদ এনে দিলে বাঁকিদের কী হবে! জানেন কত মানুষ চাঁদ দেখার জন্য কত রাত জেগে থাকে। আর তাছাড়া আমি যদি চাঁদ এনে আপনার টিপ করে দেই তবে তো যত কবি আছে, সাহিত্যিক আছে সবাই আপনার পিছনে পরে যাবে। তখন এই নিস্পাপ শিশুটার কি হবে, সিনোর!”
“বাহ... অনেক ভাবেন তো আপনি। আপনার সাথে কথা বলে ভাল লাগছে।“
“এই তো সহজ হয়ে এসেছি আমরা”। এতো সহজে সবকিছু হয়ে যাবে সেটা সোহেল ভাবতেও পারেনি। ও জানে এতো সুন্দর একটা চ্যাটিং এর পর রুবাইয়াৎ না করতে পারবে না। আর এতটুকু কনফিডেন্স সোহেলের আছে। নিজেকে নিজেই বাহবা দেয় ও।
“আপনি কিন্তু শর্তের কথা ভুলে যাচ্ছেন!”
“ওওওও শর্ত! কি যেন শর্ত ছিল আপনার!”
“এর মধ্যেই ভুলে গেলেন। কতো ভোলা মন আপনার! পড়ালেখায় নিশ্চয়ই গাড্ডা মারেন প্রতিবছর”
“ঠিক ধরেছেন। ঐ একটা কাজ আমার করতে একদম ইচ্ছে করে না। চিরতার রস!”
“আপনি কিন্তু আবার শর্তের থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন”
“হুহু বলুন আপনার শর্ত!”
“আমার শর্ত ছিল এটাই যে, আমি আপনাকে নামের অর্থ বললে, আমি যা চাইব দেবেন!”
“হ্যাঁ মনে আছে। বলুন এবার। কী চাই আপনার”
“দেবেন তো”
“যদি সম্ভব হয়, দেবনা কেন? আর যদি না হয়.........”
“না না সম্ভব হবে...”
“তো বলুন”
“বলছি...... ওয়েট”
“কী বলুন”
সোহেল আবার ভাবে বলবে কিনা। ওর বুক দুরুদুরু করছে। লিখে ফেলেছে ম্যাসেজটা। এখন শুধু এন্টার বাটনটা চাপার অপেক্ষা। সোহেল আর কিছু ভাবতে পারছে না। ঘাম হচ্ছে নাকি? হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঘাম মুছে, এন্টার বাটনে শেষমেশ চাপ দিয়েই দিল। যা হওয়ার হবে।
“আমার প্রোফাইলটা আপনি লাইক দিয়ে ভরিয়ে দিন। নোটিফিকেশনবার ফাটায় দিন। আমিও প্রমিজ করছি ১০০% লাইক ব্যাক দেব”
“কী..............................”
আমার বন্ধু সোহেলকে দেখে শিক্ষা নিন। লাইক ইজ বিগার দ্যান এনিথিং এলস!
গল্প শেষ! অবশ্য শেষটা ঠিক হোল না। শেষটা এরকম হতে পারে- তারপর সোহেল ফোন নাম্বার চাইবে। রুবাইয়াৎ প্রথমে দিতে না চাইলেও দেবে শেষমেশ। তারপর ফোনে কথা হবে। সেগুলোও লিখে দেয়া যেতে পারে। আসলে আপনার বেশিরভাগ ফ্রেন্ডই প্রেম করে নাই জীবনে। ওরা গল্প পড়েই দুধের সাধ ঘোলে মেটাবে। আপনি ওদের লুতুপুতু কথাবার্তাও তুলে দিতে পারেন। এতে গল্প আঁকারে বড় হবে। সে যাই হোক। গল্পে ফিনিশিংটা হবে এমন-
“দশ বছর পর.........
সোহেল এখন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। আর রুবাইয়াৎ ঢাবিতে ইংরেজিতে পড়ছে। সামনের মাসে ওদের বিয়ে”
হয়ে গেল। আবার ইচ্ছে করলে ট্রাজেডিও লিখতে পারেন। “রুবাইয়াৎ ধোঁকা দিল সোহেলকে। সে এখন পাগল। পাগলা গারদের শিক গুনেই এখন তার দিন কাটে”। কান্নার বন্যা বয়ে যাবে দেখবেন সবার চোখে!
নতুবা আস্তিক নাস্তিক প্যাঁচাল তো আছেই। আস্তিক হলে তো কথাই নেই। সেজদারত এক ছোট বাচ্চার ছবি আপ করে, ক্যাপসন লিখুন, “এক লাইক, এক নেকি। এক শেয়ার একশ নেকি”। অথবা “এই ছোট বাচ্চাটার জন্য কয়টা লাইক হবে মামারা”
আর নাস্তিক হলে, কাবার ছবিতে রংধনু এঁকে দিন। আর বিগ ব্যাঙ থিওরি তো আছেই। মাঝে মাঝে এমন প্রশ্ন করে বসুন- “আচ্ছা আল্লাহ কি এমন পাথর বানাতে পারবে যা তিনি নিজেই তুলতে পারেন না?” আর আপনার প্রোফাইল পিকচার হবে “কলম চলবে” অথবা “চে গুয়েভারা” কিংবা অভিজিৎ রায়ের ছবি।
এতেই কিস্তি মাত।
তো আজ আর নয়। অনেক বকবক করলাম। তিন ঘণ্টা ধরে টানা লিখছি। পেটে দানাপানি পরেনি। উপরের ফর্মুলাগুলো প্রয়োগ করলে আপনার সাফল্য অবশ্যম্ভাবী। ঘরে ঘরে সেলিব্রেটি জন্মাক এই আশা ব্যক্ত করে আমার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করলাম। ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
১০/১১/২০১৫
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৮:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



