(মূল গল্প পড়তে চাইলে সরাসরি পোস্টের ২য় পার্টে চলে যান)
তখন বাংলা সিনেমার অবস্থা এত বেহাল না। মানে পরিমাণে গুনে সব দিক থেকেই আজকালকার চেয়ে ভাল সিনেমা তৈরি হত। তাই বলে আমাকে ঐ যুগের মনে করবেন না। আমি এযুগের ডিজুস পোলা। আমি ৯০/৯৫ নব্বই সালের কথা বলছি। এখন যেমন বাংলা নাটকে ললিপপ ছেলেরা অভিনয় করছে, তখনও কিছু লেবেঞ্জুস নায়ক সিনেমাহল কাঁপাত। সালমান শাহ আর রিয়াজের কথাই হচ্ছে- ধরতে পেরেছেন নিশ্চয়ই? তখনকার হিট নায়িকারা হলেন মৌসুমি আর শাবনুর। তারা অবশ্য এখনকার মত হস্তিনী (আই মিন আটার বস্তা) ছিলেন না। তারা ছিলেন সেলেনা গোমেজের মতই কিউট, তাদের চোখ ছিল মার্বেলের মত, বাহু ছিল স্বর্ণলতার মত, কোমর ছিল...... থাক(ইহা ১৮+ পোস্ট নহে বলিয়া আর লিখিলাম না)।
তো এক ছেলে মৌসুমি-শাবনুরের বিশাল ফ্যান ছিল।(সালমাল সাহ, রিয়াজের ফ্যান হওয়ার মানেই হয় না। ওর কী এক্সট্রা আছে, যা ছেলেটার নেই?)। তাদের কোন ছবি হলে এলেই ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো তার দেখা চাই-ই চাই। দরকার হলে ব্লাকে টিকিট কাটতেও রাজি সে। তার এই ‘ফিদা’ অবস্থা দেখে তার এক মৌলানা চাচা আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি একদিন বলেই ফেললেন- “তোর জাহান্নাম নিশ্চিত। সারাদিন নাচ গান সিনেমা নিয়েই থাকিস। জাহান্নামের খড়ি হবি তুই”
ছেলেটা ভয় পেয়ে গেল এজইউজুয়াল। সে বলল, “বলিস কী”
“আলবাত! সারাদিন লেখাপড়া ফেলে, নামাজকালাম ছেড়ে মৌসুমি আর শাবনুরের বেলাল্লাপনা দেখে বেড়ালে আল্লাহ কি তোর জন্য জান্নাতুল ফেরদৌসে ঘর বানিয়ে রাখবে?”
গলা শুকিয়ে গেছে ছেলেটির। মারাত্মক কথা! সে ঢোগ গিলে বলল, “তা আমি না হয় জাহান্নামে যাব। কিন্তু মৌসুমি শাবনুর ওরা কোথায় যাবে?”
চাচার রাগ চেপে গেল। কি বেকুব ছেলে। সিনেমা দেখেই মাথাটা গেছে একেবারে। কিন্তু তিনি মুন্সি মানুষ। রাগ করা তার সাজে না।
তিনি বললেন, “ওরাও যাবে জাহান্নামে বৈকি”।
ছেলেটির দেহে যেন প্রাণ এলো। সে তাচ্ছিল্য ভরে বলল, “মৌসুমি শাবনুর জাহান্নামে গেলে আমি জান্নাতে গিয়ে কি করব? সেরেলাক্স খাব?”
এই হল কথা। শাবনুর যদি জাহান্নামে যায় তবে জাহান্নামই জান্নাত। একটা রুবাইয়াৎ আছে না?
“তব সাথে প্রিয়ে মরুভূমি গিয়ে
পথ ভুলে তবু মরি।
তোমারে ছাড়িয়া মসজিদে গিয়া
কী হবে মন্ত্র স্মরি?”
সাহিত্যের বেলাতেও এই কথা খাটে। মজা! মজাই হল মূল কথা। মানুষ যে সাহিত্য পড়ে মজা পায় সেটাই পড়ে। যে লেখায় মজা নেই, সে লেখার পাঠক নেই (আমাম চেয়ে ভাল করে একথা কে জানে? পণ্ডিতি ফলাতে রসকষহীন কিছু গল্প লিখেছিলাম। আমি ছাড়া তাঁর পাঠক ছিল সাকুল্যে ১৫/২০ জন। সাধে কি আর সাহিত্য নিয়ে লেকচার দিচ্ছি? কবি বলেছেন, যারা কবিতা লিখতে ব্যর্থ হয়, তারাই শেষ সাহিত্য সমালোচনা লেখে। আমার বেলাতেও তাই। তিনবার ব্যারিস্টারি ফেল করে কালী সাধক হয়েছি)। এমনকি তার সাহিত্যমূল্য না থাকলেও। আবার ভাববেন না যে রসময় লেখা (রসময় গুপ্তের কথা হচ্ছে না) মানেই সাহিত্যমুল্য নেই। শেক্সপিয়ারও “কমেডি অফ ইরোরস” লিখেছেন। কে বলবে তার সাহিত্য মূল্য নেই? আর মাইকেলের “বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ” আর “একেই কি বলে সভ্যতা”?
কী মধু সে লেখায়!
আর কঠিন কথা সহজ করে বললেই অধিকতর সহজ হয়ে যায়। মা যখন দেখে তার আদরের পুত্র ভাত খাচ্ছে না, তখন রাজপুত্র আর রাজকন্যার গল্প বলতে আরম্ভ করেন “সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখন একরাজ্যে ছিল এক রাজপুত্র। সে দেখতে যেমন ছিল সুন্দর, তেমনই তার শক্তি”। ছেলে বুঝতেই পারে না কখন প্লেটের ভাত শেষ করে ফেলেছে। (আমাকেও মা এভাবেই খাওয়াতেন। এখনও মা মাঝেমাঝে খাইয়ে দেয়। কিন্তু বলতে পারি না, “আম্মু একটা গল্প বল না? ঐ যে সুয়োরানী আর দুয়োরানীর গল্পটা”)
সাহিত্যও এমনই। সহজ কথা সহস করে বললেই ল্যাঠা চুকে যায়। এতে অনেক কিন্তু আছে অবশ্যই। (কিন্তুই বেশি)। সবসময় সহজ ভাষায় সব বলা যায় না, তখন কষা ভাষা টেনে আনতেই হয়। কিন্তু হাস্যরস ব্যাপারটা এমনই যে, অত্যন্ত কঠিন বিষয়কেও পানিবত তরলং করে ফেলে।
বাংলা সাহিত্য পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান সাহিত্য নিঃসন্দেহে। যাকে বলে একেবারে সোনার চামুচ মুখে নিয়ে জন্ম। যার ঠাকুরদা বিদ্যাসাগরের মত দানে খয়রাতে সিদ্ধহস্ত, পিতা রবীন্দ্রনাথের মত জমিদার, তার অবস্থা নিশ্চয়ই আপনার আমার মত হবে না।
এই বিশাল পরিবারে জন্মের কারণেই কিনা কে জানে পেয়েছে চরম রসিক মেজাজ। বাংলা সাহিত্য একবার শিবরাম, একবার মুজতবা আলী, একবার সুকুমার কখনও এযুগের বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে আমাদের হাঁসিয়েছ। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই ছিলেন জন্ম রসিক। অতন্ত্য তার লেখা থেকে এটাই মনে হয়। তিনি শুধু “হিং টিং ছট” কিংবা “নববঙ্গদম্পতির প্রেমালাপই” লেখেননি, লিখেছেন রাশি রাশি সাহিত্য(রাশি রাশি বলাটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু আর কোন শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না)। সে সবে রাশি রাশি না হলেও, দাঁড়িপাল্লায় মাপলে কেজিতে অন্তত ১০০ গ্রাম হাস্যরস আছে। আমার আজকের লেখা মূলত সেটা নিয়েই। এতক্ষণ ধরে নিন এফেমের আরজের নেকি নেকি কথা শুনেছেন, এখন হবে মূল গান।
রবীন্দ্রনাথের গল্পের কথা চলে আসে তাঁর কবিতা আর গানের পরেই এবং উপন্যাসের আগে। অসাধারণ সব ছোটগল্প তাঁর। বাংলার প্রথম সার্থক এবং শ্রেষ্ঠ গল্পগুলো তাঁরই হাতের ক্যালমা। আর হাস্যরস এসব শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পের প্রতি ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে। তাঁর “তারাপ্রসন্নের কীর্তি”, “দালিয়া”, “কঙ্কাল”, “মুক্তি উপায়”, “সমাপ্তি”, “”ডিটেকটিভ”, “অধ্যাপক”, “ফেল”, “প্রতিবেশিনী”, “দর্পহরণ” এমনই সব গল্প। এ সব গল্প পড়লে হা হা করে হাসবেন না ঠিকই, কিন্তু ঠোঁটের কোনে যদি একচিলতে হাঁসি আসবেই। না এলে বুঝতে হবে, আপনি বুঝতে পারেননি। নিচের উদাহরণগুলো কষ্ট করে পড়ে নিন।
“তখন আমার মা ছিলেন না- আমাদের শূন্য সংসারের মধ্যে লক্ষ্মীস্থাপন করিবার জন্য আমার পড়াশুনা শেষ হইবার অপেক্ষা না করিয়াই, বারো বৎসরের বালিকা নির্ঝরিণীকে আমাদের ঘরে আনিলেন।
.........প্রথম বয়সের প্রথম প্রেম অনেকগুলি ছোটখাটো বাধার দ্বারা মধুর হয়। লজ্জার বাধা, ঘরের লোকের বাধা, অনভিজ্ঞতার বাধা, এইগুলির অন্তরাল হইতে প্রথম পরিচয়ের যে আভাস দিতে থাকে তাহা ভোরের আলোর মত রঙিন, তাহা মধ্যাহ্নের মত সুস্পষ্ট, অনাবৃত এবং......
আমাদের সেই নবিন পরিচয়ের মাঝখানে বাবা বিন্ধ্যাগিরির মত দাঁড়াইলেন। তিনি আমাকে হস্টেলে নির্বাসিত করিয়া দিয়া তাঁহার বউমাকে বাংলা লেখাপড়া শেখাইতে প্রবৃত্ত হইলেন......”
এদিকে চিঠি চালাচালি হল। গল্পের নায়ক কি তা বন্ধুদের না দেখিয়ে থাকতে পারে? সে দেখাল।
“আমার যে তিনটি প্রাণের বন্ধু ছিল তাহাদিগকে আমার স্ত্রীর চিঠি না দেখাইয়া থাকিতে পারিলাম না। তাঁহারা আশ্চর্য হইয়া কহিল, “এমন স্ত্রী পাইয়াছ, ইহা তোমার ভাগ্য।” অর্থাৎ ভাষান্তরে বলিতে গেলে এমন স্ত্রীর উপযুক্ত স্বামী আমি নই!”। (দর্পহরণ/গল্পগুচ্ছ)
এই গল্প পড়েই বোধহয় আমাকে একদিন এক ফ্রেন্ড জিজ্ঞেস করেছিল, “উৎস, “আমার ভাগ্য ভাল যে তোমার মত জিএফ পেয়েছি।“ এটার ইংরেজি করত”
আমি আবার ইংরেজির জাহাজ। তবুও ভয়ে ভয়ে বললাম, “I am lucky that you are my gf”
বন্ধু বলল, “হয় নাই”
“কী হবে তাইলে?”
“এইটার ইংরেজি হইল, “I’m not worthy of you, honey!”
পরে অনেক ভেবে দেখেছি, কথাটা মিথ্যা নয়। এ কথাটা মগ্ধতা আমাকে প্রায়ই বলতো, “আমি তোমার সাথে প্রেম করছি, এটা তোমার ভাগ্য”। কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ব্রেকাপ হয়ে যায়। এখন সে যোগ্যতর কারো সাথে প্রেম করছে নিশ্চয়ই!
শুধু গল্পেই যে এমন হাস্যরস ছড়িয়ে আছে তা নয়, অনেক প্রবন্ধও হাস্যরসে টইটুম্বুর। অনেক আগে তাঁর আত্মজীবনী “জীবনস্মৃতি” পড়ে হেসেছি, আর গত কয়েকদিন থেকে তাঁর লোকসাহিত্য পড়ে হাসছি। (লোকসাহিত্য মোটেই হাসিঠাট্টার বই নয়। কবি এই বইয়ে অনেক কষ্টে সংগ্রহ করা “লোকছড়া”, “কবি সংগীত”, “গ্রাম্যসাহিত্য” নিয়ে আলোচনা করেছেন।)
একটা নমুনা-
“খোকা যাবে মাছ ধরতে ক্ষীরনদীর কূলে
ছিপ নিয়ে গেল কোলা ব্যাঙে, মাছ নিয়ে গেল চিলে।
খোকা ব’লে পাখিটি কোন বিলে চরে।
খোকা ব’লে ডাক দিলে উড়ে এসে পড়ে।।
ক্ষীরনদীর কূলে মাছ ধরিতে গিয়া খোকা কী সংকটেই পড়িয়াছিল তাহা কি তূলি দিয়া না আকিলে মনের ক্ষোভ মেটে? অবশ্য, ক্ষীরনদীর ভূগোল বৃত্তান্ত খোকাবাবু আমাদের অপেক্ষা অনেক ভালো জানেন সন্দেহ নাই; কিন্তু যে নদীতেই হউক, তিনি যে প্রজ্ঞোচিত ধৈর্যাবলম্বন করিয়া পরম গম্ভীরভাবে নিজ আয়তনের চতুরগুণ দীর্ঘ এক ছিপ ফেলিয়া মাছ ধরিতে বসিয়াছেন তাহাই যথেষ্ট কৌতুকাবহ, তাঁহার উপর যখন জল হইতে ড্যাবা চক্ষু মেলিয়া একটা উৎকট গোছের কোলা ব্যাঙ খোকার ছিপ লইয়া টান মারিয়াছে এবং অন্য দিকে ডাঙ্গা হইতে চিল আসিয়া মাছ ছোঁ মারিয়া লইয়া চলিয়াছে, তখন তাঁহার বিব্রত বিস্মিত ব্যাকুল মুখের ভাব- একবার বা প্রাণপণ শক্তিতে পশ্চাতে ঝুঁকিয়া ছিপ লইয়া টানাটানি, একবার বা সেই উড্ডীন চৌরের উদ্দেশ্যে দুই উৎসুক ব্যাগ্র হস্ত উৎক্ষেপ- এ সমস্ত চিত্র সুনিপুণ সহৃদয় চিত্রকরের প্রত্যাশায় বহুকাল হইতে প্রতীক্ষা করিতেছে।”
(ছেলেভুলানো ছড়া/লোকসাহিত্য)
এরকম প্রচুর উদাহরণ দেখতে পাবেন তাঁর সাহিত্য একটু ঘাঁটলেই। “ফেল” এমনই এক গল্প। হাস্যরসে। প্রাকাশিত হয়েছিল আসসিন/১৩০৭ বঙ্গাব্দে। অনবদ্য এই গল্পটিকে একটু মডার্ন করে ২০১৫ সালের পটভূমিতে বসিয়েছি আমি। একটু মজা নিতে। সত্যি কথা বলতে, আমাদের জীবনে হাউলার নেই। সেটা আনতেই এই প্রচেষ্টা। পরিবর্তিত এই গল্পের নাম দিলাম “বউ বদল”।
২
বউ বদল
লেজা আর মুড়, রাহু আর কেতু পরস্পরের সাথে পাশাপাশি করে রাখলে যেমন দেখতে হয় এখন তেমন দেখাচ্ছে। প্রাচীন হালদার বংশ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে একই ফ্লাটের দুটি অংশে বাস করছে। এ অংশ ও অংশের এবং ও অংশ এ অংশের পশ্চাৎ দর্শন করে কেবল কিন্তু ভুলেও মুখদর্শন করে না।
নবগোপালের ছেলে নলিন এবং ননীগোপালের ছেলে নন্দ একবংশজাত(কোন সন্দেহ রাখবেন না), একবয়সি, এবং একই কিন্টার গার্ডেনে পড়ে। পারিবারিক ঠ্যালাঠেলিতেও দুইজন দুইজনের ফেসবুক ফ্রেন্ড।
নলিনের মা রাঁধা অতন্ত কড়া মহিলা। সারাক্ষণ ছেলেকে ডানার ভেতর মুরগি যেমন বাচ্চাকে আগলে রাখে, তিনিও তেমনি আগলে রাখেন। ছেলেকে হাঁফ ছাড়ার সময় দেন না। সকালে নিজেই বসে থেকে ছেলেকে হোমওয়ার্ক করিয়ে নিজ হাতে খাইয়ে, কিন্টার গার্ডেনে দিয়ে আসেন। বসে থাকেন ছুটি না হওয়া পর্যন্ত। ছুটি হলেই আবার ঢুকিয়ে ফেলেন ডানার নিচে। দুপুরে নলিনকে চিত্রাংকন শেখাতে চারুকলার এক ছাত্র আসে। চিত্রাংকন শেখা হতে না হতেই গান শেখানোর জন্য চলে আসেন গানের টিচার। “সা রে গা মা পা ধা নি” দেড় ঘণ্টা চেঁচিয়ে সে যখন ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন হরলিক্স খাইয়ে ছেলেকে চাঙা করেন। তারপর তারই স্কুলের এক শিক্ষক এসে তাকে গণিত শিখিয়ে যান। বিকেল বেলাতেও মা পিছু ছাড়ে না নলিনের। বাড়ির বাইরে যাওয়া মানা। যত ইচ্ছা কুম্পুতে খেল। বাইরের ছেলেদের সাথে মিশে ছেলেকে নষ্ট হতে তিনি কিছুতেই দেবেন না। গেম ভাল না লাগলে নলিন কার্টুন দেখে। কার্টুন দেখতে দেখতে যতই তার পেট ফুলে আর গাব্লু হয়, ততই তার মায়ের কলজে আনন্দে ভরে ওঠে। বুক স্ফীত হয় গর্বে।
এদিকে নন্দের মা খুব সরল সোজা মহিলা। তিনি ছেলেকে সাজিয়ে গুছিয়ে স্কুলে পাঠান। পকেটমানিও দেন কিছু। লুলামি আর ইতরামি সে প্রায় শচিন টেন্ডুল্কার হয়ে উঠেছে।
মনে মনে পরাভব অনুভব করে নলিন প্রায়ই ভাবে, “আমার বাবা যদি আমার মাকে বিয়ে না করে নন্দের মাকে আর নন্দের বাবা যদি আমার মাকে বিয়ে করত তবে নন্দকে মজা দেখাতাম”।
কিন্তু এদিকে নন্দ প্রতিবার ফার্স্ট হয়, আর নলিন প্রতিবছর মায়ের আদর খেয়ে ওজন বাড়ায়। দেখতে দেখতে ওরা পিএসসি দিয়ে ফেলল। পিএসসিতে নন্দ শুধু এ প্লাসই পেল না, সাথে ট্যালেন্টফুল বৃত্তিও পকেটস্ত করল। এদিকে নলিন পেল ফোরপয়েন্ট টু এইট।
নলিনের মা বলে বেরাল, “প্রশ্ন আউট হয়েছে বলে এতো ক্যাদ্দানি। প্রশ্ন আউট না হলে দেখতাম কী করে ঐ ন্যাল্লোজ নন্দ”।
এবারে নন্দ আর নলিন অ্যাডমিসান নিল দুটি আলাদা আলাদা স্কুলে। আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃতি। নন্দ প্রতি বছর প্রাইজ পেতে লাগল। আর নলিন প্রতিবার টেনে টুনে পাশ। “অমুক স্যারের কাছে প্রাইভেট না পড়লে স্যার পরীক্ষায় নাম্বার দেয় না। আবার অমুক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়লে তমুক স্যার রাগ হয়। বলে, ‘আমার চেয়ে অমুক স্যার ভাল বুঝি? কি শিখলি অমুকের কাছে? বল কি কি শিখলি?”
সব বুঝেশুনে নলিনের মা বললেন, “তুই অমুক তমুক দুইজনের কাছে প্রাইভেট পড়। দেখি এবার কে নাম্বার কম দেয়”। কিন্তু যাহা তেল তাহাই তৈল। নলিনের রেজাল্টের কোন পরিবর্তন এলো না। প্রতিবছরের মতই সে টেনেটুনে পাশ করতে লাগল। তার মা তার উপর আরও চেপে বসল। ঘুমের খাতা থেকে একঘণ্টা কেটে যোগ করে দিলেন পড়ার খাতায়। একগ্লাসের পরিবর্তে সকাল সন্ধ্যা দুই গ্লাস করে হরলিক্স খাওয়াতে লাগলেন। তার শ্লোগান ছিল, “হরলিক্স খাও, শক্তি বাড়াও আর পড়”
এভাবে ইন্টার পাশ করল নলিন আর নন্দ। নন্দ ঢাবিতে ভর্তি হয়ে গেল আর নলিন ডিগ্রি। নলিন বলে, “প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল কিনা ঢাবির!”
এদিকে নলিনের মায়ের বড় স্বপ্ন ছিল তার ছেলে ডাক্তার হবে। কিন্তু ডাক্তার হওয়া তো দূরের কথা তার ছেলে পড়ছে এখন ডিগ্রি! তিনি নলিনের হরলিক্স বন্ধ করে দিলেন। আর নলিন মায়ের খোটা খেয়ে আর হরলিক্স না খেয়ে ওয়েট লুজ করতে লাগল। অনেক কষ্টের মধ্যেও ও এটা ভেবে সুখ পাচ্ছিল যে, “যাক আর কষ্ট করে জিম করে চিকনা হতে হচ্ছে না”
ছেলের এরকম শুকিয়ে যাওয়া দেখে বোধহয় নলিনের মায়ের দয়া হল। তিনি মরে গেলেন। পাঁচ বছরের অকথ্য কঠোর পরিশ্রমের পড় নলিন বিএ পাশ করল। মা মরার পর সে এখন পিঞ্জর থেকে সদ্য ছাড়া পাওয়া পাখি যেন। সে চারদিকে উড়ে বেড়াতে লাগল। সেকি স্টাইল তার চুলের! এক হাতে ব্রেসলেট, আরেক হাতে কোয়ার্টস এর ঘড়ি। জিন্সের হাঁটুতে সামান্য তালিয়া আর বিদেশি বডি স্প্রে। “লেডি কিলার”, “জাস্ট ডু ইট”, “লাভ ইউ গার্ল” ইত্যাদি সাইনবোর্ডওয়ালা টিশার্ট। কিছুদিনের মধ্যেই সে এলাকার ব্র্যান্ড হয়ে গেল।
কেউ সামান্য গোঁফ আর ঠোঁটের নিচে সামান্য দাড়ি রাখলেই ছেলেরা বলে, “কিরে তোর তো দেখি নলিন হওয়ার খুব শখ”
এদিকে নন্দ নিষ্প্রভ হয়ে গেল নলিনের আভায়। নলিনের বিএমডাবলু নন্দের হিরোহোন্ডাকে পাত্তাই দেয়না। এমনকি ফেসবুকেও নলিন সেলিব্রেটি হয়ে গেল কয়েক মাসেই, যেখানে নন্দের পোস্টে ম্যাক্সিমাম লাইক পরে মাত্র একশটা! নলিন স্লেলফি আপ করলেই সেখানে রহস্যময়ি কন্যা, অধরা অপ্সরা, চাঁদের কণা, অতন্দ্রিলা’রা লাইক দেয় আর রিমিক্স ফাতেমা, হিফহপ রোকসানা আর জিনিফার জোহরারা কমেন্ট করে, “ওহ, কি কিউট!”, “লুকিং ড্যাম হট ম্যান!” ইত্যাদি ইত্যাদি।
এদিকে নলিন আর নন্দ দুজনের জন্যই পাত্রীর সন্ধান চলছে। নলিন ড্যাম হট পোলা হলেও, কিউট ছেলের মত এরেঞ্জ ম্যারেজই করবে। তার প্রতিজ্ঞা একটাই, যাকে সে বিয়ে করবে সে হবে একের মাল। রূপসী, হট, স্মার্ট, কিউট, এজুকেটেড, ওয়েল ম্যানার্ড, কেয়ারিং এবং অবশ্যই ধার্মিক- এক কথায় ইউনিক একটা প্যাকেজ হতে হবে তাকে। সে নন্দকে হার মানাবেই মানাবে এ ব্যাপারে।
নলিন মেয়ে দেখলও প্রচুর। সবচেয়ে ভালোর জন্য যার আকাঙ্ক্ষা, অনেক ভাল তাকে পরিত্যাগ করতে হয়। সুতরাং নলিন মেয়ে পছন্দ করতেই পারল না। যদি এর চেয়ে পার্ফেক্ট কেউ থাকে! আর সে যদি ফাঁকি দিয়ে অন্য কারো কপালে জোটে!
অবশেষে খবর পাওয়া গেল, রংপুরে প্রবাসী এক বাঙালির পরমাসুন্দরী মেয়ে আছে। কাছের সুন্দরীর চেয়ে দূরের সুন্দরী বেশি লোভনীয়। নলিন বলল, “চল রংপুর”।
মেয়ে দেখা হল। সুন্দরী বটে। কোমল। কচু পাতার জলের মত টলমল করে চোখ।
নলিন বলল, “যে যাই বলুক এ মেয়েকে ছাড়িয়ে যাবে এমন মেয়ে নেই। অন্তত এমন কেউ বলতে পারবে না যে, আগেই দেখেছি, পছন্দ হয়নি বলে সম্বন্ধ করিনি”
বিয়ে প্রায় স্থির। তোড়জোড় চলছে। এমন সময় একদিন সকালে দেখা গেল নন্দদের বাড়িতেও বেশ উৎসব লেগে গেছে।
নলিন বলল, “কাহিনীটা কী?”
কাহিনী পুরাই ডিজুস-নন্দের বিবাহ ঠিক হয়ে গেছে। তারই তোড়জোড়।
নলিন বলল, “স্পাই লাগাও”
স্পাই এসে বলল, “ঢাকারই মেয়ে। একেবারে খাসা!”
নলিনের ফ্রেন্ড হাজরা বলল, “বলিস কী!”
নলিন বলল, “দেখতে হচ্ছে”
স্পাইয়ের সহযোগিতায় নলিন দেখতে গেল নন্দের সাথে বিয়ে ঠিক-হওয়া-মেয়েকে, একদিন। সুন্দরী বোধহয় একেই বলে। সুন্দরী শুধু না, নামকরা সুন্দরী। একে কল্পনা করেনি নিজের প্রেয়সীরুপে এমন ছেলে খুব কমই আছে ওদের মহল্লায়। সে অবশ্য এলাকার ছেলের সাথে প্রেম করেনি। এলাকার ছেলের সাথে প্রেম করে বদনাম করবে নাকি? মডেলিংও করেছে। অল ইন ওয়ান যাকে বলে- গান তো জানেই এমনকি নাচতেও দেখা গেছে কয়েকজন বন্ধুর সাথে; সুতরাং নাচও জানে। আর অভিনয়? সেতো সে ক্লাস নাইন থেকেই ছেলেদের সাথে করছে। এখন অবশ্য নাটকে করে। কিন্তু এমন মেয়ে নলিনের চোখ এড়িয়ে গেল কীকরে সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার।
মেয়ে দেখে বুক জ্বলে গেল নলিনের। আঃ চোখ গেল! চোখ গেল! তার মনে হল, রংপুরের মেয়ে এর কাছে কিছুই নয়।
তবুও তার দ্বিধা ছিল। সে হাজরাকে জিজ্ঞেস করল, “দোস্ত, কেমন?”
“ঝাক্কাস”
“এ ভাল না সে ভাল?”
হাজরা বলল, “এ-ই ভাল।”
এবার নলিন দেখল এর গায়ের রঙ ওর চেয়ে বেশি ফর্সা, ঠোঁটগুলো একটু বেশি লাল। বুকে...... থাক। শোনার দরকার নেই। আগেই বলেছি ১৮+ পোস্ট নয়।
নলিন চেয়ারে হেলান দিয়ে বেন্সন টানতে টানতে ভাবল, “একে তো হাতছাড়া করা যায় না”
হাজরাকে বলল, “কী করা যায় বলতো?”
হাজরা বলল, “এটা কোন ম্যাটার হল?”। সে হাত দিয়ে ইশারা করে টাকা দেখাল।
টাকার গরমটা একটু বেশিই ছিল। সেই গরমে ঢাকাই কন্যার আর তার পিতার পেট গরম হতে সময় লাগল না। কন্যার বাবা কি একটা ছুতোয় নন্দের বাবার সাথে তুমুল ঝগড়া লাগিয়ে দিলেন, “দূর আপনার ছেলের ইয়ে নেই। ওখানে মেয়ে দেব না।”
নন্দের বাবার মাথায় বাজ পড়ল যেন। তিনি বললেন, “মুখ সামলে কথা বলবেন। আমার ছেলের সব আছে। বিশ্বাস না হলে ওর আগের গার্লফ্রেন্ডদের জিজ্ঞেস করতে পারেন। তাছাড়া আমিও প্রমাণ দিতে পারি। নন্দ এদিক আয় তো!”
কন্যার বাবা বলল, “আরে না, ওটা বলি নাই। আপনার ছেলের ইয়ে নাই। মানে টাকা নাই। ওখানে বিয়ে দেব মেয়ের... ইত্যাদি ইত্যাদি”
নন্দের বাবাও ছাড়লেন না, “সাকিব খানের সাথে ছেলের বিয়ে দেব কিন্তু আপনার ছেলের সাথে না ইত্যাদি ইত্যাদি!”
সুতরাং নলিনের রাস্তা ক্লিয়ার। সে নন্দকে ফাঁকি দিয়ে শুভলগ্নে বিয়ে করে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, “বাবু আর এবার ফার্স্ট হতে পারল না।”
কিছুদিন পর আবার ননীগোপাল অর্থাৎ নন্দদের ফ্লাটে অনন্দের কোলাহল। নলিন জিজ্ঞেস করল, “হোল টা কী”
“নন্দের বিয়ে”
নলিন বলে, “মেয়েটা কে?”
স্পাই আবার কাজে নেমে পড়ে। এসে বলে, “সেই রংপুরের মেয়েটি”।
রংপুরের মেয়ে। হে হে হে। নলিন খুব হাসছে দাঁত কেলিয়ে। “নন্দ কী আর মেয়েই পেল না, আমারই পরিত্যাক্ত মেয়েকে বিয়ে করছে”। হাজরা শুনেও হাসতে হাসতে খুন!
কিন্তু নলিনের হাসির তেজ কমে এলো আস্তে আস্তে। কে যেন বলে গেল কানে কানে, “হাতছাড়া হয়ে গেল। শেষকালে কিনা নন্দের কপালে জুটল!”
কে যেন আবার কানে এসে ফুসমন্তর দিল, “এবার লাখ চেষ্টা করলেও একে আর পাওয়া যাবে না।”
নলিন ভাবছে, আঃ মেয়েটা ভারি মিষ্টি। সেই মেয়েটির একটা পিক তার মোবাইলে আছে। সে দেখছে। কী চোখ! কচু পাতার জলের মত! একে হাতে পেয়ে হাতছাড়া করেছি, কতো বড় গাধা আমি!
এদিকে তার নিজের স্ত্রীকে অসহ্য লাগছে ওর। সে সারাদিন ফেসবুকে পড়ে আছে। বাসর রাতে ঢোকার আগেও সে স্ট্যাটাস দিয়েছিল, “বাসর রাত............... ফিলিং ভয় ভয়”
ওর এক বান্ধবী কমেন্ট করেছে, “ভয়ের কিছু নাই দোস্ত, আগেরগুলো যেমন ছিল, আজকেরটাও তেমনই লাগবে”
এদিকে একদিন সন্ধ্যায় নন্দ বিয়ে করতে চলে গেল রংপুর। নলিন তখন বিড়ির পশ্চাৎ টানছে। এমন সময় হাজরা হাসতে হাসতে এসে বলল, “শেষ কিনা আমাদেরই পরিত্যাক্ত মেয়েকে... হে হে”
নলিন চিৎকার করে উঠল, “দারোয়ান”
হাজরা নিজেই দারোয়ানকে ডেকে আনতে গেল।
দারোয়ান এলে হাজরাকে দেখিয়ে বলল, “একে বের দিয়ে দরজা লাগিয়ে দাও”
মূল গল্পটা পড়ুন- Click This Link
৩
রসিক রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘রবি-পুরাণ’ নামে অসাধারণ এক প্রবন্ধ আছে। সেটি পাবেন সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলীর ২য় খণ্ডে। “চতুরঙ্গ” রম্য সংকলনের এ প্রবন্ধটি আছে। রসিক রবির কৌতুক আর মুজতবা আলীর রম্য- দুই মিলে প্রবন্ধটিকে অবশ্যপাঠ্য করে ফেলেছে।
আমার লেখা পড়ে না হাসলে নিচের লিংকগুলোতে ক্লিকান- হাসলেও হাসতে পারেন।
১। রবি ঠাকুরের ব্লগ বিড়ম্বনা-কাক নং ৭৯৯ Click This Link
২। রবি ঠাকুরের মজার ঘটনা- Click This Link
৩। মঙ্গলে প্রাণ আছে-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- সাফি- http://www.sachalayatan.com/rajputro/5513o
৪। নববিবাহিতের প্রেমালাপ-আরণ্যক ফিচারিং রবীন্দ্রনাথ!- আরণ্যক রাখাল- Click This Link
৫। রবি ঠাকুরের বদহজম ও টোটকা চিকিতসা!- আরণ্যক রাখাল- Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৮:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



