রোদের মাকে আমি যতোটা সম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। রাস্তাঘাটে দেখা হলে এমন একটা ভাব করি যেন আমি এই মাত্র মহা কোন কাজ করে ফিরলাম, এখন সামনে কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে, আমি এই মুহূর্তে সেই রকম ব্যস্ত। কোন দিকে তাকানোর টাইম নেই। কিন্তু আমার এই ব্যস্ততার তিনি থোরাই মূল্য দেন। তিনি আমাকে থামাবেনই। মহিলা প্রচণ্ড ত্যাঁদড়। ত্যাঁদড় শব্দটা সাধারণত পিচ্ছিপাচ্চা ছেলেদের বেলা ব্যবহার করা হয়, আমিও করি। কিন্তু রোদের মাকে ত্যাঁদড় বলায় শব্দটার বিন্দুমাত্র অপব্যবহার হয় না, বরং আমার মনের ক্ষোভটা মেটে।
দেখা হলেই আমাকে কোন না কোন কাজে বেগার খাটাবেনই। এই যেমন পরশু আমার হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “বাবা, এক কেজি খাসির মাংস এনো দাও। মেহমান আসছে। তোমার আঙ্কেল বাড়িতে নাই। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই এনে দেয়ার মতো”।
আমি মাথা চুলকে, বাম হাতের ‘দুপুরবেলায় সাতটা বাজা’ ব্যাটারিবিহীন ঘড়িতে তাকিয়ে, মুখে করুণ ভাব এনে বলি, “আনটি, আমার একটু কাজ ছিল। পানির লাইন চলে গেছে। মিস্ত্রি আনতে হবে”। কথাটা ষোলআনা মিছে যদিও কিন্তু আমি আমার বলার দক্ষতায় সেটাকে সত্যিতে কনভার্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা করি।
আমার কথা তিনি বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করলেন বলে মনে হয় না। আসলে আমি বড়ই নিষ্পাপ ছেলে। মিথ্যে বলতেই পারি না! সবাই ধরে ফেলে। নয়ত ওরা ধরেই নিয়েছে, আমি মিথ্যে বলি!
“বাবা, পানির লাইন পরেও ঠিক করার যাবে কিন্তু মেহমান না খেয়ে চলে গেলে কী হবে ভাবো”, বলেন তিনি।
অগত্যা মাংস কিনতে যেতে হয়েছিল আমায়।
আজ আর সেটা হচ্ছে না। এখন যেভাবেই হোক আমাকে কাকার দোকানে পৌঁছতেই হবে। সকাল থেকে একটাও বিড়ি টানিনি। পকেট ফুটা। ভাগ্য ভাল আমার মত কিছু ছেলেকে কাকা বাকি দেয়। না হলে ধোঁয়াথার্মিয়ায় মরতে হতো!
আমি কাঁঠাল গাছটার নিচ দিয়ে চলে যাওয়া গলিটা দিয়ে কেটে পড়তে পা বাড়াই।
“গোপাল দাঁড়াও!”
গোপাল! আমার পিতৃদত্ত এতো সুন্দর একটা নাম থাকতে ‘গোপাল’! আমার এই মুহূর্তে পারভেজ স্যারের মেয়েকে পালিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে করছে। তিনিই আমাকে এই ঐতিহাসিক নামটা দিয়েছিলেন। স্কুলে সবাই এই নামে খেপাত। এতদিন পর ও নামটা পুনর্জন্ম লাভ করল কীভাবে?
আমি না শোনার ভান করে হাঁটতে থাকি। কিন্তু আগেই বলেছি, তিনি ত্যাঁদড়। পিছেপিছে এসেছেন।
“ঋদ্ধি, একটু দাঁড়াও বাবা”
তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললেন, “পালাচ্ছিলে কেন?”
“না আনটি, ঐ বাজারে যাওয়ার দরকার ছিল। মেহমান এসছে। মাংস কিনব”
আনটি কিছুক্ষণ হাঁপান। তার এই কদুর মত শরীর নিয়ে তিনি যে আমাকে ধাওয়া করেছেন, এজন্য তাকে মেডেল দেয়া উচিৎ।
“বাবা, আমাদের বাথরুমে পানি আটকে আছে। বের হচ্ছে না। একটু আসো প্লিজ”
আমি একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। বেকার আছি বলে কি আমার কোন মূল্য নেই মাইরি? বাথরুম পরিষ্কার করতে পর্যন্ত আমাকে ডাকবে? আমার ইচ্ছে করল, মুখের উপর দুটা কথা শুনিয়ে দেই। কিন্তু পারলাম না। মধ্যবিত্তের ফালতু ভদ্রতা!
“আনটি, মেথরপট্টিতে অনেকে আছে, ওদের ডাকুন না”
উনি এখনও হাঁপাচ্ছেন। মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, “তুমি থাকতে মেথর ডাকব কেন? ওটা কোন ব্যাপার না। একটু নাড়াচাড়া করে দিলেই পানি চলে যাবে”।
“আনটি আমি গোসল করছি। এখন আবার করা লাগবে তাইলে”, বলি আমি।
“শুধু একটু নাড়াচাড়া করে দিলেই হবে। পানি এমনভাবে জমছে যে রোদ গোসল করতে পারছে না”
রোদের গোসলের কথা শুনতেই মনের সব আপত্তি দূর হয়ে গেল।
আমি রোদদের বাড়ি গিয়ে দেখব, ও শুধু একটা তোয়ালা বুকে আটকিয়ে বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে। বাড়িতে কেউ নেই। আনটি কী একটা কাজে বাইরে চলে যাবেন। আমি ওর সামনে গিয়ে একটা লাঠি টাইপ কিছু নিয়ে বাথরুমের দিকে ইন্ডিগেট করে বলব, “একটু ঘুতিয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে!”
তারপর সব ইতিহাস!
ধুর শালা, কী ভাবছি এগুলা! আজ থেকে আর কোন বাজে সাইট ভিজিট করব না। লুতফর রহমানের ‘যুবক জীবন’ বইটা আবার পড়া আমার জন্য অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।
রোদদের বাড়িটা আমাদের পাড়ার একেবারে মাঝে। বাড়ির পিছনেই একটা কিন্টার গার্ডেন। এই স্কুলে আমিও পড়েছি। আগে বিকেল হলেই এর মাঠে ক্রিকেট খেলাটা আমাদের একমাত্র কাজ ছিল। এখন মাঠই নেই, খেলব কি!
ওদের বাড়িতে ঢুকেই ধাক্কা খেলাম। রোদের ছোট বোন নিশু এতো বড় হয়ে গেছে! এই তো কিছুদিন আগেই, ওকে দেখলাম- পিচ্চিপিচ্চি ছেলেগুলার সাথে সাইকেল চালানো শিখছে! বিকেলবেলা রোদের সাথে হাঁটতে বের হতো। আমরা ভ্যা করে ওর বড় বোনের দিকে তাকিয়ে থাকতাম!
অবশ্য রোদ আমাদের কোনদিন পাত্তা দেয়নি। স্কুলে আমি ওর দুবছর সিনিয়র ছিলাম। কিন্তু সিনিয়র হিসেবে আমাকে রোদ মোটেই সম্মান করতো না। তাতে অবশ্য কিছুই যায় আসে না। সম্মান করাটা ওর দায়িত্ব। আর জুনিয়র হিসেবে স্নেহ, মায়া, মমতা ইত্যাদি ইত্যাদি করাটা আমার কর্তব্য। ও ওর দায়িত্ব পালন না করতে পারে, কিন্তু আমি আমার কর্তব্যে ফাঁকি কেন দেব? “তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?”
আমি নিশুর দিকে তাকিয়ে ঋদ্ধ হই। আমার মনে হয়, ওর দেহ থেকে একধরনের আনন্দরশ্মি নির্গত হচ্ছে। এই রশ্মি অত্যাধুনিক স্পেক্ট্রমিটার মিটার দিয়েও দেখা যায় না। অনুভব করতে হয়। ও সকাল বেলার আলোর মতো, সামান্য রোদ উঠলেই আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার ইচ্ছে করে ওকে ছুঁয়ে দেই। ছোঁয়ার মাধ্যেই ওর দেহ থেকে সামান্য কিছু পবিত্রতা আমার শরীরে কপি করে নেই।
কিন্তু ছুঁতে চাইলেই তো আর ছোঁয়া যায় না! আমার মত আরও কত জন ওকে ছুঁতে চাইতে পারে! চাইলেই পাওয়া যায় নাকি?
বাথরুমটা রোদের রুমের পাশে। যাওয়ার সময় ওর রুমে তাকালে দেখতে পাই শুয়ে শুয়ে কী একটা বই পড়ছে। উপন্যাস টুপন্যাস হবে। আমি রোদের মুখটা দেখতে পাইনি। শুধু গাছের মোটা ডালের মতো পা দুটো দেখতে পেয়েছি। কী সেক্সি ফিগার!
আমি বাথরুমে উঁকি দিয়ে দেখি, সত্যি সত্যি অনেক পানি জমেছে। এই পানি সরানো আমার কাজ নয়। আর যদি সরাতে পারি, তাহলে আমার পেশাদারভাবে মেথরামিতে নাম লেখানো উচিৎ। এই কাজে আমি উন্নতি করতে পারব!
“রোদ, রডটড থাকলে দাও”
আমি ওর ঘরে সামনে দাঁড়িয়ে বলি। রোদ বই থেকে চোখ সরিয়ে আমাকে দেখে। তারপর উঠে বসে বলে, ‘রড তো নাই”
“নাই মানে। আমি কী তাইলে হাত দিয়ে পরিষ্কার করব?” বলি আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে। হয়তো দেরী করে উঠেছে ঘুম থেকে, চোখগুলো ফোলা ফোলা। ওর গলার কাছে কীসের একটা দাগ। আঁচড়ের? হতে পারে। সুযোগ পেলে কে বা ছেড়ে দেবে?
“আচ্ছা, ঋদ্ধিমান ভাই, আপনি মেথরামি শুরু করলেন কবে থেকে?” আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে বলে ও।
আমি ওদের বাড়িতে ঢুকেই প্যান্ট গুঁটিয়ে নিয়েছি প্রায় হাঁটু পর্যন্ত।
আমি খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলে, “এইতো আজ থেকে!”
“ও। তা মেথরের কাছে রড থাকে না বুঝি?”
বলতে ইচ্ছে হলো, ‘টেম্পোরারি রড সবার থাকে”। কিন্তু কিছু না বলে ওর ঘর থেকে বেড়িয়ে আসি। আসলে রোদের সামনে আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। এ জন্য না যে ও সুন্দরী। এ জন্য যে, ও চরম মাত্রায় হাস্কি। সুন্দরী মেয়ে রাস্তাঘাটে অনেক দেখা যায়। হাস্কি কাম সুন্দরী কাম পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা ক’জন আছে? ও আসলে একটা ফুললি লোডেড এইট জিবি পর্ণ ম্যামরি। লোড করার সময় যেমন মনে হয়, পুরোটাই আজ দেখেই ছাড়ব! কিন্তু দশবারোটা দেখার পর যেমন আর দেখতে ইচ্ছে করে না, রোদ তেমনই। কিছুক্ষণ তাকিয়ে তাকলেই আর তাকাতে ইচ্ছে করে না।
রড নেই তবে একটা কাজ চালানোর মতো লাঠি এনে দেন আনটি! সেটা নিয়েই রণক্ষেত্রে লাফিয়ে পড়ি আমি। প্রায় একঘণ্টা বিভিন্নরকম কসরত করে, বালতি বালতি পানি ঢেলে, পাইপের ভিতর হাত পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিয়ে আমি যখন বাথরুম থেকে বেড়িয়ে এলাম, তখন আর আমি ঋদ্ধি নেই। পুরোমাত্রায় মেথর হয়ে গেছি। সারা শরীর ভিজে গেছে। প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গুঁটিয়ে নিয়েও কাজ হয় নি। পুরোটাই প্রায় ভিজে গেছে।
একটা সেলফি নিলাম। বাড়ি গিয়ে ফেবুতে আপ করতে হবে।
আমি যতোটা ভালভাবে হাতমুখ ধুয়ে চলে যাওয়ার সময় পিছন থেকে রোদ বলল, “মেথর সাহেব, পারিশ্রমিক না নিয়েই যাচ্ছেন যে”।
একঘণ্টা পানির সাথে লড়াই করে আমার মেজাজ বিচ্ছিরি রকম খারাপ হয়ে গিয়েছে। আমার বলতে ইচ্ছে হলো, “তুই গোসল কর। আমি দেখি। এই পারিশ্রমিক চাই। দিতে পারবি?”
কিন্তু আমি ভদ্র ছেলে। পাড়ায় আমার নামে খারাপ কথা কেউ বলতে পারবে না। তাই আমার মুখে এগুলো মানায় না।
আমি যতোটা সম্ভব ভদ্রভাবে বললাম, “যাও একশ টাকা নিয়ে এসো”
“দাঁড়ান” বলে রোদ ঘরে চলে গেল। চল্লিশ পঞ্চাশ সেকেন্ড পর আমার হাতে একটা একশ টাকার নোট দিয়ে বলল, “ভাগেন এখন”।
আমি টাকাটা মানিব্যাগে রেখে বেড়িয়ে এলাম।
***********************
লেখাটা দেখে নিয়ে রিয়াজ বলল, “তোর নায়কের কোন ক্যারেকটার নাই মাইরি!”
রিয়াজ মোটামুটি সাহিত্যবোদ্ধা, আমাদের “ভাল আছি” ক্লাব থেকে যে লিটলম্যাগটা প্রতিবছর বের হয় তার সম্পাদনাও ও করে।
“গল্প উপন্যাস পড়ে মানুষ চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে। তোর নায়কের কোন চরিত্রই নাই”
আমি শুধু বলি, “বুঝলাম”।
“নায়িকার নামটা রোম্যান্টিক। নায়কও হবে তেমন। একটু হাবাগোবা অথবা মিষ্টি শয়তান টাইপ। ও মেয়েদের ফিগার দেখবে না। চোখ নাক কান মুখ দেখবে আর নায়িকার প্রেমে পড়ে যাবে। লতাপাতা বুঝলি তো। আর তুই নায়ককে মেথর বানায় দিছিস! ওঁর কোন ব্যক্তিত্ব নাই। নায়িকাকেও দেখে, ওঁর বোনকেও স্ক্যান করে। নায়কের ওটা চোখ না স্ক্যানার?”
আমি চুপ করে থাকি। কিছু বলার খুঁজে পাই না।
“কিছু কচ্ছিস না ক্যান?”
“আচ্ছা, তুই বলতে চাচ্ছিস, নায়ক হিজড়া টাইপ হবে। চশমা চোখে থাকলে আরও ভাল। মা সকালে ভাত খাওয়ায় দিবে। সারাদিন বই পড়বে। মাঝেমাঝে প্রেমে পড়বে, এই তো?”
“খারাপ কী? তুই এইটা এডিট করে অমন করে দে। নয়তো নতুন একটা ল্যাখ। এটা বাল হইছে”
“চু****রানী” বলে ওঁর ঘর থেকে বেড়িয়ে এলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১২:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



