একদিন সকালে পত্রিকা দেইখা আমার ছোট কাকা হঠাৎ চীৎকার দিয়া উঠলো। আমরা ঐ চীৎকারের মর্মার্থ ধরতে পারি নাই কোনকালে। কিন্তু ঐ চীৎকারে মা'রে দেখলাম ছুইটা যাইতে বসার ঘরে...তারপর বাড়ির সবাইর মুখ থমথম...প্রেসিডেন্ট জিয়া মারা গেছেন...মারা গেছেন কওয়াটা ভুল হইলো...তারে খুন করা হইছে! আমাগো বাড়ির মানুষের চিন্তাটা অন্য অনেকের চাইতে বেশি ছিলো, কারণ তার সাথে ছিলেন আমার এক মামা, মেজর আহসান, জিয়া সাহেবের চীফ সিকিউরিটি গার্ড, আমার প্রিয় ফজল মামা।
আমার আদৌ জেনারেল জিয়া সাহেবরে নিয়া এই পোস্ট লেখনের খায়েশ নাই। তিনি অনেকের দোয়ায় হয়তো বেহেস্ত পাইছেন, হয়তোবা অনেকের দোয়ায় তার নরকের দরজার সামনে ঝিমানির-অপেক্ষার দিন গুজরান চলতেছে। আমার কিছুই যায় আসে না তাতে...আমি নিস্পৃহ আর অবিশ্বাসী মানুষ , এইসব বিষয় নিয়া গল্প করনের বেলায়। আমার হঠাৎ গত কয়দিন ধইরা মনে পইড়া যাইতেছে ঐ সময়টার কথা। সাত্তার সাহেবের কথা...আমার বাপের কুঞ্চিত ভ্রুযুগলের কথা...
বয়স কতো আমার তখন!? সবে 9 পার হইয়া 10 এ পা দেওনের সময় হইছে। বাড়িতে দুইটা বিষয় নিয়া অনেক তোলপাড় চলতো বইলা আমি একটু ইচড়ে পাঁকার মতোন অংশ নিতাম...রাজনীতি আর আবাহনী-মোহামেডানের ফুটবল যুদ্ধ। বাপে পুরানা জমানার আওয়ামি সমর্থক...কাকায় তখন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা, মানে এ্যান্টি আওয়ামি, বাপে মোহামেডানের প্রবল ভক্ত, আর চাচায় আবাহনীর সমর্থক গোষ্ঠীর নেতা। আমি একটু বাপ বিরোধী টাইপ ছিলাম ছোটবেলা থেইকাই, সেইহেতু ছিলাম কাকার ন্যাওটা। অর্থাৎ... বুইঝা নেন কি আছিলাম, বেশি বুঝাইয়া দিতে আর ইচ্ছা করে না আজকাল।
আমার মনে পইড়া যায় যে, সাত্তার সাহেব বক্তৃতা দিছিলেন একটা দুঃখ ভারাক্রান্ত কনঠে...চোখ ছলছল ছিলো তার...যে দেশ নাকি দুর্নীতিতে ছাইয়া গ্যাছে...আর এই দুর্নীতির বাহক হইছে দলের লোকেরাই...বিএনপি মন্ত্রীসভার সদস্যরাই। আর তাই তিনি বাধ্য হইতেছিলেন সবাইরে বরখাস্ত করনে। দেশে তখন জরুরী অবস্থা জারী হইছিলো সম্ভবতঃ...আমি তখন হয়তো এইসব রাজনৈতিক শব্দাবলী জানতাম না, কিন্তু মনে আছে যারা মন্ত্রী ছিলো তারা আর নাই এই ভাবনায় আমি বাড়ির ছাদে গিয়া এক একা অনেক ভাবছি তখন...চিন্তাক্লীষ্ট শিশুর, চিন্তার শৈশব!
আমার বাপ তখন একজন লোকের নাম কইতেন খুব, সেই লোক নাকি দেশ দখলের পায়তারা কষতেছিলো...বাপের ব্যবসা আর রাজনীতির সাথে যোগাযোগ থাকনের কারনে এইসব তার পরিকল্পণার মধ্যে রাখতেই হইতো এখন বুঝি। এরশাদ নামের ঐ লোকই জিয়ারে মারনের ষড়যন্ত্র করছে এই আলাপ চলতে দেখছি ঘন্টার পর ঘন্টা আমাগো বাসায়। মামার লাশ সনাক্ত করছিলো আমার বাপে...সেই কারণে তার বেশ কয়েকবার ক্যান্টনমেনটে যাইতে হইছিলো। প্রতিবারই সে মুখ ভার কইরা ফিরতেন...
এরপরের ঘটনা কয়মাস পর ঘটছিলো ঠিক নির্দিষ্ট কইরা মনে নাই কিন্তু মনে আছে এরশাদ সাহেব ক্ষমতা নিলেন। আমার তখন ট্যাংক-কামান খেলার সামগ্রী, তাই যুদ্ধ বিগ্রহ ভালো লাগে, একজন মিলিটারীর পোশাকে স্মার্ট প্রেসিডেন্ট পাওনের সম্ভাবণায় রোমাঞ্চিত হইছিলাম আমি মনে আছে। কিন্তু বাপের মুখ ভার কাটে নাই...কাকায় বিদ্রোহে ফাটছে! যাই হোক দেশের অনেকেই তখন ঐ দুর্নীতি দমনের প্রক্রিয়ারে স্বাগতঃ জানাইতো, অনেকেরেই কইতে দেখছি এইবার দেশে যদি একটু শান্তি আসে। আমার তখন ভালো লাগতো, এরশাদ আমার খেলার সাথী, হিরো!
এরশাদের পরিণতি আমরা জানি...আর বেশি কিছু বলনের প্রয়োজন নাই ঐ সময় নিয়া...আমি নিজেও পরে কাকার মতো তার বিরুদ্ধে নামছিলাম...সে অনেক কাল পরের কথা...কাকা অবশ্য দল পালটাইয়া নতুন বাংলায় জয়েন করছিলো! আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর ফেনা তুলতে তুলতে বহুত কিছু খোয়াইলো ইত্যবসরে...আমি তাগো দুইজনের বালখিল্যতা নিয়া খোঁচাই...এখ নো!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



