somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কষ্ট কন্যা - বিলাস

০৪ ঠা মে, ২০১৪ রাত ১১:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আয়নার সামনে দাড়িয়ে অনু। রুমের বাতি নিভানো, বাহিরের রুম থেকে যা আলো আসচ্ছে তাতে আয়নায় নিজেকে খুঁজতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আয়নার দিকে। ফ্যানের বাতাসে চুলগুলো আপন মনে দুলছে। চুল খুলে রাখা অনুর মোটেও পছন্দের নয় কিন্তু আজ তার মন ভাল নেই। নিজের মধ্যে নিজেকে যখন খুঁজে পায় না তখন আয়নার সামনে সে দাড়িয়ে পড়ে। আয়নায় নিজের অবয়বের নাম দিয়েছে কষ্ট কন্যা। যখন তার মন খারাপ হয় তখন কষ্ট কন্যাকে প্রয়োজন হয়। অনুর ধারণা সে শুধু কষ্ট কন্যাকে দেখে না, কষ্ট কন্যাও তাকে দেখে। সে শুধু শুনতে পায়, বলতে পারে না।
অনু, খেতে আয় মা।
আসচ্ছি।
মায়ের দাকে সারা দিয়ে এখন কষ্ট কন্যাকে ত্যাগ করতেই হবে। কষ্ট কন্যা ছাড়া তার সব থেকে কাছের বন্ধু তার মা, আর ঘরের বাহিরে আছে মেহেদী। দুই ছেলে আর এক মেয়ের সংসারে মায়ের একমাত্র বন্ধু অনু। মায়ের হাসিই তার হাসি।
খাওয়া শেষে শুয়ে পড়লো অনু। ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা বেজে ছুই ছুই। রাতে রেডিও না শুনলে ঘুম হয় না তার। বাবার কথা ভীষণ মনে পড়চ্ছে। বাঙালি মেয়েরা বাবার ভক্ত হয়, অনুও তার ব্যতিক্রম নয়। অনুর যত রাগ, অভিমান সব তার বাবার সাথে। মানুষ এত দ্রুত বদলে যায় কল্পনাতেও আনতে পারে না অনু। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো।
বারান্দায় কেউ মনে হয় আছে যে ফ্লোরে পা ঘষিয়ে ঘষিয়ে হাটচ্ছে। এত রাতে কে তার বারান্দায় হাঁটবে ভাবতেই শুয়া থেকে উঠে পড়লো অনু। বড় বড় চোখ করে বারান্দার দিকে তাকিয়ে আচ্ছে। হাঁটার শব্দের সাথে এখন কান্নার সুরও পাওয়া যাচ্ছে। এক পা এক পা করে আগাচ্ছে অনু। দারান্দায় কে তা দেখার আকাঙ্খা আর ভয় নিয়ে বারান্দার গেটের সামনে দারাল। একটি ছেলে দাড়িয়ে। তার পড়নে কাল প্যান্ট, গায়ে নীল রঙের টি-শার্ট, পায়ে চটি। ছেলেটির চাঁদের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে যার কারণে অনু ছেলেটির মুখ দেখতে পাচ্ছে না। অনু ভাল করে খেয়াল করল ছেলেটির টি-শার্টটির ডান হাতা নিচ দিয়ে কিছুটা ছেঁড়া, যেখানে ছেঁড়া সেখানে ছেলেটির হাতও সামান্য কেটে গেছে। এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে ফ্লোরে রক্ত পরচ্ছে। ফ্লোরের দিকে তাকানোর জন্য মাথা নামাতে চোখ পড়লো ছেলেটির হাতে, তার হাতে বেশ কয়েকটি ফুল। তবে কি ফুল হবে তা ঠিক বুঝা যাচ্ছে যা। এমন সময় ছেলেটি পিছনে ফিরে তাকাল, বীভৎস চেহারা। চোখের জায়গায় চোখ নেই, নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে জমাট বেঁধেছে, ঠোঁট শুকিয়ে রক্ত। অনু ভয়ে শক্ত হয়ে গেল। পালানোর জন্য মুখ ঘুরানোর আগেই ছেলেটি তার হাত ধরে ফেলে, কর্কশ ভাষায় ছেলেটি বলল, ‘অনামিকা, আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, আমি তোমায় কষ্ট দিবো না। আমাকে ছেড়ে চলে যেও না।’ বলতে বলতেই সে অনুর হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে আর অনু চিৎকার করচ্ছে।
সাথে সাথে উঠে বসল অনু। সারা শরীর থর থর করে কাঁপছে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত ২টা বাজে। ঘড়ির পাসেই পানির গ্লাস। অনু ঘুমালে অনুর টেবিলের উপর পানি রেখে যায় অনুর মা। পানি খেয়ে একটু ঠাণ্ডা হল। প্রায় সে এই স্বপ্ন দেখে। সেই একই দৃশ্য বার বার ফুটে আসে।

কলেজে যাবি না?
হম যাব।
তাহলে এখনও শুয়ে আছিস কেন? ৭টা বেজে গেছে। আবার ওঠ।
হম উঠি।
সাধ সকালে ঘুম থেকে উঠে হয় কলেজ যাবার জন্য। অনুর মা সব কিছু গুছিয়ে রাখেন শুধু কলেজ যাওয়া আর আশা নিজ দায়িত্ব অনুর। হাসি মুখে ঘর থেকে বের হলেও হাসি মুখ আর থাকে না। সকাল হতে না হতেই ক্রিকেট খেলতে নেমে পড়ে কলনির ছেলেগুলো। সমস্যাটা অনুর সেখানে না। অনু যখন কলেজ ড্রেস পড়ে নিচে নামে তখন ছেলেগুলো এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন কোন দ্বৈত আকাশ থেকে নেমে এসেছে নয়তো কোন পরি আকাশে উড়ে যাচ্ছে। অনু অতিরিক্ত রাগী যার কারণে ছেলেগুলো অনুকে নিয়ে কখনো বাজে কথা বলার সাহস পায় না। ছেলেগুলোর মধ্যে একটা ছেলে তার ক্লাসে পড়ে। নাম অচিন। দেখে বোকা বোকা মনে হলেও অনুকে দেখলে তার চেহারা পাল্টে যায় যেন তার সামনে আজরাইল দাড়িয়ে আছে। ক্লাস শুরু হওয়ার ২০ মিনিট পর আসে অচিন। তারপর ক্লাস থামিয়ে ১০ মিনিট বকাবকি গিলতে হয়। ছেলেটি একটু লাজুক স্বভাবের। বেশি কথা বলে কিন্তু মেয়েদের সামনে বলদের মত মাথা নিচু করে কথা বলে তাও খুব আসতে আসতে। অনুর যখন খুব রাগ হয় তখন এই ছেলের উপরেই সব রাগ ঝারে আর অবলা জীবের মত সব সহ্য করে অচিন। এই জন্যই অনুকে সে যেখানে দেখে সেখান হতে পালানোর পথ খুঁজে।
বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে আছে অণু। সূর্য পূর্ব আকাশ থেকে পশ্চিম আকাশে নেমে পড়েছে। লাল আভা সমস্ত আকাশ জড়িয়ে, হালকা মিষ্টি বাতাশ শরীর ছুয়ে যায়। এসব সে কখনো মিস করে না। পাসেই মোবাইল বাজছে। অনু জানে এখন কে ফোন করেছে তাই না দেখেই রিসিভ করল
হ্যালো? আপনি কি অনামিকা রায়?
জি। আমিই অনামিকা রায়
ওহ। আপনার সাথে কথা বলতে পেরে আমার খুব ভাল লাগছে।
তাহলে আমি কি করতে পারি?
আমি কি আপনার সাথে প্রেম করতে পারি?
হয়নি। প্রতিদিন ভুল হয় কেন?
রাগে ফুলে উঠছে অনু। মেহেদী এই সময়ই ফোন করে, ফোন করে অচেনা মানুষের মত প্রেম করতে চায়। এগুলো সব অনুরই বুদ্ধি। সে চায় কোন অজানা মানুষের সাথে প্রেম করবে কিন্তু মেহেদী ছাড়া আর কাউকে সে ভাবতে পারে না তাই মেহেদীকেই এই কাজ করতে হয়।
হ্যালো? আপনি কি অনামিকা রায়?
জি। আমি অনামিকা রায়।
ভাল আছেন?
হ্যাঁ।
আপনার সাথে কথা বলতে পেরে ভাল লাগছে।
তাহলে আমি কি করতে পারি?
আমি কি আপনার বন্ধু হতে পারি?
না।
শুধু বন্ধু হব আর কিছু না।
যদি প্রেম না করেন তাহলে বন্ধু হয়ে লাভ কি? প্রেম করবেন আমার সাথে?
হ্যাঁ করবো। আমি কি আপনাকে ‘তুমি’ করে বলতে পারি?
না। ‘আপনি’ করে বলতে কি খারাপ লাগছে।
না না খারাপ না।
তাহলে ‘তুমি’ বলবেন কেন?
ভালোবাসার মানুষকে আপনি বলতে কেমন যেন লাগছে। তাই আর কি।
আমি আপনার ভালোবাসার মানুষ কখন হলাম? আপনি কি আমাকে ‘I Love You’ বলেছেন?
না। বলবো?
না বলতে হবে না। আমি এখন রাখব। প্রেম করার সময় শেষ।
কথা শেষ করার আগেই অনু লাইন কেটে দিয়েছে। অন্ধকার নেমে এসেছে সারা আকাশ জুরে। মায়ের রুমের পাস দিয়ে যাবার সময় কান্নার শব্দ পেল। ভিতরে গিয়ে দেখা গেল মা দাড়িয়ে আছে সামনে তুলিতে আঁকা বড় ছবি। মা আর বাবার বিয়ের পর ছবি আঁকা হয়েছিল। অনু তার মায়ের গলা জড়িয়ে নিজের চোখের পানিও আটকে রাখতে পারল না। তারা শুধু কেদেই গেল কিছু বলতে পারেনি।
অচিন। এদিকে আসো।
অচিনের হটাৎ ডাক পড়ায় আকাশে বজ্রপাত শুরু হল। সুন্দর ভাবে সামনে দাঁড়াল অনুর। এতক্ষণের হাসি মুখ এখন আর নেই।
জি।
ভাল আছ?
জি। হাঁ। ভাল। আপনি?
তোমার কাছে একটা অনুরধ আছে। রাখবে?
কথাটা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল অচিন। চোখ বড় বড় হয়ে গেছে তার। কি অনুরধ করবে এটা নিয়েই মনে হাজার প্রশ্ন।
জি। চেষ্টা করবো।
‘এইতো লক্ষ্মী ছেলে মত কথা বললে। আমার মন খারাপ তাই আমি তোমাকে একটা ছড় মারব। তারপর স্যারি বলবো এবং তুমি বলবে কিছু মনে করিনি। পারবে না?’ বলল অনু। ইটের ভাটায় যারা কাজ করে তাদের চামড়া যেমন কাল হয় ঠিক তেমনই কাল হয়ে গেল অচিনের চেহারা কথাটি শুনার পর।
অচিনের মুখ থেকে উত্তর না পেয়ে অনু আবার বলল, ‘থাক তুমি যাও। ছড় খাবার আগেই তোমার চেহারা পাল্টে গেছে। আমার মন ঠিক হয়ে গেছে তাই আপাতত তোমার ছুটি’ অচিন যেতে যেতে কয়েকবার মুখ ঘুরিয়ে পিছন ফিরে অনু কে দেখল আর অনু দাড়িয়ে দাড়িয়ে হাসছিল। কলেজে যা টুকু সময় কাটে তা হল এই ছেলেকে বকাঝকা করে। অনুদের সব থেকে বিরক্তকর ক্লাস হল বাংলা ক্লাস। প্রতিদিন হৈমন্তী-বিলাসী তার ভাল লাগে না। বাইরে ঠাণ্ডা বাতাশ বইছে তাই ঘুমালে খারাপ হয় না। বাংলা ক্লাস তার কাটে ঘুমিয়েই, শুধু অনুর একার না প্রায় সবারই এভাবে ক্লাস পার করে। অল্প সময়েই অনু একটা স্বপ্ন দেখল।
অনু বৃষ্টিতে ভিজচ্ছে। দুহাত ছড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে। সামনে তাকিয়ে দেখে মেহেদী আসচ্ছে। পড়নে তার জিন্স, খালি পা আর গায়ে কাল গেঞ্জি। হাত দুটো পকেটের ভিতরে রেখে হেঁটে আসচ্ছে সে।
ঘণ্টার আওয়াজে স্বপ্নটি অসমাপ্ত রয়ে গেল। বাইরে তাকিয়ে দেখল বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে খুব তার থেকে বেশি চাইছে মেহেদী আসবে এই স্বপ্নের রূপে। মেহেদীকে বেশ কয়েকবার ফোন করার পরও পাওয়া গেল না। অনু বুঝতে পারচ্ছে মেহেদী কয়েকদিনে অনেকটা বদলে গেছে। সে কি পছন্দ করে না পছন্দ করে আর গুরুত্ব নেই এখন তার কাছে। যদি থাকতো তাহলে অনু ফোন করার আগেই সে কলেজের সামনে দাড়িয়ে থাকতো। তাই একাই হাটচ্ছে বৃষ্টি মধ্যে অনু। বৃষ্টির পানিতে তার চোখের পানি মুছে যাচ্ছে তাই বিধাতা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারচ্ছে না তার আবেগগুলো। মেহেদী তাকে কথা দিয়েছিল সে অনুকে কখনো কষ্ট দিবে না, কখনো একা ফেলে চলে যাবে না, কখনো কাঁদতে দিবে না। ভাবতে ভাবতে চোখ ভারি হয়ে আসচ্ছে তার। মেহেদী কি তাকে সত্যি ভালোবাসে? যদি ভালোবাসতো তাহলে সে প্রতিদিন অনুর বন্ধু রিয়ার সাথে ফোন কথা বলতো না। অনুর নিষেধ সত্তেও সে লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খেত না। অনুর চোখে এখনও সে দিনের দৃশ্য ভেসে আসে যেদিন মেহেদী আর জয়ন্তিকে দেখেছিল কোচিংয়ের পিছনের বারান্দায় যেখানে কেউ খুব একটা যায় না। জয়ন্তির ওড়না বুকে ছিল না, ছিল মেহেদীর হাতে। দুজন খুব ঘামাচ্ছিল। মেহেদীর শার্টও ঠিক ছিল না। এভাবে দুজনকে দেখতে পেয়ে পাথরের মত শক্ত হয়ে গিয়েছিল অনু, হয়তো পাথরের থেকেও একটু বেশি শক্ত। মেহেদীকে খুব ভালোবাসে অনু যার কারণে নিজেকে সে ঐদিন মানিয়ে নিতে পেরেছিল এই ভাবে যে হয়তো জয়ন্তির ওড়না পড়ে দিয়েছিল তাই মেহেদী ওড়না উঠিয়ে দিচ্ছিল। হয়তো খুব গরম লাগচ্ছিল তাই দুজন ঘামাচ্ছিল। হয়তো গরম সহ্য করতে না পেরে মেহেদী শার্টের বোতামগুলো খুলে রেখেছিল। হয়তো পাশের রুমে পড়ার সমস্যা হবে তাই দুজন খুব কাছাকাছি আসে কথা বলছিল। সব কিছু সে মানিয়ে নিয়েছিল কারণ মেহেদীকে সে খুব ভালোবাসে। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারচ্ছে তার সুখে নীরে ছার পোকা অনেক আগেই বাসা বেঁধেছে।
বৃষ্টিতে ভিজার ফল রাতেই পেয়ে গেছে অনু। প্রচণ্ড জ্বরে লেপের নিছেও সে কাপচ্ছে। অনুর মা অনুর মাথায় জলপট্টি লাগিয়ে দিচ্ছে। জ্বরের তোপে শত কথা অনুর মুখে। সব মেহেদীকে নিয়েই। অনুর মায়ের বুঝতে বাকি রইল না অনুও তার মত ভুল করে ফেলেছে। অনুর বাবার মারা যায়নি তা অনু জানে না। অনু বাবা তাদের ছেড়ে চলে গেছে তার কলিগের সাথে। গত ১০ বছর কোন খবর নেয়নি তাদের। বল যত জোড়ে দেয়ালে মারা হয় ঠিক তত জোড়েই বল ফিরে আসে।
গত ৬ মাসে মেহেদী কোন ফোন দেয়নি, যতবার দিয়েছে সেটা অনু। এখন আর মেহেদী হাটতে নিয়ে যায় না অনুকে সাগুফতায়। কাশ ফুল দেখাতে নিয়ে যায় না বসুন্ধরায়। বিকেলে অপরিচিত ভাষায় প্রেমের প্রস্তাব দেয় না। তাই অনুও অনেকটা নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে নিজের মত, তার মায়ের মত, তার কষ্ট কন্যার মত। বারান্দায় দাঁড়ালে কলনির ছেলেগুলোকে দেখা যায়, কি আনন্দে ক্রিকেট খেলচ্ছে। যদি ছেলে হতো তাহলে সে কত বন্ধু পেত, ছেলেগুলোর সাথে ক্রিকেট খেলতে পারত। অনুর কাঁধে কেউ হাত রেখেছে। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে তার মা।
তোর কি শরীর খারাপ?
না মা। মা, আমার একটা কথা রাখবে?
কি কথা মা? বল
মা, আমার না আজ সেই রাজকুমারের গল্পটা শুনতে ইচ্ছে করচ্ছে। সেই রাজকুমার মা যে পক্ষিরাজ ঘোড়ায় করে নিয়ে যাবে তুমি বলতে মা, সেই রাজকুমার।
কথা বলতেই অনুর গলা মোটা হয়ে এল। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপেও চোখের পানি আটকে রাখতে পারল না।
অনুর মা বললো, ‘মা, আমরা কিছু সময় ভুল মানুষগুলোকে সঠিক ভেবে অন্ধের মত ভালোবেসে যাই কিন্তু সঠিক মানুষগুলোর দিকে ফিরেও তাকাই না। তুই সেই রাজকুমারকে এখনও পাসনি। আর যাকে পেয়েছিস তাকে রাজকুমার ভেবে ভালবেসেছিস।’
অনু কিছুই বলতে পারচ্ছে না, শুধু চোখের জল যা বলে।
‘মানুষই ভুল করে আর মানুষই তা শুধরে নেয়। তুইও পারবি মা। চেষ্টা করে দেখ।’ অনুর মা বললো
আজ অনেক দিন পর মেহেদী ফোন করেছে। কিন্তু অনুর সেই আগের আবেগগুলো নেই। সে অনেকটাই বদলে নিয়েছে নিজেকে।
হ্যালো? আপনি কি অনামিকা রায়?
না। আমি অনু।
ওহ। অনু। আপনার সাথে কি আমি প্রেম করতে পারি?
না।
না কেন? তাহলে বন্ধু?
না।
শুধু বন্ধু হব আর কিছু না।
মেহেদী। নাটক ভাল লাগচ্ছে না।
কি হয়েছেন তোমার? শরীর খারাপ?
না। সব ঠিক আছে। শুধু তুমি ঠিক ছিলে না আমার জীবনে। তোমার সাথে কোন সম্পর্ক রাখা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
কি বলচ্ছ এই সব? আমি ঠিক ছিলাম না মানে? তোমার বিয়ে ঠিক হইসে এটা আমাকে আগে জানালা না কেন?
মেহেদী শুন, আমার আর ভাল লাগচ্ছে না এই সব নাটকের।
নাটক মানে? কিসের নাটক?
‘রিয়ার সাথে তোমার সম্পর্ক নেই? জয়ন্তির সাথে তোমার শারীরিক সম্পর্ক নেই?’ বললো অনু। অনুর এইসব কথা শুনে মেহেদী জবাব খুঁজে পেল না। সব শেষে মেহেদীর অনুরধ ছিল শেষ বারের মত হলেও একবার দেখা করা, অনুও রাজি হল। মেহেদীর ধারণা ছিল সামনা সামনি হলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। তারপরও সকালেই বেরিয়ে পড়লো অনু, গন্তব্য মেহেদী। আজও মেহেদী দেরী করচ্ছে। এটাই তার চরিত্র। কাকে কোন কথা দেয় তা নিজেরই মনে থাকে না। ঘণ্টাখানিক বসে থাকার পর চোখে পড়লো মেহেদীকে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। অনুকে দেখতে পেয়ে একটু তারাহুরা করে আসতে গিয়ে রিক্সার সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে যায় মেহেদী। অনু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মেহেদীর দিকে। এই যেন মেহেদী নয়, অন্য কেউ। কাল রঙের সেই একই প্যান্ট, নীল রঙের সেই একই টি-শার্ট। রিক্সায় লেগে টি-শার্টের ডান হাতা খানিকটা কেটে গেছে, আর তার সাথে হাতও কেটেছে। কাঁটা জায়গা থেকে রক্ত পরচ্ছে নিচে, আর হাতে অনেকগুলো লাল গোলাপ। সব কিছুই মিলে যাচ্ছে তার দুঃস্বপ্নের সাথে। আকাশে বজ্রপাতে দুনিয়াতে ফিরল অনু। মেহেদী তার সামনে দাড়িয়ে। সে পিছপা হলে মেহেদী তার হাত ধরে এবং বলতে থাকে, ‘অনামিকা, আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, আমি তোমায় কষ্ট দিবো না। আমাকে ছেড়ে চলে যেও না।’ আর অনু ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহেদীর দিকে। কোনটাই স্বপ্ন নয় সবই বাস্তব এটাই মেনে নিতে পারচ্ছে না। মেহেদীকে ধাক্কা দিয়ে পা বাড়াতে থাকে অনু। সব কিছু ফেলে দৌরাচ্ছে অনু। মেঘ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামচ্ছে। তার এই ছুটে চলা আজ তার মুক্তির। রাজপথের পথিক না হলেও সে আজ বিজয়ের প্রতীক। আজও বৃষ্টির পানি তার চোখেকে মুছে দেয়। হয়তো এই পথে কেউ নেই তার এই বিজয় দেখার তবুও সে আজ এক বিজয়ী। এক সময় পড়ে যায় অনু। আধকাঁত হয়ে শুয়ে আছে অনু আর হাঁপাচ্ছে। মুখ তুলে দেখল কেউ যেন আচ্ছে। জুতোর শব্দ নেই, খালি পায়ে আচ্ছে কেউ। জিন্স প্যান্ট পড়া, গায়ে কাল গেঞ্জি। দুই হাত পকেটের ভিতর। ছেলেটি আচ্ছে সমগ্র জাতির বিজয়ীকে হাত ধরে উঠানোর জন্য। সে আচ্ছে, সে আর কেউ নয়। সে ছেলেটিই অচিন।


আমার ফেসবুক আইডিঃ https://www.facebook.com/virtualpain
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০১৪ রাত ১১:৫৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×