কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে আলোচকদের ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্র হনন এবং বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়ায় অনেকে এখন টকশো এড়িয়ে চলছেন।দেখা গেছে, সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন এমন আলোচকদের এক বিষয়ে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে অন্য বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে উপস্থাপক নিজেও একটি পক্ষ নিয়ে ফেলেন।ফলে আলোচনা শুধু যে একপেশে হয়ে যায় তাই নয় বরং ভিন্নমত পোষণ করেন এমন আলোচককে হেয় প্রতিপন্ন করারও চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের অভিযোগ এনে লাইভ অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন একাধিক আলোচক। সম্প্রতি একাত্তর টেলিভিশনে একটি লাইভ অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী। অনুষ্ঠান ত্যাগের আগে তিনি দর্শকদের বলেন, এই টেলিভিশনে কোনো অ্যাকাডেমিশিয়ান ও ভদ্রলোক আসতে পারে না। তিনি অনুষ্ঠানের উপস্থাপকের বিরুদ্ধে সরাসরি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনেন। দিলার চৌধুরী বলেন, তাকে ডেকে এনে অপদস্থ করা হচ্ছে।একই টেলিভিশনে এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান এবং বন ও পরিবেশমন্ত্রী হাছান মাহমুদের মধ্যে উত্তপ্ত বাগি¦তণ্ডা হয়। অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান অনুষ্ঠান থেকে চলে যেতে উদ্যত হন। অবশ্য উপস্থাপক ও আরেকজন আলোচকের অনুরোধে তিনি অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত থাকেন। অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান বলেন এই টেলিভিশনের আর কোনো আলোচনায় অংশ নিতে তিনি আগ্রহী নন।এ ছাড়া একই অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও মেয়র আইভী রহমানের মধ্যে অশ্লীল বাক্যবিনিময় এবং ব্যক্তিগতপর্যায়ে পরস্পরকে আক্রমণ করা হয়। উপস্থাপক দুইজনকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হন। এ অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার হয়।সর্বশেষ দিলারা চৌধুরীর এই অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল ও সাংবাদিক শ্যামল দত্ত।অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে টেলিফোনে এক দর্শক প্রশ্ন করেন একাত্তর সালে দিলারা চৌধুরী ও তার স্বামী কোথায় ছিলেন? দিলার চৌধুরী বলেন, তারা তখন লন্ডনে ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন এই দর্শক শালীনতা ও শোভনতার সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন।দর্শকের টেলিফোনের সূত্র ধরে ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, আগস্ট মাসে এমন কিছু ঘটনা আছে যার কারণে কনসেনশাস পলিটিক্স (রাজনীতিতে ঐকমত্য) সম্ভব নয়। তিনি বলেন ২১ আগস্টের ঘটনায় প্রকাশ্য জনসভায় আপনি ১৬টি গ্রেনেড মারলেন, তার মধ্যে দুইটি ফোটে নাই। সে দুইটি গ্রেনেড নষ্ট করে ফেললেন। জেলখানার ভেতরে গ্রেনেড পাওয়া গেল। আপনার ওসমানী উদ্যানের ভেতর গ্রেনেড পাওয়া গেল। এ সবকয়টি গ্রেনেড নষ্ট করে ফেলা হলো। এ পর্যায়ে দিলারা চৌধুরী বলেন, এসব ঘটনার তদন্ত হওয়া দরকার। দিলারা চৌধুরীর সাথে একমত পোষণ করে শ্যামল দত্ত বলেন, তদন্ত হওয়া দরকার, আনফরচুনেটলি তদন্ত হয়নি। আপনি জজ মিয়া বের করলেন। ৭৫-এর খুনিদের চাকরি দিলেন বিভিন্ন মিশনে।এ পর্যায়ে দিলারা বলেন, কে দিয়েছে, মোশতাক? শ্যামল দত্ত বলেন, মোশতাক দিয়েছে। দিলারা প্রশ্ন তোলেন, মোশতাক আওয়ামী লীগ না? শ্যামল দত্ত বলেন, এই চাকরি কন্টিনিউ করেছেন বেগম জিয়া পর্যন্ত। মোশতাক মীরজাফর, বেঈমান।এ পর্যায়ে দিলারা চৌধুরী শ্যামল দত্তকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি এমন এক সময়ে এ কথা তুললেন যারা এখনো ক্ষমতায় আছেন এবং তারা মোশতাকের ক্যাবিনেটের সদস্য ছিলেন। তাদের কথা বলেন, যে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী। পারবেন তাদের নাম বলতে? শ্যামল বলেন, অবশ্যই আছে।দিলারা চৌধুরী ফের তাকে তাদের নাম বলতে বললে শ্যামল দত্ত হেসে বলেন, আমিতো ইয়াহিয়া ক্যাবিনেটে যারা ছিলেন তাদেরও নাম বলব আপা...দিলারা চৌধুরী বলেন, হ্যাঁ নাম বলেন। ওই ক্যাবিনেটে আমার হাজব্যান্ড ছিল। শ্যামল এ পর্যায়ে বলেন, ইয়েস। দিলারা চৌধুরী বলেন, যদি ইতিহাস ঘাঁটতে হয় তাহলে আমার হাজবেন্ডের বই পড়ে দেখবেন। শ্যামল দত্ত বললেন, আপনার হাজবেন্ডের বই পড়ে দেখেছি ম্যাডাম। দিলারা চৌধুরী বলেন, আমি এখানে আমার হাজবেন্ডকে রিপ্রেজেন্ট করতে আসিনি। আমিতো বলিনি যে আমার হাজবেন্ডের কাসুন্দি ঘাঁটেন। আমি বলেছি, মোশতাকের ক্যাবিনেটে যারা ছিল তাদের নাম বলেন। তার সঙ্গে ইয়াহিয়া ক্যাবিনেটের সদস্যদের নাম বলার কী যোগাযোগ আছে? এটা বলে পারসোনালি হিউমিলেট (ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ) করতে পারবেন আমাকে?শ্যামল দত্ত একপর্যায়ে বলেন, ইয়াহিয়া ক্যাবিনেটে আপনার হাজবেন্ড ছিল এ কথা তো বলিনি আমি। দিলারা বলেন, তাহলে আপনি হাসি দিয়ে কেন বললেন যে তাহলে আমাকে ইয়াহিয়া ক্যাবিনেট মেম্বরদের নাম বলতে হবে। এই হাসির ইনসিনিউয়েশন আছে। শ্যামল দত্ত বলেন, যুগে যুগে বিভিন্ন ক্যাবিনেটে বেঈমানরা ছিল। ইয়াহিয়ার ক্যাবিনেটেও ছিল, মুজিবের ক্যাবিনেটেও ছিল।দিলারা চৌধুরী বলেন তাহলে সেই বেঈমানরা যারা এখন পাওয়ারে (ক্ষমতায়) আছে তাদের নাম বলেন। কোনো সদুত্তর না পেয়ে দিলারা চৌধুরী এ সময় বলেন, আমার বক্তব্য শেষ হয়নি। আমি বলতে চাচ্ছি অন রেকর্ড-৭১ টেলিভিশনে কোনো ভদ্রলোক, কোনো অ্যাকাডেমিশিয়ান এখানে কোনো আলোচনায় অংশ নিতে আসতে পারে না।এ পর্যায়ে অনএয়ারে দিলারা চৌধুরী উঠে দাঁড়ান এবং স্টুডিও ত্যাগ করতে উদ্যত হন। অধ্যাপক মেজবাহ কামাল তখন বলেন, আচ্ছা ঠিক আছে, অনুষ্ঠান আমাদের শুরু করতে হচ্ছে। যাওয়ার আগে উপস্থাপক শাকিল আহমেদ দিলারা চৌধুরীকে বসতে বললে তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে কথা ওঠালে আমি বসব না। শাকিল আহমেদ জানান, সে দায় ৭১ টেলিভিশন কিভাবে নেবে? জবাবে দিলারা চৌধুরী বলেন, ৭১ টেলিভিশনের উপস্থাপকের যে রোল, সে রোলটা হবে মডারেট করা। মডারেট করতে যেয়ে অনেককে অনেক কিছু চান্স দিয়ে ফেলছেন।শ্যামল দত্ত ও অধ্যাপক মেজবাহ কামালকে লক্ষ্য করে দিলারা চৌধুরী বলেন, আমি এখানে বসে বসে অতীতে আপনার কোথায় ছিলেন, কোনখান থেকে জাম্প করে এখানে এসেছেন এগুলো বের করি? এ পর্যায়ে স্টুডিও থেকে দিলারা চৌধুরী বের হয়ে যান।অনুষ্ঠানের শুরুতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, শুধু ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নয় এর পরবর্তী সময়ে উপজেলা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হয়ে যে ভূমিকা নিয়েছে তাতে আমি লজ্জিত হয়েছি। ৪২টি দলের মধ্যে ৮-৯টি দলের অংশগ্রহণে যে নির্বাচন হয়েছে তা অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক। তিনি বলেন, যেখানে সাংবিধানিক পথ বন্ধ হয়ে যায় সেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা হবে এটাই স্বাভাবিক। দাবি না মানলে সহিংসতা হবেই। সহিংসতা শুধু একটি দলই করে না, সহিংসতা আওয়ামী লীগও করে। কিন্তু সহিংসতা কারোই কাম্য নয়। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াত ও হেফাজতের সহিংসতার কথা বললে তার নিন্দা করব। কিন্তু সাংবিধানিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য যে আন্দোলন হয়েছে তার নিন্দা করব না। দুই পক্ষই একে অপরের প্রতি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে।অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেন, তাকে ৭১ টেলিভিশন থেকে জানানো হয়েছিল সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু আলোচনা শুরু হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। শুরু থেকে উপস্থাপক পক্ষপাতমূলক ভূমিকা গ্রহণ করেন।
টকশোতে ব্যক্তিগত আক্রমণ : এড়িয়ে যাচ্ছেন অনেকে
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন
সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....
ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।
ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন
তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-
বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন
দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন
DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।