জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের ছবিখানা দেখে আঁতকে ওঠেনি এমন বঙ্গসন্তান কমই আছে! আমার নিজের এন আইডির ছবিখানা দেখলে মনে হয় পানিতে ডুবে মৃত কোন কৃষ্ণাঙ্গের পচে গলে ফুলেফেঁপে ওঠা লাশের মুখ!
ব্যাংকে এসে এন আইডির আরো কিছু নেতিবাচক বিষয় নজরে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরমান অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব চালু করতে হিসাবধারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি প্রদান বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয়, আইডি কার্ডে হিসাবধারীর নামের যে বানান, সেই বানানেই একাউন্টের নামও হতে হয়। গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত অথবা অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষদের নামগুলোতে বানানের অবস্থা ভয়াবহ। ইংরেজি বানান তো বটেই, বাংলা বানানগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। এজন্যই বাধ্য হয়েই জনৈক মোজাম্মেল হকের একাউন্ট খুলতে হয় মোগাম্মাল হোক নামে, কারণ আইডি কার্ডে বানান লেখা Mogammal Hok!
অন্যদিকে, যারা পাসপোর্ট দেখিয়ে একাউন্ট খোলেন, তাদের প্রায় সবারই নামের বানান যথেষ্ট ভদ্রস্থ ও চলনসই। এতে বুঝা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্পে ডাটা এন্ট্রির কাজে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ করা হয় যাদের মুরোদ বড়জোর কম্পিউটারের কীবোর্ডে এবিসিডির বাটনগুলোতে গুতাগুতি করা পর্যন্তই সীমিত।
এটা তো গেলো এনআইডির একরকমের দুর্বলতা। আরেকটা বাজে ব্যাপার হচ্ছে, কার্ডে বিবাহিত নারীদের পিতার নামের অনুপস্থিতি। এজন্য সবসময় জেনানাদের একাউন্টের ফর্ম পূরণ করতে গেলে বাড়তি সতর্কতা আরোপ করে পিতার নামটা জেনে নিতে হয়। আমার মতে, এন আইডির সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল এটা।
শুনলাম নির্বাচন কমিশন আজ থেকে আইডি কার্ডে ভুল সংশোধন করার কাজ আরম্ভ করতে যাচ্ছে। এই কাজ কতোটা সফল হবে, তা নিয়ে আমার পুরাপুরি সন্দেহ আছে। গ্রামে তো বটেই, শহরেও এমন অনেকেই আছে, যারা নিজের নামের বানানের ভুল ধরে তা সংশোধন করতে সমর্থ নন। ফলে বেশ কিছু টাকার শ্রাদ্ধ হবার চেয়ে বেশি কিছু এর দ্বারা অর্জিত হবেনা।
আমার মনে হয়, নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে ভোটার তালিকা প্রণয়নের মতো প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে এন আইডির ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া। পাশাপাশি ডাটা এন্ট্রির কাজে শিক্ষিত লোকদের নিয়োগ করা, এবং মাঠ পর্যায়ে পাঠানোর আগে নামের ইংরেজি ও বাংলা বানানের শুদ্ধরূপ সম্পর্কে একটি বিস্তারিত ও কার্যকর প্রশিক্ষণ বা কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে স্বামীর নামের পাশাপাশি পিতার নাম যুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি, বিদ্যমান ছবিগুলোকে পাল্টে ভদ্রস্থ ছবি যুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমি বিশ্বাস করি, ব্যবহারিক জীবনে মানুষের নাম হচ্ছে তার প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচিতি, নিজেকে অন্যের সামনে উপস্থাপনের প্রথম জরিয়া। আর এই পরিচিতি ও জরিয়া প্রথমেই হোঁচট খায়, যদি তার নামের বানানে ভুল হয়। আর 'নামের বানানে ভুল নেই' এটা নেহায়েতই বাঙ্গালীর আবিস্কার করা একটি সুবিধাবাদী তত্ত্ব। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, একজন মানুষ নিজস্ব কোন বানানরীতিতে তার নাম লেখতেই পারে। কিন্তু সংঘবদ্ধ সরকারী প্রয়াসে মিঞাকে মেয়া, পেয়ারাকে ফেয়ারা, আহমদ/ আহমাদ বা আহমেদকে আহম্মেদ, শরফুদ্দীনকে সর্প উদ্দিন, সকিনাকে চকিনা করার কোন মানে হয়না...!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



