১।
সন্ধ্যায় হামিদ সাহেব খুব ফুরফুরে মেজাজে আছেন । তিনি তাঁর ৩২ টা রুমাল আলমারি থেকে বের করে খাটে বসেছেন । সেগুলো খুলে খুলে দেখছেন, ঘ্রাণ নিচ্ছেন, আবার ভাঁজ করছেন । সাথে গুনগুন করে গান ও গাচ্ছেন ।স্ত্রী শুমিতা ড্রেসিং টেবিল থেকে মুখ ফিরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন,
- কীইই ব্যাপার ? এতো খুশি কেন শুনি ?
- হুম...ম কারণ তো একটা আছে ।
- কী !
- আজকে গাড়িটা নষ্ট হয়ে ভালোই হয়েছে । বাসে করে আসার সময় আমার মত একটা ছেলেকে দেখলাম । মনটা ভরে গেল ।
- ও ও এই ঘটনা, হাহ, আমিতো ভাবছি কি না কি ! শুনেছি দেখতে একই রকম মানুষ নাকি পৃথিবীতে সাতজন থাকে । হয়তো তোমার মত দেখতে আরেকজন এই শহরেই আছে তাই দেখেছ । এতে এতো খুশির কী আছে !
- ও তুমি বুঝবে না শুমিতা । এই বলে হামিদ সাহেব নিজের কাজে মন দেয় ।
- হয়েছে, তোমার এসব পাগলামী আমার এতো বোঝার দরকার নাই । কাল বিকালে একটু বিউটি পার্লারে যাব । দশ হাজার টাকা লাগবে ।
- আব্বু, আমাকে আই ফোন সিক্সটা কিনে দিতে হবে । এটাতে আরো দারুণ দারুণ ফিচার্স যোগ হয়েছে । মিতু এসে বলল ।
- আব্বু , আমার একটা ইলেক্ট্রিক গিটার লাগবে । সামনে ইনিভার্সিটি ফাংশানে পারফর্ম করবো । সুহান এসে বলল ।
ফুরফুরে মেজাজে থাকার মজাটা হামিদ সাহেব এবার টের পেলেন । তাতক্ষনিক তিনটা আবদার তাঁর সামনে মুখ থুবড়ে পড়লো । তিনি হ্যাঁ করে দিলেন । খোশ মেজাজে থাকলে তিনি স্ত্রী সন্তানদের কোন আবদারে না করতে পারেন না । আর হামিদ সাহেবের টাকা পয়সারও কমতি নেই । তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের এম ডি । বেতন পান মাসে দুই মিলিয়ন++ অন্যান্য সুবিধা । তবে বড় হতে হতে সন্তানদের চাহিদা আর বয়স হতে হতে স্ত্রীর বিউটি পার্লারের বিল দিন দিন বেড়েই চলছে । সুহান এইবার নামীদামী একটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে আর মিতু পড়ছে ‘এ’ লেভেলে একটা নামীদামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে । তাই খরচের এমন ঘোড় দৌড় দেখে হামিদ সাহেব একটু চিন্তিত ।
হামিদ সাহেবের রুমাল রহস্য নিয়ে তার স্ত্রী সন্তানদের কৌতূহল বহু আগেই মরে গিয়েছে । সুহান আর মিতু উনাকে প্রায় সময় রুমালের কথা জিজ্ঞেস করতো । তারা উত্তর না পেয়ে বলে, তুমি কী আগে রুমাল বিক্রি করতে নাকি বাবা, তাই আমাদের বলতে চাচ্ছো না ! হামিদ সাহেব ছেলেমেয়েদের এমন কথা শুনে আওয়াজহীন একটা হাসি দিয়ে চুপ হয়ে যেতেন । উনার কাছে মজাই লাগে । এরপর থেকে তারা আর তেমন জিজ্ঞেস করে না । তবে শুমিতা একটু বেশিই গিয়েছিল । সে রুমাল নিয়ে হামিদ সাহেবের সাথে ঝগড়া লাগাতো । উনাকে সন্দেহ করতো বিয়ের আগে দেওয়া প্রেমিকার রুমাল কিনা । একসময় শুমিতা অসহ্য হয়ে হামিদ সাহেবকে বলল,
- তুমি মানসিক ডাক্তার দেখাও । তোমার এইসব পাগলামি আমার সহ্য হচ্ছে না ।
- তোমাকে এ নিয়ে মাথা ঘামাতে কে হলেছে ? তুমি তোমার কাজ নিয়েই থাকো না ।
- আমাকে এ ঘরে থাকতে হয় । তোমার এই সব ছাতার রুমাল কীর্তি আমার আর ভাল লাগছে না । আর যদি এসব করো তোমার এই রুমালগুলো আমি আগুনে পুড়ে ফেলবো । শুমিতা রাগ নিয়ে বলে ।
- খবরদার শুমিতা, এ কথা যদি আরেকবার মুখ দিয়ে আনো তোমাকেই আমি আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলবো । হামিদ সাহেবের চোখ রাগে লাল হয়ে যায় । শুমিতা খুব ভয় পায় । সে চুপ হয়ে যায় । এরপর থেকে রুমাল টুমাল নিয়ে শুমিতাও আর তেমন কিছু বলে না ।
২।
হামিদ সাহেব আজও গাড়ি বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন । তিনি অফিস থেকে বাসে করেই যাবেন । গতবার ছেলেটাকে দেখার পর থেকে তিনি বাসে করেই বাসায় ফেরেন । তিনি ছেলেটাকে খুঁজছেন । একমাস হয় তিনি বাসে করে ফিরছেন অথচ ছেলেটাকে খুঁজে পাচ্ছেন না । গতবার ছেলেটাকে ধরে রাখলে আর এই সমস্যাটা হত না ।কিন্তু তখন হামিদ সাহেব এতো আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলেন যে ছেলেটাকে ধরে রাখার চিন্তাটাই মাথা থেকে চলে গিয়েছিল । এ নিয়ে হামিদ সাহেব নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছেন । তিনি বাসের ভেতর উঁকিঝুঁকি করছেন যদি ছেলেটাকে পেয়ে যান !
- ভাইজান, ভাড়াগুলো সবার হাতে হাতে নেন ।
হামিদ সাহেব মার্জিত আওয়াজটা শুনে বাসের সামনের দিকে তাকাচ্ছেন । ছেলেটাকে ভিড়ের জন্য দেখা যাচ্ছে না । তিনি দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছেন । এইতো ছেলেটার মাথাটা দেখা যাচ্ছে । মাথায় একটা রুমাল বাঁধা, মুখে একটা রুমাল বাঁধা । চমৎকার চোখের দৃষ্টি । গোছানো কথাবার্তা । দেখে মনে হচ্ছে কলেজ পড়ুয়া ছাত্র । হয়তো তারও দুইটা ছোট ভাই আছে, একজন মা আছেন । হয়তো ছেলেটা পড়াশোনার পাশাপাশি বাপমরা সংসারটাকেও চালাচ্ছে বাসে হেলপারি করে । হামিদ সাহেবের চোখ টলমল করছে । ছেলেটা উনার কাছে ভাড়া চাচ্ছে । হামিদ সাহেব ভাড়ার সাথে সাথে একটা কার্ডও দিল ছেলেটাকে । তিনি বললেন, বাবা এই ঠিকানায় তুমি এসো । আর অবশ্যই এইভাবে মাথায় এবং মুখে রুমাল বেঁধে । এই বলে হামিদ সাহেব বাস থেকে নেমে গেলেন । ছেলেটা বাসের জানালা দিয়ে হামিদ সাহেবকে দেখার চেষ্টা করছে...
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৫:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




