somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রুমাল । ( অণুগল্প )

১৪ ই জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৪:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১।

সন্ধ্যায় হামিদ সাহেব খুব ফুরফুরে মেজাজে আছেন । তিনি তাঁর ৩২ টা রুমাল আলমারি থেকে বের করে খাটে বসেছেন । সেগুলো খুলে খুলে দেখছেন, ঘ্রাণ নিচ্ছেন, আবার ভাঁজ করছেন । সাথে গুনগুন করে গান ও গাচ্ছেন ।স্ত্রী শুমিতা ড্রেসিং টেবিল থেকে মুখ ফিরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন,

- কীইই ব্যাপার ? এতো খুশি কেন শুনি ?

- হুম...ম কারণ তো একটা আছে ।

- কী !

- আজকে গাড়িটা নষ্ট হয়ে ভালোই হয়েছে । বাসে করে আসার সময় আমার মত একটা ছেলেকে দেখলাম । মনটা ভরে গেল ।

- ও ও এই ঘটনা, হাহ, আমিতো ভাবছি কি না কি ! শুনেছি দেখতে একই রকম মানুষ নাকি পৃথিবীতে সাতজন থাকে । হয়তো তোমার মত দেখতে আরেকজন এই শহরেই আছে তাই দেখেছ । এতে এতো খুশির কী আছে !

- ও তুমি বুঝবে না শুমিতা । এই বলে হামিদ সাহেব নিজের কাজে মন দেয় ।

- হয়েছে, তোমার এসব পাগলামী আমার এতো বোঝার দরকার নাই । কাল বিকালে একটু বিউটি পার্লারে যাব । দশ হাজার টাকা লাগবে ।

- আব্বু, আমাকে আই ফোন সিক্সটা কিনে দিতে হবে । এটাতে আরো দারুণ দারুণ ফিচার্স যোগ হয়েছে । মিতু এসে বলল ।

- আব্বু , আমার একটা ইলেক্ট্রিক গিটার লাগবে । সামনে ইনিভার্সিটি ফাংশানে পারফর্ম করবো । সুহান এসে বলল ।

ফুরফুরে মেজাজে থাকার মজাটা হামিদ সাহেব এবার টের পেলেন । তাতক্ষনিক তিনটা আবদার তাঁর সামনে মুখ থুবড়ে পড়লো । তিনি হ্যাঁ করে দিলেন । খোশ মেজাজে থাকলে তিনি স্ত্রী সন্তানদের কোন আবদারে না করতে পারেন না । আর হামিদ সাহেবের টাকা পয়সারও কমতি নেই । তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের এম ডি । বেতন পান মাসে দুই মিলিয়ন++ অন্যান্য সুবিধা । তবে বড় হতে হতে সন্তানদের চাহিদা আর বয়স হতে হতে স্ত্রীর বিউটি পার্লারের বিল দিন দিন বেড়েই চলছে । সুহান এইবার নামীদামী একটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে আর মিতু পড়ছে ‘এ’ লেভেলে একটা নামীদামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে । তাই খরচের এমন ঘোড় দৌড় দেখে হামিদ সাহেব একটু চিন্তিত ।

হামিদ সাহেবের রুমাল রহস্য নিয়ে তার স্ত্রী সন্তানদের কৌতূহল বহু আগেই মরে গিয়েছে । সুহান আর মিতু উনাকে প্রায় সময় রুমালের কথা জিজ্ঞেস করতো । তারা উত্তর না পেয়ে বলে, তুমি কী আগে রুমাল বিক্রি করতে নাকি বাবা, তাই আমাদের বলতে চাচ্ছো না ! হামিদ সাহেব ছেলেমেয়েদের এমন কথা শুনে আওয়াজহীন একটা হাসি দিয়ে চুপ হয়ে যেতেন । উনার কাছে মজাই লাগে । এরপর থেকে তারা আর তেমন জিজ্ঞেস করে না । তবে শুমিতা একটু বেশিই গিয়েছিল । সে রুমাল নিয়ে হামিদ সাহেবের সাথে ঝগড়া লাগাতো । উনাকে সন্দেহ করতো বিয়ের আগে দেওয়া প্রেমিকার রুমাল কিনা । একসময় শুমিতা অসহ্য হয়ে হামিদ সাহেবকে বলল,

- তুমি মানসিক ডাক্তার দেখাও । তোমার এইসব পাগলামি আমার সহ্য হচ্ছে না ।

- তোমাকে এ নিয়ে মাথা ঘামাতে কে হলেছে ? তুমি তোমার কাজ নিয়েই থাকো না ।

- আমাকে এ ঘরে থাকতে হয় । তোমার এই সব ছাতার রুমাল কীর্তি আমার আর ভাল লাগছে না । আর যদি এসব করো তোমার এই রুমালগুলো আমি আগুনে পুড়ে ফেলবো । শুমিতা রাগ নিয়ে বলে ।

- খবরদার শুমিতা, এ কথা যদি আরেকবার মুখ দিয়ে আনো তোমাকেই আমি আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলবো । হামিদ সাহেবের চোখ রাগে লাল হয়ে যায় । শুমিতা খুব ভয় পায় । সে চুপ হয়ে যায় । এরপর থেকে রুমাল টুমাল নিয়ে শুমিতাও আর তেমন কিছু বলে না ।

২।

হামিদ সাহেব আজও গাড়ি বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন । তিনি অফিস থেকে বাসে করেই যাবেন । গতবার ছেলেটাকে দেখার পর থেকে তিনি বাসে করেই বাসায় ফেরেন । তিনি ছেলেটাকে খুঁজছেন । একমাস হয় তিনি বাসে করে ফিরছেন অথচ ছেলেটাকে খুঁজে পাচ্ছেন না । গতবার ছেলেটাকে ধরে রাখলে আর এই সমস্যাটা হত না ।কিন্তু তখন হামিদ সাহেব এতো আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলেন যে ছেলেটাকে ধরে রাখার চিন্তাটাই মাথা থেকে চলে গিয়েছিল । এ নিয়ে হামিদ সাহেব নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছেন । তিনি বাসের ভেতর উঁকিঝুঁকি করছেন যদি ছেলেটাকে পেয়ে যান !

- ভাইজান, ভাড়াগুলো সবার হাতে হাতে নেন ।

হামিদ সাহেব মার্জিত আওয়াজটা শুনে বাসের সামনের দিকে তাকাচ্ছেন । ছেলেটাকে ভিড়ের জন্য দেখা যাচ্ছে না । তিনি দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছেন । এইতো ছেলেটার মাথাটা দেখা যাচ্ছে । মাথায় একটা রুমাল বাঁধা, মুখে একটা রুমাল বাঁধা । চমৎকার চোখের দৃষ্টি । গোছানো কথাবার্তা । দেখে মনে হচ্ছে কলেজ পড়ুয়া ছাত্র । হয়তো তারও দুইটা ছোট ভাই আছে, একজন মা আছেন । হয়তো ছেলেটা পড়াশোনার পাশাপাশি বাপমরা সংসারটাকেও চালাচ্ছে বাসে হেলপারি করে । হামিদ সাহেবের চোখ টলমল করছে । ছেলেটা উনার কাছে ভাড়া চাচ্ছে । হামিদ সাহেব ভাড়ার সাথে সাথে একটা কার্ডও দিল ছেলেটাকে । তিনি বললেন, বাবা এই ঠিকানায় তুমি এসো । আর অবশ্যই এইভাবে মাথায় এবং মুখে রুমাল বেঁধে । এই বলে হামিদ সাহেব বাস থেকে নেমে গেলেন । ছেলেটা বাসের জানালা দিয়ে হামিদ সাহেবকে দেখার চেষ্টা করছে...
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৫:৫০
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কঠিনতম সব চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপির ভবিষ্যৎ কি অন্ধকার??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১০



বিএনপির সামনে অনেক কঠিন সব চ্যালেঞ্জ...

তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে দ্বিমুখী বিরোধী-দলীয় রাজনীতি বা কর্মকাণ্ড (যেটা কিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি)।

জামাত-এনসিপি যতই লীগের ফিরে আসার বিরুদ্ধে বিএনপির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার নানা মরহুম শাহাবুদদীন মাহমুদ জায়গীরদার

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:২৫



আমার আম্মার সেঝ চাচা’র লেখা ‘My life is not mine’ বইটি পড়ছি। বইটিতে ‘মাইজম ভাই’ নামের একটি অধ্যায় আছে। এতে সেঝ নানা আমার নানার বিভিন্ন সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যু পেরিয়ে আবার ব্লগে------

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৬




প্রায় ০৩ মাস হয়ে গেলো ব্লগে আসনা হয় না, আসা হয়না মানে লিখা হয়না। প্রিয়জনের মৃত্যু শোক কাটিয়ে ব্লগে উকি দেওয়া হয় কিন্তু পোস্ট দেওয়া হয় না।


গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×