somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টুকুর উত্তরাধিকারের রাজনীতি ও ইনকিলাব বিতর্ক

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক অনুষ্ঠানে মাননীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর একটি বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শুধু বিষ্ময়ই সৃষ্টি করেনি, বরং ইতিহাসের এক গভীর ক্ষতকেও নতুন করে উন্মোচিত করেছে। তিনি দাবি করেছেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি বাংলার সঙ্গে সম্পর্কহীন এবং এটি নাকি তাঁদের ভাষা যারা আমাদের মাতৃভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। শুধু তাই নয়, এই স্লোগান শুনে তাঁর ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণ’ হয় উল্লেখ করে তিনি নিজেকে ১৯৭১ সালের একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেছেন। তবে ইতিহাসের নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ এবং তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিশ্লেষণ করলে এই দাবির পেছনে লুকিয়ে থাকা এক গভীর স্ববিরোধিতা ও ঐতিহাসিক বিকৃতিই কেবল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন কোনো রাজনীতিক নিজেকে ইতিহাসের রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন, তখন তাঁর নিজস্ব ঐতিহাসিক ভিত্তিটি পরখ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। জনাব টুকুর ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটার সুযোগ নেই।

​ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যখন আজ জেন-জি বা নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও ভাষার সংজ্ঞায়ন শেখাতে আসেন, তখন তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের রাজনৈতিক জীবনের খতিয়ানটি সামনে আসা অনিবার্য। ইতিহাসের অমোঘ দলিলে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ একজন মুসলিম লীগের কট্টর নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন । ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশনে যখন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেন, তখন সিরাজগঞ্জ থেকে সেই সম্মেলনে সক্রিয়ভাবে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। ১৯৪২ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ সম্মেলনের আহ্বায়ক হওয়া থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালে লন্ডনে সদর দপ্তর বিশিষ্ট ইম্পেরিয়াল জুট কমিটির চেয়ারম্যান হওয়া সবই ছিল তাঁর পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি একনিষ্ঠতার ফল। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য ও জয়েন্ট চিফ হুইপ নিযুক্ত হন। এর চেয়েও বিস্ময়কর তথ্য হলো, ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতায় পাকিস্তানের ডেপুটি হাই কমিশনারের মতো স্পর্শকাতর কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ, যখন রফিক-সালাম-বরকতরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছেন, যখন বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষায় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে, তখন আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বিদেশের মাটিতে সেই পাকিস্তান রাষ্ট্রেরই প্রতিনিধিত্ব করছিলেন যারা বাংলাকে মুছে দিতে চেয়েছিল।

​ষাট ও সত্তরের দশকের উত্তাল দিনগুলোতেও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের পাকিস্তান প্রীতিতে কোনো ভাটা পড়েনি। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত আইয়ুব খান সরকারের কেন্দ্রীয় শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সিরাজগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকালেও তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব ও অখণ্ড পাকিস্তানের সংহতি। বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা কিংবা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের উত্তাল আন্দোলনে তাঁর কোনো ইতিবাচক ভূমিকার ছিটেফোঁটাও ইতিহাসে নেই। বরং ১৯৬৯ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কখনোই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পক্ষে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তাঁর পুরো জীবনদর্শন ছিল বাঙালির স্বাধিকারের বিপরীতে এক অনড় পাকিস্তানি সত্তার পাহারাদার।

​এমন একটি পারিবার থেকে উঠে আসা ব্যক্তি যখন স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর জনসমক্ষে নিজেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করেন, তখন তা ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাস হিসেবেই গণ্য হয়। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আজ বলছেন যে তিনি সমাজ পরিবর্তনের জন্য জীবন দিতে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, অথচ ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার বা মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্বীকৃত প্রামাণ্য দলিলে তাঁর সেই ‘বীরত্বগাথা’র ন্যূনতম কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় না। প্রশ্ন ওঠে, যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর সুনির্দিষ্ট কোনো যুদ্ধক্ষেত্র বা সাংগঠনিক ভূমিকার প্রমাণ কোথায়? অথচ এই তথাকথিত 'মুক্তিযোদ্ধা' পরিচয়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে তিনি যখন আজ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূলমন্ত্রকে আক্রমণ করেন, তখন তা স্রেফ রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবেই প্রতিভাত হয়। তিনি দাবি করেছেন যে ‘ইনকিলাব’ (বিপ্লব) শব্দটি বিদেশি এবং এটি ভাষা বিরোধীদের স্লোগান। ভাষাবিজ্ঞান ও ইতিহাসের নূন্যতম জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ভাষার সম্পদ নয়। এটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে হসরত মোহানির হাত ধরে জন্ম নিয়ে ভগত সিং-এর মাধ্যমে উপমহাদেশে জনপ্রিয় হওয়া শোষণের বিরুদ্ধে এক বৈশ্বিক বিপ্লবী মন্ত্র। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লব প্রতিটি মোড়েই এই শব্দটি ফ্যাসিবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

​মন্ত্রীর এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাসনাত আব্দুল্লাহ বা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর মতো চব্বিশের বিপ্লবের নায়কদের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, নতুন প্রজন্ম ইতিহাসের এই চাতুর্যপূর্ণ বিকৃতি গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। হাসনাত আব্দুল্লাহর ফেসবুক পেজে মাত্র দুই শব্দের ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্ট্যাটাসটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমর্থন পাওয়ার অর্থ হলো মানুষ মন্ত্রীর দাবিকৃত সেই ‘চেতনা’র মোড়কটি ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যে ‘জেন-জি’র রক্তে নতুন বাংলাদেশ রচিত হয়েছে, তাদের বিপ্লবী স্লোগানকে ‘রক্তক্ষরণ’ এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা মূলত সেই গণআকাঙ্ক্ষাকেই অস্বীকার করার শামিল। যিনি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন, তাঁর মুখে আজ ‘ভারতের দালাল’ হওয়ার ভয়হীন ঘোষণা বা ‘মুক্তিযুদ্ধের ইজারা’ নেওয়াটা হাস্যকর। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যে রাজনৈতিক চেতনা বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল, আজ সেই উত্তরাধিকারীরাই মুক্তিযোদ্ধা সেজে আমাদের দেশপ্রেমের পাঠ দিচ্ছেন এটিই হলো ইতিহাসের আধুনিক ট্র্যাজেডি।

​মন্ত্রীর বক্তব্যে যে ‘রক্তক্ষরণ’-এর কথা বলা হয়েছে, তা সম্ভবত দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে না পারারই যন্ত্রণা। তিনি সম্ভবত এই স্লোগানের শক্তি এবং এর সঙ্গে মিশে থাকা আবেগ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ২০২৪ এর বিপ্লবীরা যে ইনকিলাবের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছে, সেই বাস্তবতাকে যারা তথাকথিত চেতনার দোহাই দিয়ে অস্বীকার করতে চায়, তাদের পতন ইতিহাসের পাতায় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাসের সত্য এটাই যে, পারিবারিক দায়ভার সবসময় ব্যক্তির ওপর বর্তায় না ঠিকই, কিন্তু যখন কেউ রাজনৈতিকভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন এবং ইতিহাসের বানোয়াট বয়ান তৈরি করতে চান, তখন তাঁর অতীতের আয়নাটি উন্মোচিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আজ তথাকথিত সেই উত্তরাধিকারীরাই দেশপ্রেমের ধ্বজাধারী সাজেন, যাদের পূর্বপুরুষরা এই দেশটির জন্মের প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, আর নথিপত্র সবসময়ই সত্যের পক্ষে সাক্ষী দেয়। সেলুকাস সম্ভবত এমন দৃশ্য দেখেই ইতিহাসের এই বৈচিত্র্যময় বৈপরীত্য নিয়ে বিষ্ময় প্রকাশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জয় হয় সত্যের আর বিপ্লবের, যাকে কোনো বানোয়াট আখ্যান দিয়ে ঢাকা সম্ভব নয়।
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজাদি না মুক্তি? ইনকিলাব না বিপ্লব? ~ ভিনদেশী শব্দের মচ্ছবে বিপন্ন বাংলা ভাষা?

লিখেছেন সাজিদ উল হক আবির, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

১।
বিগত ৮ বছরের মতো এবারের ২১ ফেব্রুয়ারিও সাতসকালে কর্মস্থলে এসে হাজির হয়েছি, কেননা আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, সেখানে বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতাদিবসের মতো জাতীয় দিবসগুলিকে উৎযাপন করা হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ প্রমোশন

লিখেছেন সামিয়া, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৫


একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করতো দু’জন সায়ন চৌধুরী আর ঈশিতা রহমান। ঈশিতা এসেছিল সায়নের আগে। তাই শুরু থেকেই কাজের বেশিরভাগ দায়িত্ব ছিল তার হাতে। প্রেজেন্টেশন, ক্লায়েন্ট ব্রিফ, স্টোর রুমের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতে ইসলামী ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে ছিল না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০২


জামায়াতে ইসলামীকে আমি এখন নতুন চোখে দেখি। মানুষ ভুল করতেই পারে, ইতিহাসে ছোটখাটো কিছু ভুল তো সবারই থাকে। যেমন ধরুন, একটা দেশের জন্মের বিরোধিতা করা, সেটাকে ভেঙে দিতে চাওয়া, বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫


রমজান মাসে শাহেদ জামালের সমস্যা হয়ে যায়।
দিনের বেলা সিগারেট খাওয়া যায় না। রাস্তার পাশে আরাম করে দাঁড়িয়ে চা খাওয়া যায় না। রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এই দেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুক্তরাজ্যের ভিসা পাওয়া এতো কঠিন কেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:২৪

আমার বড় মেয়ে মারিয়ার সাথে আজ কথা হলো। সে যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করে। এখন ৭ম শ্রেণীতে। মারিয়ার নানাবাড়ি ইংল্যান্ডে হওয়ায় সেখানে থেকে পড়ালেখা করাটা একটু সহজ হয়ে গিয়েছে। আমার সাথে ফোনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×