somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ঔপন্যাসিক জিল্লুর রহমান
চোখের সামনে যেকোন অসঙ্গতি মনের মধ্যে দাগ কাটতো, কিশোর মন প্রতিবাদী হয়ে উঠতো। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতো কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে। ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে, নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা। তারপর গল্প, উপন্যাস। এ যাবত প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা-২১ টি।

ক্যামেরার চোখ-০৩

১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ১১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবি ঢাকা থেকে ফেরার পর তার বই প্রকাশের কথা সবাইকে বলেছেন। যে-ই শুনেছে সেই কবির প্রশংসা করেছে, কবিকে উৎসাহিত করেছে। কবির স্ত্রীর নাম নুরজাহান বেগম। কবি বউয়ের নাম সংক্ষিপ্ত করে বেগম বলে ডাকেন। বেগম সবকিছু শুনে বললো, এতোদিনে বুঝি তুমি কবির মূল্যায়ন পেলে। তোমার কবিতা সারা দেশের মানুষ পড়বে।
কবি নুরজাহানকে এটুকুই বলেছিলেন। বই প্রকাশের সঙ্গে যে টাকার একটা বিরাট অংক জড়িয়ে আছে সেকথা কৌশলে এড়িয়ে গেছেন কিন' ক’দিন পর যখন বই প্রকাশের আনন্দ আর টাকা জোগাড় করার দুশ্চিন্তা মাথায় ভর করলো তখন তার কলম একেবারে বন্ধ হয়ে গেলো।
আজকাল কবি সবসময় দুশ্চিন্তায় ছট্‌ফট্‌ করছেন। কেমন একটা অস্থিরতায় সবসময় তার কেন্দ্রীভূত চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে আসছে। কবির এই অস্থিরতা বেগমের চোখ এড়িয়ে যেতে পারেনি।
আগে কবি অনেক রাত পর্যন্ত লেখালেখি করতেন। রাত যতো গভীর হতো কবির কলমের গতিও ততো বেড়ে যেতো। কবি যখন লেখালেখি শেষ করে বিছানায় যেতেন তখন বেশিরভাগ দিনে বেগম ঘুমিয়ে পড়তো। কবি বিছানায় যাওয়ার আগে বেগম ঘুমিয়েছে জেনেও ডাক দিতেন, বেগম ঘুমিয়েছো?
বেগম কোনো সাড়া দিতো না।
আজ ক’দিন থেকে কবি লেখালেখি না করে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে আসছেন দেখে বেগম জিজ্ঞেস করলো, তুমি এতো তাড়াতাড়ি বিছানায়?
কবি কোনো কথা বললেন না।
আজ ক’দিন থেকে দেখছি তুমি লিখতে বসছো না। কী হয়েছে তোমার?
কবি তবুও কোনো কথা বললেন না।
বেগম বিছানায় উঠে বসলো, আমাদের সংসার করার কত বছর হলো বলোতো?
ত্রিশ বছর।
আমার আজো মনে আছে। প্রথম রাতে তুমি আমাকে বেগম বলে ডেকেছিলে। তারপর আমাদের এক ছেলে এক মেয়ে হলো। ওদের সামনেও তুমি আমাকে বেগম বলে ডাকতে। ওদের বিয়ে হলো। আমরা বুড়োবুড়ি হলাম তারপরও তুমি আমাকে বেগম বলে ডেকেছো।
কবি মাথা নত করে বিছানার কোণায় বসে রইলেন।
আজ ক’দিন থেকে দেখছি তুমি লিখতে বসছো না। খাওয়া-দাওয়ার পর কিছুক্ষণ লেখার টেবিলে কাগজ-কলম নিয়ে কিছু এলোমেলো লিখে শুয়ে পড়ছো। আমি ঘুমাবার ভান করে শুয়ে থেকেছি তুমি আমাকে বেগম বলে ডাকবে এই আশায় কিন' তুমি সেই প্রিয় নামে আমাকে ডাকছো না। তুমি কেমন জানি অসি'র হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো। কী হয়েছে তোমার?
কবি বেগমের বাহুতে একটা হাত রাখলেন। তারপর একটা কষ্টের হাসি হেসে বললেন, বেগম কাকে বলে জানো?
বেগম না সূচক মাথা নাড়লো।
বাদশাহ্‌র বউকে বেগম বলে। তুমি চেহারায় বেগম বটে কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে বাদশাহ্‌র বউ না। আল্লাহ তোমাকে পাঠিয়েছে আমার মতো একজন হাভাতে কবির ঘরে।
বেগম কিছুটা রেগে গেলো, তোমার এসব কথা আমি শুনতে চাইনি। কী হয়েছে তাই বলো?
কবি একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে বললেন, বেগম আমার বই ঢাকা থেকে ছাপা হবে এটা ঠিক কিন' এর সঙ্গে একটা বড় টাকার অংক আছে।
মানে?
মানে টাকা দিতে হবে।
কতো?
সে অনেক টাকা।
বলবে তো কত টাকা?
বিশ হাজার।
অ। সেজন্য কবি নিরব?
কবি মাথা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন।
সেজন্য তোমার লেখালেখি বন্ধ। কবিরা এতো তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে পড়লে হয়, তুমিই বলো? তুমি যে কেমন কবি। তুমি মানুষকে আশার আলো দেখাবে, বিপদে পথ দেখাবে আর তুমি যদি এভাবে ভেঙ্গে পড়ো তবে তোমার ভক্তরা তোমার কাছে কী শিখবে, বলো?
কবি শুষ্ক হেসে বললেন, এতো টাকা আমি কোথায় পাবো?
সেজন্য ভেঙ্গে পড়ো না। তোমার জমির ধান আছে না।
তা আছে কিন্তু ধান বেচা টাকা দিয়ে বই ছাপালে সারা বছর খাবো কী?
তখন দেখা যাবে। আল্লাহ কোনো না কোনোভাবে চালিয়ে নিবেন।
প্রতি বছর অগ্রহায়ন-পৌষ মাসে মেয়ে জামাই আসে শীতের পিঠা খেতে। তাদের কী হবে?
হবে। আল্লাহ সব চালিয়ে নিবেন। তাছাড়া আমার কাছে কিছু টাকা আছে।
কবির মুখ উজ্জ্বল হলো, তাই নাকি? তুমি কোথায় টাকা পেলে?
হ্যাঁ। আমি কোথায় টাকা পেলাম সেটা কোনো বিষয় না। তুমি তো মুখে মুখে বলো অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর। আমার ওপর একটুও সাহস করতে পারলে না?
বেগম আসলে আমি কখনো চিন্তা করিনি তোমার কাছে কোনো টাকা থাকতে পারে।
তা করবে না তো। এখন তোমাকে একটা কথা বলি?
বলো?
তোমার বই ছাপানোর পুরো টাকাটা যদি আমি দিই?
তুমি?
হ্যাঁ আমি। অবাক হচ্ছো কেনো? আমার কাছে টাকা থাকতে পারে না?
হ্যাঁ তা পারে।
একটা টাকা দুটাকা করে জমাতে জমাতে আমার কিছু টাকা জমেছিল। তারপর সেই টাকা থেকে ছাগল, তারপর গরু কিনে ডাঙ্গাপাড়া একজনকে পালতে দিয়েছি। তোমার কবিতার বই ছাপানোর জন্য যদি টাকার প্রয়োজন হয় তবে আমি না হয় আমার সেই গরুটা বেচে দিবো।
কবি বেগমের মুখ উঁচু করে ধরলেন। বেগমের চোখ পানিতে চিক্‌চিক্‌ করছে। কবির চোখ থেকেও কয়েক ফোটা পানিয়ে গড়িয়ে পড়লো। কবি বেগমকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, বেগম, আমার বেগম।

কবির চোখে ঘুম নেই। সারারাত শুধু ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে কবিতা আবৃত্তি করেছেন। সারারাত তার কাব্যিক জীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন।
কৈশোরে কবি এক কিশোরীর প্রেমে পড়েছিলেন। কবি তাকে খুব ভালো বাসতেন। সেই কবির প্রথম প্রেম। প্রথম প্রেম হারানোর পর কবি কবিতা লেখা শুরু করেন। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে। সেই চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি নিয়ে কবি তার জন্য কবিতা লিখে যাচ্ছেন। সেই কিশোরী নারী হয়েছে, নানি হয়েছে। এতদিনে বুড়ি হয়েছে নাকি মারা গেছে সে খবর কবির জানা নেই তবু তার সব কবিতা যেনো সেই নারীর উদ্দেশ্যে।
কবির আজ চোখ খুলেছে। যে নারীর জন্য কবি সারাজীবন বেগমের পাশে শুয়ে সেই নারীর স্মৃতি বুকে লালন করেছেন, বেগমকে বঞ্চিত করেছেন সেই নারীর কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ বেগম! বেগম তার পাশে শুয়ে আছে, জলজ্যান্ত এক নারী। তার কোনো দোষ নেই। এতদিন কবি শুধু একটা স্মৃতির পেছনে, মরীচিকার পেছনে ঘুরেছেন।
বেগম এতোকিছু জানে না। সে জানে কবি তার স্বামী, তার সঙ্গেই তাকে সারাজীবন কাটাতে হবে। কবির সঙ্গেই তার সুখ-দু:খ ভাগাভাগি করে চলতে হবে।
না কবি আর সেই কৈশোরের নারীর কথা ভাববেন না। তিনি একবার ভেবেছিলেন তাঁর এই কবিতার বইটি সেই অনামিকার নামে উৎসর্গ করবেন। কিন' এখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই কবিতার বই কবি বেগমের নামে উৎসর্গ করবেন। উৎসর্গে লিখবেন: আমার প্রিয়তমা স্ত্রী, সেই মহীয়সী নারী যে সুখে-দু:খে কবির পাশে দাঁড়িয়েছে তার উদ্দেশ্যে আমার এই ক্ষুদ্র কর্ম উৎসর্গ করলাম।
চলবে...
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জগন্নাথবাসীগণ, আমার কথা শুনছেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

জগন্নাথবাসীগণ,
আপনাদের গরু কোরবানি যদি হযরত জাবের (রাঃ)-এর মতো
নবীজীর সম্মানে হয়ে থাকে, তাহলে মোবারকবাদ।
আর, শুধু প্রতিবাদ দেখাতে একটি অবলা পশুকে হত্যা করে থাকলে,
তার জন্যে খোদার দরবারে বিচার দিলাম।
...বাকিটুকু পড়ুন

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

লক্ষ্মীপুরের সুপারি থেকে উপকূলের অর্থনীতি: কৃষিজ সম্পদই পারে গ্রামীণ ভাগ্য বদলাতে

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮


বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে এমন কিছু নির্দিষ্ট ফল, ফসল বা মৎস্য সম্পদ প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়, যা শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটায় না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে জোরালো প্রভাব ফেলে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×