somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বাধীনতার ঘোষণায় শেখ মুজিব

২৬ শে মার্চ, ২০১১ সকাল ১০:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেশের ক্রান্তিকাল আজ- বড় দুর্দিন। আর এ দুর্যোগ থেকে বাদ যাচ্ছে না দেশের বড়-ছোট কেউই, এমনকি দেশের অবিংসবাদিত নেতাও। স্বাধীনতার চার দশক না পার হতেই স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁরই দলের হাতে আজ চরম অন্যায়ের শিকার। তাহলে সামনে কি আরো কঠিন কিছু অপেক্ষা করছে জাতির জন্য?

১৯৭১ সালে তৎকালীন আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ১৯৭০ এর সাধারন নির্বাচনে স্বাধীকারের পক্ষে গণরায় দেয় সাড়ে সাত কোটি জনতা, যা পরে স্বাধীনতার দাবীতে পরিণত হয়। যুদ্ধকালে আওয়ামীলীগের ও দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, আর সাধারন সম্পাদক ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ যিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী। এ দুই মহামানবের অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন-সংগ্রামের সাথে সামিল হয় দেশের আপমর জনতা। যার ফলশ্রুতিতে লক্ষপ্রাণ আর ত্যাগের বিনিময়ে একটি দেশের জন্ম। অথচ আজ স্বাধীনতার মহানায়কের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়েও প্রশ্নে উঠছে। এমনকি তার কর্মকান্ডের স্বীকৃতির জন্য সরকার আনছে আদালতে রায়।

পূর্বপাকিস্তানের নির্বাচিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাক বাহিনীর হাতে আটক হন ২৫ মে মার্চ কালোরাতে। এসময় ’অপারেশন সার্চেলাইটের’ আক্রমনে দিশাহারা জনতা দিগবিদিগ ছুটতে থাকে। তখন দরকার ছিল একটি আহবানের- যা সমগ্র জাতির জন্য হবে আশার আলো, আর প্রতিরোধের ডাক। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে সময়মত সে ডাক আসেনি। যদিও এর আগে মার্চের শুরুতে মাওলানা ভাসানী ও ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু দেশবাসীকে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় শেখ মুজিব তার এমএনএ ও এমপিএ ও দলের সিনিয়র নেতাদের আত্মগোপনের নির্দেশ দেন, যার ফলে পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধে কোন নির্বাচিত প্রতিনিধি হতাহত হতে হয়নি। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে সকল জনপ্রতিনিধিরা নিরাপদে দেশে প্রত্যাবর্তন করে। এ প্রসঙ্গে যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের ব্যক্তিগত সচিব মঈদুল হাসান তরফদার লিখেন, “ফেব্রুয়ারী বা সম্ভবতঃ তার আগে থেকেই যে সমর প্রস্তুতি শুরুন, তার অবশিষ্ট আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য মার্চের মাঝামাঝি থেকে ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার ধুম্রজাল বিস্তার করা হয়। এই আলোচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে যুগপৎ সন্দিহান ও আশাবাদী থাকায় আওয়ামীলীগ নেতৃত্বের পক্ষে আসন্ন সামরিক হামলার বিরুদ্ধে যথোপযোগী সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা গ্রহন করা সম্ভব হয় নি। সম্ভবতঃ একই কারণে ২৫/২৬ শে মার্চের মধ্যরাতে টিক্কার সমর অভিযান শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব স্বাধীনতার স্বপক্ষে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উঠতে পারেননি। শেষ মুহূর্তে আওয়ামীলীগ নেতা ও কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েও সহকর্মীদের সকল অনুরোধ উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেখ মুজিব রয়ে গেলেন নিজ বাসভবনে। সেখান থেকে গ্রেফতার হলেন হত্যাযজ্ঞের প্রহরে।” (সূত্রঃ মুলধারা ৭১)

ওই সময় পাক বাহিনীর আক্রমনের মুখে দিশাহারা জাতিকে আশার বাণী শোনানোর জন্য কোনো জনগনের নির্বাচিত কোনো নেতাকে পাওয়া গেলো না। কিন্তু এর মধ্যে ঘটে যায় দু’টি গুরুত্বপূর্ন ঘটনা। এর একটি হলো, পাকিস্তানের পূর্বাংশকে আলাদা করে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ হিসাবে ঘোষণা করা এবং পাক বাহিনীকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দেয়া। কোন পরিস্থিতিতে কিভাবে তা ঘটে সে সম্পর্কে আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ জাতিকে অবহিত করেন ১১ ই এপ্রিল ১৯৭১। ঐদিন জাতির উদ্দেশ্যে স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত এক ভাষণে তাজউদ্দিন আহমদ বলেন বলেন,“The brilliant success of our fighting forces and the daily additions to their strength in manpower and captured weapons has enabled the Government of the People’s Republic of Bangla Desh, first announced through major Zia Rahman, to set up a full-fledged operational base from which it is administering the liberated areas.” (Ref: Bangladesh Document vol-I, Indian Government, page 284).

দেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭২ সালে আওয়ামীলীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে তৎকালীন সাধারন সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ তার রিপোর্ট পেশ করেন। এ রিপোর্টে তিনি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলেনঃ “২৫শে মার্চ তারিখে অন্তর্বতীকালীন সংবিধান রচনার জন্য সরকার ও আমাদের মধ্যে চুড়ান্ত অধিবেশন অনুষ্ঠানের কথা ছিল। বিশ্বাসঘাতকতার এক অতুলনীয় ইতিহাস রচনা করে, কাউকে কিছু না জানিয়ে, আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা না করে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া রাতের বেলায় ঢাকা ত্যাগ করেন। তার পরেই পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী টিক্কা খানের ঘাতক সেনারা মধ্যরাতে ঢাকা শহরের বুকে হত্যার তান্ডবে মেতে ওঠে। তারই মধ্যে তারা গ্রেফতার করে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ২৬শে মার্চ রাতের ভাষনে ইয়াহিয়া খান আওয়ামীলীগকে বেআইনী ঘোষণা করেন। কুর্মীটোলার সেনানিবাসে, পীলখানার ইপিআর সদর দফতরে ও রাজারবাগে পুলিশ লাইনে সশস্ত্র বাঙালিরা অপূর্ব বীরত্বের সঙ্গে আমৃত্যু যুদ্ধ করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়, বস্তি অঞ্চলে এবং সাধারন মানুষের উপরে বর্বর পাকসেনারা যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তা প্রতিরোধ করার শক্তি ছিল না নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালিদের। আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে চট্টগ্রামে সংগ্রামেরত মেজর জিয়াউর রহমান বেতার মারফত বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষনা প্রচার করেন এবং বাংলাদেশে গণহত্যা রোধ করতে সারা পৃথিবীর সাহায্য কামনা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কথা জানতে পেরে বাংলার মানুষ এক দুর্জয় প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলল। সারা বাংলাদেশে সামরিক, আধাসামরিক ও বেসামরিক কর্মীরা অপূর্ব দড়্গতা, অপরিসীম সাহসিকতা ও অতুলনীয় ত্যাগের মনোভাব নিয়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে অগ্রসর হন। মাত্র তিন দিনে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ করতলগত করার যে পরিকল্পনা সামরিক সরকার করেছিল, প্রাণের বিনিময়ে বাংলার মানুষ তাকে সর্বাংশে ব্যর্থ করে দেয়।” (সূত্রঃ দৈনিক বাংলা, ৯ এপ্রিল ১৯৭২)।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে পশ্চিম বাংলার আনন্দ পাবলিশার্স (ভারত) কর্তৃক এপ্রিল ১৯৭২ সালে একটি পুস্তক প্রকাশ করে “বাংলা নামের দেশ”। এ পুস্তক সম্পর্কে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ ১৯৭২ তারিখে নিজ স্বাক্ষরিত এক বাণীতে বলেন, “বাংলা নামের দেশ’ গ্রন্থে সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, সংগ্রামের আগের ও পরের ইতিহাস, ধারাবাহিক রচনা, আলোকচিত্রমালায় চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে। বইটি নিঃসন্দেহে একটি গুরম্নত্বপূর্ন দলিল।” অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু নিজে সার্টিফিকেট দিয়ে গেছেন, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। এরূপ পুস্তক দ্বিতীয়টি আর আছে কি না সন্দেহ। এ বাণীতে বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন,

"১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ্চ আমি ঘোষণা করেছিলাম 'এই সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম' বহু নির্যাতন, বহু দুঃখভোগের পর আমাদের সংগ্রাম স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছে। সেই সংগ্রামের কাহিনী ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। পাকিস্তানী সমরনায়কদের নরমৃগয়ার শিকার হয়েছে ৩০ লক্ষ লোক, এক কোটি লোক আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। জঙ্গীচক্র আঘাতের পর আঘাত হেনেছে, কিন্তু আমার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনোবল তাতে ভেঙ্গে পড়েনি, আমরা স্বাধীনতা, আদায় করে নিয়েছি।" -শেখ মুজিবুর রহমান, ২৫/৩/৭২।

এ ঐতিহাসিক গ্রন্থের ৮১ পৃষ্ঠায় মুক্তিযুদ্ধের উষালগ্নের অবস্থা সম্পর্কে যে ইতিহাস লেখা রয়েছে তাও উল্লেখযোগ্য। “মুজিব গ্রেফতার। সর্বত্র সঙ্ঘশক্তি প্রায় তছনচ। এই শূন্য অবস্থাকে ভরাট করে তোলার জন্যে মেজর জিয়া রবিবার ২৮ মার্চ চট্টগ্রাম রেডিও থেকে অস্থায়ী সরকার ঘোষণা করলেন। তার প্রধান তিনি নিজেই। মনোবল বজায় রাখতে সব জেনেও বললেন, মুজিবের নির্দেশেই এই সরকার, তিনি যেমন বলছেন তেমন কাজ হচ্ছে।”

২৫ মার্চ রাতে আওয়ামীলীগের দলীয় ঘোষণা ছিল- ২৭ মার্চ হবে হরতাল, যা ২৬শে মার্চ দৈণিক ইত্তেফাকসহ সকল পত্রিকায় ছাপা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সহ-অধিনায়ক একে খোন্দকার, এসআর মির্জা ও মঈদুল হাসান (মুক্তিযুদ্ধকালে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও মূলধারা৭১ গ্রন্থের প্রণেতা) রচিত প্রথমা (প্রথম আলো) প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথপোকথন’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ২৫ মার্চ পর্যন্ত যুদ্ধের জন্য কারো কাছ থেকে কোনো নির্দেশ আসেনি। জহুর আহমেদ চৌধুরী নিজে তাজউদ্দিনকে বলেছিলেন, স্বাধীনতার ঘোষনার ব্যাপরে তাকে কিছুই বলা হয়নি। এমনকি স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য তাজউদ্দিন আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে একটি চিরকুট লিখে এবং টেপরেকর্ডার নিয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু তাতে শেখ মুজিব স্বাক্ষর করেননি এবং রেকর্ড করতে রাজী হননি। তাজউদ্দীন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যখন তাঁকে বললেন, “মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে, কেননা কালকে কী হবে, আমাদের সবাইকে যদি গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, তাহলে কেউ জানবে না কী তাদের করতে হবে।’ এই ঘোষণা কোনো না কোনো জায়গা থেকে কপি করে আমরা জানাব। যদি বেতার মারফত কিছু করা যায়, তাহলে সেটাই করা হবে। শেখ সাহেব তখন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানিরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারবে।’ এ কথার পিঠে তাজউদ্দীন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে রাত ৯টার পর পরই ৩২ নম্বর ছেড়ে চলে যান।” যদিও পরের দিন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে একটি স্বাধীনতার মেসেজ ছাত্র-জনতা স্বতস্ফুর্তভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু আনন্দ পাবলিশার্সকে নিজ স্বাক্ষরে দেয়া বাণীতে ২৫ শে মার্চ স্বাধীনতার কথা বলেননি, বলেছেন ৭ই মার্চের কথা। আর দেশ স্বাধীন হবার পরে ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিব নিজেই বলেছেন, আমি ৭ই মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেইনি, কারণ আমি পাকিস্তান ভাঙতে চাইনি। তারমানে এটা অত্যন্ত পরিস্কার, শেখ মুজিব আটকের আগে স্বাধীন দেশের ঘোষণা দিয়ে যেতে পারেন নি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু ছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী। প্রধানমন্ত্রী গান্ধী মুজিবের পক্ষে জনসমর্থন সৃষ্টির লক্ষ্যে যে পৃথিবীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন রাজধানী সফরকালে ৬ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় পরিস্কার বলেন, “The cry for independence arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He himself, so far as I know, has not asks for independence even now.“ (Ref: Bangladesh Documents Vol-II, Page-275, Ministry of External Affairs, Government of India-1972).

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের এ দুই মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমেদ এবং বড়বন্ধু ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্যের পরে এ নিয়ে আর কি কোনো বক্তব্য দেয়া চলে? নাকি বিশ্বাসযোগ্য? অথচ আজ এক শ্রেণীর স্ত‍াবকরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছেন, শেখ মুজিব স্বাধীতার ঘোষক! তিনি ঘোষণার কাজটি নিজে করতে চাননি এবং কখনো দাবীও করেননি। একই কথার প্রতিধ্বণি পাওয়া যায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ অলি আহাদের জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫ পুস্তকে, “যাহা হউক, শেষ পর্যন্ত বাংলা জাতীয় লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এম এম আনোয়ারের উদ্যোগে আগরতলা এসেম্বলি মেম্বার রেষ্ট হাউসে আমার ও আওয়ামী লীগ নেতা এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল মালেক উকিলের মধ্যে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর এক দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়া দেন যে, শেখ মুজিবর রহমান গ্রেফতারের পূর্বমুহূর্ত অবধি কোন নির্দেশ দান করেন নাই। এইদিকে মুজিব- ইয়াহিয়ার মার্চ-এর আলোচনার সূত্র ধরিয়া কনফেডারেশন প্রস্তাবের ভিত্তিতে সমঝোতার আলোচনা চলিতেছে। জনাব মালেক উকিল আমাকে ইহাও জানান যে, তিনি এই আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে আশাবাদী। প্রসংগত ইহাও উল্লেখ্য যে, ইতিমধ্যে আমি সর্বজনাব আবদুল মালেক উকিল, জহুর আহমদ চৌধুরী, আবদুল হান্নান চৌধুরী, আলী আজম, খালেদ মোহাম্মদ আলী, লুৎফুল হাই সাচ্চু প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতার সহিত বিভিন্ন সময়ে আলোচনাকালে নেতা শেখ মুজিবর রহমান ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বা লক্ষ্য সম্পর্কে কোন নির্দেশ দিয়াছিলেন কিনা, জানিতে চাহিয়াছিলাম। তাহারা সবাই স্পষ্ট ভাষায় ও নিঃসঙ্কোচে জবাব দিলেন যে, ২৫শে মার্চ পাক বাহিনীর আকস্মিক অতর্কিত হামলার ফলে কোন নির্দেশ দান কিংবা পরামর্শ দান নেতার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। অথচ স্বাধীনতা উত্তরকালে বানোয়াটভাবে বলা হয় যে, তিনি পূর্বাহ্নেই নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন।”(পৃষ্ঠা ৪২৪-৪২৫)।

যেসব আওয়ামীলীগের নেতারা আজ বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার মহানায়ক থেকে ঘোষকের পর্যায়ে নামিয়ে আনছেন এরাই ১৯৭৫ সালে মুজিবের চরম দুর্যোগের সময় তাদের পরিচালিত বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেননি। বরং মোশতাক সরকারের অধীনে কাজ করেছেন, পরবর্তীতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘকাল। এরূপ একজন হলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কেএম সফিউল্লাহ বীর উত্তম, মুক্তি বাহিনীর ৩নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান, যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ দলীয় নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৮৯ সালে তাঁর রচিত Bangladesh at war গ্রন্থে লিখেছিলেন, ু“All the troops then took an oath of allegiance to Bangladesh. The oath was administered by Zia at 1600 hrs on March 26. Thereafter, he distributed 350 soldiers of East Bengal Regiment and about 200 troops of East Pakistan Rifles to various task forces under command of an officer each. These task forces were meant for the city. The whole city of Chittagong was divided into various sectors and each sector was given to a task force. After having made these arrangements, Zia made his first announcement on the radio on March 26. In this announcement apart from saying that they were fighting against Pakistan army he also declared himself as the head of the state. This, of course, could have been the result of tension and confusion of the moment. As the battalion began to gather strength, in the afternoon of March 27, Zia made another announcement from the Shawadhin Bangla Betar Kendra established at Kalurghat. (Ref: Maj.Gen.K.M. Safiullah psc, Bir Uttam: Bangladesh at war, Academic Publisher, Dhaka 1989, page 44-45). তবে জনাব সফিউল্লাহ আওয়ামীলীগ শাসনামলের সংস্করনে কিছু লেখা বদলে ফেলেন- যা সুবিধাবাদী মনোবৃত্তিরই পরিচায়ক। আবার বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি মমতাজউদ্দিন তাদের এ সংক্রান্ত বহুলালোচিত রায়ে বলেন, জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মে মার্চ সৈন্যদের একত্রিত করিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন’··· ইত্যাদি বক্তব্যও সংবিধান পরিপন্থি বিধায় অবৈধ ঘোষণা করা হইল। এ অবৈধ (!) কাজটিই জনাব কেএম সফিউল্লাহ করেছেন ১৯৮৯ সালে যখন ক্ষমতায় ছিলেন বিএনপি নয়, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

‘চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগ্রামেরত মেজর জিয়াউর রহমান বেতার মারফত বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন’- বিষয়টি দলীয়ভাবে আওয়ামীলীগ স্বীকৃতি দিয়েছে ১৯৭১-৭২ সালে। কিন্তু এতকাল পরে কেন অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে জাতিকে বিভক্ত করা হচ্ছে, সেটাই সকলকে ভাবতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত দলিল এবং জনাব তাজউদ্দিনের পরিস্কার বক্তব্যও কি আজ দলীয় অপরাজনীতির কাছে মূল্যহীন? তারা বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিনের স্বীকৃত সত্যকে নাকচ করার জন্য হাইকোর্টের দারস্থ হয়েছেন। আর কোর্টে এর জন্য স্বাক্ষ্য হাজির করেছেন বিদেশী পত্রপত্রিকার কাটিংকে। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের ডকুমেন্টও হাজির করা হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ডিক্লাসিফাইড করা ওই ডকুমেন্টেও উলেস্নখ রয়েছে,“On March 27 the clandestine radio announced the formation of a revolutionary army and a provisional government under the leadership of a Major Zia Khan.” হায়রে দুর্ভাগ্য, যে দেশ আমাদের স্বাধীনতার পক্ষেই ছিল না- তার স্বাক্ষ্যও আজ বঙ্গবন্ধুর লিখিত স্বীকারোক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ!!! এদের শিক্ষার জন্য আজকের দুঃসময়ে কবি ঈশ্বরগুপ্তের ২ খানি চরণ স্মরণ করিয়ে দিতে হয়,

“কতরূপ স্নেহ করি দেশের কুকুর ধরি,

বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।”

আজ কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, জিয়াউর রহমান জীবদ্দশায় কখনও দাবী করেননি- তিনি স্বাধীনতার ঘোষক। একই রকমভাবে বলা যায়, বঙ্গবন্ধুও কখনই দাবী করেননি, তিনি এ কাজটি করেছেন। তাঁরা তো জাতির ঐতিহাসিক সন্তান। কোনো স্বীকৃতির জন্য উনারা এত কিছু করেন নি- এটা আমাদের বুঝতে হবে।

তবে পত্রিকা উল্টালে এখনও সংবাদ ছাপা দেখা যায়, ১৯৭২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী উদযাপন উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমীতে মুক্তিযুদ্ধের ১১ জন সেক্টর কমান্ডার বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেক্টর কমান্ডারদের উপস্থিতিতে যখন জিয়াউর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়, “২৫ মার্চ পাক বাহিনীর বর্বর হামলার পর চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনাকারী ও তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৃতিত্বের অধিকারী কর্নেল জিয়াউর রহমান”- তুমুল করতালির মধ্যে বক্তৃতা করতে ওঠেন। (সূত্রঃ দৈনিক বাংলা ২০/২/১৯৭১)। এসব রেকর্ড তো আর ধংস করা যাবে না, মুছে ফেলা যাবে না ইতিহাস থেকে।

আজ স্বাধীনতার ৪০ বছর পরে যখন আইন করে বা আদালতের রায় দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে অবিংসবাদিত নেতা থেকে বানোয়াটভাবে স্বাধীনতার ঘোষকের পর্যায়ে নামিয়ে আনার কাজটি করছে তাঁরই দল আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়। জিয়ার অবদান মুছে ফেলতে গিয়ে হাইকোর্টের মাধ্যমে মুজিবের জন্য একজন সৈণিকের কাজের অবদানকে হাইজ্যাক করা হয়েছে, এমন ভাবে- যেখানে বাদী ও বিবাদী দুপক্ষই সরকার এবং বেনিফিসিয়ারী। বঙ্গবন্ধুর ওপর এর চেয়ে আর অবিচার কি হতে পারে? তবে একথা নিদ্বিধায় বলা যায়, বঙ্গবন্ধুকে হাইকোর্টের রায় নিয়ে বা সংবিধানে লিখে জাতির পিতা বা স্বাধীনতার ঘোষক বানানো হবে- এ ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ত সময়ের চাহিদা মেটাবে, কিন্তু ইতিহাসের নয়।


"এখন সময়" ২৬ মার্চ ২০১০ প্রকাশিত।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশে কি ইনফ্লেশান শুরু হয়েছে?

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সকাল ১০:০৩



আমি দেশ থেকে দুরে আছি, দেশের কি অবস্হা, ইনফ্লেশান কি শুরু হয়েছে? কোভিড ও ইউক্রেন যুদ্ধ মিলে ইউরোপ, আমেরিকাকে ভয়ংকর ইনফ্লেশানের মাঝে ঠেলে দিয়েছে; বাংলাদেশে ইহা এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছদ্মবেশী রম্য!!!

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সকাল ১০:৩৪



আমার ফেসবুকে একটা নামমাত্র একাউন্ট আছে। সেখানে যাওয়া হয় না বলতে গেলে। তবে ইউটিউবে সময় পেলেই ঢু মারি, বিভিন্ন রকমের ভিডিও দেখি। ভিডিওগুলোর মন্তব্যে নজর বুলানো আমার একটা অভ্যাস। সেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঘোওওল....মাখন.....মাঠায়ায়ায়া.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ দুপুর ২:৪৬

ঘোওওল....মাখন.....মাঠায়ায়ায়া.....

আমার ছোট বেলায় আমাদের এলাকায় ২/৩ জন লোক বয়সে প্রায় বৃদ্ধ, ঘোল-মাখন বিক্রি করতেন ফেরি করে। তাঁদের পরনে থাকত ময়লা ধুতি মালকোঁচা দেওয়া কিম্বা ময়লা সাদা লুংগী পড়া। খালি পা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাঠের আলোচনায় ব্লগারদের বই!

লিখেছেন মনিরা সুলতানা, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ বিকাল ৫:২৬

আমার আত্মজরা আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাঝে যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে মাঝেমাঝে হতাশা প্রকাশ করে! সেটা হচ্ছে আমার খুব অল্পে তুষ্ট হয়ে যাওয়া ( আলাদা ভাবে উল্লেখ করেছে অবশ্যই তাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

'সহবাসের জন্য আবেদন'...

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ১০:১৯



রোকেয়া হলে আবাসিক ছাত্রী হিসেবে দীর্ঘ ৭বছর কেটেছে। হলের নানা গল্পের একটা আজ বলি। হলের প্রতিটি কক্ষে ৪টা বেড থাকলেও থাকতে হতো ৫জনকে। মানে রুমের সব থেকে জুনিয়র দুইজনকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×