somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন সফল প্রেমিকের গল্প

১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের মাধ্যমিক স্কুলের বাংলা শিক্ষক প্রায়ই বলতেন, ক্লাস নাইনে উঠলেই ছেলেরা রঙিন চশমা পরে দুনিয়া দেখা শুরু করে ।আমরা একদিন ক্লাস এইট পাস করে অদৃশ্য সেই চশমা চোখে পরে ক্লাস নাইনে উঠলাম।দুনিয়া কতখানি রঙিন দেখতে শুরু করেছিলাম তা বলতে পারব না, তবে বয়ঃসন্ধিকালীন হরমোনের প্রভাবে আমরা সবাই আমাদের ভিতরে হটাৎ জাগ্রত হটকারী এক সত্তা আবিষ্কার করি, কড়া রোদের ঝিম দুপুরে হটাৎ করেই কি এক অজানা বোধে তাড়িত হই, আশেপাশের জগৎটা ভীষন রকম অচেনা হয়ে ওঠে আমাদের কাছে, প্রচন্ড রকম নিঃসঙ্গ আর অবাঞ্চিত বলে মনে হয় নিজেদের, ক্লাসে শিক্ষক না থাকলে এখানে ওখানে জটলা করে ফিসফিসিয়ে নরনারীর সম্পর্কজনিত নিষিদ্ধ জ্ঞান একে অপরের সাথে বিনিময় করি,শার্টের একদম উপরের বোতামটা লাগানো খুব বেমানান বলে মনে হয়, টিফিন টাইমে বটগাছের আড়ালে একটা স্টার সিগারেট অনেকে মিলে ভাগাভাগি করে টেনে বেদম কাশি,সবখানে আমরা খুঁজতে চাই নিয়মভাঙ্গার আনন্দ।
প্রেম বিষয়ক আমাদের আবছা জ্ঞান খানিকটা পোক্ত হয় ক্লাস নাইনের শেষ দিকে এসে, যখন আমরা জানতে পারি আমাদের এক ক্লাস সিনিয়র সুমন ভাই এবং লোপা আপা পরস্পরকে ভালবাসে।তাদেরকে নাকি প্রায়ই একসাথে দেখা যায় ডাকবাংলোর নির্জন রাস্তায়, বড়দিঘীর পাড়ে কিংবা স্কুলের পেছনের ইউক্যালিপটাস বাগানটায়।ভালবাসাহীন জীবন তখন অপূর্ণ বলে মনে হতে থাকে আমাদের কাছে।
আমাদের হেডস্যার একদিন স্কুলের পেছনে নির্মানাধীন বিল্ডিঙে সুমন ভাই-লোপা আপাকে হাত ধরাধরি অবস্থায় দেখতে পান এবং তাদের পিতা-মাতাকে স্কুলে ডেকে আনেন। সুমন ভাইয়ের খুব রাগী বাবা স্কুলে সবার সামনেই সুমন ভাইকে বেধড়ক পিটান।এরপর তাদের আর একসাথে দেখা যায় না।আমরা ব্যাপারটা ভুলে যেতে থাকি।কিন্তু হটাৎ করেই আমরা আবার খবর পাই লোপা আপা তার মায়ের গয়না চুরি করে সুমন ভাইয়ের সাথে পালিয়ে গেছে দূরে কোথাও।আমাদের খুচরা আড্ডায় আবার ফিরে আসে সুমন ভাই-লোপা আপা, আমরা এও বলি তাদের ভালবাসা সফল হল।আমরা সকলেই তখন মনে মনে সুমন ভাইয়ের মত একজন সফল প্রেমের কারিগর হওয়ার স্পৃহা নিয়ে দিন কাটাই।
আমাদের স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত ছেলে মেয়েদের জন্য পৃথক ক্লাসরুমের ব্যবস্থা থাকলেও ক্লাস নাইনে ওঠার পর আমরা মেয়েদের সাথে একসাথে ক্লাস করতাম।ওই ঘটনার পর ব্ল্যাকবোর্ডের থেকে আমরা মেয়েদের সারিতে বেশি মনযোগ দিতে শুরু করি এবং আমাদের পরম আকঙ্খিত সেই মেয়েটিকে খুঁজতে থাকি যার সাথে প্রেমজ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সুমন ভাইয়ের মত একটি সফল ভালবাসার মাইলফলক গড়ার কথা।আমরা কেউ কেউ আমাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যত জীবনসঙ্গিনীকে খুঁজে পেলেও প্রেম নিবেদনের সাহস জুগিয়ে উঠতে পারি না।আকাঙ্খিত মেয়েটিকে প্রেম নিবেদন না করেই আমরা নিজেদের দেবদাসের মত ব্যর্থ প্রেমিক হিসেবে ভাবতে থাকি এবং উদাস মনমরা ভাব নিয়ে ঘোরাফেরা করি, ফলসরূপ ডিসির মোড়ে স্টার সিগারেটের বিক্রী বেড়ে যায় এবং বটতলা থেকে মূহুর্মুহ কাশির শব্দ শোনা যায়।
একসময় আমরা ক্লাস নাইনের পাট চুকিয়ে টেনে উঠি।এরই মাঝে একদিন আমরা জানতে পারি সহপাঠী আসাদ আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে মিলিকে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যখ্যাত হয়েছে।আমরা মহা উৎসাহে তাকে বটতলায় ডেকে আনি, কিন্তু সিগারেটের ধোঁয়া-কাশি তাকে শান্ত করতে পারে না।একদিন স্কুল ছুটির পর আসাদ ধারালো ভাঙ্গা কাঁচ দিয়ে তার বাঁ হাত কেটে মিলির নাম লেখে, আমরা তাকে হাসপাতালে নেই।
আস্তে আস্তে ম্যাট্রিক পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে আসে, আমাদের মধ্যকার সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটিও পড়ালেখা নিয়ে তুমুল ব্যস্ত হয়ে পড়ে।একমাত্র আসাদকে দেখা যায় পড়ালেখা নিয়ে একদম নির্বিকার।মিলির বাসার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করা তার একমাত্র দৈনন্দিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়।জানতে পারি ডাকবাংলোর রাস্তায় দ্বিতীয়বারের মত প্রেম নিবেদন করতে গিয়ে নাকি মিলির হাত চেপে ধরেছিল আসাদ আর মিলি কষে চড় বসিয়েছিল তার গালে।
আসাদ শেষপর্যন্ত ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয় নি ।আমরা কেউ ভাল, কেউ মোটামুটি রেজাল্ট নিয়ে শহরের কলেজে ভর্তি হই ।ধীরে ধীরে আমরা সুমন ভাই-লোপা আপার কথা ভুলে যাই, ভুলে যাই আসাদের কথাও।
এরপর অনেক বছর বাদে অফিস থেকে ফেরার পথে আসাদের সাথে আমার দেখা হয় মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে। মলিন ময়লা পোশাক রুক্ষ অবিন্যস্ত চুলের আসাদকে এতদিনপরে তবুও চিনতে পারি।আটতলার উপরে ভাড়া নেওয়া আমার চিলেকোঠায় নিয়ে আসি আসাদকে।আসাদ বরাবরই চুপচাপ ধরণের ছেলে ছিল, এখন সে যেন একদম নির্বাক হয়ে গেছে।ওর রুগ্ন হাতে বাড়তি কিছু সাদা শিরার মত মিলি নামটা এখনো স্পষ্ট বোঝা যায় ।
অনেক রাতে দুজন উঠে যাই পানির ট্যাঙ্কির উপরে, চিৎ হয়ে শুয়ে থাকি, না কেশে সিগারেট টানি।আমাকে অবাক করে দিয়ে আসাদ বলে, দোস্ত জানিস, মিলির ক্যান্সার। ওকে দেখতেই ক্লিনিকে গেছিলাম।
মিলি ক্যান্সারে আক্রান্ত, নাকি আসাদের সাথে মিলির এখনো যোগাযোগ আছে কোন সংবাদটায় বেশি অবাক হব বুঝতে পারি না।আসাদ যেন নিজের সাথেই কথা বলছে এমনভাবে বলে যায়, মিলিকে দেখলে এখন আর চিনতে পারবি না। কেমো দেওয়ার পর মাথার প্রায় সব চুল পড়ে গেছে , গালের হাড় উঁচু হয়ে বেরিয়ে পড়েছে।খুব কুৎসিত হয়েছে দেখতে বুঝলি। তা হোক, একবার যাকে ভালবেসেছি অসুন্দর বলে তো আর তাকে ছেড়ে যেতে পারি না, কি বলিস। ডাক্তার অবশ্য বলছে সুস্থ হয়ে যাবে , একটু সময় লাগবে এই যা।দোয়া করিস দোস্ত ও সুস্থ হলেই বিয়েটা সেরে ফেলব তুই আসবি কিন্তু।জানিস ওর একটা মেয়ে বেবির খুব শখ, এখনি নাম ঠিক করে রাখছে-নিহারীকা।আমার পছন্দ হয় নি নামটা, বেশ বড় নাম, ডাকতে অসুবিধা হবে।তুই বিয়েতে যখন যাবি ওকে একটু বুঝিয়ে বলিস তো।
কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে আসাদ আবার বলে, মিলি একদিন আমাকে চড় মেরেছিল, মনে আছে তোর ? সেই ঘটনা আমি কবেই ভুলে গেছি, কিন্তু মিলি এখনো ভুলতে পারেনি।কি যে অনুশোচনায় ভোগে সেই ঘটনার জন্য! আজ আমার হাত ধরে খুব কাঁদছিল মিলি।
আমি শুনে যাই চুপচাপ।
আরো অনেকদিন পর আসাদকে যখন দ্বিতীয়বারের মত ভুলে গেছি, হটাৎ একদিন মিলির সাথে আমার দেখা হয় নিউমার্কেটে। মিলি এখনো আগের মতই সুন্দর আছে। আমি এগিয়ে যাই,পরিচয় দেই, মিলি চিনতে পারে আমাকে।মিলির কাছ থেকে জানতে পারি ও ঢাকাতেই থাকে। ওর স্বামী ডাক্তার, ওর একটা মেয়ে আছে, নাম নিহারীকা।চলে আসার সময় মিলি বলে, তোমার সেই বন্ধুটার কোন খোঁজ জান? কিভাবে কিভাবে জানি আমার ঢাকার বাসার ঠিকানা জোগাড় করেছিল।বাসার সামনের চায়ের দোকানে বসে দিন-রাত সিগারেট খেত।অনেকদিন হল আর দেখিনা ওকে।দেখা হলে ওকে বুঝিয়ে বলবে তো, এসব ছেলেমানুষী যেন আর না করে।
অনেকদিন কেটে গেছে মিলি কিংবা আসাদ কারো সাথেই আমার আর দেখ হয় নি আর।মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফেরার পথে আমি চোখ মেলে রাখি রাস্তায় যদি আসাদের দেখা পাই আবার; নিহারীকার জন্য খেলনা নিয়ে ফিরছে কিংবা অসুন্দর মিলিকে নিয়ে হুডতোলা কোন রিক্সায়। আমাদের মত এত এত ব্যর্থ প্রেমিকের ভীড়ে একমাত্র সফল প্রেমিক হতে পেরছিল কেবল আসাদ, ওকে দেখার বড্ড সাধ হয় আমার।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:৫৭
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×