১.৩
সিগারেট ধরাবে কি না এই দ্বিধায় পড়ে যায় বিজু। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে একজোড়া বুড়োবুড়ি। ধূমপায়ীদের কপালে কোনো ছাপ মারা থাকে না, ওদেরও নেই। তবু তার ধারণা হয়, ওরা না-খাওয়া গোত্রের। ওদের সামনে সিগারেট ধরিয়ে ফেললে হয়তো মুখে কিছু বলবে না, কিন্তু কপাল কুঁচকে এমনভাবে তাকাবে যেন বিশাল কোনো অপরাধ করে ফেলেছে।
এরকম অভিজ্ঞতা দু'একবার হয়েছে। গায়ের রং তামাটে দেখলে আগেও কেউ কেউ ভুরু কুঁচকে তাকাতো, আজকাল তা সারাক্ষণ মনে রাখতে হচ্ছে _ তাদেরই এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়। একসময় হয়তো পৃথিবী গায়ের চামড়ার রং দিয়েই বিভক্ত হয়ে যাবে। সুতরাং আলাদা করে নজরে না পড়ে ভিড়ে মিশে থাকাই ভালো।
দ্বিধায় পড়ার পরের কারণ কিছু জটিল। তার অভিজ্ঞতা বলছে, সিগারেট না ধরালে আরো মিনিট পনেরো অপেক্ষা করতে হবে বাসের জন্যে। কিন্তু সে ঠিক জানে, যদি ধরিয়ে ফেলে, গোটা দুয়েক টান দেওয়ার পরেই বাসের দেখা পাওয়া যাবে। প্রায় আস্ত সিগারেট তখন ফেলে দিয়ে বাসে উঠে পড়তে হবে। মৌজ টুটে গেলে কারো ভালো লাগে! হাজার হোক, নেশার জিনিস তো বটে!
একবার নয়, দু'বার নয় - অজস্রবার এরকম ঘটেছে। একবার অফিসের কাজে বিজুকে সিঙ্গাপুর যেতে হয়েছিলো মাসখানেকের জন্যে। পৃথিবীর অন্য অনেক শহরের মতো নয় সিঙ্গাপুর, সেখানে যখন-তখন ট্যাক্সি পাওয়া কোনো শক্ত ব্যাপার নয়। অথচ তাড়ার সময় অনেকবার দেখেছে, সব খালি ট্যাক্সিগুলো যাচ্ছে উল্টোদিকে। বিরক্ত হয়ে রাস্তার ওপারে গিয়ে দেখেছে কিছুই বদলায়নি ট্যাক্সিগুলো তখনো যাচ্ছে উল্টোদিকে, সে নিজে দাঁড়িয়ে আছে ভুল জায়গায়!
এবারের এই বস্টন ট্রিপটাও ব্যতিক্রম কীসে! ডালাস ছাড়ার দিনে ফ্লাইট ছিলো দুপুর আড়াইটায়। দুপুরের খাওয়ার জন্যে সেটা বড্ড দেরি। সকালে জরুরি কয়েকটা কাজ সেরে নেওয়ার জন্যে অফিসে যেতে হয়েছিলো, তার ওপরে একটা অনির্ধারিত মিটিং-এও বসতে হয়। দেরি হয়ে যাচ্ছিলো বলে তাড়াহুড়ো করে এয়ারপোর্টে পৌঁছে একটা স্যান্ডউইচ আর বরফ-চা খেয়ে প্লেনে উঠেছিলো বিজু। অহো, বিমান আকাশে ওড়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ট্রে-ভর্তি খাবার এসে হাজির। স্যান্ডউইচ, চিপ্স্, ব্রাউনি আর একখানা আস্ত আপেল।
অতোসব খাওয়ার অবস্থা ছিলো না বিজুর, আকাশযাত্রার একঘেয়েমি কাটাতে শুধু চিপ্স্ খানিকটা চিবিয়েছিলো। কিছু পরে এককাপ কফিও পাওয়া যায়। আজ ফেরার ফ্লাইটও প্রায় একই সময়ে - বস্টনের সময় দুপুর পৌনে তিনটা। হাতের কাজকর্ম সারতে সারতে সাড়ে বারোটা। দুপুরের ট্র্যাফিক ঠেলে এয়ারপোর্টে পৌঁছতেও ঘণ্টাখানেক লেগে যাবে। বস্টনে বিজুর এই প্রথম। অচেনা শহরে একা ড্রাইভ করার সময় এক ধরনের উৎকণ্ঠা থাকে, সময়মতো পৌঁছতে পারবো তো! একবার পথ ভুল করে ফেললে ঠিক রাস্তায় ফিরতে অনেকখানি সময় খরচ হয়ে যেতে পারে। ভাড়া করা গাড়ি আবার জায়গামতো ছাড়তে হবে।
সাত রকমের ব্যস্ততা আর উদ্বেগে দুপুরে খাওয়ার কথা বিজুর মনেও পড়েনি। সব সেরে কোনোমতে প্লেনে উঠে নিজের সীটে বসতেই খিদে টের পায়। তিনদিন আগের অভিজ্ঞতা মনে করে নিশ্চিন্তও বোধ করে - খাবার প্রচুর দিয়েছিলো সেদিন। কিন্তু আশ্চর্য, কী করে যে ওরা বিজুকে চিনে ফেলে বার বার, কে জানে! আজকের ফ্লাইটে খাবার বলতে সাকুল্যে পাওয়া গেলো লিলিপুটদের দেশ থেকে আমদানি করা অতিশয় ছোটো এক প্যাকেট প্রেটজেল আর বাচ্চাদের খেলনা সাইজের প্লাস্টিকের গ্লাসে দু'চুমুক-সমান কোক।
খিদেয় এখন পেট জ্বলছে, ক্লান্তি আর অবসাদের কারণও সেখানেই। বাড়ি ফেরার তাড়া আছে, তবু এয়ারপোর্টে কিছু একটা খেয়ে নিলে হতো। ইচ্ছে করেনি। পেটে এখন কিছু পড়া দরকার মনে হলেও বাড়ি ফিরে খাবে ঠিক করেছিলো। রানু অফিস থেকে এতোক্ষণে ফিরেছে নিশ্চয়ই। কাজের চাপ পড়লে মাঝেমধ্যে অবশ্য দেরিও হয়। বিজুর আজ ফেরার কথা, রানুর মনে আছে কি না কে জানে!
হাতের কাছে খাবার নেই, সিগারেট আছে। বিজুকে অবাক করে দিয়ে বুড়োবুড়ি দু'জনেই সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে। জয় বাংলা! এবার আর আটকায় কে! দু'টান দেওয়ার পরে বাস আসে তো আসুক। ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট ঝুলিয়ে পকেট হাতড়ে মেজাজ খারাপ। লাইটার কোথায় গেলো? কোথায় পড়েছে, কে জানে! কলম, লাইটার এসব যারা সবসময় হারায়, বিজু সে দলের মানুষ নয়। ভ্রমণের সময় হাতব্যাগের ভেতর একটা-দুটো অতিরিক্ত লাইটার রাখে সে, খুঁজলে ঠিকই পাওয়া যাবে। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে ব্যাগের ভেতর এখন হাতড়াতে যাবে কে? বুড়োবুড়ির কাছে চাইতে হবে।
এখানে সিগারেটের আগুনও ধার করতে হয়। বলতে হবে, ক্যান আই বরো আ লাইট? যেন বাড়ি বয়ে গিয়ে কালই বিজু ধার করা আগুন ফেরত দিয়ে আসবে। এ দেশে আসার আগে শুনেছিলো, আমেরিকায় ভিখারি বলে কিছু নেই। কিন্তু সিগারেটের ভিখারি তো যত্রতত্র। জীর্ণ কাপড় পরা বয়স্ক সাদা চামড়ার মানুষ, কখনো তরতাজা কৃষ্ণকায় যুবক নির্দ্বিধায় এগিয়ে এসে বলে, ক্যান আই বরো আ স্মোক?
এক হিসেবে এরা আবার ভিক্ষুকও নয়, ভিখারিরা ধার চায় না, দান চায়। বিজুর তখন বলতে ইচ্ছে করে, বাবা, ধার তো নিচ্ছো, ফেরত দেবে কীভাবে? তোমার সঙ্গে এ জীবনে কখনো আর দেখা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখি না যে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

