২.১
আমাকে তুমি বিয়ে করলে কেন?
এই অদ্ভুত ও আচমকা প্রশ্নটি রানু করেছিলো বিয়ের রাতে। পরিচয়ের সময় থেকেই এইসব চমকের সঙ্গে বিজুর পরিচয় হয়েছিলো। এই হাসিখুশি, আবার পরের মুহূর্তে তুচ্ছ কিছু নিয়ে রেগে ওঠা - রানু এরকমই বরাবর। তবু টানা চার বছর প্রেম করার পর বিয়ের রাতে একা হলে বিজুকে বলা রানুর প্রথম বাক্য ওই অদ্ভুত প্রশ্নটি। শুনে মনে হবে, যেন ওর অমতে জোর করে বিয়েটা ঘটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিয়ের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন বা সংশয় দু'জনের কারোই ছিলো না। ঝোঁকের মাথায় নয়, ভেবেচিন্তে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। তাহলে? তবু তখন এটাকে ছেলেমানুষি বা পাগলামি বলে বিশ্বাস করে নিতে সক্ষম হয়েছিলো বিজু। সময় যেতে মনে হতে শুরু করেছিলো, কী যেন একটা ইঙ্গিত ছিলো সেখানে।
আজও সে ভেবে পায় না, কথাটা রানু কেন বলেছিলো। রানু নিজেও কি জানে, নাকি বলার ঝোঁকেই বলা? অনেকবার জিজ্ঞেস করবে ভেবেছে, কথাটা মুখে আনতে পারেনি বিজু। নাটকে-সিনেমায় দেখে বিয়ের রাতে দু'জনের কথাবার্তা কীরকম হতে পারে তার একটা ধারণা তৈরি হয়েছিলো, তার ধার দিয়েও যায় না এই প্রশ্ন।
নাটক-সিনেমা বাস্তব নয়, তাহলে বাস্তব কীরকম? নিজেও তো আগে কোনোদিন বিয়ে করেনি, করলে আগেরটার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যেতো। বন্ধুদের কেউ তখনো বিয়ে করেনি, করলেও তাদের কাছে কি সে জিজ্ঞেস করতে পারতো? সম্ভবত না, সংকোচ হতো। রানুর সেই প্রশ্ন আজও বিজুর কাছে অদ্ভুত ও বিস্ময়কর, অস্বস্তিকরভাবে অমিমাংসিত।
রানু আজকাল আর বিজুকে বিস্মিত করে না। যে কোনো অপ্রত্যাশিতকে অতি স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে শিখে গেছে সে। অনেক বছরের অভ্যাস! তবু পুরোপুরি অভ্যস্ত হওয়া কি যায়? এখনো রানুর আচমকা আক্রমণ বিজুকে আহত করে, বিষণ্ন করে।
বুয়েটে একই বছরে ভর্তি হওয়া - রানুর আর্কিটেকচার, বিজু ইলেকট্রিক্যালে। তবু রানুকে চোখে না পড়ার কোনো কারণ ছিলো না। সুন্দরী বলে ততোদিনে তার নাম রাষ্ট্র হয়ে গেছে। অনেকের নজরে পড়েছিলো সে।
সুন্দরী মেয়েরা লেখাপড়ায় ভালো হয় না বলে একটা তত্ত্ব বাজারে চালু আছে। সেই হিসেব মনে হয় খুব বেঠিক ছিলো না, বুয়েটে সুন্দরী চোখে পড়তো ক্কচিৎ-কদাচিৎ। রানু ব্যতিক্রম ছিলো, বলতেই হবে।
লাইব্রেরির সামনে একদিন বিজু একা পেয়ে যায় রানুকে। শরৎকালের সকালে রোদের তেমন তেজ নেই। পরিষ্কার নীল আকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি। রানুর পরনের শাড়ির রঙও আকাশী নীল। আকাশ দেখেই পরেছে নাকি? বিজু লাইব্রেরিতে ঢুকতে যাওয়ার আগে বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলো, শেষ করে ভেতরে ঢুকবে। রানুকে দেখে এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ায়, অনেকটা পথ আগলে ধরার মতো। রানু থমকে দাঁড়িয়েছে।
বিজু বলে, তোমার সঙ্গে খুব জরুরি দরকার আমার।
রানুর চোখে জিজ্ঞাসা। কিছু কৌতূহল। আর অবাক হওয়া। একে কি সে আগে কোথাও দেখেছে? কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকাও যায় না। চোখের জিজ্ঞাসা মুখে তুলে আনে সে, কথা! আমার সঙ্গে!
হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে।
ছেলেটি কি ওদের সিনিয়র নাকি? না হলে সরাসরি তুমি করে বলার কথা নয়। রানু নিশ্চিত হতে পারে না। বলে, কী কথা?
সরাসরি রানুর চোখে চোখ ফেলে বিজু বলে, তোমাকে আমার চাই।
অপ্রস্তুত রানুর মুখে এসে যায়, মানে?
বিজু ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে দু'হাত নেড়ে বলে, মানে হলো, তোমার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক আগে থেকেই ঠিক হয়ে আছে। তোমার হয়তো জানা নেই, তাতে তোমার কোনো দোষ না-ও থাকতে পারে, সব খবর সবাই সময়মেতো পায় না। কিন্তু তোমাকে আমার যেমন চাই, আমাকেও তোমার চাই।
রানু সামলে নিয়েছে। এর নাম কি প্রেম নিবেদন? এখানে নিবেদন কোথায়? প্রেমই বা কোথায়? এ তো উদ্ভট দাবি। কোনো বইয়ের পাতায়, সিনেমায় এরকম দেখেনি সে। কারো কাছে শোনেওনি। হাসিই পেয়ে যাচ্ছিলো, কোনোমতে সামলে গম্ভীর মুখে বলে, আমার কাছে তেমন কোনো খবর আসেনি।
বলেইছি তো, সবাই সবকিছু সময়মতো জানতে পারে না। পরে জানবে।
না জেনে আমার কোনো ক্ষতিও হয়নি।
কিন্তু তোমাকে না হলে যে আমার চলবে না!
স্পষ্ট করে রানু বলে, আমার চলবে।
তুমি ঠিক জানো না।
এবার স্পষ্টতই বিরক্ত রানু, চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছে। বলে, আশ্চর্য, আপনাকে আমি তো চিনিও না!
বিজু সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো করে বলে, আপনি নয়, তুমি।
আপনার মতো অচেনা কাউকে তুমি করে বলতে শিখিনি আমি।
কঠিন কিছু নয়, শিখে নিলেই হয়।
না শিখেও আমি বেশ আছি।
থাক, ওসব ফয়সালা না হয় পরে হবে। আমরা এখন ক্যান্টিনে যাচ্ছি চা খেতে। এসো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



