২.২
রানু অনায়াসে না বলতে পারতো। সেটাই স্বাভাবিক ছিলো। বলে না, কৌতুক বোধ করছিলো সে। ছেলেটিকে দু'একবার দেখেছে বলে মনে করতে পারে, কিন্তু আলাদা করে মনে রাখার কোনো দরকার হয়নি। উপলক্ষও নয়। এখন হলো।
চা নিয়ে একটা খালি টেবিলে সামনাসামনি বসে বিজু বলে, তোমার কথা শোনার আগে নিজের পরিচয়টা দিয়ে নিই, কী বলো?
জবাব দেওয়ার কিছু নেই, চায়ের কাপ তুলে নিয়ে বিজুর মুখের দিকে তাকায় রানু। তার কৌতূহল হচ্ছে খুব। কৌতূহলে নাকি বিড়াল মারা পড়ে। নাঃ, নিজের ওপর বিশ্বাস আছে তার, সে মারা পড়বে না।
আমার নাম বিজু। পুরো নাম জানাতে পারি, আপাতত তার দরকার দেখছি না। পড়ি ইলেকট্রিক্যালে, তুমি আর্কিটেকচারে, আমি জানি। একই ব্যাচে। ইস্কাটনে পৈত্রিক বাড়িতে থাকি, দুই ভাইয়ের মধ্যে আমি ছোটো। বড়ো ভাই আমার পাঁচ বছরের বড়ো, বুয়েট থেকেই পাশ করেছে, এখন বউ আর এক ছেলে নিয়ে থাকে সুইডেনে। বাবা সরকারি চাকরিতে, মা সংসারে। আর আমার নিজস্ব কথা, কবিতা পড়তে আর সব ধরনের গান শুনতে ভালোবাসি। ক্লাস করার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বেশি ভালো লাগে। কলেজে পড়ার সময় একটা মেয়ের সঙ্গে কিছুটা বন্ধুত্বমতো হয়েছিলো, প্রেমট্রেম পর্যন্ত যাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আর কোনো অনাত্মীয় মেয়ের সঙ্গে মেলমেশা করিনি। এই তো আমি, এবার তোমার কথা বলো।
রানু কী বলবে, তার অবাক হওয়া যে ফুরায় না! কেউ এভাবে আলাপ-পরিচয় করতে পারে! এইমাত্র যার নাম জানা হলো, সেই বিজু নামের ছেলেটিকে তার ভালো বা মন্দ কিছুই লাগছে না। তার নিজের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত বা যে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা সঙ্গত কিনা - বোঝা যাচ্ছে না। বলে, আমার কোনো কথা নেই।
তার মানে তোমার নামধামও কিছু নেই!
তা তো নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু সেগুলো আপনাকে জানানোর দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না।
কেন দরকার নেই?
দরকার নেই, ব্যস।
তার মানে এই যে আমরা এক টেবিলে চা নিয়ে বসেছি, এরও কোনো মানে নেই?
রানু বলে, নেই মনে করলেই নেই। আপনি চা খেতে বললেন, এসেছি। এই তো।
বিজু হাসে, যে কেউ ডাকলেই বুঝি তুমি চা খেতে যাও?
এবার রানুর রেগে যাওয়া উচিত। রীতিমতো অপমানজনক! সম্পূর্ণ অপরিচিত একজনের সঙ্গে চায়ের টেবিলে বসা রানুর জন্যেও একেবারেই নতুন। কেন যে এলো তা সে নিজেও জানে না, যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে এসেছে।
রানু কোলের ওপর রাখা ব্যাগটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। বলে, স্যরি। ভুল করে ফেলেছি।
বিজু কিছু বলার আগেই রানু টেবিল ছেড়ে চলে গেছে।
সেই প্রথমদিনের ঘটনার পরে সম্পর্কটা যে বিয়ে পর্যন্ত যেতে পেরেছিলো, তা-ও বিজুর পাগলপারা একগুঁয়েমির কারণে।
রানু টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়ার পর নিজেকে তার নিতানত ক্যাবলাকান্ত মনে হচ্ছিলো প্রথমে। জানে, আশেপাশের টেবিল থেকে কেউ কেউ ওকে লক্ষ্য করছে। সামলে নেয় কয়েক মুহূর্তে। চায়ের কাপে দু'চুমুক দিয়ে একটা মেয়ের এভাবে টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়াটা যেন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার - এরকম মুখ করে ধীরেসুস্থে চায়ে চুমুক দিতে থাকে।
চা শেষ করে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরায়। '...ইউ গট লাকি বেব, হোয়েন আই ফাউন্ড ইউ...'।
মনে পড়ে, মেয়েটা তার নাম বলেনি। না বলুক, ওর নাম সে জানে।
পরদিন, তার পরদিন এবং তার পরদিন ক্রমাগত রানুর ডিপার্টমেন্টে ক্রমাগত হানা দিতে থাকে বিজু।
রানু চোখমুখ কুঁচকে বলে, নির্লজ্জের মতো আসেন কেন?
বিজুর জবাব, বলেছি তো, তোমাকে আমার চাই। কতো কোটিবার আমাকে ফেরাবে তুমি? একসময় তোমাকে হ্যাঁ বলতেই হবে।
এরকম বিশ্বাস থাকা ভালো। রানু গলায় ঠাট্টা স্পষ্ট।
রানু, পুরুষমানুষের কাজ হলো লক্ষ্যস্থির করে তাকে জিতে নেওয়া। তার জন্যে বিশ্বাস তো কিছু লাগেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

