৩.১
সিগারেট নিয়ে মেয়ের আপত্তি মায়ের থেকে আরেক কাঠি ওপরে। ফুলটুস জন্মানোর কয়েক মাস আগে থেকে ঘরে সিগারেট খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলো বিজু। বাইরে গিয়ে খায়। শীতের সময় যখন বরফে চারদিক সাদা হয়ে আছে, তীব্র ঠাণ্ডা হাওয়ায় হাড় পর্যন্ত জমে যাওয়ার অবস্থা, তখনো বাইরে বারান্দায় যেতে হয়।
তবু রেহাই নেই, টের পেলেই ফুলটুস তেড়ে আসবে। ছুঁড়ে না ফেলা পর্যন্ত একটানা বলতে থাকবে, বাবা, তোমাকে না বলেছি আর সিগারেট খাবে না। ফেলে দাও। কী হলো, শুনছো না! বলেছি না, সিগারেট খেলে তোমার অসুখ হবে, অসুখ হলে তুমি মরে যাবে। এক্ষুণি ফেলে দাও বলছি...
স্কুলে শেখা। গতবছর স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে সে, তখন থেকে শুরু। হাট্টিমা টিম টিম শেখার বয়সেই আজকাল বাচ্চাদের ধূমপানের, ড্রাগের জ্ঞানে জ্ঞানী করে তোলা হয়। কী হতো আরো দু'চার বছর পরে এসব তাদের মাথায় ঢোকালে? শিশুদেরও আর এজ অব ইনোসেন্স বলে কিছু থাকবে না!
সিগারেট নিয়ে, ড্রাগস নিয়ে কতো কথা, অথচ প্রসেস করা গোমাংসের নামে যে বিষ দিয়ে বারগার তৈরি হয়, তা-ও আবার স্কুলে লাঞ্চের সময় দুধের বাচ্চাদের জন্যে অনায়াসে হালাল। এই নিয়ে কেউ কথাটিও বলে না। টিভিতে সিগারেটের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, কমবয়সী ছেলেমেয়েরা নাকি তাতে সিগারেটে আসক্ত হতে উৎসাহী হয়। বীয়ার-হুইস্কির বিজ্ঞাপন অবশ্য অনায়াসে অবাধে চলতে পারে, ওগুলো টিভিতে দেখানোর সময় সম্ভবত ছেলেমেয়েরা চোখ বন্ধ রাখে অথবা ওসবে বোধহয় আসক্ত হওয়ারই কিছু নেই!
হাইওয়েতে এখন তেমন ভিড় নেই। সূর্যের শেষ আলোও নিভে আসছে। হেডলাইট জ্বালিয়ে নব টিপে রেডিও চালু করে বিজু। ট্রাফিক রিপোর্ট হচ্ছে একটা স্টেশনে, শহরের কোন রাস্তায় ট্রাফিক কেমন, কোথাও অ্যাক্সিডেন্ট বা রাস্তা মেরামতের কারণে ট্রাফিক জ্যাম আছে কিনা সেসবের বিবরণ। দু'একটা রেডিও স্টেশনের নিজস্ব হেলিকপ্টার আছে, সেগুলো সকাল-বিকেল রাশ আওয়ারে সারা শহরের ওপর চক্কর দিয়ে রিপোর্ট করে, সেগুলো খানিকটা বিশ্বাসযোগ্য। বাদবাকি স্টেশনগুলোগুলোর ট্রাফিক রিপোর্ট শোনার দরকার নেই, বেশিরভাগ সময়ই পুরনো খবর।
অনেক সময় এমনও হয়েছে, যে রাস্তায় বা ইন্টারসেকশন বন্ধ বলা হচ্ছে, বিজু হয়তো ঠিক সেখানেই তখন। কোথায় রাস্তা বন্ধ, কোথায় কী! গাড়িগুলো দিব্যি চলছে যেমন চলার কথা। বিজু অন্য স্টেশন ধরে, সেখানে গাড়ির বিজ্ঞাপনের নামে তারস্বরে চিৎকার। পরেরটাতেও বিজ্ঞাপন, ভায়াগ্রার বিকল্প ওষুধের খবর। চার নম্বরে এসে পছন্দমতো একটা গান পেয়ে যায়, 'ইউ ডোন্ট নো হাউ ইট ফীলস্ টু বি মি...'।
হাইওয়ে থেকে বেরিয়ে একটা দোকানে থামতে হয়, ফুলটুসের জন্যে বড়ো বারবি পুতুল কেনে বিজু। কে জানতো বাবা হলে মেয়ের পুতুলের হিসেবও রাখতে হবে! এমন একটা পুতুল চাই যেটা ওর সংগ্রহে নেই। কতো রকমের যে বারবি তার কোনো হিসেব করা সম্ভব নয় - জিপসি বারবি, সাঁতারু বারবি, প্রিন্সেস বারবি আর ফ্যাশন বারবির পাশাপাশি তাদের ব্যবহার্য খেলনা গাড়ি, ফোন, রেডিও। একই বারবিকে অনেক সাজে সাজানোর জন্যে হরেক রকমের পোশাক, নেইল পলিশ, কানের দুল সব প্যাকেট করে ঝুলিয়ে রাখা।
ফুলটুসের এখন সেই বয়স যে বয়সে এ দেশে বড়ো হওয়া মেয়েরা বারবি-জ্বরে পড়বেই, তৈরি হবে তার হরেক রকমের বারবির সংগ্রহ। কার সংগ্রহে কতোগুলো বারবি, এই নিয়ে তাদের প্রতিযোগিতা। এখনকার দাদী-নানীরা যে বয়সে বারবি খেলেছে, এখন নাতনিরাও সেই বয়সে বারবির জন্যে একই রকম পাগল হয়।
ফুলটুসের বায়না ছিলো, বস্টন থেকে বড়ো একটা বারবি আনতে হবে। ফরমায়েশটা শাস্তিমূলক। বস্টন যাওয়ার দিন সকালে যথারীতি ওকে স্কুলে নামাতে গিয়েছিলো বিজু। স্কুলে যাওয়ার পথে মেয়ে আর সব দিনের মতো একটানা বকবক করে যাচ্ছিলো - সূয্যিমামার আলোটা কেন চোখে ঝাল দিয়ে দিচ্ছে, দুষ্টু সূয্যিমামাকে খুব করে বকে দিও তো, বাবা!
স্কুলে যাওয়ার পথের পাশে একটা ঝাঁকড়ামতো গাছকে সে নিজস্ব গাছ বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, সেই গাছের পাতাগুলো এই সময়ে কেন ঝরে যাচ্ছে জাতীয় প্রশ্নও চলছিলো। এইসব নিয়মিত বকবকের এক ফাঁকে বিজু বলেছিলো, মামণি, আজ দুপুরে বাবা বস্টনে যাচ্ছে। তুই স্কুল থেকে ফেরার আগেই চলে যাবো, ফিরবো তিনদিন পরে। তোর জন্যে কী আনতে হবে?
মেয়ে খুব উদারভাবে তখন বলেছিলো, কিচ্ছু আনতে হবে না।
বস্টনে এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে পৌঁছে বাসায় ফোন করে জানা গেলো কাহিনী ভিন্ন মোড় নিয়েছে। কেঁদেকেটে মেয়ে বাড়ি মাথায় তুলেছে - বাবা কেন তাকে বলে যায়নি! ফোনে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শেষমেষ আসামী বাবার শাস্তি ধার্য হয়েছিলো, অনেক বড়ো একটা বারবি কিনে নিয়ে যেতে হবে। ফিরে এসে কিনে দিলে চলবে না, বস্টন থেকেই আনা চাই।
কাল সন্ধ্যায় হাতে কিছু সময় ছিলো। একটা খেলনার দোকানে ঢুকেওছিলো বিজু, না কিনে বেরিয়ে এসেছিলো। অতো বড়ো পুতুল ব্যাগে ঢুকবে না। হাতে করে বয়ে আনারও কোনো মানে হয় না। ঠিক করে রেখেছিলো, বাসায় ফেরার পথে কিনে নেবে। মেয়ে না জানলেই হলো।
দোকান থেকে বেরিয়ে আচমকা মনে পড়ে, সেলফোনটা এখনো অন করা হয়নি। প্লেনে উঠে সুইচ অফ করে রেখেছিলো। অন করে দেখে, মেসেজ আছে।
একটা মেসেজ, ফুলটুসের - বাবা, তুমি এখনো আসছো না!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



