৩.২
বাসায় পৌঁছতে সন্ধ্যে পেরিয়ে যায়। রানু রান্নাঘরে ছিলো। দরজা খোলার শব্দে উঁকি দিতে বিজুর সঙ্গে চোখাচোখি। মুখের কোনো রেখা একটুও বদলায় না। চোখ নামিয়ে সিঙ্কে রাখা কাপ-গ্লাসগুলো ধোয়ায় ব্যস্ত হয়ে যায় রানু। বিজু বস্টন যাওয়ার দিন দুয়েক আগে থেকে রানুর সঙ্গে হিসেব করা কথা চলছে। যতোটুকু না হলে নয়, তাই আর কি। বস্টন থেকে প্রতিদিন একবার করে ফোন করেছে বিজু। ঠিক রানুর সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ থেকে নয়, ফুলটুসের জন্যে।
খানিকটা দায়িত্ব পালনও বটে। না করলে এই নিয়েও কথা শুনতে হবে, আমাদের খবরে তোমার কোনো দরকার আছে নাকি!
একটা বয়সে ফুলটুসের ফোনে কথা বলার নেশা হয়েছিলো খুব, ফোন বাজলে ওকেই ধরতে হবে। কোত্থেকে ছুটে এসে সবার আগে ফোন তুলে ফেলতো। আজকাল আর ফোনের দিকে তাকিয়েও দেখে না। সুতরাং বিজু ফোন করলে রানু ধরেছে। বিজুর তোমরা কেমন আছো-র উত্তরে রানু সংক্ষেপে বলেছে, ভালোই তো।
সব ঠিকঠাক তো?
হ্যাঁ।
ফুলটুসের কথা বলো, শুনি।
এই যে ধরো, দিচ্ছি। বলে রানু ফোন তুলে দিয়েছে ফুলটুসের হাতে।
বিজু আড়চোখে দেখে, খুব সুন্দর দেখাচ্ছে আজ রানুকে। এমনিতে ঘরে সাজগোজ দূরে থাক, মাঝেমধ্যে এমন একেকটা কাপড় পরে থাকে যে, দেশে হলে যে কেউ তাকে কাজের বুয়া ভেবে বসবে। অফিসে যাওয়ার সময় সে সামান্য সাজগোজ করে, কোনো বিয়েবাড়ি-জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও যত্ন করেই সাজে। কিন্তু বাসায় সে যে কেন এমন জবরজং হয়ে থাকে, কে জানে!
অনুযোগ করলে দু'চারদিনের জন্যে ব্যাপারটা একটু পাল্টায়। তারপর আবার যে কে সেই। মনে হতে পারে, বিজুর কাছে নিজেকে অনাকর্ষণীয় করে তোলাই তার জীবনের সাধনা! অথচ সামান্য একটু যত্নে রানু যে কী সুন্দর হয়ে উঠতে পারে, ও জানেই না।
বিজু কিছুটা অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, আজ একটুখানি সেজেছে রানু। ঘরে সাধারণত সে শাড়ি পরে না, খুবই নাকি ঝামেলা। বিজু তাকে শাড়িপরা দেখতে পছন্দ করে বলেই হয়তো। আজ কলাপাতা রঙের একটা শাড়ি পরা, শাড়িটা আগে দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। নতুন কিনেছে নাকি? লম্বা চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। ঠোঁটে কি একটু লিপস্টিক দিয়েছে? ঠিক বোঝা যায় না এতোদূর থেকে। কী মনে করে? বিজু ফিরবে তাই?
রানুকে কিছু বলার উৎসাহ হয় না বিজুর। তিনদিন পরে ঘরে ফিরে ছোট্টো একটা কোনো সম্ভাষণ কিংবা সামান্য এক টুকরো হাসিও কি সে পেতে পারে না? একটা জলজ্যান্ত মানুষ ঘরে ঢুকলো, রানুর চাউনিতে, মুখের রেখায় তার স্বীকৃতিটুকুও নেই। সেই মানুষটি যদি তার মেয়ের বাবা হয়, তার জীবনের সঙ্গে পরতে পরতে জড়িত হয়ে থাকে - সে তো সামান্য মনোযোগ দাবি করতেই পারে। পারে না কি? বাতিল করা না হোক, অন্তত পুরনো প্রেমিক হিসেবেও? সেই ভালোবাসা নিষ্পত্র বৃক্ষের মতো শূন্য হয়ে তো যায়নি। হলে এক ছাদের নিচে বাস করা সম্ভব হতো না।
বিজু টের পায়, ভালোবাসা আজও আছে, বোতলবন্দী দৈত্যের মতো। জাদুর প্রদীপে হাত বোলানোর কায়দাটাই শুধু ভুল হয়ে যাচ্ছে।
শুধু রানুর দোষ হবে কেন? বিজু নিজেও কিছু বলেনি, একটা শব্দও নয়। বিজু জানে, ভব্যতার খাতিরেও কিছু একটা বলা উচিত। রাগ-অভিমান করে কথা বন্ধ করে রাখা শিশুদের মানায়, সে বয়স কবে গত হয়েছে! কয়েক ফুট দূরত্বে দু'জন কেউ কাউকে যেন চেনে না। আগন্তুকের মতো।
ঠিক তাও বোধহয় নয়। সম্পূর্ণ অপরিচিতরাও পরস্পরকে হাই বলে সম্ভাষণ জানায় এ দেশে। কেমন আছো বলাও সাধারণ রেওয়াজ। দিনের শেষে ঘরে ফেরার পর স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে নিয়ম করে জিজ্ঞেস করে, দিনটা কেমন গেলো তোমার?
হয়তো শুধুই কথার কথা, তবু সেটুকুও দরকারি বলে বিজুর মনে হয়। কথাবার্তা শুরু করার একটা ভূমিকা তো বটে। কিন্তু প্রাচ্যদেশীয় বংশোদ্ভূত পুরুষরা সংস্কার বা অভ্যাসবশে হয়তো সেটাকে বাহুল্য জ্ঞান করে। বিজু জানে, এই অহমের কোনো মানে নেই। তবু জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার, অভ্যাস যায় কী করে? সেটা ত্যাগ করা খুব সহজ নয়।
এ দেশীয় সহকর্মীদের দেখেছে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই তার প্রিয়জনের সঙ্গে ফোনে কথা শেষ করে আই লাভ ইউ বলে। ভারি লোকদেখানো আর ফাঁপা লাগে বিজুর। দিনে পঞ্চাশবার ভালোবাসি বললেই ভালোবাসার বৃক্ষ মহীরূহ হয়ে ওঠে না। হলে এদের সমাজে বিবাহ-বিচ্ছেদের ঘটনা ডালভাতের মতো সহজ ও অনায়াস হতো না।
এ দেশে লেখাপড়া করতে আসা বিজুর চেনা বাঙালি ছেলে এক শ্বেতাঙ্গিনীকে বিয়ে করেছে। ভালোবাসাবাসির কোনো ব্যাপার ছিলো না। ছেলেটি স্পষ্ট বলেছিলো একদিন, বোঝলেন বিজু ভাই, বিয়াখান করছিই পাত্তির লাইগা। খালি গ্রীনকার্ড হইয়া লউক, লাত্থি মাইরা ওই সাদা চামড়ারে খেদাইয়া দিমু। তারপর দ্যাশে গিয়া রিয়াল বিয়া কইরা লইয়া আসুম, দেইখেন। অহন তো কিছু করার নাই, খালি উঠতে-বইতে আই লাভ ইউ মুখস্থ কইয়া যাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

