৩.৩
বসার ঘরে টিভিতে কার্টুন নেটওয়ার্কে ফ্লিন্টস্টোনস। কার্টুন দেখতে বসলে মেয়ের আর কিছু খেয়াল থাকে না। তখন তার চোখের পলক পড়ে না, ছবিগুলো সব গিলে খেতে থাকে। ঠিক পাশেই বোমা ফাটলেও বুঝি চোখ ফেরাবে না। আজ অবশ্য অন্যরকম। দরজা খোলার শব্দে মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছে। বাবা আসবে বলে বোধহয় কান খাড়া করে রেখেছিলো। ছুটে এসে কোলে উঠে গলা জড়িয়ে ধরে, তুমি আমাকে বলে যাওনি কেন, বাবা? ভুলে গিয়েছিলে?
ব্যাগ দুটো কোনোমতে নামিয়ে রেখে বিজু সোফায় বসতে বসতে বলে, হঁ্যা রে, ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না।
ঠিক তো?
ঠিক।
আমার বারবি কোথায়? এনেছো?
বিজু মাথা চুলকে বলে, এই যাঃ, এক্কেবারে ভুলে গেছি যে!
প্রায় চিৎকার করে ওঠে ফুলটুস। কেঁদেই ফেলবে নাকি!
তুমি একটা পচা বাবা। খুব পচা বাবা।
বিজু হাসতে হাসতে বলে, চল, গাড়িতে বারবিটা এসে বসে আছে কি না দেখি।
মেয়েকে কোলে করে গাড়িতে ফিরে যায় বিজু। সামনের প্যাসেঞ্জার সীটে বসিয়ে রাখা বারবির গোলাপি রঙের বাঙ্টা দেখতে পেয়েছে ফুলটুস। কোল থেকে সড়াৎ করে নেমে গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। বারবি কোলে করে ফিরে আসে, বাবা, তুমি ভুল কথা বলেছো কেন?
বিজুর ধারণা শিশুদের মুখে মিথ্যে শব্দটা ভারি বেমানান আর রূঢ়। প্রথম থেকেই ফুলটুসকে শেখানো হয়নি সেটা। তার বদলে ফুলটুস শিখেছে ভুল কথা।
কী ভুল কথা বলেছি রে, বুড়ি?
এমনিতে বুড়ি বললে ফুলটুস খুব রেগে যায়। বলে, আমি বুড়ি না, আমার সাদা চুল নেই।
আজ বারবির ঘোরে আছে সে এখন, হয়তো খেয়ালও করেনি। বলে, বারবিকে গাড়িতে রেখে এসে আমাকে বলেছো, তুমি ভুলে গিয়েছো! একা একা বারবি ভয় পাবে না!
মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে ফিরে আসে বিজু। বাক্সবন্দী বারবিকে উদ্ধার করে মেয়ের হাতে দিতে হয়। সোফায় বসে বলে, বারবি তোর পছন্দ হয়েছে রে?
ঘাড় নেড়ে ফুলটুস জানায়, হ্যাঁ, হয়েছে।
এই ক'দিন বাবাকে মিস করেছিলি?
হ্যাঁ।
কতোটা?
হাত দুটো দু'দিকে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে ফুলটুস টের পায়, বগলের তলা থেকে বারবি পড়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি করে পুতুলটাকে আবার জড়িয়ে ধরে বলে, অনেক।
বারবিকে কোলে ফেলে ফুলটুস বাবার সঙ্গে বকবক করে যায়। জানো, স্কুলে টিচার আমাকে স্মার্ট গার্ল বলেছে। মা কাল গোসল করাতে গিয়ে আমাকে ব্যথা দিয়েছে, আমি অনেক কান্না করেছি। মাথায় শ্যাম্পু করার সময় চোখে ঝাল দিয়ে দিয়েছে।
বিজু বলে, জানিস, আমি যখন তোর মতো ছোটো ছিলাম, মা-র সঙ্গে গোসল করতে গেলেই আমি কাঁদতাম।
ফুলটুস দুলে দুলে হি হি করে এক চোট হেসে নিয়ে বলে, ও মা, তুমি কান্না করতে, বাবা?
কেন রে, বাবা বুঝি কাঁদতে পারে না!
বড়োরা আবার কাঁদে নাকি!
হ্যাঁ, বড়োরাও কাঁদে। খুব কাঁদে। না কাঁদলে বড়োদের চোখের পানিগুলো কোথায় যাবে বল তো? আর আমি তো তখন তোর মতো ছোট্টো। আমার মা সাবান ঘষে দেওয়ার সময় এতো জোরে জোরে ডলে দিতো, মনে হতো গায়ের চামড়াই বুঝি তুলে ফেলবে। সে যে কী দুঃখের, তুই বুঝবি না।
এতোক্ষণে রানুর গলা শোনা যায়। রান্নাঘর থেকেই মেয়েকে বলে, ফুলটুস, এখন বাবাকে জামাকাপড় বদলাতে দাও। আর তোমাকে এখন বিছানায় যেতে হবে, কাল স্কুল আছে না!
বাবার সঙ্গে আর একটুখানি কথা আছে, মা!
তোমার বকবক কী আর থামবে?
ফুলটুস ঘাড় ঘুরিয়ে মা-কে পাঁচ আঙুল তুলে দেখায়, আর ঠিক পাঁচ মিনিট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

