৩.৪
বিজু যেখানে বসেছে, সেখান থেকে রানুর মুখের আধখানা দেখা যায়। বাকি অর্ধেক আড়াল হয়ে আছে রান্নাঘর আর বসার ঘরের মাঝখানের আধখানা দেয়ালের আড়ালে। ফুলটুসের কথার জবাব না দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে সে।
রানু ফুলটুসকে তুমি করে বলে। বিজু কিছুতেই পারে না, তুই করে না বললে মনে হয় নিজের মেয়ে নয়, আর কারো সঙ্গে কথা বলছে সে। রানু আগে ভুরু কুঁচকে বলতো, মেয়ের সঙ্গে ওরকম অশিক্ষিতদের মতো তুই-তোকারি করে কথা বলো কেন?
বিজু অবাক হয়ে গিয়েছিলো, তুই-তোকারি শুধু অশিক্ষিত চাষাভূষারা করে! আশ্চর্য তো! কথাটা তার কাছে এমনই নতুন, অবান্তর ও আচমকা যে পাল্টা কোনোকিছু চট করে মুখে আসে না। আশ্চর্য, খু্বই আশ্চর্য হয়েছিলো সে।
বুয়েটে দু'জনের ডিপার্টমেন্ট আলাদা ছিলো, তখনও কোনো বিষয়ে অমিলের খবর পাওয়া যায়নি! পছন্দ-অপছন্দের মিল হলেই সম্পর্কটা প্রেম-ভালোবাসার দিকে গড়ায়। এখন পেছন ফিরে কি একটু কাটাছেঁড়া করে দেখা যায়? সত্যি সত্যি মিল ছিলো, নাকি মিল আছে বলে বিশ্বাস করতে তখন ইচ্ছে করতো? ঘোর লাগার ব্যাপার? নাকি বয়সে দু'জনেই বদলে গেছে, আগের মতো আর নেই!
এমনও তো হতে পারে, প্রেম করার দিনগুলোতে যা কিছু জরুরি আর পছন্দের মনে হয়, সংসারে ঢুকলে সেসব ফালতু, অপ্রয়োজনীয়। অন্যভাবে দেখলে, প্রেম করার দিনগুলোতে ফুল-পাখি-চাঁদ খুব জরুরি, বিয়ের পরে যেমন বাজারের ফর্দ।
এটাও ঠিক, দু'চার ঘণ্টা একসঙ্গে থাকার সময় খুব সতর্কভাবে নিজেদের দুর্বলতা, খারাপ অভ্যাসগুলো আড়াল করে রাখা খুবই সম্ভব। এমনকী প্রেমিকা সঙ্গে থাকলে প্রেমিকপুরুষ হিসি পেলেও চেপে রাখে। দাম্পত্য সেই আড়ালগুলোকে ছিঁড়ে প্রকাশ্য করে দেয়।
পরে আরেকদিন কথা উঠতে বিজু বলেছিলো, দেখো রানু, আমার মেয়েকে তুই করে না বললে আমার তৃপ্তি হবে না। তোমার পছন্দ না হলেও কিছু করার নেই, আমি ওটা পাল্টাতে পারবো না।
রানু ফোঁস করে উঠেছিলো, আমি বললে পারবে কেন?
বিজুর বলতে ইচ্ছে হয়েছিলো, কেউ বললেই পারবো না।
বিজু দেখেছে, কথা কাটাকাটির সময় রানু খুবই প্রতিভাময়ী হয়ে উঠতে পারে। সেই সময়ে তার স্মরণশক্তি তাকে চমৎকার সাহায্য করে থাকে। বাসার ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় চার-পাঁচটা বাজারের ফর্দ তৈরি করে সে, অথচ বাজারে গিয়ে দেখা যায় একটাও সঙ্গে আসেনি। গাড়ির চাবি কোথায় রেখেছে মনে করতে পারে না কখনোই। কিন্তু এইসব কথা কাটাকাটির সময় পাঁচ-সাত বছর আগের কোনো একটা তুচ্ছ কথা ঠিক সময়মতো তুলে এনে তাকে বিষাক্ত ছোবলের মতো ব্যবহার করতে পারে। তার প্রতিভার সবচেয়ে বড়ো নিদর্শন দেখায় সে যখন সম্পূর্ণ মনগড়া একটা কথাকে সত্যিকারের ঘটনা বলে সাজিয়ে বিবৃত করে।
বিজু কথা কাটাকাটির সময় উপযুক্ত পাল্টা কথাটা প্রায়ই মনে আনতে পারে না, কথা খুঁজে না পেয়ে তোতলাতে থাকে। শেষ হলেও তার রেশ থাকে অনেকক্ষণ, বিজু সেই কথাগুলো মনে মনে রিপ্লে-র মতো করে বাজায়। ঠিক সেই সময় রানুর কোনো কথার উপযুক্ত জবাব মনে এসে যায় - কোনো ঘটনা। মনে পড়ে অনেক আগে বলা রানুর কোনো একটা কথা যা এই তর্কের সময় কাজে লাগানো যেতো। ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আবার হয়তো নতুন করে শুরু করা যায়। বিজুর ইচ্ছে হয় না। সে বুঝে গেছে, দাম্পত্য বিতর্কযুদ্ধে ক্রমাগত পরাজয় তার একমাত্র ও অনিবার্য নিয়তি।
বিজু জানে বলেই সে ফাঁদ এড়িয়ে খুব ঠাণ্ডা গলায় বলেছিলো, একটা কথা কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছো। তোমার বাবাও মাঝে মাঝে তোমাকে তুই করে বলেন, আমি নিজে শুনেছি।
এর জবাব যা আসে, তা-ও বিজুর কাছে অভিনব। রানু বলে, এখানে আমার বাবার কথা আসছে কেন?
কী আর করা যাবে, সাদা চোখে স্পষ্ট জিনিসটাও যে দেখতে অস্বীকার করে, তার সঙ্গে কথা বাড়ানোর মানে হয় না। তার মনে হয়েছিলো, তুলনাটা খুবই সমান্তরাল এবং প্রাসঙ্গিক।
এরপরে অবশ্য রানু এই প্রসঙ্গ আর কোনোদিন তোলেনি। তবে সময় বয়ে যায়নি, দু'বছর পরে আবার হয়তো এটাকেই ঠিক ঘাড়ে ধরে ফিরিয়ে আনবে রানু। লড়াইয়ে কোন অস্ত্র কখন কাজে লেগে যায়, কে বলবে! বিজু কোথাও একবার পড়েছিলো, পুরুষমানুষের একজন বউ থাকে কটু কথা বলার জন্যে, যাতে জীবনটা একেবারে পানসে আর একঘেয়ে না হয়ে যায়!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

