somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ১১

০৫ ই মে, ২০০৭ রাত ১২:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


৩.৪

বিজু যেখানে বসেছে, সেখান থেকে রানুর মুখের আধখানা দেখা যায়। বাকি অর্ধেক আড়াল হয়ে আছে রান্নাঘর আর বসার ঘরের মাঝখানের আধখানা দেয়ালের আড়ালে। ফুলটুসের কথার জবাব না দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে সে।

রানু ফুলটুসকে তুমি করে বলে। বিজু কিছুতেই পারে না, তুই করে না বললে মনে হয় নিজের মেয়ে নয়, আর কারো সঙ্গে কথা বলছে সে। রানু আগে ভুরু কুঁচকে বলতো, মেয়ের সঙ্গে ওরকম অশিক্ষিতদের মতো তুই-তোকারি করে কথা বলো কেন?

বিজু অবাক হয়ে গিয়েছিলো, তুই-তোকারি শুধু অশিক্ষিত চাষাভূষারা করে! আশ্চর্য তো! কথাটা তার কাছে এমনই নতুন, অবান্তর ও আচমকা যে পাল্টা কোনোকিছু চট করে মুখে আসে না। আশ্চর্য, খু্বই আশ্চর্য হয়েছিলো সে।

বুয়েটে দু'জনের ডিপার্টমেন্ট আলাদা ছিলো, তখনও কোনো বিষয়ে অমিলের খবর পাওয়া যায়নি! পছন্দ-অপছন্দের মিল হলেই সম্পর্কটা প্রেম-ভালোবাসার দিকে গড়ায়। এখন পেছন ফিরে কি একটু কাটাছেঁড়া করে দেখা যায়? সত্যি সত্যি মিল ছিলো, নাকি মিল আছে বলে বিশ্বাস করতে তখন ইচ্ছে করতো? ঘোর লাগার ব্যাপার? নাকি বয়সে দু'জনেই বদলে গেছে, আগের মতো আর নেই!

এমনও তো হতে পারে, প্রেম করার দিনগুলোতে যা কিছু জরুরি আর পছন্দের মনে হয়, সংসারে ঢুকলে সেসব ফালতু, অপ্রয়োজনীয়। অন্যভাবে দেখলে, প্রেম করার দিনগুলোতে ফুল-পাখি-চাঁদ খুব জরুরি, বিয়ের পরে যেমন বাজারের ফর্দ।

এটাও ঠিক, দু'চার ঘণ্টা একসঙ্গে থাকার সময় খুব সতর্কভাবে নিজেদের দুর্বলতা, খারাপ অভ্যাসগুলো আড়াল করে রাখা খুবই সম্ভব। এমনকী প্রেমিকা সঙ্গে থাকলে প্রেমিকপুরুষ হিসি পেলেও চেপে রাখে। দাম্পত্য সেই আড়ালগুলোকে ছিঁড়ে প্রকাশ্য করে দেয়।

পরে আরেকদিন কথা উঠতে বিজু বলেছিলো, দেখো রানু, আমার মেয়েকে তুই করে না বললে আমার তৃপ্তি হবে না। তোমার পছন্দ না হলেও কিছু করার নেই, আমি ওটা পাল্টাতে পারবো না।

রানু ফোঁস করে উঠেছিলো, আমি বললে পারবে কেন?

বিজুর বলতে ইচ্ছে হয়েছিলো, কেউ বললেই পারবো না।

বিজু দেখেছে, কথা কাটাকাটির সময় রানু খুবই প্রতিভাময়ী হয়ে উঠতে পারে। সেই সময়ে তার স্মরণশক্তি তাকে চমৎকার সাহায্য করে থাকে। বাসার ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় চার-পাঁচটা বাজারের ফর্দ তৈরি করে সে, অথচ বাজারে গিয়ে দেখা যায় একটাও সঙ্গে আসেনি। গাড়ির চাবি কোথায় রেখেছে মনে করতে পারে না কখনোই। কিন্তু এইসব কথা কাটাকাটির সময় পাঁচ-সাত বছর আগের কোনো একটা তুচ্ছ কথা ঠিক সময়মতো তুলে এনে তাকে বিষাক্ত ছোবলের মতো ব্যবহার করতে পারে। তার প্রতিভার সবচেয়ে বড়ো নিদর্শন দেখায় সে যখন সম্পূর্ণ মনগড়া একটা কথাকে সত্যিকারের ঘটনা বলে সাজিয়ে বিবৃত করে।

বিজু কথা কাটাকাটির সময় উপযুক্ত পাল্টা কথাটা প্রায়ই মনে আনতে পারে না, কথা খুঁজে না পেয়ে তোতলাতে থাকে। শেষ হলেও তার রেশ থাকে অনেকক্ষণ, বিজু সেই কথাগুলো মনে মনে রিপ্লে-র মতো করে বাজায়। ঠিক সেই সময় রানুর কোনো কথার উপযুক্ত জবাব মনে এসে যায় - কোনো ঘটনা। মনে পড়ে অনেক আগে বলা রানুর কোনো একটা কথা যা এই তর্কের সময় কাজে লাগানো যেতো। ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আবার হয়তো নতুন করে শুরু করা যায়। বিজুর ইচ্ছে হয় না। সে বুঝে গেছে, দাম্পত্য বিতর্কযুদ্ধে ক্রমাগত পরাজয় তার একমাত্র ও অনিবার্য নিয়তি।

বিজু জানে বলেই সে ফাঁদ এড়িয়ে খুব ঠাণ্ডা গলায় বলেছিলো, একটা কথা কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছো। তোমার বাবাও মাঝে মাঝে তোমাকে তুই করে বলেন, আমি নিজে শুনেছি।

এর জবাব যা আসে, তা-ও বিজুর কাছে অভিনব। রানু বলে, এখানে আমার বাবার কথা আসছে কেন?

কী আর করা যাবে, সাদা চোখে স্পষ্ট জিনিসটাও যে দেখতে অস্বীকার করে, তার সঙ্গে কথা বাড়ানোর মানে হয় না। তার মনে হয়েছিলো, তুলনাটা খুবই সমান্তরাল এবং প্রাসঙ্গিক।

এরপরে অবশ্য রানু এই প্রসঙ্গ আর কোনোদিন তোলেনি। তবে সময় বয়ে যায়নি, দু'বছর পরে আবার হয়তো এটাকেই ঠিক ঘাড়ে ধরে ফিরিয়ে আনবে রানু। লড়াইয়ে কোন অস্ত্র কখন কাজে লেগে যায়, কে বলবে! বিজু কোথাও একবার পড়েছিলো, পুরুষমানুষের একজন বউ থাকে কটু কথা বলার জন্যে, যাতে জীবনটা একেবারে পানসে আর একঘেয়ে না হয়ে যায়!
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমরা কি তাহলে গুহা যুগে ফেরত যাচ্ছি?

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫০



বিশ্ব যেখানে উন্নতির প্রতিযোগিতা করছে, কীভাবে জীবনমান আরও উন্নত এবং সহজ করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে আর আমরা ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটছি। চারদিকে ভয়াবহ অবস্থা!! চাঁদাবাজি, খুন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:২৯

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?
============================================
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে যে নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

।। রাশিয়ার মতো বাংলাদেশে হামলা করুক ভারত।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১২


আমি আজ পর্যন্ত আম্লিগে কোন ভালোমানুষ খুঁজে পাইনি। আম্লিগ মানেই ইয়ের বাচ্চা। আম্লিগ মননে মগজে ধর্ষক, লুন্ঠনকারী, দেশদ্রোহী ও পাচারকারী। এদের মাঝে কোন কালেই কোন ভালোমানুষ ছিলোনা বর্তমানেও নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস

লিখেছেন কলাবাগান১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৭


ছবিতে যাকে দেখছেন উনার নাম প্রফেসর ইমানাকা। উনাকে সারা বিশ্ব মনে রাখবে উনার যুগান্তরী আবিস্কার এর জন্য। তার আবিস্কার যেভাবে সবার জীবনকে বদলে দিবে এবং দিচ্ছে সেটা জানানোর জন্যই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Movie-Obsession(2026)

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বিশিদবার রাতে খুব বাজে আর একটা ছিনেমা দেখলাম। ভাই-রে ভাই কি বলবো, ঐ রাতে আর ঘুমাতে পারি নাই। মানে দেখার পর থেকে এখনো গা শিরশির করছে। চোখ বন্ধ করলেও চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×