১৫.২
ঘুমাতে যাওয়া উচিত এখন। ঘুম যে পাচ্ছে, তা নয়, তবু যেতে হবে বিছানায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঝকঝকে নতুন একটি দিন শুরু হলেও পুরনো আর চেনা সব দুরন্ত ব্যস্ততা নিয়ে দৌড় শুরু হবে আবার। এ দেশে যাকে ইঁদুর-দৌড় বলা হয়, তার এক অনিচ্ছুক দৌড়বিদ ইঁদুর সে। তবু দৌড়ে নেমে পিছিয়ে যেতে, থেমে যেতে যে মন চায় না! অন্তর্গত প্রবৃত্তি ছুটিয়ে নেয়, যতোক্ষণ দৌড়ের মধ্যে আছি, সামনের দিকে এগোতে হয়।
গোসল সেরে ঘুমপোশাক পরে নিয়েছিলো বিজু। শোয়ার ঘরে দরজার কাছে দাঁড়ায়। এ ঘর আর ফুলটুসের ঘরের মাঝখানের প্যাসেজে আলো সারারাত জ্বালানো থাকে। কোনো কোনো রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে মেয়ে নিজের বিছানা ছেড়ে ধুপধাপ করে উঠে এসে বাবা-মার মাঝখানে ঢুকে পড়ে। প্যাসেজের আলো জ্বলে ওরই জন্যে, যাতে ঘুমচোখে অন্ধকারে হোঁচট না খায়।
ঘুম পাতলা হলেও ঘুমিয়ে গেলে রানুর আর কিছু হুঁশ থাকে না, বিচিত্র সব ভঙ্গিতে বিছানাময় ঘুরে ঘুরে ঘুমায় সে। প্যাসেজের আলোয় বিজু বিছানায় রানুর অবস্থান দেখে। কতোবার দেখেছে, বিজুর জন্যে নির্দিষ্ট জায়গার দখল নিয়ে ঘুমাচ্ছে রানু। আজ এখনো তাকে নিজের জায়গায় আছে দেখে হঠাৎ সন্দেহ হয়, আদৌ কি ঘুমিয়েছে সে?
খুব সাবধানে নিঃশব্দে বিছানায় ওঠে, বালিশে মাথা এলিয়ে দেয়। পা দুটো বিছানায় তুলে সটান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। রানুর কোনো নড়াচড়া নেই, গভীর নিস্তব্ধতার ভেতরে তার নিয়মিত নিশ্বাসের মৃদু শব্দ পাওয়া যায়। সন্ধ্যারাতের সেই সুগন্ধ স্মৃতির মতো উঠে আসছে তার শরীর থেকে। ডানদিকে কাৎ হয়ে ঘুমাচ্ছে রানু, মুখ বিজুর দিকে ফেরানো।
এরকম অন্ধকারে বিজুর ঘুমাতে ভালো লাগে না। রানু ঘুমানোর সময় আলো একেবারে সহ্য করতে পারে না, তার চোখে লাগে। কতোরকম বিপরীতমুখী পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার যে আছে! সব দাম্পত্যে থাকে? গ্রীষ্মকালে বাইরে যখন ঠা ঠা রোদে সব পুড়ে যাচ্ছে, তাপ ফারেনহাইট একশোতে, রানু তখন এয়ারকন্ডিশনারের অটোসেটিং দিয়ে রাখে পঁচাশিতে। পঁচাত্তর হলে বিজুর ঠিক হয়, তাহলে আবার রানুর শীত করে। শীতকালেও একই অবস্থা, হীটার পঁচাত্তরে দিলেও রানুর গরম লাগে।
একবার ঠাট্টা করে বলেছিলো বিজু, জানো এইসব কারণে বিয়ের আগে লিভ-টুগেদারের ব্যাপারটা খুব জরুরি। চব্বিশ ঘণ্টা একসঙ্গে না থাকলে ঠিকমতো বোঝাই যায় না, তোমার সঙ্গে আমার পোষাবে কি না। টেম্পারেচার টলারেন্স লেভেলটাও খুব জরুরি সংসার করার জন্যে। একসঙ্গে বাস করলে অংকটা অনেক সোজা হয়ে যায়।
বিশুদ্ধ ঠাট্টাই ছিলো। সে নিজে একটি জুটির কথা জানে যারা চোদ্দো বছর একসঙ্গে বসবাসের পর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। অথচ বিয়ের ছ'মাসের মধ্যে দু'জনে কোর্টে গিয়েছিলো বিচ্ছেদের আবেদন হাতে নিয়ে। রানুর কাছে তা ঠাট্টা মনে হয়নি।
গম্ভীর মুখে বলেছিলো, আমাকে বিয়ে করে এতো দুঃখ তোমার!
বন্ধ দরজার নিচ দিয়ে প্যাসেজের আলো ঘরে কিছুটা ঢুকে পড়ে। চোখে অন্ধকার সয়ে আসতে বেশি সময় লাগে না। বিজু মুখ ফিরিয়ে দেখে রানুকে। তার গায়ের ওপর থেকে কম্বল নেমে গেছে হাঁটুর কাছে। গোসলে ঢোকার আগে কম্বলটা পায়ের কাছে গোটানো দেখেছিলো। রানু পরে টেনে নিয়েছে। পরনের শাড়ি সামান্য আলগা হয়ে একপাশে বুকের ওপর থেকে সরে গেছে। ভারি লোভ জাগানো বুক রানুর। তার নিচে থেকে কোমর পর্যন্ত উন্মুক্ত, প্রায় মেদহীন। শাড়ি নাভির সামান্য নিচে।
দেসারুতে বিজুর আগ্রহে ওভাবে শাড়ি পরতে শুরু করেছিলো রানু। 'কালিম্পং-এর কুয়াশায় চাঁদের মতো মনীষার নাভি...' এক কবির লেখা গদ্য থেকে উদ্ধৃত করে রানুকে শুনিয়েছিলো বিজু। সে কতোদিন আগের কথা। অনেকদিন?
বিজু টের পায় তার শরীর জেগে উঠছে। শরীর কোনো বিষাদ, অভিমানের ধার ধারে না। গত কয়েকদিনের মন কষাকষির মেঘ সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত রানু নিজেই দিচ্ছিলো সন্ধ্যায়, আবার আচমকা সে নিজেকে প্রত্যাহারও করে নিয়েছে। তারপরেও বিজু কেমন করে হাত বাড়ায়?
হয় না, পারা যায় না। তার অহম, অভিমান তাকে বাধা দেয়। রানুকে স্পর্শ করার, তাকে জাগানোর অবিবেচক, লোভী আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সে নিজেকে সংহত করার চেষ্টা করে।
ঠিক তখনই তার মনে হয়, রানু জেগে আছে, ঘুমায়নি। ঘুমের ভেতরে সে অনেক নড়াচড়া করে, এমন পরিপাটি শোয়া রানুর নয়। কিঞ্চিৎ অগোছালো মনে হলেও তা সাজানো বলে সন্দেহ হয়। বিছানায় পাশাপাশি শোয়া দু’জন মানুষ স্পর্শ করার দূরত্বে। এই দূরত্বও যে কতো দুরূহভাবে অনতিক্রম্য!
বিজু চোখ বন্ধ করে। রানু পারলে সে-ও নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



