somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

উপন্যাস : পৌরুষ - কিস্তি ৩৫

১৬ ই মে, ২০০৭ রাত ৯:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৭.১

ওই লোকটা কে? আগে কোনোদিন দেখেনি। বসে থাকলেও বোঝা যায় লোকটা যথেষ্ট দীর্ঘকায়, তার মায়াবী চোখ দুটি প্রথমে চোখে পড়ে। সোফায় পা তুলে বসে হাত নেড়ে কিছু একটা বলছে সে। খুব হাসির কথা হবে, রানু উল্টোদিকের সোফায় বসে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে।

এখনো সেই কলাপাতা সবুজ শাড়ি তার পরণে। মাতাল হাওয়ার মতো সুগন্ধি কি এখনো তার শরীরে লেগে আছে? হাসি থামিয়ে রানু হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে লোকটার সামনে দাঁড়ায়। ঝুঁকে পড়ে তার ঠোঁট একবার চুম্বন করে। লোকটা হাত বাড়ায়, রানু তার আগেই সরে গেছে।

বিজু স্পষ্ট বুঝতে পারছিলো, সে স্বপ্ন দেখছে, তবু সহ্য করা যায় না। পারলে রিমোট কন্ট্রোলে স্টপ চেপে দিয়ে দৃশ্যটাকে অন্তর্হিত করে সে জেগে ওঠে। পারা যায় না। ছবি এখনো সচল। এখন লোকটাকে আর দেখা যায় না। দৃশ্যপট বদলে গেছে।

রানু অনেক উঁচু একটা বিল্ডিং-এর জানালায় দাঁড়ানো। পনেরো তলা? বিশও হতে পারে। রানু জানালায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়ে কিছু একটা দেখছে। ঝুঁকে পড়েছে সে, আরো বিপজ্জনকভাবে সামনে ঝুঁকে পড়ছে। তার শরীর হঠাৎ পাক খেয়ে জানালার বাইরে ছিটকে পড়েছে। কিন্তু রানু কোথায়? তাকে দেখা যায় না। এখন বিজু নিজে পড়ে যাচ্ছে অসীম শূন্যতার ভেতেরে - বাড়িঘর, গাছপালা, মানুষজন কিছুই দেখা যায় না নিচে।

এবারে কোনো চেষ্টা ছাড়াই ঘুম ভেঙে যায় বিজুর। শূন্য থেকে অসীম শূন্যে পড়ে ভয় পায়নি সে, নাটকীয় ভঙ্গিতে বিছানায় উঠেও বসেনি। জানে, স্বপ্ন দেখছিলো এতোক্ষণ। পূর্ণচোখে অন্ধকার ঘরে তাকিয়ে মনে পড়ে, স্বপ্নের একটা সংলাপও সে শুনতে পায়নি। শুধু ছবি দেখছিলো, যেন রিমোটে কেউ মিউট চেপে দিয়েছিলো।

পাশে তাকিয়ে দেখে, রানু গুটিসুটি মেরে চিংড়ি মাছের ভঙ্গিতে ঘুমাচ্ছে। মাথা আর বালিশ আলাদা জায়গায়। এখন রানুর ঘুমটাকে সত্যিকারের ঘুম মনে হয়। অ্যালার্ম ঘড়িতে চারটা দশ। আরো ঘণ্টা দুই সময় আছে। চোখ বন্ধ করলেও স্বপ্নের দৃশ্যগুলো টুকরো টুকরো হয়ে চোখের সামনে উঠে আসে।

স্বপ্নের ব্যাখ্যা আছে কোনো? বিজু জানে না, ভাবেও না সেসব নিয়ে। তবু মনে হয়, স্বপ্নটা সে কেন দেখলো? রানুকে কি কোনো কারণে সন্দেহ করতে শুরু করেছে?

তেমন কোনোকিছু কখনো ঘটেনি, মনেও হয়নি। নিজেদের মধ্যে বোঝা-না-বোঝার মামলা আছে, দূরত্ব আছে। কোনো তৃতীয় পক্ষের ছায় সেখানে নেই। তবু একে কি কোনো অনিশ্চয়তার বোধ বলে ব্যাখ্যা করা যায়? প্রবল আত্মবিশ্বাসী পুরুষও হয়তো কিছু ভঙ্গুর হয়। ‘ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে...।’

অফিসের জন্যে তৈরি হতে হতে গতরাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে বিজুর। স্বপ্নের দৃশ্যগুলো আর অতো উজ্জ্বল নেই, ফ্যাকাসে হতে শুরু করেছে। একটু হাসি পায়, সামান্য বিষণœতাও কি নেই? তা-ও আছে। স্বপ্নটা খুবই অদ্ভুত, কিন্তু ওই লোকটা কে? কোথা থেকে এলো?

ফুলটুস স্কুলে যাওয়ার পোশাক পরে ব্যাকপ্যাক নিয়ে তৈরি, এখন বসে বসে কার্টুনের প্রাতঃকালীন ডোজ গিলছে। সকালে সে একদম কিছু মুখে তুলতে চায় না। রানু জোর করে অর্ধেকটা ডিমসেদ্ধ, কোনোদিন দুধ-সিরিয়াল জাতীয় কিছু একটা খাইয়ে দেয়।

রানু মেয়েকে খাইয়ে এসে অফিসে যাওয়ার পোশাক পরে ফেলেছে, এখন ড্রেসারের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রসাধন সারছে। প্যান্টের বেল্ট লাগাতে লাগাতে বিজু তাকিয়ে দেখে, আয়নায় রানুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। সামান্য হাসে রানু।

বলে, কাল রাতে কখন ঘুমাতে এসেছিলে?

বলতে ইচ্ছে করে, তুমি যে জেগে ছিলে, আমি জানি, রানু। বলে না। তার পরিবর্তে সহজ গলায় বলে, খুব বেশি দেরি করিনি, তুমি দেখলাম বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলে।

হ্যাঁ, কেন যেন খুব খারাপ লাগছিলো। তাড়াতাড়ি এসে শুয়ে পড়লাম।

আমি অনেকক্ষণ জানতেই পারিনি তুমি শুয়ে পড়েছো।
রানু হঠাৎ এগিয়ে এসে বিজুকে অবাক করে দিয়ে ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট বোলায়। সত্যিকারের চুমু নয়, অনেকটা প্রতীকী ধরনের। নাহলে এই তাড়াহুড়োর সময়ে আবার নতুন করে লিপস্টিক মাখতে হবে।

স্বপ্নে দেখা চুম্বনদৃশ্যটি মনে পড়ে বিজুর। কিন্তু ওই লোকটা কে? রানুকে বলবে নাকি স্বপ্নের কথা? নাঃ, বলা যায় না।

পড়ার ঘরে ঢুকে বিজু ব্রীফকেসে ল্যাপটপ ঢুকিয়ে দরকারি কাগজপত্রগুলো দেখে নেয়। টেবিলের ড্রয়ার খুলে ঘড়ি পরে। ওয়ালেট পকেটে ঢোকায়। সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার। কোমরে বেল্টের সঙ্গে ক্লিপে আটকানো ইন্টারঅ্যাকটিভ পেজার আর সেলফোন। হাতে চাবির গোছা। বিজুর সশস্ত্র অফিসযাত্রা। অস্ত্রশস্ত্র কিছু বাদ পড়লো কি?

সকালে এক কাপ কফি ছাড়া সাধারণত কিছু খায় না বিজু। এমনিতে চা পছন্দ হলেও সকালে ব্ল্যাক কফি ছাড়া ঘুমের রেশটা ঠিকমতো কাটতে চায় না। হাতে সময় থাকলে কখনো কখনো সিরিয়াল। সকালে না খাওয়া নিয়ে অনেকদিন গজগজ করে রানু ইদানিং ক্ষান্ত দিয়েছে। রানু সকালে নেয় দুধ-সিরিয়াল অথবা জেলি-মাখন ছাড়া শুকনো দুটো টোস্ট আর এক কাপ চা।

ফুলটুসকে উঠে পড়ার তাগাদা দিতে গিয়ে বসার ঘরের দেয়ালে ফুটোটা চোখে পড়ে আবার। কেমন করে যেন একটা ফুটো হয়েছে, ক’দিন আগে দেখেছে। অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স-এর অফিসে বলা দরকার মেরামত করার জন্যে। ভুলে গিয়েছিলো। অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে বাস করার এই এক সুবিধা। কোনো মেরামতির দরকার হলে ফোন করে বলে দাও, ওদের লোকজন এসে সারিয়ে দিয়ে যাবে।

ঘরগুলো রং করার জন্যে আর কার্পেট বদলে না দিলেও অন্তত শ্যাম্পূ ক্লিনিং-এর জন্যে বলা হয়েছিলো মাসখানেক আগে, সেটারও তাগাদা দিতে হবে। এই অ্যাপার্টমেন্টে আছে ওরা চার বছর। এর মধ্যে একবারও রং করে দেয়নি। অনেক জায়গায় রং নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দেয়ালে ফুলটুসের বিদ্যাচর্চা আর শিল্পকর্মের নমুনা। আজ অফিস থেকে একটা ফোন করে দিতে হবে। মনে থাকলে হয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০০৭ রাত ৯:৫৫
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×