somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উপন্যাস : পৌরুষ -Ñকিস্তি ৩৮ (এবং শেষ)

১৮ ই মে, ২০০৭ সকাল ১১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৭.৪

পছন্দের গ্রীক রেস্টুরেন্টে বসে রানু বলে, আমরা লাঞ্চে এরকম মাঝে মাঝে একত্র হতে পারি, কী বলো?

খুব ভালো হয়। লাঞ্চ মিটিং জাতীয় কিছু না থাকলে বিপদে পড়ে যাই। মনে হয়, কোথায় যাবো খেতে। যেটাই ভাবি, অরুচি হয়, মনস্থির করতে পারি না। গাড়িতে উঠে যে কোনো এক জায়গায় ঢুকে পড়ি। মাঝে মাঝে যদি বদল হয়, তুমি যদি ঠিক করে দাও কোথায় যেতে হবে খেতে, তাহলে বেঁচে যাই।

আমি তো সবদিনই আসতে পারি। তোমার যেদিন সময় থাকবে, ফোন করে দিও।

খুব ঘন ঘন হলে আবার হজম হবে তো?

বিজুর শ্লেষ গায়ে মাখে না রানু। বলে, একেকদিন একেক ধরনের রেস্টুরেন্টে যাওয়া যায়। কতো দেশের খাবার তো চোখেও দেখা হয়নি - ব্রাজিলিয়ান, কোরিয়ান, ভিয়েতনামী, রাশান।

খাবারটা ভালো ছিলো। বিজুর ধারণা, তার চেয়ে ভালো নিজেদের মধ্যে মতান্তরের বিষয়গুলো খাবার টেবিলে না আনা। সবসময় যদি এমন হতো! গতরাতের স্বপ্ন তখন তার মনেও নেই।

সন্ধ্যায় খুব ফুরফুরে মেজাজে ফিরেছিলো বিজু। ভেতরে ঢুকে বোঝে, কোথাও কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ফুলটুসের এই সময়ে থাকার কথা টিভির সামনে, তার বদলে বসে আছে রানু। গম্ভীর থমথমে মুখ, দুপুরে গ্রীক রেস্টুরেন্টে দেখা মুখের সঙ্গে মেলে না।

বিজু জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে?

গলা চড়িয়ে রানু বলে, কী হয়েছে আমাকে জিজ্ঞেস করছো কেন? তোমার আদরের মেয়েকে ডাকো।

কী হয়েছে, বলবে তো!

হবে আবার কী? বাপের আদরে তো মাথায় উঠে বসে আছেন মহারানী।

জানা কথা। ফুলটুস কিছু একটা ভুলভাল করলে তা শেষ পর্যন্ত বিজুর দোষ বলে সাব্যস্ত হবে। নতুন কিছু নয়। সে ব্রীফকেস পাশে নিয়ে সোফায় বসে। অপেক্ষা করে অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ শোনার জন্যে। কিন্তু ফুলটুস কোথায়? নিজের ঘরে?

রানু বলে, মেয়েটা এমন অবাধ্য আর বেয়াদব হয়েছে, বলার নয়। ওকে ডে কেয়ার থেকে তুলে নিয়ে বাসায় ঢুকেছি, এই সময় হিউস্টন থেকে আপা ফোন করলো। কথা বলছি ফোনে, আর তোমার মেয়ে সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা বলতে চায়। আমি যতো বলি, একটু দেরি করো, ফোনে খালামনির সঙ্গে কথা বলছি, সে ততো চিৎকার করে। শেষ পর্যন্তু পিটিয়ে থামাতে হলো।

বাচ্চাদের মারধর করার পক্ষপাতী বিজু নয়, যদি না সেটা সত্যিকারের গুরুতর কিছু হয়। অথচ রানু তুচ্ছ অজুহাতে মেয়ের গায়ে হাত তোলে। এসব নিয়ে ঝগড়াঝাটি কম হয়নি। বিজু আশেপাশে থাকলে সে নিজে মেয়েকে আগলে রাখে, সরিয়ে নিয়ে যায় রানুর নাগালের বাইরে।

রানুর জবানীতে বেশ বোঝা যাচ্ছে, ফুলটুসের অপরাধ মার খাওয়ার জন্যে যথেষ্ট ছিলো না।

বিজু বলে, শুধু শুধু কেন মারধর করো মেয়েটাকে?

শুধু শুধু? অমন বেয়াদবি করবে কেন?

তোমার জায়গায় আমি হলে, আপাকে ফোন একটু ধরতে বলে মেয়ের কথাটা আগে শুনে নিতাম। অথবা ফুলটুসকে বুঝিয়ে বলতাম, ফোনে আমার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে। মারধর করতাম না কিছুতেই। এইসব সামান্য কারণে তুমি ওর গায়ে হাত তুলে কার কী উপকার করছো, তুমিই জানো।

তোমার কাছে তো সামান্যই মনে হবে।

সামান্য না তো কী? তুমিই ভেবে বলো, কার কী ক্ষতি সে করেছে। তার কিছু বলার ছিলো, সে তোমার মনোযোগ চেয়েছে। বাচ্চারা তা সবসময় চায়, তাতে দোষের কিছু নেই। চিৎকার-চেঁচামেচি করে থাকলে নিশ্চয়ই তা অন্যায় হয়েছে। আসলে কী জানো, আমরা হয়তো ওকে ঠিকমতো শেখাতে পারিনি, বাবা-মা ব্যস্ত থাকলে ওকে অপেক্ষা করতে হবে তার কথাটা বলার জন্যে।

তার মানে, তুমি বলছো আমি ওকে কিছু শেখাই না!

বিজু পরিচিত রানুকে দেখতে পাচ্ছে আবার। গ্রীক রেস্টুরেন্টে আজ দুপুরে গিয়েছিলো হয়তো অন্য আরেকজন কেউ, রানু নয়।

সে বলে, আমি কিন্তু বলেছি আমরা, আমিও এর বাইরে না।

রানু তা মানবে কেন? বলে, তোমার ঠেস দিয়ে কথা বলা আমি বুঝি না?

আর কথা নয়। বিজু উঠে পড়ে। পড়ার ঘরে ব্রীফকেস নামিয়ে রাখে। হাতঘড়ি খুলে, পকেট-টকেট খালি করে নিরস্ত্র হয় সে। যুদ্ধবিরতির সময় এখন।

ফুলটুসের ঘরে গিয়ে দেখে, সে ঘুমাচ্ছে। এই সময়ে সে কখনো ঘুমায় না। দিনের ঘুম তার চিরদিনের শত্রু, খুব ছোটোকাল থেকেই। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েকে দেখে বিজু। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে, চোখের পানি শুকিয়ে দাগ রেখে গেছে গালে। দু'হাতে জড়িয়ে ধরা নতুন বারবি। একটা শ্বাস ফেলে বেরিয়ে আসে বিজু।

খানিক পরে ফুলটুসকে ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞেস করে বিজু, কী রে ম্যাকডোনাল্ডস-এ যাবি নাকি আজ?

খুব যাবে। মেয়ের খাওয়া যেমন তেমন, একটা খেলনা তো পাওয়া যাবে! উঠে পড়ে ফুলটুস। বিজু বলে, যা ভালো করে মুখহাতটা ধুয়ে আয়।

গাড়িতে ফুলটুস জিজ্ঞেস করে, আমি না থাকলে মা খুব খুশি হবে, তাই না বাবা?

সে কী রে, এরকম পচা কথা তোর কেন মনে হলো?

মা আমাকে একটুও দেখতে পারে না, শুধু বকে আর মারে।

তুই তো মা-র পেটের ভেতরে কতোদিন ধরে ছিলি, তোকে বলেছি না? ভালো না বাসলে মা তোকে অতোদিন পেটের মধ্যে নিয়ে বেড়াতো নাকি?

ফুলটুস আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো, বিজু কথা ঘোরায়। বলে, তোর স্কুল কেমন হলো আজ?

জানো বাবা গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস ডে ছিলো আজ! আমার বন্ধু মিশেলের গ্র্যান্ডপা এসেছিলো, অনেক মজার মজার গল্প বলেছে।

মেয়েকে খাইয়ে ফিরে আসতে আসতে ফুলটুসের বিছানায় যাওয়ার সময় হয়ে যায়। সে আবদার তোলে, আজ তো বিকেলে ঘুমিয়েছি, পরে ঘুমাতে যাই, বাবা?

বিজু বলে, কোনো দুষ্টুমি নয়, কাপড় পাল্টে শুয়ে পড়।

ফুলটুসকে বিছানায় পাঠিয়ে সিগারেট নিয়ে প্যাটিওতে যায় বিজু। হঠাৎ খুব ক্লান্ত লাগে তার। পুরো সিগারেট না খেয়েই নিবিয়ে ফেলে। রানু একইভাবে টিভির সামনে বসে আছে তখনো। কিছু বলার আগ্রহ হয় না। রাতে খাওয়ার ইচ্ছে নেই বিজুর। বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে সে।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলো, কতোক্ষণ ঘুমিয়েছে বিজু জানে না। ঘুম ভাঙলো অন্ধকার ঘরে, রানুর শরীরের স্পর্শে। তার মুখের ওপর রানুর তপ্ত শ্বাস। বিজুর একটা হাত তুলে নিয়ে নিজের বুকের ওপর স্থাপন করেছে রানু। দোষ নিঃশব্দে স্বীকার করে নেওয়ার নিজস্ব পদ্ধতি তার।

বিজু অনড় থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু শরীর বড়ো বিশ্বাসঘাতক। সে শুধুই রক্ত আর মাংস, স্থূল তার চাওয়া। ভয়ানক নির্লজ্জ, লোভী সে। তার অহংবোধ বলে কিছু নেই, আত্মাভিমান নেই। অথচ অহংকার কী ভঙ্গুর!

'যাহাতে অমৃত নাই, তাহা লইয়া আমি কিতা করতাম রে, কিতা করতাম!'

যে অহং কেবল মনে মনে, যাকে শরীরে ধারণ করা যায় না শিরস্ত্রাণের মতো, বর্মের মতো, কী মূল্য আছে তার! কোন কাজে লাগে সে?

'দিস টাইম ইউ'ভ গট নাথিং টু লুজ
ইউ ক্যান টেক ইট ইউ ক্যান লীভ ইট, হোয়াটএভার ইউ চু
আই ওন্ট হোল্ড ব্যাক এনিথিং
অ্যান্ড আই'ল ওয়াক আওয়ে আ ফুল অর আ কিং...'
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০০৭ সকাল ১১:৪৪
৩০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×