শিশুতোষ গল্প-
পুরস্কার
-আমিনুল ইসলাম মামুন
মাগরিবের আযান হলো অল্প কিছুক্ষণ আগে। রেল লাইনের পাশ ঘেঁষা পাকা সড়ক ধরে স্কুটারযোগে বাসায় ফিরছেন রফিক সাহেব। সঙ্গে তার বৃদ্ধ মামাও। সড়কের ধারেই রেল লাইন সংলগ্ন জায়গায় গজিয়ে উঠেছে কতকগুলো বস্তি। স্কুটার বস্তির কাছাকাছি আসতেই রফিক সাহেব লক্ষ্য করলেন মটর সাইকেল আরোহী তিনজন বখাটে যুবক তাদেরকে অনুসরণ করছে। স্কুটার চলছে নিজ গতিতে। রফিক সাহেব ওদের মতি-গতি পুরোপুরি বুঝে ফেললেন। রাস্তার ওপর পাশের বস্তির একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে উদাস ভঙ্গিতে। রফিক সাহেব কেন জানি ভাবলেন, একে বিশ্বাস করা যায়। তিনি কালো রঙের একটি পলিথিনের পুটলি খুব দ্রুত ছুঁড়ে দিলেন ছেলেটির দিকে। ছেলেটি পুটলিটি নিয়ে দ্রুত বস্তির ভেতর ঢুকে পড়ল। বয়স তার নয়-দশ বছরের মতো হবে।
বখাটে ছেলেগুলো এ বিষয়টি একটুও খেয়াল করেনি। তারা বস্তি বরাবর রাস্তার শেষ প্রান্তে এসে স্কুটারের সামনে মটর সাইকেল থামিয়ে রফিক সাহেব ও তার মামাকে ধরল। রফিক সাহেবকে বললো, ভালোয় ভালোয় স্বর্ণালঙ্কারগুলো দিয়া দ্যান।
ওরা দু’পাশ থেকে দু’টি ছুরি বের করল। বললো, নইলে পেটের ভুঁড়ি বাইর কইরা ফালামু।
রফিক সাহেব বললেন, আমাদের কাছে তো কোনো স্বর্ণালঙ্কার নেই।
ছিনতাইকারীদের একজন বললো, এই মিয়া, আমরা বায়তুল মোকাররম মার্কেট থাইকা ফলো কইরা আইতাছি। শয়তানের চোখকে ফাঁকি দিবার পারেন, কিন্তু আমাগো চোখকে না। জলদি বাইর করেন।
রফিক সাহেবের একই কথা। অবশেষে তারা রফিক সাহেব ও তার মামাকে ভালো করে দেখল স্বর্ণালঙ্কারগুলো কোথাও লুকিয়ে রেখেছে কি না। না পেয়ে তারা কিছু নতুন কাপড়-চোপড় ও তাদের হাত ঘড়িসহ খুচরো সব টাকা-পয়সা নিয়ে চলে গেল।
দু’দিন পরেই রফিক সাহেবের বড় মেয়ের বিয়ে। তাই তিনি ও তার মামা মার্কেটে গিয়েছেন মেয়ের বিয়ের গয়না কিনতে। অনেক টাকার স্বর্ণালঙ্কার কিনে তারা বাসায় ফিরছিলেন। পথেই ঘটল এই অনভিপ্রেত ঘটনা। ছিনতাইকারীদের সাথে তিনি কথা বলার মতো শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছেন শেষ পর্যন্ত। তাই অবশেষে নতুন কাপড়-চোপড়, টাকা-পয়সা ইত্যাদি ওদেরকে দিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
পরদিন সকাল দশটার দিকে ছেলেটি যেখানে ছিল, রফিক সাহেব সেখানে এলেন। ছেলেটিও সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল আজও। সে রফিক সাহেবকে দেখামাত্রই চিনলো। বললো, আপনি না কাল...?
ছেলেটি কথা শেষ করার আগেই রফিক সাহেব বললেন, হ্যাঁ।
: বেশ ভালো করেছেন। অবশ্য ভুলও করেছেন। এভাবে অপরিচিত কারও কাছে এতো দামী জিনিস দেয়া ঠিক না। এই নেন আপনার আমানত।
: আমি দেখেছি ধরা পড়লেই ওরা জিনিসগুলো নিয়ে নেবে। তখন ভেবেছি তোমার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুই হয়তো তা রক্ষা করতে পারে। তুমি পড়ালেখা কর নাকি?
: জ্বি না। বাবা নাই। মা’রে ছাইড়া চইল্যা গেছে। ঠিকমতো দিনে দুই বেলা ভাতও জোটে না, পড়ালেখা করুম কেমনে?
ছেলেটির কথা শুনে রফিক সাহেবের খারাপ লাগল। তিনি পুটলিটা খুলে একটি সোনার হার ছেলেটির দিকে বাড়িয়ে বললেন, এই নাও তোমার পুরস্কার।
ছেলেটি বললো, এতো তুচ্ছ জিনিস আমার দরকার নাই। এর চেয়ে বড় জিনিস আমি পাইছি।
: কি?
: আমার প্রতি আপনার বিশ্বাস।
রফিক সাহেব ছেলেটির কথায় অভিভূত হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা কি করেন?
: মহল্লায় ঘুইরা ঘুইরা ছাই বিক্রি করেন।
: তুমি হারটা উনাকেই দিও।
: মা তো কিছুতেই নিবে না।
রফিক সাহেব একটু ভাবলেন। তিনি জানতেন নগরীর সকল বস্তি সন্ত্রাসী আর চোর-ডাকাতের আখড়া। এখন দেখছেন ভালো এবং সৎ মানুষও বস্তিতে আছে। ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ঘর কোনটা?
ছেলেটি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললো, ঐ যে নীল প্লাস্টিক দিয়ে ছাউনি দেয়া ঘরটা, ওটাতেই আমরা থাকি।
এরপর রফিক সাহেব চলে গেলেন।
বিকেল পাঁচটা। রফিক সাহেব তার স্ত্রীকে নিয়ে বস্তিতে ছেলেটির ঘরে এসে হাজির হলেন। ছেলেটির মা অল্প কিছুক্ষণ আগে ছাই বিক্রি করে ঘরে ফিরেছে। রফিক সাহেব ও তার স্ত্রী বেশ কিছুক্ষণ ছেলেটির মায়ের সাথে কথা বললেন। যাওয়ার সময় রফিক সাহেব খুবই বিনয়ের সাথে মহিলাকে অনুরোধ করে অনেকগুলো টাকা দিয়ে বললেন, আপনি এই টাকা দিয়ে অন্য কোনো ব্যবসা করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করুন। আমার বিশ্বাস, আপনি সফল হবেন। কারণ সততা আপনি ও আপনার ছেলের প্রধান পূঁজি। এ টাকা আমি আপনাকে করুণা করে দেইনি। এ আমার কর্তব্য। আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়।
অবশেষে তারা বিদায় নিলেন। ছোট্ট ছেলে ফাহিম ও তার মায়ের চোখ মুখে ফুটে উঠে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্নের হাসি।
E-mail: [email protected]
আলোচিত ব্লগ
৫০১ নাম্বার রুম কি বিজয় নাকি লাম্পট্যর সাক্ষী।

মাওলানা মামুনুল হক নামের হেফাজত ইসলামের এক নেতা তার ফেসবুক ওয়ালে দীর্ঘ একটি পোস্ট লিখেছেন। তার এই পোস্টটি এক অদ্ভুত রসাত্মক ট্র্যাজেডি।
লেখাটি পড়লে মনে হয়, তিনি... ...বাকিটুকু পড়ুন
Good governance starts with respecting public money....

Good governance starts with respecting public money....
গত দুই দশক রাষ্ট্রীয় সফর মানেই ছিল বিশাল বহর, শত শত সঙ্গী, অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক আর জনগণের টাকায় এক শ্রেণির মানুষের বিদেশ ভ্রমণের... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইসলাম প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, ভালোবাসাই যথেষ্ট

চীনের লিংশান পর্বতে শুয়ে আছেন ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর দুই সাহাবী সা-কে-জু (Sa-Ke-Zu) এবং
উউ-কো-শুন (Wu-Ko-Shun)। এই নামেই তাঁদের চিনতো স্থানীয় চীনবাসীরা। অবাক হতে হয়, আরব... ...বাকিটুকু পড়ুন
প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....
প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি.....
প্রিয় সহব্লগার,
একসময় সামু ছিল আমাদের ছোট্ট এক মহাবিশ্ব।
দৈনিক গড়ে তিন-চারশ' ব্লগার অনলাইনে থাকতেন। প্রতি মিনিটেই নতুন নতুন পোস্ট আসত। কেউ গল্প লিখছেন, কেউ কবিতা, কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন
অন্য ধর্মের অনুসারীদের সাথে সদয় আচরণ করলে আল্লাহর ভালোবাসা পাবেন
১) "দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে নিজ দেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় আচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেননি। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।