somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভৌতিক গল্পঃ ~ ~ঢাকা মেট্রো -ভ-৬৬-৬৬-৬৬~ ~ (২)

২০ শে জানুয়ারি, ২০১৩ বিকাল ৩:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(৩)

সেল ফোনের ককর্শ আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গলো রুদ্রর । ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখলো নীলাও জেগে উঠেছে । নীলার দিকে তাকিয়ে শুকনো হাসি হাসলো রুদ্র । নীলাও মুচকি হাসলো । একে অপরের দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকলো তারা । "কি খবর বেগাম । কি অবস্থা আপনার ?" মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো রুদ্র । "এই তো সাহেব চলে আর কি" উজ্জ্বল মুখে জবাব দিলো নীলা । "তা ঘুম থেকে উঠবেন না ? জিজ্ঞেস করে রুদ্র । "না ।"-"কেন ?"-"আরে ঘুম থেকে উঠে গেলে আপনার মতো এতো সুন্দর করে ঘুম থেকে ডেকে তুলবে কে ?"বলেই একটু শব্দ করে হাসলো নীলা । নীলার দিকে তাকিয়ে থাকে রুদ্র । মেয়েটা এতো সুন্দর করে কথা বলতে পারে , ভাল লাগে তার । ফোনের এলার্ম টোন আবার বেজে উঠায় দুজনেই সম্ভিত ফিরে পেলো । দ্রুত তৈরি হয়ে গেলো বের হবার জন্য । মাঝখানে রুম থেকে বের হয়ে নিচে সবার অবস্থা দেখে এলো রুদ্র । সবাই মোটামুটি তৈরি হয়ে গিয়েছে । রুমে এসে দেখলো নীলাও তৈরি হয়ে বসে আছে । "তুমি তৈরি ?" জিজ্ঞেস করলো রুদ্র । মুচকি হেসে সম্মতিসূচক মাথা ঝাকালো নীলা । নীলাকে নিচে যেতে বলল রুদ্র , তারপর নিজে তৈরি হলো । রুমের লাইট অফ করে দিতেই বাহিরের ম্লান আলো আর রুমের ভিতরের গুমোট আধাঁরে অবাস্তব একটা জগত্‍ তৈরি করলো একটা ছোট পরিসরে । রুমের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে রুদ্র হটাত্‍ দাড়িয়ে গেলো , অস্পষ্ট আলোয় রুমের ভিতরে প্রচুর মাকড়শার জাল দেখতে পেলো যেন । অবাক হলো সে , রুমে ঢুকে লাইট অন করলো আবার । কিন্তু কিছুই দেখতে পেলো না , আবারও খুব অবাক হলো রুদ্র । কয়েকদিন প্রচুর ব্যাস্ততার ফল বোধহয় ভাবলো সে । লাইট অফ করে রুমের দরজা লক করলো সে তারপর দরজাটা ধাক্কা দিল । ক্যাচ ক্যাচ করে প্রতিবাদ করতে করতে বন্ধ হয়ে গেলো দরজা , খুট করে শব্দ করে লক হয়ে গেলো । রুদ্র দরজার সামনে হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে আছে , একটু আগেও যখন বের হয়েছিল তখনও এমন শব্দটা হয়নি । ঠিক এসময় এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেলো , কেঁপে উঠলো রুদ্র । ভয় পেলো সে , অনেকটা প্রায় দৌড়েই নিচে নেমে এলো । নিচে নামতেই সবাইকে চোখে পড়লো । সবাই প্রায় গোল হয়ে দাড়িয়ে আছে , নীলাকে দেখা গেলো ডাঃ জাওয়াদের স্ত্রী ডাঃ রুশনার সাথে । তিনটা জীপ দাড়িয়ে আছে হোটেলের সামনে , স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে বলা হয় চান্দের গাড়ি । ডাঃ আসিফ সবাইকে জীপে উঠতে বলল , প্রত্যেকটা জীপে ১২ জন করে । একটা জীপে একজন কম হবে , ওটাতে একটা বেতের বাস্কেট তোলা হবে , ওটার ভিতর খাবার আছে । নীলা এগিয়ে এলো রুদ্রের দিকে , রুদ্রর চেহারা অনেকটাই ফ্যাকাশে হয়ে আছে । "কিছু হয়েছে তোমার ?" উদ্দিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো নীলা । কিছুক্ষন চুপচাপ থেকে রুদ্র জবাব দিল "না , মানে । আমার বোধহয় রাতে ঘুমটা ভাল হয়নি ।" নীলাকে চিন্তিত হতে দেখে রুদ্র আবার হেসে বলল "বেপার না । চলো জীপে উঠি ।" নীলার হাত ধরলো রুদ্র , দুজনেই একটা সাদা রং করা জীপের দিকে এগিয়ে গেলো । জীপ তিনটা বেশ পুরোনো , তিনটের শরীরই তোবড়ানো জায়গায় জায়গায় , রং চটে গিয়েছে অনেক জায়গায় । যানবাহনগুলোর অবস্থা দেখে যে কেউ এতে চড়ার আগ্রহ হারাবে । তবুও কিছু করার নেই , কারন আশেপাশে নাকি হোটেল ম্যানেজার আর কোন চান্দের গাড়ি পাননি । ঠিক করা হয়েছে এখান থেকে তারা যাবে নীলগিরি , বান্দরবানের মূল আকর্ষন । মাঝখানে সম্ভব হলে শৈল প্রপাত সহ চিম্বুক ঘুড়তে যাবে । যদি নীলগিরি যেতে খুব বেশি দেরি হয়ে যায় এবং যদি দেখা যায় ফিরে আসতে আসতে রাত হয়ে যাবে তাহলে নীলগিরি থেকে বগা লেকের দিকে যাবে সবাই । সেখানে একটা আর্মি ক্যাম্প রয়েছে । থাকা খাওয়ার একটা ব্যাবস্থা করা যাবে সেখানে । বান্দরবান মূল শহর থেকে নীলগিরি ৪৫ কিঃমিঃ দূরে , এটা মূলত একটা পাহাড় । যেখানে মেঘেরা নিজ থেকেই ছুঁয়ে যায় মানুষকে । নীলগিরির চূড়া থেকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় কেওক্রাডং, প্রাকৃতিক আশ্চর্য বগালেক, কক্সবাজারের সমুদ্র, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের আলো-আঁধারি বাতি এবং চোখ জুড়ানো পাহাড়ের সারিও দেখতে পাওয়া যায় । নীলগিরির কাছাকাছি রয়েছে বেশ কয়েকটি ম্রো উপজাতীয় গ্রাম । নীলগিরির একদম কাছে কাপ্রু পাড়া, যেখানে সহজেই পরিদর্শন করে ম্রো আদিবাসী সম্পর্কে জানা যায় । নীলগিরিতে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প । ফলে এখানে নিরাপত্তার কোন ঘাটতি নেই । যাওয়ার পথে প্রথমে পরবে শৈল প্রপাত এবং তারপর পরই চোখে পড়বে স্বপ্নচূড়া । স্বপ্নচূড়া থেকেও বান্দরবানের অবাক করা সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় । স্বপ্নচূড়ার পরই বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুকে পৌঁছে যাওয়া যায় । চিম্বুকের সুনাম সারা দেশব্যাপী । এখানে রয়েছে টি এন্ড টির বিশাল টাওয়ার, উন্নয়ন বোর্ড তৈরি করেছে সকল সুবিধা সম্বলিত রেস্ট হাউস । সড়ক ও জনপথ বিভাগের পুরনো একটি রেস্ট হাউসও রয়েছে এখানে । চিম্বুকের পরই নীলগিরি হিল রিসোর্ট । এ কথাগুলো ডাঃ রিজভি সবাইকে জানিয়ে দিলো । একটু পর এক এক করে তিনটা জীপই স্টার্ট দিলো , হুল্লোড় করে উঠলো সবাই । রাস্তায় বের হয়ে এলো জীপগুলো , মাঝারি গতিতে চলতে শুরু করলো পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে । হোটেলটার দিকে তাকিয়ে রইলো রুদ্র । কুয়াশার ঘন চাদরে মোড়ানো সকাল বেলার অস্পষ্ট আলোয় অধিভৌতিক আর পরিত্যাক্ত লাগলো হোটেলটাকে । হোটেলের প্রধান ফটকের কাছে দাড়িয়ে আছে ম্যানেজার , গতকাল রাতের মতোই রহস্যময় লাগলো তাকে । লোকটা এখনো সারা গায়ে চাদর মুড়ি দিয়ে দাড়িয়ে আছে , কেন যেন রুদ্রর মনে হলো লোকটা হাসছে । জীপ বাক ঘুড়তেই বাকের আড়ালে অদৃশ্য হলো হোটেলটা । সামনে ফিরলো রুদ্র , তাদের জীপটা সবার পরে । এর আগের দুটো জীপ তাদের চেয়ে একটু সামনে এগিয়ে গিয়েছে । রুদ্রদের জীপে মোট এগারোজন , ডাঃ আসিফ , ডাঃ জাওয়াদ ও তার স্ত্রী ডাঃ রুশান , ডাঃ এনামুল আর তার পরিবারের তিন সদস্য , রুদ্র , নীলা , ডাঃ এশা , ডাঃ রিজভি । সব কটা জীপই হুডখোলা , সবাই তারা দাড়িয়ে আছে । প্রচন্ড বাতাসে সবার চুল উড়ছে অবাধ্যের মতো , ঠান্ডা বাতাস প্রায় সূঁচের মতো গিয়ে বিধছে শরীরে । একটু পর পর জীপ বিপদজনকভাবে কাত হয়ে যাচ্ছে । পাহাড়ি রাস্তা একে বেকে চলে গিয়েছে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে । মাত্র ৪০০-৫০০ গজ পর পরই প্রায় ইংরেজি অক্ষর U অথবা L আকৃতির বাক পরে ।

আর এমন প্রায় প্রতিটা বাকই ড্রাইভার বিপদজনক গতিতে পাড় হয়ে যাচ্ছে । প্রতিবার বাক পাড় হতে হতে যাত্রীরা আতংক আর রোমান্চ মেশানো আর্তচিত্‍কার করে উঠছে । আশে পাশের পাহাড়ে কোটি কোটি বছর পুরোনো আগ্নেয় শিলার উপস্থিতি দেখা যায় । গাছ পালার ঘন আস্তরনের নিচ দিয়ে চলে গিয়েছে রাস্তা । ঘন কুয়াশা আর গাছপালার ছায়া পুরো জায়গাটাকে ভয়ানক ঠান্ডা আর অধিভৌতিক করে রেখেছে । জীপের গতির কোন হের ফের হচ্ছে না , প্রতিটি বাক এখন আরো বিপদজনক । বাক ঘুরেই রাস্তা প্রায় খাড়া হয়ে উপরের দিকে উঠে গিয়েছে , ভয়ানক বাকটাকে পাশ কাটাতে গিয়ে প্রায় রাস্তার কিনারে চলে যাচ্ছে জীপ । রাস্তার দুপাশে ঝপ করে প্রায় এক দেড় হাজার ফিট গভীর খাদ নেমে গিয়েছে । বার বার মনে হচ্ছে এই বুঝি জীপ সোজা গিয়ে খাদে পরবে , কিন্তু প্রতিবারই ড্রাইভার আশ্চর্য দক্ষতায় জীপ সামলে ফেলছে । হটাত্‍ করেই জীপের গতি কমে গেলো , সামনে বাম পাশে চুলের কাঁটার মতো তীক্ষ বাক , বাক পাড় হয়ে রাস্তা প্রায় ৫০ ডিগ্রি কোনে পাহাড়ের বুক চিড়ে উপরে উঠে গিয়েছে । জীপের গতি ১০-১৫ এ নেমে এলো , ইন্জিনের গর্জন ম্লান হয়ে গেলো হটাত্‍ । বাক সামান্য ঘুরতেই ইন্জিন পুরোপুরো বন্ধ হয়ে গেলো । জীপ মধ্যাকর্ষনের সূত্র মেনে পিছনের দিকে গড়ানো শুরু করলো , পিছনে গভীর খাদ । আতংকে যাত্রীদের চিত্‍কার পর্যন্ত থেমে গেলো , রুদ্র রিভারভিউ মিররে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে ড্রাইভারের দিকে । মুখে কালো মাংকি মাস্ক পরা লোকটা আপ্রান প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে স্টিয়ারিং আর ব্রেক প্যাডেল চেপে ধরে । কিন্তু গাড়ির অবাধ্য চাকা তার কথা শুনছে না , পিছনের দিকে গড়িয়ে চলছে । ব্রেক খুব সামান্যই কাজ করলো , সামান্য কমলো জীপের গতি । কিন্তু তবুও গতি অনেক বেশি , ভয়াবহ ধাক্কা লাগলো রাস্তার পাশে একটা গাছে । ধাক্কা লেগে সবাই প্রথমে সামনে ডান দিকে সরে গিয়েছিল , পরক্ষনই পিছনের অর্থাত্‍ বাম দিকে হেলে পড়লো সবার শরীর । জীপের পিছনে বসে ছিল ডাঃ এশা , জীপের পিছনের দিক দিয়ে প্রায় উড়ে চলে গেলো তার শরীরটা । অন্যান্য যাত্রীরা তার গোলাপি সোয়েটারটার একটা ঝলক দেখতে পেলো শুধু , রওনা হয়ে গেলো সে প্রায় ১০০০ ফুট নিচে গাছপালা আর শক্ত জমিনকে আলিঙ্গন করতে । আর্তচিত্‍কার বের হয়ে এলো এশার মুখ দিয়ে । নিঃস্তব্ধতার মাঝে অনেক বেশি করে শোনা গেলো তার মরণ চিত্‍কার ।

(৪)

হতভম্ব হয়ে বসে আছে সবাই । আতংকে সাদা হয়ে গেছে মেয়েদের মুখ । কেউ নড়ছে না । এশার চিত্‍কার বহু আগেই থেমে গিয়েছে , থেমে গিয়েছে তাদের জীপের পতনও । যে গাছটার সাথে জীপটা ঠেস দিয়ে আছে , সেটা বেশ শক্ত , সহজে ভাঙ্গবে না । সবার প্রথমে নড়ে উঠলো রুদ্র । সবাইকে পাশ কাটিয়ে নেমে এলো জীপ থেকে । তার দেখাদেখি অন্যান্য সবাইও নেমে এলো । খাদের কিনারে দাড়িয়ে উকি দিলো সবাই , এশার লাসের চিন্হও নেই । গ্রাস করে নিয়েছে তাকে নির্মম প্রকৃতি । "কো...কোত্থায় এশার লাস ?" আতংকিতো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো ডাঃ রুশান । সবাই ফিরে তাকালো তার দিকে , সবার চোখের দৃষ্টিতেই অদ্ভুত বিষাদ আর শূন্যতা লক্ষ্য করলো রুশান । নীলা শক্ত করে রুদ্রকে ধরে আছে , মেয়েটা এই প্রথম চোখের সামনে এধরনের ঘটনা ঘটতে দেখেছে , ভীষন ভয় পাচ্ছে সে । জীপের ইন্জিন শব্দ করে চালু হলো আবার । ড্রাইভার জীপ থেকে বেরই হয়নি , ব্যাপারটাকে এতো সহজভাবে নিলো সে যে এটা এখানে নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার । অসহ্য নিরবতার মাঝে জীপের আয়োয়াজটায় কেমন যেন অস্বস্থিতে ভুগতে লাগলো সবাই । ডাঃ আসিফ নিজেকে প্রথম সামলে নিলো । সবাইকে জীপে উঠতে বলল , কিন্তু কেউ নড়লো না , আগের মতোই দাড়িয়ে রইলো । আসিফ রুন্দ্রর কাছে গিয়ে তার কাধ দুহাতে ধরে ঝাকালো , রুন্দ্র হতভম্বের মতো তাকালো আসিফের দিকে । "রুদ্র কাম অন , উই হ্যাব টু ক্যাচ আদার্স , দ্যান উই হ্যাব টু রেসকিউ দ্য ডেড বডি অব এশা ।" কথাটা বলে তাকে আবারও কাধ ধরে ঝাকালো আসিফ । ধাক্কা খেয়ে যেন বাস্তবে ফিরে এলো রুদ্র । সবাইকে প্রায় ঠেলে , ধাক্কা দিয়ে জীপে উঠালো । তারপর সে আর আসিফ চেপে বসলো জীপে , চলতে শুরু করলো জীপ । আগের চেয়েও ভয়ানক গতিতে বাক ঘুড়তে লাগলো , কেউ কিছু বললো না । আসলে বলার কিছু নেই , এই কিছুক্ষন আগেও একজন মানুষ তাদের সাথেই ছিল , এখন হটাত্‍ করেই নেই । ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে সবার , জীপের মেঝেতে পাতা গদীর উপর বসে আছে সবাই । রাস্তা ক্রমশ উপরে উঠে গিয়েছে , সেই সাথে কুয়াশার ঘনত্বও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে । জীপের হেডলাইট জ্বলছে এখন , হেডলাইটের হলদেটে আলোর সামনে ঘন কুয়াশার স্তর পাক খাচ্ছে । জীপের ইন্জিন এখন ভয়াবহ আর্তনাদ করছে , রাস্তা এখন প্রায় ৬৫ ডিগ্রি কোনে উপরে উঠেছে । সবাই এবার শক্ত করে জীপের পাশে লোহা ধরে রইলো , এশার নিয়তি বরন করতে রাজী না কেউ । রুদ্রর মনে হচ্ছে কোথাও একটা ভুল হচ্ছে , কিন্তু কি ভুল তা সে ধরতে পারছে না । তার অবচেতন মন বার বার তাকে বিপদ সংকেত শোনাচ্ছে । হুড খোলা জীপের পাশ দিয়ে নিচের প্রায় অন্ধকার , কয়েক হাজার ফুট নিচের খাদের দিকে তাকালো সে । অনেক দূরে ক্ষুদ্র ফিতার মতো একটা অবয়ব একে বেকে চলে গিয়েছে পাহাড়ের গা বেয়ে । কি যেন একটা মনে পরি পরি করেও পরছে না । হটাত্‍ বিদ্যুত্‍ এর চমকের মতো সে ধরে ফেলল ব্যাপারটা । জীপ চলছে প্রায় দেড় ঘন্টার মতো হয়ে গেলো অথচ তারা এখনো শৈল প্রপাতের কাছেই পৌছায়নি । ব্যাপারটা খুব বেশি অস্বাভাবিক লাগলো তার কাছে । পাশ ফিরে নীলার দিকে তাকালো রুদ্র , আতংকে মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আছে । জীপে পুরুষ মানুষ আছে মোটে পাঁচজন , মেয়েদের সামনে কথাটা না বলার সিদ্ধান্ত নিলো সে , অযথাই ভয় পাবে তাহলে । তার চেয়ে সামনের জীপগুলোর নাগাল পেলেই বরং তাদের সাথে পরামর্শ করে কিছু একটা করা যাবে । সামনে তীক্ষ বাক , প্রচন্ড গতিতে বাক ঘুড়লো জীপ । কিন্তু হটাত্‍ করেই কড়া ব্রেক করলো ড্রাইভার , রাস্তার সাথে চাকা ঘষা খাওয়ার বিশ্রি কিইচচচ শব্দ হলো । টায়ার পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো বাতাসে , পিচ ঢালা রাস্তায় স্পষ্ট হয়ে বসে গেলো টায়ারের দাগ । কেন জীপ থেমেছে দেখতে উঠে দাড়ালো সবাই , আরেকবার স্তব্ধ হলো । সামনেই তাদের আরেকটা জীপ দাড়ানো , তবে এখন আর ওটাকে জীপ না বলে জীপের ধ্বংসাবসেশ বলাই ভাল ।

জীপটা প্রায় অর্ধেটাই তুবড়ে গিয়েছে , তুবড়ে গিয়ে পাহাড়ের সাথে আটকে আছে । রাস্তার এখান থেকে বাম দিকে শক্ত আগ্নেয় শিলার পাহাড়ের কঠিন ভিত শুরু হয়েছিল । জীপের বাম পাশটার সামনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশই পাহাড়কে ভেদ করে ভিতরে ঢুকে গিয়েছে । ড্রাইভার কম্পার্টমেন্ট বাদামের খোসার মতো চ্যাপ্টা করে দিয়েছে একটা বড় পাথর । এখনো সেটা স্বগর্বে নিজের অস্তিত্ব ঘোষনা করে যাচ্ছে । পাথরটা উচ্চতায় প্রায় দশ থেকে এগারো ফুট উচু আর প্রস্থে প্রায় পাঁচ ফুটের মতো । একবার দেখেই বলে দেওয়া যায় ড্রাইভারের হাড় পাওয়ার সম্ভাবনাও খুব অল্প , বহু আগেই হাড় মাংস দলা পাকিয়ে গিয়েছে । অবশিষ্ট এগারো যাত্রীর মধ্যে প্রথম দিকে যে তিনজন ছিল তারা সবাই পাথর চাপা পরেছে । দুজনের মাথা তরমুজের মতো থেতলে গিয়েছে , ধরটা অসহায় ভঙ্গীতে জীপের উপরের দিকের ফ্রেমে ঝুলছে । অপর লাসটার প্রায় অর্ধেকটাই পাথরের নিচে । বাকি আটজনের মধ্যে তিনজন মহিলা আর পাঁচজন পুরুষ ছিল । জীপটার ঠিক মাঝামাঝি কয়েকটা বাঁশ সটান হয়ে প্রায় ইংরেজি U আকৃতিতে আটকে আছে । অস্পষ্ট হলেও বুঝা যায় প্রত্যেকটা বাঁশ একজন একজন করে মানুষকে বর্শাতে বিধানো মাছের মতো আটকে ফেলেছে । বাঁশের অপরপ্রান্ত পাহাড়ের প্রায় কিনার ঘেসে জন্মানো বাঁশ ঝাড়ের সাথে আটকে আছে । অবাক করা ব্যাপায় হলো বাঁশ কখনো নিচু হয়ে থাকে না সাধারনত । কিন্তু যেভাবে বাঁশগুলো বেঁকে আছে তাতে মনে হচ্ছে ইচ্ছা করেই কেও এমনটা করেছে । অথবা বাঁশগুলোই নিচে নেমে এসেছে । আর দুজনের মধ্যে ডাঃ ইমরানের কন্ঠনালী এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে বের হয়েছে একটা গাছের ঢাল । ডাঃ ইমরানের শরীরটা জীপ থেকে দু ফুট পিছনে গাছের ডালটার সাথে অসহায় ভঙ্গিতে দুলছে । মুখ হা হয়ে আছে লোকটার , মুখের দুপাশ আর কন্ঠার ছিদ্রটা দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে , শরীর বেয়ে টপ টপ করে পরছে রাস্তার উপর । সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় আছে ডাঃ পিযূষ । তার শরীরের অর্ধেকটা জীপের ভিতরের দিকে আর বাকি অর্ধেক রাস্তার উপরে পরে আছে , তার ঠিক পেট বরাবর এসে পড়েছে জীপ থেকে খুলে আসা দুটো শিক , পা থেকে দেহের উপরের অংশ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে । আরেকটা শিক সোজা ঢুকে গেছে তার মাথার পিছন দিক দিয়ে , বাম চোখ ভেদ করে রাস্তায় গেথে আছে সেটা । ভয়াবহ দৃশ্যটা দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সবাই , হুশ ফিরতেই চিত্‍কার করে উঠলো মেয়েরা । ভয়ে , আতংকে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে সবার মুখ । জীপ থেকে নামলো সবাই । ডাঃ আসিফ আর ডাঃ জাওয়াদ এগিয়ে গেলো সামনে , মৃতদেহগুলো পরিক্ষা করলো । ডাঃ ইমরানের মৃতদেহটা নামানোর কোন ব্যাবস্থাই নেই , রাস্তা থেকে প্রায় ১০ ফুট উচুতে তার দেহ । বিস্ফোরিত চোখে এখনো লেগে আছে আতংক । নীলাকে এক হাতে আগলে ধরে আছে রুদ্র , মেয়েটা ফোপাচ্ছে তার বুকে মুখ গুজে । হটাত্‍ কি মনে হওয়াতে নীলাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেলো রুদ্র । মৃতদেহগুলো পরিক্ষা করলো । ডাঃ পিযূষের পায়ে একটা গভীর ক্ষত দেখতে পেলো , খুব চোখা কিন্তু ধারালো নয় এমন কিছু ঢুকেছিল এখানে । ঝট করে বাঁশঝাড়টার দিকে তাকালো সে । একটা বাঁশের চূড়ায় লাল একটা আভা দেখতে পেলো । ঢোক গিললো রুদ্র , গলা ভীষন শুকনো লাগলো হটাত্‍ । কেন যেন মনে হলো সমগ্র ব্যাপারটাই কেউ ইচ্ছে করে ঘটিয়েছে । মনে পরলো ডাঃ ইমরান ছাড়া সবাই জীপের মেঝেতে পেতে রাখা সিটে বসে ছিল । ডাঃ ইমরানের গলায় ডালটা ঢুকে যাওয়ায় সবার চিত্‍কারে সম্ভবত ড্রাইভার নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে । পাহাড়ের গায়ে সজোরে ধাক্কা দেয়ার ফলে হয়তো পাথরটা এসে পরে জীপটার উপর । বাকি যেসব আরোহী বেচে ছিল , তারা জীবন নিয়ে বাচার চেষ্টা করে কিন্তু বাঁশগুলো কোনভাবে নিচে নেমে আসে এবং তাদেরকে গেঁথে ফেলে । ডাঃ পিযূয ভাগ্যবান ছিল যার কারনে তার পায়ে লাগে বাঁশের আগা । কিন্তু জীপ থেকে নামার আগেই বিভত্‍সভাবে খুন করা হয় তাকে । যেন কেউ একজন খুব সতর্কভাবে একে একে মেরেছে সব সাক্ষীকে । হটাত্‍ জীপটার নাম্বারপ্লেটের দিকে নজর গেলো রুদ্রর , ধূলোর আস্তরন পরে তার অর্ধেকটা ঝাপসা হয়ে এসেছে , সেখানে লেখা "ঢাকা মেট্রো -ম-৬৬-৬" বাকি তিনটা সংখ্যা বালুতে ঢাকা । কিন্তু রুদ্র জানে বাকি তিনটা সংখ্যা ৬৬৬ । দ্য ডেভিল নাম্বার । এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেলো হটাত্‍ , খস খস করে কুতসিত শব্দ করলো বাঁশপাতাগুলো , আর নিজের অজান্তেই কেঁপে উঠলো রুদ্র ।

(চলবে)
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কলকাতায় নিয়মিত যারা যাতায়ত করেন তারা এই প্রশ্নের মূখোমুখি হবেন প্রায়ই।

লিখেছেন ইমরান আশফাক, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৩

আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে যারা কলকাতায় যাতায়ত করে থাকেন তারা স্হানীয়দের কাছেকি এই প্রশ্নটির মূখোমুখী হয়েছেন নিয়মিতভাবে: দেশভাগের সময় বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ আর ভারতকে দেয়া হয়েছিলো খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৯


আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×