somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যেভাবে জন্ম হয় একটি বইয়ের – গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মারকেজ (অনুবাদ)

১৫ ই জুলাই, ২০১৫ দুপুর ১২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই বইয়ের মোড়ক উল্টানো মাত্র যে বারোটি গল্প আপনারা পাবেন, তা লেখা হয়েছে প্রায় আঠারো বছর ধরে। গল্প আকারে প্রকাশের আগে এদের মধ্যে পাঁচটি পত্রিকার কলাম এবং সিনেমার চিত্রনাট্য হিসেবে ছাপা হয়েছে, আর একটির উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছিলো টেলিভিশন সিরিয়াল। আরও একটি গল্পের প্লট আমি পনেরো বছর আগে আমার এক বন্ধুকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেয়ার করি। ভদ্রলোক অন্যসব কথার সাথে প্লটটিও টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করে নিয়ে যায় এবং নিতান্তই ভদ্রলোকের মত তার পত্রিকায় ছাপিয়ে দেয়, আমার নামেই। তার সেই পত্রিকার লেখা থেকে গল্পটি উদ্ধার করে আমি আবার পুনরায় সেটা আমার মত করে লিখি। বইটি লেখা শেষ করে আমি অনুভব করছি- এই অদ্ভুত, জাগতিক সকল ব্যাখ্যার উর্ধে থাকা সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়াটিকে আমার ব্যাখ্যা করার একটা প্রয়াস নেয়া উচিৎ। এতে করে তরুণ যেসব লেখক এখনও বুভুক্ষের মত চেষ্টা করছে, লেখালিখিতে একটা লাইনঘাট বের করবার, তারা বুঝবে যে লেখালিখির নেশা কতটা কঠিন এবং সর্বগ্রাসী হয়।

প্রথম প্লটটি আমার মাথায় আসে ১৯৭০এর গোড়ার দিকে। বার্সেলোনায় যে পাঁচটি বছর কাটিয়েছি আমি, তারই কোন এক রাত্রে, ঘুমের মাঝে এক আলোকিত স্বপ্নের আকারে প্লটটি আমার কাছে ধরা দেয়। স্বপ্নে দেখি, আমার মৃত্যু হয়েছে। আমি নিজেই আমার শেষকৃত্যে এসে হাজির হয়েছি। শোকপোশাক পরে আসা আমার পুরাতন বন্ধুবান্ধবদের সাথে চুপচাপ হেঁটে বেড়াচ্ছি এদিকসেদিক, যদিও আমার মনে চাপা প্রফুল্লতা। কারণ বহুদিন পর আমি আমার পুরনো বন্ধুবান্ধবদের সাথে একত্রিত হতে পেরেছি। আমার মৃত্যু আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে ল্যাতিন আমেরিকার আমার শৈশব- কৈশোরের সেসব বন্ধুদের সাথে দেখা করবার, যাদের সাথে আমার দেখা হয়নি বছরের পর বছর। সে যাক, অনুষ্ঠান শেষ হল। যে যার মত করে ফিরবে এখন। আমিও তাদের সাথে চলে আসবার চেষ্টা করতেই তাদের একজন আমাকে স্মরণ করিয়ে দিল – “এটা তোমার শেষকৃত্য ছিল বন্ধু। তুমি আর ফিরে আসতে পারবে না”। মৃত্যু জিনিসটা আসলে কি- মৃত্যু আমার স্বপ্নে এসে দেখা দিয়ে প্রথমবারের মত তা আমায় বুঝিয়ে গেল। মৃত্যু মানে আর কখনোই নিজের বন্ধুবান্ধবদের সাথে একত্রিত হতে না পারা।

জানি না কেন, আমার মনে হল, এ স্বপ্নের মধ্য দিয়ে আমি আমার ব্যাক্তিসত্ত্বাকে, আমার লেখক পরিচয়কে নূতন করে আবিষ্কার করলাম। বুঝতে পারলাম যে সময় এসেছে ইউরোপে বাস করা ল্যাতিন অ্যামেরিকানরা যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়- তাকে লেখনীর মাধ্যমে তুলে আনার। আমার জন্যে ছিল এ এক অসাধারণ স্বস্তির আবিষ্কার। কারণ, মাত্রই আমি আমার এযাবৎকালীন সবচেয়ে পরিশ্রমসাধ্য এবং দুঃসাহসী কাজ –The Autumn of the Patriarch শেষ করেছি। এরপর লেখালিখি নিয়ে কোন পথে এগোবো, আমার কোন ধারণা ছিল না।

পরবর্তী দুইবছর ধরে আমার ঝুলিতে জমা হওয়া অভিজ্ঞতার ওপর যে প্লট বা আইডিয়াগুলো এসেছে, আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে কেবল নোট নিয়ে গেছি। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না যে এগুলো লেখার যে গুরুদায়িত্ব, তা ঠিক কোনদিক থেকে শুরু করে কোনদিকে গিয়ে শেষ করব। এমনও দেখা গেছে যে আমার মাথায় গল্পের প্লট এসেছে কিন্তু, সে রাতে আমার কাছে কোন নোটবুক নেই । আমাকে তখন আমার বাচ্চারা আমাকে তাদের পিয়ানোর স্টাফ নোটেশন লেখা একটি বই ধার দিলে আমি তার উলটো পীঠে আমি সেই প্লটগুলো লিখে রাখা শুরু করি। পরবর্তীতে আমাদের এদিক সেদিক বেড়াতে বের হবার সময় বইটা আমি বাচ্চাদের স্কুলব্যাগের ভেতরেই রেখে দিতাম, হারিয়ে যাবার ভয়ে। এভাবে মোটমাট চৌষট্টিটি আইডিয়া এত নিখুঁত ডিটেলস সহ আমার নোট করা হয়ে গেল যে বাকি রইল কেবল ঠাণ্ডামাথায় বসে লেখার কাজ শেষ করা।

১৯৭৪ সালে আমি বার্সেলোনা থেকে আবার ম্যাক্সিকোতে ফেরত আসার পর আমার মনে হয়, আমার সংগৃহীত আইডিয়াগুলোকে উপন্যাসে পরিণত করবার বদলে পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্তের ঘোঁট পাকিয়ে ওদেরকে গল্পে পরিণত করা দরকার। গল্পগুলো হবে পত্রিকার কলাম লেখার মতই – কিন্তু অনেক অনেক কাব্যিকতার সংমিশ্রণে। এর আগে আমার ছোটগল্পের তিনটি সংকলন বেরিয়েছে, কিন্তু প্রতিটি সংকলনের গল্পগুলো ছিল খাপছাড়া। মানে, তাদের একটা গল্পের সাথে আরেকটা গল্পের কোন সম্পর্ক নেই। তাই আমার মনে হল, কোনক্রমে যদি এই চৌষট্টিটা গল্পকে আমি একই ছাঁচে ফেলে তৈরি করতে পারি, তবে এটা বিশ্বজুড়ে পাঠকদের মনে চিরস্থায়ী একটা জায়গা করে নেবে। এক সংকলনে একই বুনটের চৌষট্টিটা গল্প – ভাবা যায়!

প্রথমদুটো গল্প – “The Trail of Your Blood in the Snow” এবং “Miss Forbes’s Summer of Happiness” - দ্রুতই লেখা হয়ে গেল আমার, ১৯৭৬ সালের মধ্যে। গল্পগুলো ছাপিয়েও ফেললাম এদিকসেদিক। একটানা লিখে যাচ্ছিলাম আমি , কিন্তু তৃতীয় গল্পটা, যেটা আমার মৃত্যুর পর শেষকৃত্য নিয়ে ছিল- সেটা লিখবার সময় আমি অনুভব করলাম, আমি একদম হাঁপিয়ে পড়েছি। এতটাই ক্লান্তি এসে ভর করেছে আমার ওপর, যেটার তুলনা হয় কেবলমাত্র একটা নূতন উপন্যাস শুরু করবার ক্লান্তির সাথে। কাজেই সেই গল্প বাদ দিয়ে আরেকটা গল্পের ওপর কাজ শুরু করলাম। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, এখানেও একই অবস্থা! এগুলো শেষ করবার জন্যে আমি এনার্জিই পাচ্ছি না! কেন এই অবস্থা হয়েছিল- উত্তরটা তখন আমার জানা ছিল না, কিন্তু এখন জানি।

একটা ছোটগল্প লিখবার জন্যে যে পরিশ্রম করতে হয়, তা অনেকটাই একটা নূতন উপন্যাস শুরু করবার মতই। বিশেষ করে গল্পের প্রথম প্যারাটা তৈরি করতে হয় খুবই যত্ন সহকারে। কারণ গল্পের structure বা গঠন, tone বা ভাষ্য, style বা আঙ্গিক, রিদম বা ছন্দ, length বা দৈর্ঘ, এমনকি মুখ্য চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলিও সেই প্রথম প্যারাতেই ফুটিয়ে তুলতে হয়। এই কাজটা ঠিকঠাক মত শেষ করতে পারলে গল্পের বাকি অংশ গল্প বলার আনন্দেই তরতরিয়ে এগোয়। সেটা বর্ণনাতিত এক আনন্দময় অভিজ্ঞতা!
একটা উপন্যাস লেখার পর যে অনেকেই বারবার সেটা এডিট করবার কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে চায় না, তার কারণ হল একটা উপন্যাস শুরু করবার পর সেটা শেষ করতে যতটুকু কষ্ট, একটা গল্প লিখে শেষ করবার পর একেবারে প্রথম থেকে আবার এডিট করে আসাটাও প্রায় সমপরিমাণের কষ্ট। এদিকে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে কিন্তু ঘটনা ভিন্ন। ছোট গল্পের কোন শুরু বা শেষ নেই- হয় একটা ছোটগল্পের প্লট কাজ করবে, অথবা কাজ করবে না- এ দুইয়ের মাঝামাঝি কখনো কিছু হবে না।

এরকম একটা প্লট নিয়ে বেশ কিছুদূর এগোনোর পর যদি দেখি সেটা আর কাজ করছে না- তখন কি করা উচিৎ? আমার অভিজ্ঞতা বলে, তখন গল্পটি অন্য আরেক ডিরেকশনে বা অভিমুখে পরিচালিত করা উচিৎ। অর্থাৎ, গল্পের অভ্যন্তরীণ অন্যকোন একটি বার্তাকে মূল লক্ষ্য বানিয়ে আস্তে আস্তে সেদিকে গল্পটি নিয়ে যাওয়া। এতেও যদি কাজ না হয়, তাহলে কি করবো? আমি বলি, প্যাড থেকে সুন্দর মত কাগজগুলি টেনে আলাদা করে সেগুলি দিয়ে গোল্লা পাকান আর বাজে কাগজ ফেলবার ঝুড়িতে ছুঁড়ে ফেলুন! কার লেখায় যেন পড়েছিলাম, এখন আর ভদ্রলোকের নাম মনে পড়ছে না –“ একজন লেখককে পাঠকেরা ভালো লেখক হিসেবে স্মরণে রাখে তার ছুঁড়ে ফেলে দেয়া অখাদ্য প্লটগুলোর কারনেই, ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত লেখার জন্যে নয়”। এ ক্ষেত্রে সত্য কথাটি স্বীকার করি, আমি আমার সেই প্রথম ড্রাফটগুলো ছিঁড়ে ফেলে দেই নি বটে, তবে করেছিলাম তারচেয়েও বাজে কিছু। আস্তে আস্তে আমি ভুলেই যাই প্লটগুলোর কথা।

আমার মনে আছে, ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ঝড়ে বিধ্বস্ত জাহাজের মত প্লট লিখে রাখা সেই স্টাফ নোটেশনের বই ম্যাক্সিকোতে আমার ডেস্কের ওপর পড়ে ছিল। একদিন, অন্য কি একটা জিনিস খুঁজতে গিয়ে আমার হঠাৎ মনে পড়ে, বইটাকে আমি বেশ কয়েকদিন যাবত আর দেখছি না। সেই মুহূর্তে ব্যাপারটা অত গুরুতর না মনে হলেও পরে যখন আমার টেবিলে গিয়েও আমি বইটা খুঁজে পেলাম না, তখন আমি সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গেলাম। ঘরের প্রতিটি কোনা তন্ন তন্ন করে খোঁজা হল। প্রতিটি আসবাব টেনে হিঁচড়ে দেখা হল, বইয়ের তাক থেকে প্রতিটি বই বের করে ছুঁড়ে ফেলা হল মেঝেতে, পাছে কোন বইয়ের ফাঁকে সেটার দেখা মেলে। এমনকি আমাদের গৃহ পরিচারিকা এবং আমার সব বন্ধুবান্ধবকেও তলব করা হল, যদি ভুলে তাদের কেউ নিয়ে গিয়ে থাকে। কিন্তু কোন চিহ্নই নেই! সম্ভাব্য এবং যুক্তিযুক্ত একমাত্র যে ব্যাখ্যাটি আমার মাথায় এলো, তা হচ্ছে – বাজে আইডিয়া কৃচ্ছতাসাধন অভিযানের শিকার হয়ে বইটির ঠিকানা হয়েছে আস্তাকুঁড়েতে।

তার প্রতিক্রিয়া আমার উপর যা হল, তাতে আমি নিজেই বিস্মিত হয়ে গেলাম! চারবছর ধরে যেসব গল্পের প্লট আমি একরকম অযত্নে অবহেলায় ধুলোর মাঝে ফেলে রেখেছিলাম, সেগুলো পুনরুদ্ধার এখন আমার সম্মানের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো। যেকোনো মুল্যে আইডিয়াগুলো পুনরায় দাঁড় করবার প্রচেষ্টাটা ছিল আমার যেকোনো উপন্যাস লেখার মতই কঠোর এবং একনিষ্ঠ পরিশ্রমের ব্যাপার। যা হোক, কোনক্রমে ত্রিশটি গল্পের প্লট ঘসেমেজে তৈরি করতে পারলাম। এর মধ্যে থেকে যেগুলোকে কোনভাবেই গল্পে পরিণত করা যাবে না বলে মনে হল, কোন দয়ামায়া দেখানো ছাড়াই সেগুলোকে পুনরায় ছুঁড়ে ফেলে দিলাম ডাস্টবিনে। এভাবে করে বাঁচল আঠারোটি গল্পের প্লট। এইবার আমি কোন ছাড়াছাড়ি ব্যাতিরেকে একটানা গল্পগুলো লিখে শেষ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেও শীঘ্রই আবার আবিষ্কার করলাম, আমি ওগুলো লিখবার অনুপ্রেরণা পাচ্ছি না। তরুণদের আমি বরাবরই প্রস্তাব দেই, এমতাবস্থায় ঐ প্রকল্প বাদ দেয়াই উত্তম, কিন্তু আমি নিজে করলাম তার ঠিক বিপরীত। গোঁয়াড়ের মত জেদ ধরে ঝুলে রইলাম গল্পগুলোর পিছে।

১৯৭৯এ এসে যখন আমি Chronicle of a Death Foretold লিখা শুরু করলাম, আমি খুঁজে বের করলাম সমস্যার মূল হোতা। পূর্বের বই লিখে শেষ করবার পর লম্বা সময় ধরে যে বিরতি নিয়েছি আমি, তাতেই আমার লেখালিখির হাত খারাপ হয়ে গেছে। এখন আমি নূতন যা ই লেখা শুরু করতে চেষ্টা করি, আমার কষ্টে দমবন্ধ হয়ে আসে। এই দুঃসহ অবস্থা থেকে ফিরে আসতে আমি ১৯৮০ সালের অক্টোবর হতে নিয়ে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকাগুলোতে শিল্পসাহিত্যের সমালোচনামূলক একটি সাপ্তাহিক কলাম লেখা আরম্ভ করি। এই কঠোর অভ্যাস আমার ফাঁড়া কাটিয়ে লেখালিখির হাত পুনরায় খুলে দিল। এরপর, আমি দ্বিতীয় সমস্যা চিহ্নিত করলাম। গল্পগুলো যে আমার এতদিনেও লেখা শেষ হচ্ছে না, তার কারণ প্লটগুলোর সাহিত্যের শ্রেণী বা জেনার ঠিক করতে আমার ব্যার্থতা। আমার মনে হল, ওগুলো আসলে গল্প নয়, বরং পত্রিকার কলাম হবার কথা। এভাবে, সেই আঠারোটি প্লটের পাঁচটির ওপর পাঁচটি কলাম দাঁড়িয়ে পত্রিকায় ছাপাও হয়ে গেল। তারপর মাথায় এলো আরেক চিন্তা- পত্রিকার কলাম নয়, আসলে এগুলোর ওপর সিনেমা হওয়া উচিৎ! এভাবেই আমার প্লটগুলো বিচিত্র চিন্তার জাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়ে পত্রিকার কলাম এবং সিনেমায় পরিণত হয়েছিল।

এতেও যদি সুরাহা হত! পত্রিকার কলাম এবং সিনেমা হিসেবে বড়পর্দায় আসার পর ঐ প্লটগুলো সংক্রান্ত আমার চিন্তাভাবনা একটু বদলে গিয়ে মাথার ভিতরে অন্য আকৃতিতে জমা হয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো লেখতে বসে যাই। এইবার, এইবার সবগুলো গল্পের একটা ড্রাফট তো প্রস্তুত হল, তবে সে জন্যে আমাকে খুব সতর্কভাবে সিনেমার পরিচালকেরা প্লটগুলো থেকে সিনেমা বানানোর সময় ঐগুলোতে যে নিজস্ব সৃষ্টিশীল মোচড় দিয়েছে, তার প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হয়েছে। আমি গল্পগুলো শেষ করবার নিজস্ব একটা পদ্ধতিও আবিষ্কার করে ফেললাম। তাহল – একটানা একটা গল্প লিখে শেষ করার চেষ্টা না করা, বরং পাঁচটা গল্পই একসাথে চালিয়ে যাওয়া। একটা লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে অন্য একটায় চলে যাওয়া এবং পরে পুনরায় আগের গল্পে ফিরে আসা। পরবর্তী একবছরে আঠারোটি প্লটের আরও ছয়টি প্লট আমার কাগজ ফেলবার ঝুড়িতে ঠাই পেলো। আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, তাতে আমার শেষকৃত্যের যে স্বপ্ন- সেই প্লটটাও বাদ পড়েছে। স্বপ্নে যেভাবে ঘটনাটি এসেছিল – সেই প্রাণবন্ততা, সেই বিষণ্ণ সজীবতা আমার পক্ষে লেখায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয় নি। বাকি গল্পগুলো শেষ করবার পর মনে হল, এগুলোর ভাগ্যে ভালোকিছুই অপেক্ষা করে আছে। পাঠকের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে রবে এরা।

গল্পগুলি যখন আবার আমি এক এক করে পড়া শুরু করলাম সে ছিল পুনরায় এক বিস্ময়কর অবস্থা! যে স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে গল্পগুলো দাঁড় করবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম আমি , লেখা শেষ হবার পর দেখি গল্পগুলোর সাথে তার কোন সম্পর্কই নেই! আমি কোনভাবেই আমার প্রাথমিক চিন্তার সাথে, যে ঘটনাসূত্রের মাধ্যমে আইডিয়াগুলির জন্ম হয়েছে তাদের সাথে গল্পগুলির চূড়ান্ত আকারকে মেলাতে পারছিলাম না। সত্য স্মৃতিগুলোকে লাগছিল দূরে বসে দাঁত কেলিয়ে হাসতে থাকা প্রেতের মত। আর কল্পনার জগত এতটাই বাস্তব বলে মনে হচ্ছিল যে একপর্যায়ে তারাই মহাসমারোহে বাস্তব ঘটনার জায়গা দখল করে নিল! আমি বুঝতে পারলাম, সবকিছুর উর্ধে আমার সমস্যা ছিল আমার ইয়োরোপে কাটিয়ে আসা দিনগুলির যে স্মৃতি, তার প্রতি সবসময় একটা সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করা। অবশেষে বইটাকে চূড়ান্তরূপে ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করবার জন্যে যে অনুপ্রেরণা আমার দরকার ছিল, আমি তা পেয়ে গেলাম। সেটা হল – ইয়োরোপের দিনগুলির ব্যাপারে বাস্তবঘেঁষা নয়, বরং বাস্তব ও কল্পনার মিশেলে তৈরি সম্পূর্ণই নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি।

আমি আট মাস সময় হাতে নিয়ে সবগুলো গল্প আবার আদ্যোপান্ত লিখলাম। বিশবছর আগে, ইয়োরোপের যে স্মৃতিগুলো আমার মাথায় জমা হয়ে আছে- তার কতটুকু সত্যি আর কতটুকু মিথ্যা, এ নিয়ে সন্দেহ দূর করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই কোনটা বাস্তব আর কোনটা কল্পনা – সে চিন্তা থেকে আমি নিজেকে মুক্তি দিলাম। বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা বা বেড়িবাঁধ ও একই সঙ্গে তুলে নিলাম আমার লেখা থেকে। এরপরে লেখা এত গতি পেল যে, আমি অনুভব করছিলাম, শুধুমাত্র একেকটা গল্প বলার আনন্দ থেকেই আমি ভুতের মতোন লিখে চলেছি! এটা এমন একটা আনন্দ, যার যথোপযুক্ত তুলনা করা যায় কল্পনায় উড়ে বেড়াবার অনুভূতির সাথে। আর যেহেতু গল্পগুলো লিখছিলাম আমি একটা থেকে আরেকটায় জাম্প করে করে, আমার পুরো বিষয়বস্তু সম্পর্কে এমন একটা সামগ্রিক ধারণা চলে এসেছিল যে প্রতিটি গল্প থেকে অপ্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু ছেঁটে ফেলতে গিয়ে আমার দু’বার ভাবতে হয় নি। এছাড়া কোন গল্পের প্লটের তথ্যগত সত্যতা নিয়েও এমন তুমুল কোন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েও আমার আর যেতে হয় নি, যা আমার কোন গল্প লেখার স্পৃহাকে খেয়ে ফেলতে পারে। এভাবেই , আমি মনে করি , জন্ম নেয় আমার গল্পগুলো, যেগুলি একত্রে ও বিচ্ছিন্ন ভাবে একে অপরের খুব ঘনিষ্ঠ।

শেষ করতে চাই এই বলে, আমার কাছে প্রতিটি গল্পের শেষ ভার্শনটি তার আগের ভার্শন থেকে উন্নততর। তাহলে কেউ বুঝবে কি করে – কোন ভার্শনটি তার গল্পের শেষ ভার্শন? কোন চেইন ফুডশপ যেমন তাদের রান্নার রেসিপিকে কারো সাথে শেয়ার করতে চায় না, গল্পের নির্মাণ এবং পুনঃনির্মাণ সংক্রান্ত এই ব্যাপারটাও তেমনি একটা ব্যাবসায়িক সিক্রেট! শুধু এতটুকু বলি যে, পাকা রাঁধুনি যেমন ভাত চড়ানোর পর একটা ভাতে টিপ দিয়েই বুঝতে পারে কখন ভাত নামাতে হবে, তেমনি একজন পাকা গল্পকারও বুঝতে পারেন- কখন গল্পে কাটছাঁট করা থামাতে হবে। পঞ্চইন্দ্রিয়ের কোন কারবার নেই এতে, সবই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের খেলা!

তবে হ্যাঁ, বই আকারে বেরোবার পর আমি আর এই গল্পগুলো পড়ছি না। শুধু এই বই নয়, আমি আমার কোন বইই পড়ি না, কারণ আমার আফসোস হয়- ছাপার অক্ষরে যা বেরিয়েছে, তার থেকে আরও ভালো করে বইটা লেখা যেত। কাগজ ফেলবার ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে এসে গল্পগুলোযে বই আকারে প্রকাশিত হচ্ছে, এতেই আমি যারপরনাই খুশী!

(আমার অনূদিত এই লেখাটি গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মারকেজের ছোট গল্পের সংকলন Strange Pilgrims এর prologue । গল্প লেখার খুঁটিনাটি অনেক টেকনিক শেয়ার করা আছে বলে অনুবাদ করে সবার সঙ্গে শেয়ার করতে উদ্বুদ্ধ হলাম)

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০২১ দুপুর ১২:১৬
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কঠিনতম সব চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপির ভবিষ্যৎ কি অন্ধকার??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১০



বিএনপির সামনে অনেক কঠিন সব চ্যালেঞ্জ...

তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে দ্বিমুখী বিরোধী-দলীয় রাজনীতি বা কর্মকাণ্ড (যেটা কিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি)।

জামাত-এনসিপি যতই লীগের ফিরে আসার বিরুদ্ধে বিএনপির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার নানা মরহুম শাহাবুদদীন মাহমুদ জায়গীরদার

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:২৫



আমার আম্মার সেঝ চাচা’র লেখা ‘My life is not mine’ বইটি পড়ছি। বইটিতে ‘মাইজম ভাই’ নামের একটি অধ্যায় আছে। এতে সেঝ নানা আমার নানার বিভিন্ন সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যু পেরিয়ে আবার ব্লগে------

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৬




প্রায় ০৩ মাস হয়ে গেলো ব্লগে আসনা হয় না, আসা হয়না মানে লিখা হয়না। প্রিয়জনের মৃত্যু শোক কাটিয়ে ব্লগে উকি দেওয়া হয় কিন্তু পোস্ট দেওয়া হয় না।


গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×