somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খোয়াবনামা এবং আনন্দমঠ - তুল্যমূল্য পাঠ

০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খোয়াবনামা পড়া শেষ হল। এত বৃহৎ পটভূমিতে সৃষ্ট এ আখ্যানের ব্যাপারে হুট করে একটা- দু'টো কথা বলা মুশকিল। তবে যেহেতু বইটা পড়ে শেষ করলাম মাত্রই, বইটি থেকে আমার কিছু understandings share করাটা এই মুহূর্তে প্রয়োজন বোধ করছি।
.
খোয়াবনামা উপন্যাসের যে দিকটির ব্যাপারে আমাকে আমার পড়ুয়া কমরেডরা আগে থেকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তা হল - আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এই বইটি ১৯৪৭ এবং তার পূর্ব পরের ইতিহাস - তথা সিপাহি বিপ্লব - ফকির-সন্ন্যাসীদের লড়াই ইত্যাদির "বঙ্গদেশীয়" ন্যারেটিভ। "বঙ্গদেশীয়" - এই sense এ যে, ফকির বিদ্রোহের একটা বর্ণনা আমরা বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসে পাই। আবার দেশভাগের ইস্যুতে এপিক উপন্যাস পূর্ব-পশ্চিম লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। বঙ্কিম এবং সুনীল - দু'জনেই পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক। ফলে তাদের সাহিত্যকর্মের একটা রাজনৈতিক অবস্থান আগে থেকেই নির্দিষ্ট থাকে। যখন একটা বিষয় সম্পর্কে আপনাকে একটি নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়ার মত অবস্থানে আসতে হয়, তখন আপনার দুপক্ষেরই বয়ান শুনতে হবে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা আপনাকে বাংলাদেশি বাঙ্গালীদের, '৪৭ এর আগে যাদের মূল পরিচয় ছিল ন্যাড়া ও ম্লেছের জাত - তাদের বক্তব্যটি শোনার ব্যাবস্থা করে দেয়।
.
সরাসরি উপন্যাসে যদি যাই, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বঙ্কিমের আনন্দমঠে বর্ণিত ফকির- সন্ন্যাসী এবং ম্লেছ- মুসলিমদের সাংঘর্ষিক অবস্থানের বয়ানের প্রতিবাদ করেন খোয়াবনামার ৩৭ নং চ্যাপ্টারে। এক জমিদারের কাছারিঘরে আলাপরত নায়েববাবু ও তার এক হিন্দু প্রজার সংলাপ পড়ে দেখা যাক। নায়েববাবু বলছেন -
.
"-'কিন্তু সন্ন্যাসীরা তো ছিল মুসলমানের শত্রু, সে খবর রাখো?'
-'না বাবু।'
- 'তুমি বেশী জানো?' সতীশ মুক্তার কেষ্ট পাল (প্রজা) কে ধমক দেয়, ' সন্ন্যাসীরা ম্লেছদের ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দিয়েছিল, তা জানো? আনন্দমঠ পড়েছো?'
-'না বাবু। বলে কেষ্ট পাল তার আনন্দমঠ না পড়ার তথ্য এবং সতীশ মুক্তারের কোথায় অবিশ্বাস প্রকাশ করে এক সঙ্গে, ' হামাগরে ভবানী সন্ন্যাসীর সেনাপতি আছিলো এক পাঠান... ফকির মজনু শাহ আছিল ফকির রাজা, আর সন্ন্যাসির দলের রাজা আছিল ভবানী সন্ন্যাসী।'
-'কোথাকার রাজা হে? নাটক নভেল না পড়লে কি হয়, ইতিহাস বেশ মেলা পড়েছ।"
.
অর্থাৎ আনন্দমঠে যেখানে স্বাধীনতাকামী সন্ন্যাসীরা মুসলিমদের অপছন্দ করতো এবং সুযোগ পেলেই খড়গহস্ত হত বলে যে বক্তব্য বঙ্কিমচন্দ্র রেখেছেন , ওটাকে "নাটক- নভেল" - তথা মনগড়া কাহিনী উল্লেখ করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে ফকির- সন্ন্যাসী, নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলিমরা একত্রেই জোট বেঁধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী এক নায়েবের মুখ দিয়ে স্বীকারও করিয়ে নিচ্ছেন যে, এটাই ইতিহাস।
.
একই অধ্যায়ে নায়েববাবু আর টাউনের আরেক উচ্চবর্ণের সনাতন ধর্মাবলম্বী অনিল স্যান্যালের কথোপকথনের একটা অংশ উদ্ধৃত করি। নায়েব বাবু বলছেন -
.
"রিলিজিয়ন যে খুব বড় ফ্যাক্টর তা নয়। কিন্তু দে বিলং টু এ ডিফারেন্ট কালচারাল লেভেল। উই ক্যানট লিভ টুগেদার। ইম্পসিবল।"
.
লেখক-পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, উপন্যাসের সবচে' গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। একদিকে সদ্য ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া সমাজের নিচু তোলার মুসলিমরা "লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান" - এর নাড়া তুলছে, আর সমাজের উঁচু জাতের ক্ষমতাশীল, শিক্ষিত সনাতন ধর্মাবলম্বী নায়েব বলছেন - ধর্মীয় নয় বরং সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারনে হিন্দু- মুসলিম এক সাথে বসবাস সম্ভব নয়।
.
এই জায়গাটি নিয়ে একটা বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছা আমার আছে। নিদেন পক্ষে একটা উপন্যাস এ নিয়ে লেখাই যায় যে সংস্কৃতিগত পার্থক্য অবিভক্ত ভারতের হিন্দু ও মুসলিম সমাজের মধ্যে বিদ্যমান থাকার কারণে শত শত বছরের একত্রে এক ঠাই এ থাকার পাঠ চুকল আমাদের, সেটা ২০১৬ সালের প্রেক্ষিতে আসলে কতটুকু বিদ্যমান, ভারতে এবং বাংলাদেশে।


.
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০২১ দুপুর ১২:০৮
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কারখানা বাঁচাতে পারিনি, তাই মানুষকে অটো চালাতে হচ্ছে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩৪


বাংলাদেশে এখন এমন এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক সংকট চলছে, যেখানে একজন শ্রমিক কারখানায় বিদ্যুৎ না পেয়ে চাকরি হারিয়ে অটো রিকশা চালাচ্ছেন। সেই অটো আবার চার্জ দিতে বিদ্যুৎ খাচ্ছে। যে বিদ্যুৎ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা কে রাখলে এমনি হবে...দাদা, যতদিন পারেন রাখেন

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২



২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানটি ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে (Hindon Air... ...বাকিটুকু পড়ুন

খারাপটা কোথায়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪


বিশ্বখাতায় নাম লিখিলাম পাগল
কবিতারা হেসেই মাঠে হয়ে যায় ছাগল;
ঘাস খাওয়া আনন্দটা অন্যরকম
তবু পাগল বলে কথা, পূর্ণিমায় যুগল;
আজ কাল হাঁটবাজারে হিংসাটা
কম মূ্ল্যেই বিক্রয় হচ্ছে! যোগোপযোগি
সময়টা পাগল ছাড়া চলেই না
লেখার খাতার দামটাও... ...বাকিটুকু পড়ুন

আম্লিগ যদি আসে তাহলে ....... :(

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৬



বিএনপি। আপনারা ১৭ বছর ঘরে থাকতে পারেন নাই কিন্তু এখন যদি আবার আম্লিগ ফিরে আনেন তাহলে আপনারা তো দূরের কথা আপনার বাড়ির মাটিও থাকবে না। আপনার ঘর-দরজা থাকবেনা। শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরকাল কেন পাই না?

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫২

বিল গেটস এর নামে একটা কথা প্রচলতি আছে; জানি না কথাটা বিল বলেছে কি না, তবে আমার কাছে মাঝে মাঝে কথাটা সত্য মনে হয়। কথাটা এমনঃ আমি কোন কাজ করবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×