
যখন এ লেখাটি আমি আমার ল্যাপটপে টাইপ করছি, তখন মুষলধারে বৃষ্টিতে ঢাকার পথঘাট আপ্লুত। যদি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এখনো আল্লাহর রহমতে কিছু পয়সা থাকে, যদি করোনার অজুহাতে বেতন বন্ধ করে না দেয়া হয়, বা চাকরি থেকে ছাটাই না করে দেয়া হয়, যদি পরিবার পরিজন সবাই সুস্থ - সাবলীল থাকে, আর এ সবকিছুর সঙ্গে যদি থাকে বারান্দা/জানালা দিয়ে দেখার মত এক চিলতে ঢাকার আকাশ আর দৃশ্যাবলী, তবে মাঝদুপুরে ঢাকার সড়কে এ অঝোরধারে বৃষ্টিপাত উপভোগ করবার মত বিলাসিত এই মুহূর্তে আর কি ই বা হতে পারে!
সে বৃষ্টিবিলাসই করছি এ মুহূর্তে, কিন্তু মাথায় ঘুরছে জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের কথা। গতকাল রাতে, আমাদের অনেকের মতই স্যার প্রাক সেহরি ঘুমের উদ্দেশ্যে শয্যাশায়ী হয়েছিলেন, কিন্তু আমাদের মত স্যারের আর সেহরি খেতে ওঠা হয় নি। ওনার বাড়ির লোকজন ওনাকে ঘুম থেকে উঠাবার জন্যে একাধিকবার ডাকার পরেও যখন ওনার সাড়া পেতে অক্ষম হন, তখন ওনার কলাবাগানের বাড়ি থেকে স্যারকে স্কয়ার হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। দুঃখের বিষয়, স্যার ততখনে আসলে আমাদের মাঝে আর নেই। খবরটা আমি জানতে পাড়ি আজ সকালে এক ছাত্রের মাধ্যমে, অনলাইনে ক্লাসের মাঝে।
আমার সংক্ষিপ্ত জীবনে আমি বেশ কিছু বড় মানুষের সাহচার্য পেয়েছি। তাদের কারো সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিল, কারো সাথে সম্পর্ক ছিল কর্মসূত্রে। কারো সাথে সম্পর্ক হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী, কারো সাথে ফরমাল কাজটুকু শেষ হবার পর আর যোগাযোগ থাকে নি। জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের সাথে আমার পরিচয় ও সম্পর্ক কর্মসূত্রেই। আমার শিক্ষকতাজীবনের প্রথম ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রধান ছিলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে সদ্য মাস্টার্স শেষ করে রিসার্চে সময় দিচ্ছি, টুকটাক কনফারেন্সে পেপার প্রেজেন্ট করছি, আর ইউনিভার্সিটির চাকরির কোন বিজ্ঞাপন দেখলে পত্রিকায় লাল কালি দিয়ে গোল গোল দাগ দিয়ে দিন কাটাচ্ছি। এরকম অবস্থায় আমার প্রথম ডাক আসে ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিক থেকে। জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার তখন তার ভিসি।
মনে পড়ে ইন্টার্ভিউ কক্ষে ঢোকার সময় আমার সব সার্টিফিকেট, আর অফিশিয়াল কাগজপত্র ছাড়াও হাতে ছিল আমার প্রকাশিত দুটো বই। কে যেন পরামর্শ দিয়েছিল আমাকে, এখন ঠিক মনে নেই যে - প্রকাশিত সব কাজই হাতে এক কপি করে রাখতে। সে সূত্র ধরেই আমার দুটো ফিকশান সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। বোর্ডের সবাই নানারকম প্রশ্ন করছেন, জামিল স্যার এরমধ্যেই হঠাৎ আমার সামনে টেবিলের ওপর রাখা কাগজপত্রের দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন - ওগুলো কার বই? উত্তরে আমি যখন বললাম যে আমারি, স্যার আগ্রহ সহকারে আমার হাত থেকে বইদুটো চেয়ে নিয়ে দেখলেন। বিষয় সংশ্লিষ্ট, বিষয় বহির্ভূত নানারকম প্রশ্নের মুখোমুখি হতে তো হয়েছিলই, সব প্রশ্নেরই যে খুব সন্তোষজনক উত্তর দিতে পেরেছিলাম, ব্যাপারটা তেমনও নয়। কিন্তু ইন্টার্ভিউর একমাস পর যখন আমার জয়েনিং লেটার মেইল করা হল, তখন স্পষ্টতই বুঝেছিলাম, কেবল রেজাল্টে কিংবা কেবল গতানুগতিক চিন্তাধারায় নয়, আমার সিলেকশনের পেছনে আমার মননশীল কাজও মুল্যায়িত হয়েছে, এবং এ কাজটি করেছেন জামিল স্যার নিজেই। হাতে, বা টেবিলের ওপরে রাখবার পর বোর্ডের সবার চোখেই পড়েছে আমার বইপত্র, কিন্তু কারোকাছে বিষয়টির কোন আলাদা গুরুত্ব ছিল না, স্রেফ জামিলুর রেজা চৌধুরী ছাড়া। জামিল স্যারকে পরবর্তী দু'বছর পেয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরূপে, আমি যখন এশিয়া প্যাসিফিকে ইংরেজি বিভাগে নবীন প্রভাষক। এ দু'বছরে স্যারের নেতৃত্বে দেখেছি আনঅর্থোডক্স সিদ্ধান্তের দ্বারা অনেক জটিল জটিল ও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সমস্যার চটজলদি সহজতর সমাধান।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্ফুরণকালীন সময়ের উপাচার্য ছিলেন জামিল স্যার। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি যে আজ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে অন্তত রিসার্চের দিক থেকে অসম্ভব ডায়নামিক একটি ইউনিভার্সিটি, তার পুরো ব্লু প্রিন্ট জামিল স্যারের মস্তিষ্কপ্রসূত। তার আগে বুয়েটেও স্যার কৃতিত্বের সাথে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও নানা প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। বাংলাদেশের এ অন্যতম পুরাকৌশলির নকশায় যে কেবল বড়বড় দালানকোঠা, স্থাপনা ও ব্রিজ - কালভার্ট নির্মিত হয়েছে, তা তো নয়, তিনি গড়ে তুলেছেন অনেক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক হিসেবে ক্লাসরুমের নিবিড় পরিচর্যায় গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠানের মত বড় বড় মানুষ।
ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিক যখন ধানমণ্ডির বিবিধ ভাড়াবাড়িতে স্ক্যাটারড অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে, সেই অবস্থায়, আবারো একটি প্রতিষ্ঠানের স্ফুরণকালীন সময়ে তার দায়িত্ব নেন জামিল স্যার। যদিও স্যারের আগ্রহ ছিল না, বিবিধ সরকারী ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের দায়িত্বে এমনিতেই জামিল স্যার প্যাকড ছিলেন, কিন্তু ইউএপির তৎকালীন ভিসি আবদুল মতিন পাটোয়ারী স্যার, যিনি বুয়েটে জামিল স্যারের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন, তার অনুরোধে জামিল স্যার তার স্থলাভিষিক্ত হন। চার বছরের মাথায় ফার্মগেটের নিজস্ব সুদৃশ্য নয়তলা ইউনিফাইড ক্যাম্পাসে ক্লাস নেয়া শুরু করে ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিক। আমার নিজেরও শিক্ষকতার যাত্রা শুরু ঐ ক্যাম্পাসেই।
জয়েন করার পর স্যারের সাথে মাঝেমাঝেই দেখা হত, লিফটে, সিঁড়িতে, ক্যাম্পাসের গ্রাউন্ডে। অত্যন্ত কড়া প্রশাসক, কিন্তু সদা হাস্যজ্জল একজন মানুষ ছিলেন তিনি। কখনোই কর্কশ কণ্ঠে কথা বলতেন না, মৃদুভাষী ছিলেন, কিন্তু ভদ্রভাবেই খুব স্পষ্ট করে দিক নির্দেশনা দিতেন। ভিসি ছিলেন, কিন্তু পুরো ক্যাম্পাস জুড়েই ছিল স্যারের বিচরণ। ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকের উল্লেখযোগ্য এমন কোন প্রোগ্রাম ছিল না - যাতে স্যারের উপস্থিতি থাকতো না। নতুন সেমিস্টারের শুরুতে নবীন ছাত্রছাত্রীদের বরন করে নেয়ার দিন স্যারের বক্তৃতা শুনবার জন্যে অপেক্ষায় থাকতাম আমরা। আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে, স্যার একুশে পদকের সম্মাননায় ভূষিত হবার পর এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির তরফ থেকে স্যারকে দেয়া সংবর্ধনার কথা। কি প্রাঞ্জল একটা অনুষ্ঠান ছিল সেটা! স্যার বলেছিলেন, একুশে পদক পাওয়ার পর তিনি সরকারি - বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের থেকেই সংবর্ধনা পেয়েছেন, কিন্তু ইউএপি থেকে তাকে দেয়া এই সংবর্ধনার আন্তরিকতার কোন তুলনা নেই। সেই অনুষ্ঠানেই স্যার ঘোষণা করেন যে - জীবনের বাকি দিন গুলো তিনি ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকের সাথেই কাটিয়ে দেবেন। স্যার তার কথা পূর্ণ করলেন। আমৃত্যু ভিসি থেকেই ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকের সাথে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কচ্ছেদ করলেন তিনি।
স্যারের সাথে আমার শেষ ব্যক্তিগত আলাপচারিতা আজ থেকে দু' বছর আগে, যখন আমি এশিয়া প্যাসিফিক ছেড়ে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগে জয়েন করি। রেজিগ্নেশন লেটার জমা দেয়ার পর জামিল স্যারের রুম থেকে ডাক পড়ে। স্যার জিজ্ঞেস করেন - চলে যেতে চাচ্ছো কেন। আমি উত্তর দিই যে - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ফকরুল আলম স্যার এখন ইস্ট ওয়েস্টে প্রোভিসির দায়িত্ব নিয়েছেন, আর আমি দু' কলম যা পড়ালেখা শিখেছি, তা ফকরুল স্যারের কাছে, কাজেই ওনার কাছ থেকে ডাক পাওয়ার পর সেটা ফেলা আমার পক্ষে মুশকিল। শিক্ষকের প্রতি আমার অনুরাগে খুশী হন জামিল স্যার। স্যার আমাকে আর থেকে যেতে বলেন না।
রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এটা ছিল আমার আর জামিল স্যারের শেষ কথোপকথন,
- 'স্যার, এটা আমার জন্যে অনেক বড় গর্বের বিষয় যে আমি আমার শিক্ষকতা জীবন আপনার অধীনে শুরু করতে পেরেছি।'
- 'গর্বের বিষয় ঠিক আছে, কিন্তু আজ যাওয়ার দিনে এই কথা বলছ, আগে তো কখনো বলনি।'
- 'সাহস হয় নি স্যার। কিন্তু আমি জানতাম, আমরা জানতাম, আমাদের মাথার ওপর ছাদ হয়ে আপনি বরাবর আছেন ...'
স্যার মৃদু হাসেন। আমি সালাম দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসি।
সেই জামিল স্যার আমাদের ছেড়ে গেলেন আজ দিবাগত রাতে। এদিকে দুপুর থেকেই প্রবল বৃষ্টি। স্যারের পরিবার থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে বাদ জোহর ধানমণ্ডি জামে মসজিদে স্যারের জানাজার কথা। জানি না এই বৃষ্টির মধ্যে স্যারের জানাজা সংঘটিত হচ্ছে, নাকি পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিষণ্ণ লাগছে খুব। এমন বৃষ্টিস্নাত করোনার দিনে স্যারের মহাপ্রস্থানে স্যারের প্রতি সম্মাননা প্রদর্শনে আমাদের অপারগ করে দিলো। ধর্ম নিজ কায়দায় হাজার হাজার বছর ধরে বহতা নদীর মত প্রবাহিত হয়, তবুও ধর্মগুরুদের শেষকৃত্যে আবেগীয় স্ফুরনে মানুষের ঢল নামে। এদিকে জলজ্যান্ত একটি দেশ কিন্তু চেতনায় প্রবাহিত হয় না, কামারের মত পরিশ্রম করে একটি দেশ, একটি জাতিকে গড়েপিটে নিতে হয়। মুক্তিযুদ্ধত্তোর বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন, বাংলাদেশকে আজকের রূপে নিয়ে আসার পেছনে আমৃত্যু প্রত্যক্ষ - পরোক্ষ ভূমিকা রেখে চলা এই মহান মানুষ, জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের দেহাবশানের দিনটি এত করুণ, নির্জন, আড়ম্বরবিহীন হবে, ভাবতেই কষ্ট লাগে।
আসুন, আজকের প্রার্থনায় আমাদের দেশ ও মাটির এ সেরা সন্তানকে আমরা বিশেষভাবে স্মরণে রাখি, এবং তার স্পিরিটকে নিজেদের মাঝে ধারন করি।
(উপরের ছবিটি ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকের ক্লাব ফেয়ারের। আমার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইউএপি লিটেরারি ক্লাবের স্টলে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথোপকথনরত জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

