somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ত্রিশহাজার টাকা মূল্যমানের একটি প্রেমের গপ্পো

০৩ রা মে, ২০২০ বিকাল ৪:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গল্পের পেছনের গল্প

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস, ভ্যালেন্টাইনস ডে'র দিন কয় আগে - দাঁড়িয়েছিলাম টিএসসির পার্শ্ববর্তি ডাচ - বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে, লাইনে। দীর্ঘ লাইন। মানুষের ভিড়। শুধুমাত্র করোনার ভীতিটাই ছিল না মানুষের মনের মাঝে। তাই লাইনে দাঁড়িয়েও কারো মধ্যে খুব উশখুশে ভাব নেই। তাড়াহুড়ো নেই। টিএসসি এলাকার রঙ্গিন আশনাই সবার চোখে। বসন্তের বাতাসে ভালোবাসার ঘ্রাণ। এরমধ্যেই খুবই রঙচঙে টিশার্ট আর ক্যাপ মাথায় একটা ছেলে লাফাতে লাফাতে সামনে এসে লাইনে দাঁড়ানো সবার হাতে একটা করে লিফলেট ধরিয়ে দিতে লাগলো। দেখি, দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে কাগজ। জীবনে বেশীরভাগ সময়ই লিফলেট হাতে এসে পৌঁছানোর পর তা আমাদের হাতে থাকে গড়ে ত্রিশ সেকেন্ড। তবুও সে কাগজ ফসকে গেলে মনে হয় কি যেন মিস হয়ে গেলো। যাহোক, সে কাগজ শেষ হয়ে যাওয়ার পূর্বেই আমার হাতে এসে পৌঁছালো। রঙ্গিন লিফলেটে দেখা গেল কালের কণ্ঠ পত্রিকা ও ওয়ালটন ইলেক্ট্রনিক্সের যৌথ পরিসরে আয়োজিত ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে প্রেমের গল্প লেখার একটা প্রতিযোগিতার খবর।

খুচরো কিছু প্রেমের গপ্পো আমার ল্যাপটপে প্রায়ই জমা হয়ে থাকে। বাসায় ফিরে তারই একটা খুঁজে বের করে ঝেড়েমুছে সাফসুতরো করে মেইল করে দিলাম লিফলেটের ঠিকানা বরাবর। দু'সপ্তাহ পরে ফোন এলো কালের কণ্ঠ অফিস থেকে - আমার গল্প প্রথম দশজনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। আরও ন'জনের সাথে পুরস্কৃত করা হবে আমাকে, এই উপলক্ষে অনুরোধ করা হল কালের কণ্ঠের বসুন্ধরা অফিসে একটা নির্দিষ্ট তারিখে যেন উপস্থিত থাকি।

হলাম উপস্থিত। গিয়ে দেখি, আমার আগে আরও কয়েকজন প্রতিযোগী বসে আছেন। সম্ভাব্য পুরস্কার কি হতে পারে , এটা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। কেউ একজন বলল - পুরস্কারে নাকি স্মার্টফোন আছে। শুনে ভাবলাম, বেশ! প্রায়ই রিকশায় বসা অবস্থায় মোবাইল ফোনের রিং বাজলে আমি আর আমার রিকশাপুলার ভাই একসঙ্গে পকেটে হাত দিই। ব্যাপারটা এমন না যে পয়সার অভাবে স্মার্টফোন ইউজ করি না, অহেতুক নেট আসক্তি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা স্বরূপ স্মার্টফোনে বৈরাগ। তবে পুরস্কার হিসেবে মুফতে পেলে ক্ষতি কি? নিজে ইউজ না করি , বাবা/মা/বোনকে দিয়ে পরে তাদের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করা যাবে সংসারের রেস্পন্সিবল বড়ছেলে হিসেবে! পরে কে জেনো বলল - থার্ড পুরষ্কার টেলিভিশন, সেকেন্ড পুরস্কার ফ্রিজ। এটা শুনে আমি ফ্রিজ। তখন গোপীবাগে ভাড়া বাসায় থাকি। বসুন্ধরা থেকে গোপীবাগে কোন বাসে কিভাবে যাবো, সেইটা নিয়ে ধারণা নাই; যদি কপালে ধ্রিম করে একটা ফ্রিজ এসে পড়ে - তবে সেটা কান্ধে করে এখান থেকে গোপীবাগ কিভাবে যাবো আল্লাহ মালুম। মনে মনে বলা শুরু করলাম, আল্লাহ, আমি তোমার নেক বান্দা, আমার চাওয়া বরাবরই কম। মোটামুটি রকমের একটা মোবাইল হইলেই আপাতত চলবে, পকেটে ফেলে বাসায় নিয়ে যাওয়া যাবে।

কালের কণ্ঠ - ডেইলি সান অফিসের গ্রাউন্ড ফ্লোরের ওয়েটিং রুমে বসে বড় বড় মশার কামড় খাচ্ছি, আর টাস টাস চড়চাপড়ে দুটো একটা মশা মারার চেষ্টা করছি, এমন সময় ওপর থেকে ডাক এলো। লাঞ্চের ব্যবস্থা ছিল যদ্দুর মনে পড়ে। একটু পরে ইমদাদুল হক মিলন সাহেব আসলেন, ওয়ালটন গ্রুপের এমডি সাহেব আসলেন, আমাদের সবাইকে নিয়ে প্রায় সচিবালয়ের কনফারেন্স রুমের মত ঝকঝকে একটা কনফারেন্স রুমে নিয়ে গিয়ে গোলটেবিল বৈঠক শুরু হল। বসুন্ধরা গ্রুপের অর্থকড়ির ব্যাপারে খুব সামান্য একটা প্রত্যক্ষ ধারণালাভের ঐ আমার প্রথম সুযোগ। ছাত্রজীবনে ডেইলি সানে অল্প কিছুদিন সাব এডিটরের চাকরি করেছিলাম অবশ্য। তখনই বুঝেছিলাম সৃষ্টিশীল লেখা আর সাংবাদিকতা দুটো পুরো ভিন্ন জগত, এবং দ্বিতীয় জগতটি আমার জন্যে না। পরবর্তীতে বিবিধ জাতীয় দৈনিকে লিখলেও রিপোর্টিং এর ভূত মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
যা হোক, ইমদাদুল হক মিলন সাহেব লেখক হবার জন্যে পড়ার প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা শুরু করলেন। হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দা সি উপন্যাসের ঐ বিখ্যাত ডায়লগ আওড়ালেন, কি কনটেক্সটে, এখন আর মনে নাই - But man is not made for defeat. A man can be destroyed but not defeated. আমি বললাম স্যার এই বই আমার পড়া। উনি বললেন - ও , তাইলে তো উপযুক্ত মানুষই আমাদের কম্পিটিশনের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে! ওনার কথা শুনে এ ওর মুখের দিকে তাকায়। আয়োজকেরা খুক খুক কাশি দেয়। কারণ তখনও কে কোন প্রাইজ পেয়েছে তা ঘোষণা করা হয় নাই। আগেই রেজাল্ট আউট। আমি বললাম মনে মনে আবারো বললাম আলহামদুলিল্লাহ। মূলত এই কারণে যে, প্রথম পুরস্কার যাই হোক, আমারে আজকে অন্তত একটা ফ্রিজ কান্ধে কইরা ঢাকা শহরের একমাথা থেকে আরেকমাথায় যাইতে হবে না।

পাইলাম একটা ল্যাপটপ। পুরস্কারের ছবিতে মিলন সাহেবের ডান পাশে ওয়ালটনের এমডি, তারপাশে আমি। যদিও সবাই ল্যাপটপটারে ঘিরে এমনভাবে দাঁড়ানো, যেন ছোট বেলার সেই ছড়া - 'এক কাপ চা, সবাই মিলে খা' এই টাইপের কিছু। কে দিচ্ছে, কি দিচ্ছে, কারে দিচ্ছে - ছবি দেখে বোঝার কোন জো নাই। যাই হোক, এভাবে অবশেষে ল্যাপটপটা আমার হস্তগত হল। সিএনজিতে উঠে দেখি প্যাকেটের লক খোলা। কেউ আগে উইজ করেছিল, নাকি সব ঠিক আছে কিনা চেক করার জন্যে তার কাভার খুলে দেখা হয়েছিল যন্ত্রটা, ঐ মুহূর্তে বোঝা সম্ভব হয় নি। কিন্তু আজ যেহেতু প্রায় তিনবছর ধরে ল্যাপটপ সার্ভিস দিয়ে চলেছে, তাই আমার কোন আপত্তি নাই। ল্যাপটপটা ছোটবোনেকে দিয়ে দিসি। ও খানিকটা অযত্নের সাথে ব্যবহার করে, সময় মত চার্জে দেয় না - এই নিয়া একটু আফসোস লাগে মাঝে মাঝে। আর সব ঠিক আছে।

এই গল্পের পেছনের গল্পের কথা যখন মনে হয়, তখন মজাই লাগে। মনে হয়, ঐ দিন ঐ সময়ে ঐ জায়গায় দাঁড়িয়ে না থাকলে হয়তো গল্পটা আজ বলা হত না। জীবন এরকম কত ছোট ছোট কো ইনসিডেন্সের সমন্বয়, ভাবতে ভালো লাগে।

নীচে ত্রিশ হাজার টাকা মূল্যমানের একটি প্রেমের গপ্পো, হে পাঠক, আপনার নিমিত্তে, একদমই ফ্রি।



ছয় তারে ভালোবাসা

সে ছিল এডগার এলেন পোর মানস প্রেয়সী এনাবেল লির অন্ধভক্ত, আর আমি ছিলাম বনলতা সেনের শাশ্বত প্রেমিক। সে ছিল ৩.৮ সিজিপিএ-ওয়ালা ক্লাস টপারদের একজন, আমার সিজিপিএ কেউ জিজ্ঞেস করলেই একগাল হেসে বলতাম, কেন লজ্জা দিচ্ছেন ভাই? সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কন্যাটি যখন প্রাইভেট কার থেকে নেমে ক্লাসে প্রবেশ করত, পুরো ক্লাস যেন ঝলমল করে উঠত! আর আমি যখন ক্লাসে ঢুকতাম, জানালায় বসা দাঁড়কাকটা ভাবত, ‘ছোকরার এলোমেলো চুলে একবার বাসা বাঁধতে পারলে শীতকালটা বেশ আরামে কেটে যেত!’ তার জন্মের সময় ঢাকা শহরে তুষারপাত হচ্ছিল কি না জানা নেই, তবে আমার জন্মের সময় খুবসম্ভব কারেন্ট চলে গিয়েছিল— নতুবা এই গায়ের রং হয় কী করে!

এত বৈপরীত্যের মধ্যেও সেই অলিম্পাসের চূড়া থেকে কিভাবে ওর নাম লেখা কিউপিডের ছোড়া তীর নির্ভুলভাবে আমাকেই বিদ্ধ করে, সে প্রশ্নের জবাব মনে হয় না স্বয়ং সিগমুন্ড ফ্রয়েডও দিতে পারতেন!

উঁহু, বাবা! প্রকৃতি কোনো অসামঞ্জস্য সহ্য করে না। সে বড় নির্দয় বিচারক! কয় দিনই বা ক্লাস শেষে ওর পিছু পিছু ছবির হাটে লুকিয়ে-চুরিয়ে ঘুরেছি? বড়জোর মাস দেড়েক! এরই মধ্যে হঠাৎ করে একদিন পেছন দিক থেকে এসে আমার কলার চেপে ধরল :

‘আমার পিছু নিস ক্যান প্রতিদিন, ক্লাস শেষ হলে?’
বিকেলের নরম রোদ বড় আয়েস করে এলিয়ে পড়েছিল ওর গালে, মুখে, ঠোঁটে!

একেই কি বলে শ্রাবস্তীর কারুকার্য?

‘প্রতিদিন না, আজই এলাম, তা-ও তোমার পিছু পিছু না’, আমি কাঁচুমাচু মুখে মিথ্যের ডালি সাজাই—‘শুনেছি, আজ এখানে সুররিয়ালিস্টিক পেইন্টিং এক্সিবিশন হবে!’

‘ছবির হাটে আজ সুররিয়ালিস্টিক পেইন্টিং এক্সিবিশন’, ওর ভ্রু কুঁচকে যায়—‘জানতাম না তো?’

হঠাৎ আমার দিকে কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে—

‘বল, দু-একজন সুররিয়ালিস্টিক পেইন্টারের নাম বল।’

আমার ভ্যাবাচেকা খাওয়া মুখ দেখে ও খুশি হয়ে যায়। আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অবলীলায় বলে দিই,

‘আর্নস্ত চে গুয়েভারা! ওই যে একটা ছবি আছে না—মাথায় বিপ্লবীর টুপি আর একমুখভর্তি দাড়ি নিয়ে দূরে কোথাও বিষণ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এক লোক, সেটাই তার আঁকা সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি!’

আমি অধীর চিত্তে অপেক্ষা করি কিছুক্ষণ। শ্রাবণের প্রথম বাদলধারার মতো ওর মুখচ্ছবি হাসিতে উদ্বেল হয়ে ওঠে মুহূর্তের জন্য। ওর এই হাসি দেখার জন্য আমি আজীবন কেবলাকান্ত সেজে থাকতে রাজি আছি—ও কি তা জানে?

হঠাৎ থেমে গিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আমাকে যাচ্ছেতাই বলে অপমান করে সবার সামনে! আমি তার কিছু শুনি, কিছু শুনি না। যা বলে তার খুব অল্পই বুঝি, বেশির ভাগই বুঝি না। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি, ও হেঁটে চলে যায়, একবারের জন্যও ফিরে তাকায় না।
নাকি তাকায়? কে জানে!

তারপর আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ শীতকালটি আসে। আমি ক্যাম্পাস বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিই। আলমারির কোণ থেকে টেনে বের করি ধুলাজর্জরিত গিভসন গিটারখানা। টুংটাং সুর তুলি তাতে—কিছু কর্ড সার্কেল, কমল ভাইয়ের গিটার ক্লাসে শেখা পুরনো কিছু লেসন প্র্যাকটিস করি। সর্বোপরি চেষ্টা করি ওকে মন থেকে শিফট চাপ দিয়ে ডিলিট বাটন প্রেস করার মতো পার্মানেন্টলি ডিলিট করতে।
পারি আর কই!

আমার লিরিক লেখার খাতায় জমে ওঠে একটি, দুটি করে নতুন কিছু গান। তাতে সুর বসাই।

কিছুটা বন্ধুদের আহ্বানে আর অনেকটাই প্রাণের টানে ফিরে আসি আবার ক্যাম্পাসে। এবার আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী আমার গিটারখানা।
বন্ধুদের নতুন কম্পোজ করা গানগুলো শোনাই। টিএসসি, হাকিম চত্বরের চায়ের দোকান ও আশপাশের জায়গা সরগরম হয়ে ওঠে গানের সুরে।

সেই ছেলেবেলা হতে মনের খাতায় কতশত আঁকিবুকি
স্বপ্ন আমার নাটাই ছেঁড়া ঘুড়ি,
গায়ক নায়ক কত কিছু হওয়া এক জীবনের খাতায়
বন্ধু মহলে ভীষণ বাহাদুরি!
আজ শেষ বিকেলের আলোয় আমার একটাই খালি চাওয়া
চাইলেই তুমি দিতে পারো সহজেই
ভার্সিটির প্রতিটি বিকেল তোমার স্মৃতিতে নাওয়া
দাও একটা বিকেল যাতে তুমি মিশে নেই,
মিশে নেই......’

বন্ধুবান্ধবদের গান পছন্দ হয়। অনেকেই শিখে নেয় গানটা। অনেকেই জিজ্ঞেস করে—গানটা কাকে নিয়ে? আমি মৃদু হাসি। ওরা আমার হাসির অর্থ পড়তে পারে না। বিরক্ত হয়, প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়।

আমি সচেতনভাবে ওকে এড়িয়ে চলি! ও যে রাস্তা দিয়ে হাঁটে, আমি তার উল্টো রাস্তা ধরি। কখনো-সখনো একদম এড়াতে না পারলে জ্যাকেটের হুডি দিয়ে চেহারা ঢেকে ফেলি।

এক সকালে ডিপার্টমেন্টের করিডরে এসে দেখি, দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ও। ওর বিপরীতে, দোতলার বাউন্ডারিতে আমারই গিটার হাতে বসা আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু অতনু। ডিপার্টমেন্টের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে আসছে আমার খুব চেনা একটা সুর, প্রিয় কিছু শব্দ—

আজ শেষ বিকেলের আলোয় আমার একটাই খালি চাওয়া
চাইলেই তুমি দিতে পারো সহজেই
ভার্সিটির প্রতিটি বিকেল তোমার স্মৃতিতে নাওয়া
দাও একটা বিকেল যাতে তুমি মিশে নেই...

আমি আমার হারানো প্রেমের চোখে এমন দুর্লভ মায়াবী একটা চাহুনি দেখলাম অতনুর প্রতি, যা একটিবার, সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্যও যদি আমার জন্য হতো, আমি ধন্য হতাম!

বিকেলে টিএসসিতে অতনু গিটারটা ফেরত দিতে এলে আমি হাসিমুখে তা ফেরত নিই। ও চলে গেলে সবার সামনে গিটারটা শক্ত পাথুরে মেঝেতে আছড়ে ভাঙি। আমার সুর আমার পিঠে ছুরি বসিয়েছে। আমার আর গান লেখার শখ নেই!

দিনকয়েক পরের ঘটনা। শীত প্রায় শেষ, বসন্ত হয় হয়। মধ্যে আবার ক্যাম্পাসে যাইনি প্রায় এক সপ্তাহ। হঠাৎ একদিন সাতসকালে কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ভাঙে। আমি আবার লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমানোর পাঁয়তারা করছি, এমন সময় আম্মুর ডাকে বিছানা ছেড়ে উঠতে হয়। এই ভোরবেলা কে নাকি দেখা করতে এসেছে আমার সঙ্গে!

ড্রয়িংরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আমি একদম জমে যাই পুরোপুরি!

‘কী রে ক্যাবলা, রাগ করেছিস আমার ওপর?’

আমার হতভম্ব অবস্থা দেখে ও-ই প্রথম মুখ খোলে। ওর হাতে সুন্দর করে র্যাঠপিংপেপারে মোড়ানো ওটা কী? দেখে তো গিটার মনে হচ্ছে!

ও আমার ইঞ্চিখানেক দূরত্বে এসে দাঁড়ায়। মধ্যে থাকে কেবল একটা গিটার, র্যা পিংপেপারে মোড়া সুদৃশ্য সেই গিটার!

‘আমাকে নিয়ে গান লিখিস লুকিয়ে লুকিয়ে, আমাকে বলিসনি কেন?’ ও যুদ্ধাংদেহী ভাব ধারণ করে! আমি কাঁচুমাচু করি। ও আরো কাছে সরে আসে, আমি সন্ত্রস্ত হই—

‘আম্মু আছে বাসায়!’

‘তাই না? আমাকে নিয়ে যখন গান লিখিস, তখন তোর মা এসে পিটুনি দেয় না?’ ও আমার পিঠে মৃদু কিল দেয়।

‘একটুতেই এত রাগ? অতনু না হয় একবার গানই শুনিয়েছে আমাকে, তাই বলে নিজের গিটার ভেঙে ফেলেছিস।’ ও আবার মেকি রাগের ভাব দেখায়—‘কত পয়সা খসালি আমার দেখ!’

আমার হাতে গিটার তুলে দিয়ে ও একটু দূরে দাঁড়ায়—

‘চে গুয়েভারা, অ্যাঁ? তা বিপ্লবী, অস্ত্রের বদলে গিটার কেন তোমার হাতে?’

‘যে যুদ্ধের যা অস্ত্র’, মৃদু হেসে বলি আমি!

সেদিন প্রথমবারের মতো এনাবেল লির হাত বনলতা সেনের প্রেমিকের হাতে মুঠোবন্দি হয়। চোখে চোখে বলা হয়ে যায় মাসখানেকে জমানো অনেক না-বলা কথা।

বন্ধু মহল এখনো আমাকে জিজ্ঞেস করে, সেদিন এনাবেল লির অধরে বনলতা সেনের প্রেমিকের অধর মিলেছিল কি না। আমি মুচকি হেসে বলি—সে গবেষণা জাতির বিবেকই করুক!
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০২১ রাত ১১:০৮
২১টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাদা নীল জার্সি

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪২


গায়ে ভাই রে সাদা নীল জার্সি
গন্ধ বাতাসে উম্মুখ হয়ে আছি;
কখন হবে- কণ্ঠ নালীর মিছিল-
তারপর- তারপর- সজোরে কিক
গোল- গোল শব্দটা আনন্দ মুখর!
আমার জার্সির রঙগুলো আত্মহারা
রাতজাগা পাগলাপাড়া ফুটবল খেলা
নয়ন জলে টলমলে- স্মৃতির... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাইরে এসো

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬

এসো, বৃত্তবদ্ধ খাঁচা ছেড়ে বাইরে এসো,
কল্পনাতীত উদাত্ত আকাশে চোখ পেতে
দুজনে বসি ঘাস গালিচাতে আজ পাশাপাশি ,
দেখ, পুস্প-ফলে বৃক্ষদের একাগ্র তপস্যা
দেখ, পূর্নিমাকে অর্থ দেয় বিপরীত অমাবশ্যা ।

দেখ, সাপ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রীবর্গের দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত নয় কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"হে কাবা! তুমি কতই না উত্তম, তোমার সুঘ্রাণ কতই না চমৎকার! তোমার মর্যাদা কতই না মহান! তবে সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একজন মুমিনের জান,... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পর্শে_ _ _ _ _

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০

-কি পাও আমার মাঝে ?
-দুটি চোখ।
যেখানে আমার সর্বসুখ নিহিত,
ছমছমে সন্ধ্যা, ভয় জাগানিয়া অন্ধকার রাত,
এসব বৃথা হয়ে যায়,
তোমার একটি ছোঁয়ায়।
তোমার চোখের একটি পলক, আমার হাজার বছর,
আর কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×