শহরের কোলাহল থেকে দূরে, সবুজে ঘেরা একটি ছোট মফস্বল শহরে থাকে ১২ বছরের রোমান । আর দশটা ছেলের মতো শুধু ভিডিও গেম বা কার্টুনে পড়ে থাকে না। সে সুযোগ পেলেই বাগানে উঁকি দেয়, ঘাসের ওপর ফড়িংয়ের পিছু ছোটে। রোমান যেন প্রকৃতির এক পরম বন্ধু। বড় বড় দালানের চেয়ে বটগাছের ছায়া তাকে বেশি টানে।
রোমানের খালামণি একটি পুরনো সরকারি কলেজে পড়ান। সেই কলেজের ক্যাম্পাসটা যেন একটা আস্ত জঙ্গল। বিশাল সব পুরনো গাছ সেখানে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিন ছুটির দুপুরে রোমান তার খালামণির সাথে সেই কলেজে বেড়াতে গেল। আর সেখানে তার জীবনের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো।
কলেজের প্রধান ফটক দিয়ে ঢোকার পর কিছুটা এগোতে রোমান থমকে দাঁড়াল। একটি বিশাল গাছ, যার কাণ্ড থেকে অদ্ভুত সব ডালপালা সাপের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে বেরিয়ে এসেছে। আর সেই ডালগুলোতে থোকায় থোকায় ফুটে আছে অদ্ভুত সুন্দর কিছু ফুল। রোমান এর আগে অনেক ফুল দেখেছে— গোলাপ, টগর, জবা। কিন্তু এমন ফুল সে কখনো কল্পনাও করেনি।
রোমান অবাক হয়ে খালামণিকে জিজ্ঞেস করল, “খালামণি! এটা কী ফুল? এ তো দেখতে একদম সাপের ফণার মতো!”
খালামণি হেসে বললেন, “ঠিক ধরেছিস। এই ফুলের নাম নাগলিঙ্গম। এটি বাংলাদেশে খুব একটা দেখা যায় না। হাতেগোনা কয়েকটি জায়গায় এই গাছ আছে।”


রোমান মুগ্ধ হয়ে ফুলটির দিকে তাকিয়ে রইল। ফুলটির পাপড়িগুলো বেশ শক্ত আর মাংসল, গায়ের রঙটা লালচে-গোলাপি। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো ফুলের মাঝখানের অংশটি। মাঝখানে সাদাটে রঙের অসংখ্য কেশর এমনভাবে বাঁকানো, যা দেখতে একদম ফণা তোলা সাপের মতো। সম্ভবত এই কারণে এর নাম হয়েছে ‘নাগলিঙ্গম’।
রোমান খেয়াল করল, শুধু দেখতে সুন্দর নয়, ফুলটির গন্ধও ভারি চমৎকার। খুব কড়া নয়, আবার খুব হালকাও নয়; এক ধরনের স্নিগ্ধ মিষ্টি গন্ধ চারদিকের বাতাসকে মায়াবী করে তুলেছে। রোমান দেখল, অনেক মৌমাছি আর প্রজাপতি সেই ফুলের চারপাশে ভিড় করছে।
রোমান তার পকেট থেকে ডায়েরি বের করল। সে যেখানে যায়, নতুন কিছু দেখলে টুকে রাখে। খালামণি তাকে বলতে লাগলেন এই গাছের ইতিহাস। “রোমান , জানিস? এই গাছটির আদি বাড়ি কিন্তু আমাদের দেশে নয়। এটি দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বন থেকে এসেছে। সেখান থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি 'ক্যাননবল ট্রি' নামেও পরিচিত, কারণ এর ফলগুলো দেখতে একদম ‘ক্যানন বল’ বা কামানের গোলার মতো বড় আর শক্ত।”
রোমান জানল যে, এটি একটি অনেক পুরনো বংশের গাছ। যদিও এই গাছে বড় বড় ফল ধরে, কিন্তু সেই ফল সরাসরি খাওয়া যায় না। তবে এই গাছের অনেক ওষুধি গুণ আছে। পাতা আর ছাল থেকে অনেক রোগের ওষুধ তৈরি হয়।
সারাদিন ধরে রোমান গাছটির নিচে বসে রইল। সে দেখল, গাছটি কত বিশাল! যেন কোনো এক প্রাচীন ঋষি ধ্যান করে দাঁড়িয়ে আছেন। শহরের যান্ত্রিক জীবনে সে যখন হাঁপিয়ে ওঠে, তখন এই ধরনের গাছ তাকে প্রাণ দেয়।
রোমান মনে মনে ভাবল, "মানুষ কেন শুধু গাছ কাটে? এই নাগলিঙ্গম গাছটি যদি না থাকত, তবে এত সুন্দর ফুল কি আর দেখা যেত?" সে ঠিক করল, বড় হয়ে সে এমন অনেক গাছ লাগাবে যেগুলো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
সেদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে রোমানের মনটা এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল। সে তার খালামণিকে বলল, “খালামণি, আমি আবার আসব এই গাছটাকে দেখতে। যখন এর ফলগুলো কামানের গোলার মতো বড় হবে, তখন দেখতে খুব মজা হবে, না?”
বাড়ি ফিরে রোমান তার ডায়েরিতে বড় বড় করে লিখল: ‘অবাক নাগলিঙ্গম’। সে বুঝতে পারল যে, প্রকৃতি আমাদের কত কী দেয়ার জন্য বসে আছে, শুধু আমাদের দেখার চোখ থাকতে হয়।
সেই রাতে রোমানের স্বপ্নে বারবার ফিরে আসলো সেই অদ্ভুত সুন্দর নাগলিঙ্গম। সে যেন অবিরাম পাচ্ছে নাগলিঙ্গম ফুলের সেই মিষ্টি ঘ্রাণ আর শুনতে পাচ্ছে বাতাসের দোলায় ঝরে পড়া তার পাপড়ির শব্দ।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




