১
স্বাধীনতার পর ৪০ বছর পার হয়েছে। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর উত্তাল সময় এখন শুধু ইতিহাসের পাতায়, কারো বা স্মৃতির অ্যালবামে। রাজধানী ঢাকা এখন আর সেই আগের মতো নেই। চারদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ন, ধুলোবালি আর ইট-পাথরের ধূসর দালানকোঠা। অয়ন, এক তরুণ সাংবাদিক, এই যান্ত্রিক শহরের একটি দৈনিক পত্রিকায় কাজ করে। তার বর্তমান কাজ হলো তার নিজ এলাকার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি প্রোফাইল তৈরি করা। কাজটা করতে গিয়ে সে এক ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি হলো। বিভিন্ন পুরোনো আর্কাইভ এবং জাতীয় সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে নানা বিতর্ক চলেছে। অয়ন যখন সরকারি গেজেট এবং স্থানীয় তালিকাগুলো মেলাতে বসল, তার চোখ কপালে উঠলো ।
তালিকায় সে এমন অনেক নাম দেখল যুদ্ধের সময় যাদের কোনো সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। সংবাদপত্রের ভাষায় এরা ‘অ-মুক্তিযোদ্ধা’ বা ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’। অয়ন নথিপত্র ঘেঁটে দেখল, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিংবা অর্থের বিনিময়ে অনেক অযোগ্য ব্যক্তি নিজেদের নাম এই তালিকায় লিখিয়ে নিয়েছে। যেখানে প্রকৃত অনেক মুক্তিযোদ্ধা আজও লোকচক্ষুর আড়ালে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে, সেখানে এই সুযোগসন্ধানীরা রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা, সন্তানদের জন্য কোটা সুবিধা এবং প্লট বরাদ্দসহ নানা সুযোগ-সুবিধা অনায়াসে ভোগ করছে।
অয়ন যখন তার এলাকায় অনুসন্ধান শুরু করল, সে দেখল অনেক প্রকৃত যোদ্ধা সম্মানের ভয়ে মুখ খুলছে না। কেউ রিকশা চালাচ্ছে, কেউ ছোট দোকান দিয়ে জীবন পার করছে। অথচ তালিকার শীর্ষে থাকা অনেকে যুদ্ধের সময় ঢাকায় ছিল না, কিংবা সরাসরি হানাদারদের দোসর হিসেবে কাজ করেছিল। আর্কাইভের পুরোনো রিপোর্টগুলো বলছে, বারবার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রতিবার রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ‘ভুয়া’ নাম যুক্ত হয়েছে।
অয়নের মনে হলো, এই পাথরের জঙ্গলে শুধু দালানই বড় হচ্ছে না, মানুষের বিবেকও পাথর হয়ে যাচ্ছে। যে মানুষগুলো দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিল, তাদের নাম এখন জালিয়াতদের পাশে। কাগজপত্র দেখে অয়নের মনে হয়, আমরা কি সত্যিই স্বাধীন হয়েছি? নাকি আমরা শুধু শাসক বদলেছি, শোষণের পদ্ধতিটা নয়?
অয়ন ঠিক করল, সরকারি তালিকার ধূসর অলিগলি থেকে বেরিয়ে সে বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। যে তালিকা নিয়ে এত বিতর্ক, সেই তালিকার সত্যতা যাচাইয়ের চেয়েও বড় কাজ এখন তার সামনে । তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করা। এই উদ্দেশ্য নিয়ে সে ঢাকা শহরের অলিগলিতে ঘুরতে শুরু করল।
২
পুরনো ঢাকার রাস্তা মানে সরু গলি। এখানে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস আজও বাতাসে ভাসে। এখানে এক গুমোট বিকেলে সে খুঁজে পেল একটি জীর্ণ, প্রায় ভেঙে পড়া দালান। দালানটির দেয়ালগুলো থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, যেন কোনো এক বৃদ্ধ তার ক্ষতচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অয়ন থমকে দাঁড়াল। তার মনে হলো, এটি শুধু ইট-কাঠের কোনো কাঠামো নয়, এ যেন ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়।
সেখানে বয়স্কদের সাথে কথা বলে অয়ন যা জানতে পারল তা তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিলো। পুরনো বাড়িটির মালিক এস. এস. এম. এ. রায়হান। আলী রায়হানের পুত্র। স্বাধীনতার আগে, ১৯৬৮ সালে আলী রায়হান মারা যান। এরপর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ রায়হানের উপর। ১৯৭১ সালে যখন হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলার ওপর, তখন রায়হান আর স্থির থাকতে পারেনি। তখন বেশ কিছু দিন সে তার মা ও ছোট বোনকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহতা কাউকে ছাড় দেয়নি। রায়হান যোগ দিল মুক্তিবাহিনীতে। সম্মুখ সমরে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হল সে। যুদ্ধের সেই দানবীয়তার পর রায়হান পরিবারের কেউ আর বেঁচে রইল না। রইল শুধু এই ভিটাটুকু।
অয়ন যখন দালানটির সার্বিক অবস্থা দেখল, তার চোখে ভেসে উঠল এক করুণ ছবি। রায়হানদের ভিটা আজ জবর-দখলে জরাজীর্ণ । স্বাধীনতার এত বছর পর এই এলাকার চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। দালানটি দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু এর আয়তন অনেক কমে এসেছে। চারপাশ থেকে আকাশচুম্বী দালানগুলো যেন একে গিলে ফেলতে চাইছে। অয়ন খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, এই দখলবাজির পেছনে কারা রয়েছে। এলাকার ক্ষমতাধর ব্যক্তি, প্রভাবশালী আমলা, ধূর্ত রাজনীতিবিদ, এমনকি সাংবাদিক মহলের কিছু পরিচিত মুখও এতে জড়িত। তারা সবাই মিলে রায়হানদের জমির অংশ নিজেদের সীমানার ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে।
যেহেতু রায়হান পরিবারের কেউ বেঁচে নেই, তাই এই জমি দখল করা তাদের জন্য পানির মতো সহজ। প্রতিবাদ করার কেউ নেই, কোনো আইনি লড়াইয়ের ঝক্কি নেই। অয়ন দেখল, রায়হানদের সেই বিশাল বাড়ির বাগান আজ ঢুকে পড়েছে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তির লন বা গ্যারেজে। যেখানে রায়হানের বোন হয়তো একসময় খেলাধুলা করত, সেখানে এখন বিলাসবহুল গাড়ির সারি। যেখানে তাদের অন্দরমহল ছিল, সেখানে এখন বিশাল সব দেয়াল । এখন শুধু পুরনো সেই দালানের কঙ্কালটাই কেবল অবশিষ্ট আছে ।
এই বাস্তবতা অয়নের ভেতর এক তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিল। সে দেখল, একজন মুক্তিযোদ্ধা নিজের জীবনের বিনিময়ে যে মাটি স্বাধীন করেছে, আজ সেই মাটিতে তার কোন অধিকার নেই । প্রভাবশালীরা ক্ষমতার দাপটে ইতিহাসকে বদলে দিচ্ছে প্রতিদিন। অয়ন ভাবল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি শুধু বইয়ের পাতায়? নাকি তা আমাদের চারপাশের এই দখল হওয়া ভিটাগুলোয়?
সে প্রতিটি সীমানা প্রাচীরের ছবি তুলল। পুরোনো দলিল সংগ্রহ করল। দলিলগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। কীভাবে জাল পর্চা তৈরি করে, কীভাবে প্রভাব খাটিয়ে জমির মালিকানা বদলে ফেলা হয়েছে, তার প্রতিটি প্রমাণ অয়ন জোগাড় করল।
এই কাজ করতে গিয়ে সে অনেক ধরনের হুমকির মুখোমুখি হলো। সাংবাদিক মহলের পরিচিত অনেকে বলল, অয়ন, এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। যার কেউ নেই, তার জমি নিয়ে ঘাটাঘাটি করে কী হবে? কিন্তু অয়ন অবিচল। সে পণ করল, এই জীর্ণ দালানটি তার কাছে শুধু একটি বাড়ি নয়, এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস। এই ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব এখন তার কাঁধে।
৩
বিকেলের সূর্য ডুবু ডুবু । আকাশটা লালচে হয়ে এসেছে । অয়ন বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, রায়হান কি জানত, তার স্বপ্নের স্বাধীন দেশে তার শেষ চিহ্নটুকুও এভাবে লুট হবে? অয়নের বুকের ভেতর নিরন্তর হাহাকার। যে বীরের রক্তে এই মাটি স্বাধীন, আজ সেই মাটি তার নিজের নেই! সে সিদ্ধান্ত নিল এর শেষ দেখে ছাড়বে। এ বিষয়ে অয়ন তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করল । অবশেষে তার পত্রিকায় "এ জমি কার?" শিরনামে একটি বিশেষ কলাম বের হলো ।
পরপর তিন দিন ‘এ জমি কার?’ বের হল। প্রতিটি লেখায় সে নথিপত্র আর সরেজমিন অনুসন্ধানের প্রমাণ হাজির করল। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, কীভাবে শহরের প্রভাবশালী আমলা, ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, এমনকি পত্রিকার পরিচিত মুখগুলো পর্যন্ত রায়হানের জমি গ্রাস করে নিজেদের সীমানার ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে।
লেখাগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর পুরো শহরে আর দেশে তোলপাড় শুরু হল। সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল। বীর শহীদের প্রতি অবমাননা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে চায়ের দোকান থেকে সর্বত্র আলোচনার ঝড় উঠল।
চতুর্থ দিন অয়ন যখন অফিসে প্রবেশ করল, পরিবেশটা অনেক ভারী মনে হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে পিয়ন এসে জানাল যে সম্পাদক তাকে নিজের কামরায় ডেকে পাঠিয়েছেন। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে অয়ন দেখল, সম্পাদকের বড় টেবিলের ওপর তার সেই কলামের কাটিংগুলো স্তূপ করে রাখা।
সম্পাদক চেয়ারে বসে, তার মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। তিনি অয়নের দিকে সরাসরি তাকালেন না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর শান্ত অথচ ভারী গলায় বললেন, অয়ন, তুমি গত তিনদিন ধরে অসাধারণ কাজ করেছ। সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্ব আর সাহসের পরিচয় দিয়েছ । কিন্তু আর নয়। এই কলাম লেখা এখানেই থামাও ।
অয়নের মনে হলো, তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। যে পত্রিকার শক্তিতে সে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল, সেই পত্রিকা আজ তাকে থেমে যেতে বলছে। সম্পাদকের কণ্ঠে সাহসের অভাব নেই, তবে আছে পরিস্থিতির অসহায়ত্ব। অয়ন বুঝতে পারল, প্রভাবশালী মহল সরাসরি সম্পাদকের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
অয়ন জিজ্ঞেস করল, কেন স্যার? আমি তো কোনো ভুল লিখিনি। তথ্য সব সঠিক। সম্পাদক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি যাদের বিরুদ্ধে লিখছ তারা অনেক শক্তিশালী। আমাদের পত্রিকার ওপর অনেক চাপ আসছে। তুমি কি বুঝতে পারছ ?
সম্পাদকের কামরাটার নীরবতা ভারী হয়ে এল। শুধু শোনা যাচ্ছে ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ যা হিসাব কষছে আমাদের জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডের। টেবিলের ওপারে বসে থাকা প্রবীণ সম্পাদক চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ, কণ্ঠে জড়তা। তিনি সরাসরি অয়নের চোখের দিকে তাকাতে পারছেন না।
অয়ন শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় উত্তর দিল, আমি বুঝতে পারছি স্যার, আপনি চাপের মুখে আছেন। কিন্তু আমি তো শুধু কয়েক কাঠা জমি উদ্ধার করতে চাইনি। আমার স্বপ্ন, এই শহীদের শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষা করা। আমি চেয়েছিলাম এই ভিটায় একটি সবুজ বাগান হবে আর সাধারণ মানুষের জন্য একটি সামাজিক কেন্দ্র গড়ে উঠবে । সেখানে শহীদ রায়হানের নামে একটি পাঠাগার থাকবে। আগামী প্রজন্মের বাচ্চারা সেখানে বসে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখবে, তারা জানবে একজন বীরের নিঃস্বার্থ ত্যাগের কথা। আমরা কি এতটাই ছোট হয়ে গেছি যে একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য সম্মানটুকুও দিতে পারছি না?
অয়নের এই দৃঢ়তা সম্পাদকের পাথরের মতো শক্ত মনেও ফাটল ধরাল। কিন্তু বাইরে ঝড়ের পূর্বাভাস। সকাল থেকে মা একাধিকবার ফোন করেছেন। অয়নের বাবাও হতাশ। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। সারাজীবন তিনি নিয়ম মেনে চলেছেন। এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি আতঙ্কিত। মায়ের চোখের জল আর বাবার দীর্ঘশ্বাসে অয়ন বিচলিত। কিন্তু সে জানে, আজ যদি সে পিছিয়ে যায়, তবে নিজের বিবেকের কাছে কোনোদিন সে ক্ষমা পাবে না।
৪
রাজু অয়নের অফিসে ফটোগ্রাফার। অয়নের প্রতিটি অনুসন্ধানে সে ছায়া হয়ে পাশে ছিল। অয়নের এই সাহসী কলামের পেছনে রাজুর তোলা ছবিগুলো ছিল বড় শক্তি। কিন্তু আজ সকালে অফিসে ঢোকার পথে রাজু তাকে সতর্ক করেছে, অয়ন, খবর ভালো নয়। যাদের বিরুদ্ধে তুই লিখছিস, তারা কেবল ক্ষমতাবান নয়, তারা মাফিয়া। তোর ফোন ট্র্যাক হচ্ছে, গতিবিধি নজরদারিতে আছে। একটু বুঝে পা বাড়া।
সবচেয়ে বেশি চিন্তায় আছে তানিয়া। তানিয়ার সাথে অয়নের বিয়ের কথা পাকা। আগামী মাসে তাদের বিয়ের দিন ঠিক করা। তানিয়া ফোনে কেঁদে ফেলল, অয়ন, এই শহর খুব ভয়ংকর। তুমি কি একবারও ভেবেছ, তোমার কিছু হলে আমার কী হবে? আমি কি শুধু তোমার নামের পাশে 'শহীদ' বা 'নিখোঁজ' শব্দটা শোনার জন্য অপেক্ষা করছি? আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের সংসার সবকিছুর চেয়ে ওই পুরনো ইট-কাঠ কি বেশি দামী?
তানিয়ার কথাগুলো অয়নের কানে বাজছে। তার মনে পড়ছে তাদের বাগদান অনুষ্ঠানের কথা। তানিয়া বলেছিল যে সে অয়নের সাহসে গর্বিত। আজ সেই সাহসেরই বলি হতে যাচ্ছে তাদের সংসার। একদিকে পরিবার ও প্রিয়তমার ভালোবাসা, অন্যদিকে একজন অজানা বীরের ঋণের দায়—এ এক ভয়াবহ দোলাচল।
সন্ধ্যায় যখন অয়ন অফিস থেকে বেরল, তখন সামনের রাস্তায় দুটি কালো গাড়ি এসে থামল। অন্ধকার কাঁচের আড়াল থেকে কারা যেন তাকে দেখছে । সে বুঝতে পারল, তার কলম শুধু শব্দ লিখছিল না, সে আসলে একটি শক্ত দেয়ালের গায়ে সামান্য হলেও আঁচড় কাটতে পেরেছে !
রাতে অয়ন ঘরে ফিরতে মা দৌড়ে এলেন। বাবা গম্ভীর মুখে সোফায় বসে। বাবা বললেন, অয়ন, আমি তোমাকে সাংবাদিকতা করতে বারণ করিনি, কিন্তু নিজের জীবন বাজি রেখে কেন? যাদের ক্ষমতা পাহাড়সমান, তাদের গায়ে হাত দেওয়া তোর কাজ নয়। অয়ন কোনো উত্তর দিল না। সে জানে, সত্যের পথ সবসময় কঠিন। সে তার পকেট থেকে তার মোবাইল ফোন বের করল। সেটা খুলতেই তানিয়ার একটা মেসেজ ঝিলিক দিয়ে উঠল স্ক্রিনে, আমি তোমার পথ চেয়ে আছি, অয়ন। তোমার সাহসের সাথে সাথে তোমার জীবনের নিরাপত্তাটাও আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অয়ন বুঝল যে তার চারপাশে আজ অজস্র শিকল, আর সে এক বন্দী মানুষ । কিন্তু তার মনের ভেতরে রায়হানদের সেই জীর্ণ ভিটা। সেখানে এখন অন্ধকার, ধুলোবালি আর দখলদারদের দাপট।
রাতে অয়ন ঘুমতে পারল না। নিজের ঘরে বসে সে রায়হানদের ভাঙা দালানের একটি স্কেচ আঁকল। যেখানে এখন ধুলোবালি, সেখানে সে কল্পনা করল একটি বাগান। যেখানে এখন অন্ধকার, সেখানে সে দেখল একটা পাঠাগার।
শেষ রাতের আধোঘুমে অয়ন স্বপ্ন দেখল। স্নিগ্ধ ভোর চারদিকে। রায়হানদের ভাঙা ভিটায় এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে। সেখানে কোনো দখলদার নেই, আছে কেবল ফুলে ভরা বাগান। চারদিকে শিশুদের কোলাহল আর হাসি আনন্দ । সেখানে, সেই পাঠাগারের প্রতিটি বই শিশুদেরকে মানবতা, মনুষ্যত্ব আর শহীদদের আত্মত্যাগের গল্প শোনাচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



