
‘সত্য’ শব্দটি বৈদিক ও ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে। এর আক্ষরিক অর্থ যা বিদ্যমান বা বাস্তব, তা-ই সত্য। বাংলা একাডেমি ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ ও ‘বাংলা উচ্চারণের নিয়ম’ গ্রন্থে ‘সত্য’ শব্দটির প্রয়োগ ও উচ্চারণ ব্যাখ্যা করেছে। এতে দেখা যায়, ‘সত্য’ শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে:
বিশেষণ (Adjective): প্রামাণিক, যথার্থ, বা বাস্তব (যেমন: ‘ঘটনাটি সত্য।‘)
বিশেষ্য (Noun): সত্যতা, বাস্তব সত্তা, বা সততা (যেমন: ‘সত্যের জয় হয়।‘)
সাধারণ দৃষ্টিতে সত্যকে একটি একক ও অখণ্ড সত্তা মনে হলেও, দর্শন, প্রজ্ঞানশাস্ত্র (Epistemology) এবং আধুনিক বিজ্ঞানে সত্য বহুমাত্রিক। প্রিজমের আলো বিচ্ছুরণের মতো সত্যেরও আছে বহু রূপ।
দর্শনের আলোকে সত্য
সাধারণ কথায় সত্য বলতে আমরা বুঝি এমন কিছু যা বাস্তব বা সঠিক। তবে দর্শনে সত্য কেবল কোনো তথ্যের সঠিকতা নয়, এটি উপলব্ধির একটি ধারা। একটি একক আলোর রশ্নি যেমন প্রিজমের ভেতর দিয়ে গেলে সাতটি ভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়, ঠিক তেমনি সত্যও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও কাঠামোর ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
দর্শনে 'সত্য' বলতে সাধারণত কোনো উক্তি, বিশ্বাস বা ধারণার সাথে বাস্তবতার বা যুক্তির সঙ্গতিকে বোঝায়। জ্ঞানবিদ্যায় (Epistemology) জ্ঞান হলো Justified True Belief বা "যুক্তিসঙ্গত সত্য বিশ্বাস" । অর্থাৎ, কোনো বিষয় সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস তখনই জ্ঞানে পরিণত হয়, যখন তা বস্তুনিষ্ঠভাবে সত্য প্রমাণিত হয়।
দার্শনিক আলোচনায় সত্যকে ব্যাখ্যা করার জন্য মূলত তিনটি প্রধান তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়:

আবার, হাবারমাস (Jürgen Habermas, 1981) তাঁর জ্ঞান ও সত্যের শ্রেণিবিন্যাসে জগতকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। যথা: বস্তুগত জগত (Objective World), আত্মনিষ্ঠ/ব্যক্তিগত জগত (Subjective World) এবং সামাজিক/মানক জগত (Normative/Social World)। এই শ্রেণিবিন্যাসটি মূলত দর্শন (Epistemology / জ্ঞানতত্ত্ব) এবং সামাজিক বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রদর্শনের আধুনিক শ্রেণিবিন্যাস থেকে এসেছে।

প্রাত্যহিক উদাহরণ
উদাহরণ ১: অন্ধের হাতি দেখা (Perspective and Subjective Truth)
প্রাচীন পরিচিত গল্প 'অন্ধ ও হাতি' সত্যের বহুমাত্রিকতার সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ।
যে অন্ধ ব্যক্তি হাতির পা স্পর্শ করেছে, তার কাছে হাতি একটি 'স্তম্ভের' মতো।
যে ব্যক্তি কান স্পর্শ করেছে, তার কাছে হাতি একটি 'পাখার' মতো।
এখানে প্রত্যেকে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে সত্যি বলছে, কিন্তু কারও সত্যই সম্পূর্ণ সত্য নয়। মানুষের ব্যক্তিগত বা সামাজিক সত্যও এভাবে গঠিত হয়।
উদাহরণ ২: আধুনিক যুগের 'পোস্ট-ট্রুথ' (Post-Truth) ও ডিজিটাল মাধ্যম
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সত্য তৈরি হতে দেখা যায়। একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনাকে দুটি ভিন্ন সংবাদমাধ্যম নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের ‘সত্য’ উপস্থাপন করে। এখানে কোনটা সত্য তা ব্যক্তিমানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে।
ধর্মীয় সত্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য
ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে সত্য মানবীয় যুক্তি, ইন্দ্রিয়লব্ধ পর্যবেক্ষণ বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নির্ভর নয়। এটি সৃষ্টিকর্তা, ওহী বা ঐশ্বরিক বাণী (Divine Revelation) এবং সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত। ধর্মতত্ত্বে (Theology) সত্য হলো শাশ্বত ও মহাজাগতিক (Eternal Order), যা সমস্ত বিশ্বলোক চরাচর পরিচালনা করে। তা মানুষের নৈতিক জীবন যাপন ও ন্যায়-অন্যায়ের বিধি-নিষেধ নিয়েও কথা বলে।
অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক সত্য (Scientific Truth) হলো প্রকৃতি ও বিশ্বজগতের এমন কিছু নিয়ম বা তথ্য, যা অনুমান বা বিশ্বাস নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। এটি মানুষের ব্যক্তিগত মতামত বা অনুভূতির ওপর নির্ভর করে না। বৈজ্ঞানিক সত্য তাই সবার জন্য সমান। যেকোনো জায়গায় যে কেউ একই নিয়মে পরীক্ষা করলে একই ফলাফল পাবে। তাছাড়া, বিজ্ঞান কখনো নিজের ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা করে না। তাই, ভবিষ্যতে যদি নতুন ও আরও নিখুঁত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বৈজ্ঞানিক সত্য নিজেকে সংশোধন ও উন্নত করে নিতে পারে। যেমন, হাতের কলমটি ছেড়ে দিলে তা নিচে পড়বে, কারণ পৃথিবীর অভিকর্ষ বল একে টানছে। অথবা, সাধারণ বায়ুমণ্ডলে পানিকে তাপ দিলে তা ঠিক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটতে শুরু করবে।
বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য এবং ধর্মীয় সত্য মানবজ্ঞানের দুটি ভিন্ন ধারা। বিজ্ঞান জগতের কার্যকারণ বা "কীভাবে" (How) ঘটে তার উত্তর খোঁজে, ধর্ম সেখানে অস্তিত্বের উদ্দেশ্য, অর্থ বা "কেন" (Why)-এর অনুসন্ধান করে।

সত্যের যাচাই দার্শনিক কার্ল পপারের মতে, বৈজ্ঞানিক সত্যের বৈশিষ্ট্য হলো একে 'ভুল প্রমাণের যোগ্য' (Falsifiable) হতে হবে। এটি বস্তুগতভাবে প্রমাণ বা ভুল প্রমাণ করার বিষয় নয়; এটি আত্মিক উপলব্ধি ও শাস্ত্রীয় মানদণ্ডে যাচাইযোগ্য।
বাস্তব উদাহরণ
বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য: আইজ্যাক নিউটন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির যে ধারণা বা 'সত্য' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পরবর্তীতে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর 'আপেক্ষিকতা তত্ত্ব' (Theory of Relativity) দিয়ে তার সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করেন এবং নতুন বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক সত্য সর্বদা জ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে বিকশিত হয়।
ধর্মীয় সত্য: সব প্রধান ধর্মে বলা হয়েছে, "মানুষ হত্যা মহাপাপ" বা "দরিদ্রকে সাহায্য করা পুণ্য"। এটি এক চিরন্তন নৈতিক ও ধর্মীয় সত্য। হাজার বছর ধরে সমাজের বা বিজ্ঞানের যত উন্নতিই হোক না কেন, এই নৈতিক সত্যগুলোর কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
আধুনিক 'পোস্ট-ট্রুথ' (Post-truth) বা সত্য-উত্তর যুগ
Post-truth বা সত্য-উত্তর যুগ এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে বোঝায়, যেখানে জনমত গঠনের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য বা সত্যের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ, বিশ্বাস এবং অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে "Post" মানে সত্যের সমাপ্তি নয়, বরং সত্যের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া (Irrelevance of Truth)।
২০১৬ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারি 'Post-truth' শব্দটিকে "Year of the Word" হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমান একাদশ শতাব্দীতে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসারের সাথে আমরা এ যুগে প্রবেশ করেছি। অর্থাৎ, সত্যের স্থান যখন আবেগ এবং অন্ধ বিশ্বাস দখল করে নেয়, তখনই পোস্ট-ট্রুথ যুগের সূচনা হয়।
Post-truth যুগের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. ইকো চেম্বার ও কনফারমেশন বায়াস (Echo Chambers & Confirmation Bias):
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম আমাদের কেবল সেই তথ্যগুলো দেখায়, যা আমাদের আগে থেকে বিদ্যমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে। ফলে মানুষ নিজ বিশ্বাসের বাইরের সত্যকে সহজে অস্বীকার করে।
২. ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার (Misinformation & Disinformation):
ইন্টারনেটের যুগে কোনো তথ্য কতটুকু সত্য, তার চেয়ে সেটি কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বা লাইক-শেয়ার পাচ্ছে তা দিয়ে সত্যতা নির্ধারণের একটি ভুল প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
৩. বিশেষজ্ঞদের প্রতি অনাস্থা (Distrust in Expertise):
বৈজ্ঞানিক তথ্য, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা বা বিশেষজ্ঞদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে সাধারণ মানুষ অনেক সময় কাল্পনিক বা ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব (Conspiracy Theories)-কে বেশি বিশ্বাস করে।
Post-truth যুগের বাস্তব উদাহরণ
জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার (Climate Change Denial): বিশ্বের ৯৭% জলবায়ু বিজ্ঞানী গবেষণা ও প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক লাভ বা ব্যক্তিগত অনুভূতির কারণে অনেক গোষ্ঠী এটিকে "গুজব" বা "চক্রান্ত" বলে এড়িয়ে যায়।
ভ্যাকসিন সংক্রান্ত গুজব (Anti-vaccine Movement): বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আবেগী ও ভীতিজনক গুজবের কারণে অনেকে প্রতিষেধক টিকা গ্রহণে অস্বীকার করে।
রাজনৈতিক নির্বাচন ও ফেক নিউজ: রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা নিজেদের নীতিকে সঠিক প্রমাণ করতে তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে ইমোশনাল মেসেজিং তৈরি করা হয়, যা ভোটারদের প্রভাবিত করে।

সত্যের রাজনীতিকীকরন
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault, 1926–1984)-র মতে, সত্য কোনো নিরেট, নিরপেক্ষ বা চিরন্তন বাস্তব বস্তু নয় যা মানুষ আবিষ্কার করে। বরং সত্য হলো একটি সামাজিক উৎপাদন (Social Construction), যা ক্ষমতার অনুশাসন ও কাঠামোর মধ্য দিয়ে সমাজ কর্তৃক তৈরি হয়।
ফুকোর মতে, প্রতিটি সমাজের নিজস্ব 'Regime of Truth' বা 'সত্যের শাসনব্যবস্থা' থাকে। এটি এমন এক ধরনের ব্যবস্থা যা নির্ধারণ করে:
১. কোন ধরনের বক্তব্যকে 'সত্য' হিসেবে গ্রহণ করা হবে আর কোনটিকে 'মিথ্যা' বলে বাতিল করা হবে।
২. সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার নিয়ম ও কৌশলগুলো কী হবে।
৩. কারা সত্য বলার অধিকার পাবে (যেমন: বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, বিচারক, বা বিশেষজ্ঞ)।
৪. কীভাবে সত্য অনুমোদিত (sanctioned) ও প্রচারিত হবে।
ফলে, যে বক্তব্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন ও নিয়ম মেনে আসে, সমাজ তাকেই 'সত্য' বলে মেনে নেয়। ফুকো তাঁর 'Madness and Civilization', 'The Birth of the Clinic', এবং 'Discipline and Punish' বইগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সমাজ ও ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সাথে সত্যের সংজ্ঞা বদলে গেছে:
ক. ডিসকোর্স বা বাচনভঙ্গি (Discourse)-র ভূমিকা
'ডিসকোর্স' হলো চিন্তাভাবনা ও যোগাযোগের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা ভাষা। সমাজ বা ক্ষমতা যে ডিসকোর্স তৈরি করে, তার ভেতরে থেকেই মানুষ সত্যকে উপলব্ধি করে। যেমন, ১৮ শতকের আগে পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের 'ঈশ্বর বা শয়তানের ভর করা ব্যক্তি' হিসেবে দেখা হতো—তখন সেটাই ছিল সত্য। কিন্তু আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিসকোর্স আসার পর মানসিক রোগকে 'চিকিৎসাগত সমস্যা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলো। এখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষমতা একটি নতুন 'সত্য' তৈরি করেছে।
খ. প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন (Institutional Validation)
যে তথ্য বা দাবি প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, হাসপাতাল বা বিজ্ঞানাগার থেকে অনুমোদিত হয়, সমাজ সেটাকে সত্য বলে ধরে নেয়। যেসব জ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকে (যেমন: আদিবাসী জ্ঞান, লোকজ চিকিৎসা, বা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা), ক্ষমতা সেগুলোকে 'অ-বৈজ্ঞানিক' বা 'অ-সত্য' বলে প্রান্তিক করে রাখে।
গ. স্বাভাবিকীকরণ বা নরম্যালাইজেশন (Normalization)
ক্ষমতা ডিসকোর্সের মাধ্যমে সমাজে কিছু আচরণকে 'স্বাভাবিক' (Normal) এবং কিছু আচরণকে 'অস্বাভাবিক' (Abnormal) হিসেবে সাব্যস্ত করে। যা স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজ তাকেই 'সত্য ও গ্রহণযোগ্য' বলে মান্য করে।

১৯৭০-এর দশকে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক প্রচারণা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নলকূপের ভূগর্ভস্থ পানিকে 'একমাত্র নিরাপদ ও আধুনিক সত্য' হিসেবে জনমনে স্বাভাবিক করা হয়েছিল, যেখানে খোলা জলাশয়ের ভূপৃষ্ঠের পানিকে চিহ্নিত করা হয় অনিরাপদ হিসেবে। তবে পরবর্তীতে অগভীর পানিতে আর্সেনিক দূষণ ও অতিরিক্ত উত্তোলনে মাটির নিচের পানির স্তর নেমে যাওয়ার সংকট দেখা দিলে 'গভীর নলকূপ' সেই সত্যের স্থলাভিষিক্ত হয়; আর বর্তমানে পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে নদী-নালার ভূপৃষ্ঠের পানিকে আধুনিক শোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরায় টেকসই ও সুপেয় 'নতুন সত্য' হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও স্বাভাবিকীকরণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, সত্য হলো এমন এক ব্যবস্থা যা ক্ষমতা দ্বারা উৎপাদিত হয়, সুরক্ষিত হয় এবং সমাজের ওপর শাসন বজায় রাখতে ব্যবহৃত হয়। তাই ফুকোর দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশ্নটা "সত্য কী?" হওয়া উচিত নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত "কার স্বার্থে এবং কোন ক্ষমতার বলে এটি সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?"

তাই সব শেষে এ কথা বলা যায় যে, নিজের জানা/মানা সত্যকে চরম বা একমাত্র মনে না করে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুধাবন করা জরুরি। পরম সত্য (Absolute Truth) অনুসন্ধানের বস্তু হলেও, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সত্য বহুলাংশে আপেক্ষিক (Relative)। সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটাতে সত্যের এই বহুমাত্রিকতাকে গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ ।
‘সত্য’ শব্দটি বৈদিক ও ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে। এর আক্ষরিক অর্থ যা বিদ্যমান বা বাস্তব, তা-ই সত্য। বাংলা একাডেমি ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ ও ‘বাংলা উচ্চারণের নিয়ম’ গ্রন্থে ‘সত্য’ শব্দটির প্রয়োগ ও উচ্চারণ ব্যাখ্যা করেছে। এতে দেখা যায়, ‘সত্য’ শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে:
বিশেষণ (Adjective): প্রামাণিক, যথার্থ, বা বাস্তব (যেমন: ‘ঘটনাটি সত্য।‘)
বিশেষ্য (Noun): সত্যতা, বাস্তব সত্তা, বা সততা (যেমন: ‘সত্যের জয় হয়।‘)
সাধারণ দৃষ্টিতে সত্যকে একটি একক ও অখণ্ড সত্তা মনে হলেও, দর্শন, প্রজ্ঞানশাস্ত্র (Epistemology) এবং আধুনিক বিজ্ঞানে সত্য বহুমাত্রিক। প্রিজমের আলো বিচ্ছুরণের মতো সত্যেরও আছে বহু রূপ।
সাধারণ কথায় সত্য বলতে আমরা বুঝি এমন কিছু যা বাস্তব বা সঠিক। তবে দর্শনে সত্য কেবল কোনো তথ্যের সঠিকতা নয়, এটি উপলব্ধির একটি ধারা। একটি একক আলোর রশ্নি যেমন প্রিজমের ভেতর দিয়ে গেলে সাতটি ভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়, ঠিক তেমনি সত্যও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও কাঠামোর ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
দর্শনে 'সত্য' বলতে সাধারণত কোনো উক্তি, বিশ্বাস বা ধারণার সাথে বাস্তবতার বা যুক্তির সঙ্গতিকে বোঝায়। জ্ঞানবিদ্যায় (Epistemology) জ্ঞান হলো Justified True Belief বা "যুক্তিসঙ্গত সত্য বিশ্বাস" । অর্থাৎ, কোনো বিষয় সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস তখনই জ্ঞানে পরিণত হয়, যখন তা বস্তুনিষ্ঠভাবে সত্য প্রমাণিত হয়।
দার্শনিক আলোচনায় সত্যকে ব্যাখ্যা করার জন্য মূলত তিনটি প্রধান তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়:

আবার, হাবারমাস (Jürgen Habermas, 1981) তাঁর জ্ঞান ও সত্যের শ্রেণিবিন্যাসে জগতকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। যথা: বস্তুগত জগত (Objective World), আত্মনিষ্ঠ/ব্যক্তিগত জগত (Subjective World) এবং সামাজিক/মানক জগত (Normative/Social World)। এই শ্রেণিবিন্যাসটি মূলত দর্শন (Epistemology / জ্ঞানতত্ত্ব) এবং সামাজিক বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রদর্শনের আধুনিক শ্রেণিবিন্যাস থেকে এসেছে।

প্রাত্যহিক উদাহরণ
উদাহরণ ১: অন্ধের হাতি দেখা (Perspective and Subjective Truth)
প্রাচীন পরিচিত গল্প 'অন্ধ ও হাতি' সত্যের বহুমাত্রিকতার সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ।
যে অন্ধ ব্যক্তি হাতির পা স্পর্শ করেছে, তার কাছে হাতি একটি 'স্তম্ভের' মতো।
যে ব্যক্তি কান স্পর্শ করেছে, তার কাছে হাতি একটি 'পাখার' মতো।
এখানে প্রত্যেকে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে সত্যি বলছে, কিন্তু কারও সত্যই সম্পূর্ণ সত্য নয়। মানুষের ব্যক্তিগত বা সামাজিক সত্যও এভাবে গঠিত হয়।
উদাহরণ ২: আধুনিক যুগের 'পোস্ট-ট্রুথ' (Post-Truth) ও ডিজিটাল মাধ্যম
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সত্য তৈরি হতে দেখা যায়। একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনাকে দুটি ভিন্ন সংবাদমাধ্যম নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের ‘সত্য’ উপস্থাপন করে। এখানে কোনটা সত্য তা ব্যক্তিমানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে।
ধর্মীয় সত্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য
ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে সত্য মানবীয় যুক্তি, ইন্দ্রিয়লব্ধ পর্যবেক্ষণ বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নির্ভর নয়। এটি সৃষ্টিকর্তা, ওহী বা ঐশ্বরিক বাণী (Divine Revelation) এবং সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত। ধর্মতত্ত্বে (Theology) সত্য হলো শাশ্বত ও মহাজাগতিক (Eternal Order), যা সমস্ত বিশ্বলোক চরাচর পরিচালনা করে। তা মানুষের নৈতিক জীবন যাপন ও ন্যায়-অন্যায়ের বিধি-নিষেধ নিয়েও কথা বলে।
অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক সত্য (Scientific Truth) হলো প্রকৃতি ও বিশ্বজগতের এমন কিছু নিয়ম বা তথ্য, যা অনুমান বা বিশ্বাস নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। এটি মানুষের ব্যক্তিগত মতামত বা অনুভূতির ওপর নির্ভর করে না। বৈজ্ঞানিক সত্য তাই সবার জন্য সমান। যেকোনো জায়গায় যে কেউ একই নিয়মে পরীক্ষা করলে একই ফলাফল পাবে। তাছাড়া, বিজ্ঞান কখনো নিজের ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা করে না। তাই, ভবিষ্যতে যদি নতুন ও আরও নিখুঁত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বৈজ্ঞানিক সত্য নিজেকে সংশোধন ও উন্নত করে নিতে পারে। যেমন, হাতের কলমটি ছেড়ে দিলে তা নিচে পড়বে, কারণ পৃথিবীর অভিকর্ষ বল একে টানছে। অথবা, সাধারণ বায়ুমণ্ডলে পানিকে তাপ দিলে তা ঠিক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটতে শুরু করবে।
বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য এবং ধর্মীয় সত্য মানবজ্ঞানের দুটি ভিন্ন ধারা। বিজ্ঞান জগতের কার্যকারণ বা "কীভাবে" (How) ঘটে তার উত্তর খোঁজে, ধর্ম সেখানে অস্তিত্বের উদ্দেশ্য, অর্থ বা "কেন" (Why)-এর অনুসন্ধান করে।

সত্যের যাচাই দার্শনিক কার্ল পপারের মতে, বৈজ্ঞানিক সত্যের বৈশিষ্ট্য হলো একে 'ভুল প্রমাণের যোগ্য' (Falsifiable) হতে হবে। এটি বস্তুগতভাবে প্রমাণ বা ভুল প্রমাণ করার বিষয় নয়; এটি আত্মিক উপলব্ধি ও শাস্ত্রীয় মানদণ্ডে যাচাইযোগ্য।
বাস্তব উদাহরণ
বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য: আইজ্যাক নিউটন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির যে ধারণা বা 'সত্য' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পরবর্তীতে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর 'আপেক্ষিকতা তত্ত্ব' (Theory of Relativity) দিয়ে তার সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করেন এবং নতুন বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক সত্য সর্বদা জ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে বিকশিত হয়।
ধর্মীয় সত্য: সব প্রধান ধর্মে বলা হয়েছে, "মানুষ হত্যা মহাপাপ" বা "দরিদ্রকে সাহায্য করা পুণ্য"। এটি এক চিরন্তন নৈতিক ও ধর্মীয় সত্য। হাজার বছর ধরে সমাজের বা বিজ্ঞানের যত উন্নতিই হোক না কেন, এই নৈতিক সত্যগুলোর কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
আধুনিক 'পোস্ট-ট্রুথ' (Post-truth) বা সত্য-উত্তর যুগ
Post-truth বা সত্য-উত্তর যুগ এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে বোঝায়, যেখানে জনমত গঠনের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য বা সত্যের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ, বিশ্বাস এবং অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে "Post" মানে সত্যের সমাপ্তি নয়, বরং সত্যের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া (Irrelevance of Truth)।
২০১৬ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারি 'Post-truth' শব্দটিকে "Year of the Word" হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমান একাদশ শতাব্দীতে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসারের সাথে আমরা এ যুগে প্রবেশ করেছি। অর্থাৎ, সত্যের স্থান যখন আবেগ এবং অন্ধ বিশ্বাস দখল করে নেয়, তখনই পোস্ট-ট্রুথ যুগের সূচনা হয়।
Post-truth যুগের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. ইকো চেম্বার ও কনফারমেশন বায়াস (Echo Chambers & Confirmation Bias):
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম আমাদের কেবল সেই তথ্যগুলো দেখায়, যা আমাদের আগে থেকে বিদ্যমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে। ফলে মানুষ নিজ বিশ্বাসের বাইরের সত্যকে সহজে অস্বীকার করে।
২. ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার (Misinformation & Disinformation):
ইন্টারনেটের যুগে কোনো তথ্য কতটুকু সত্য, তার চেয়ে সেটি কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বা লাইক-শেয়ার পাচ্ছে তা দিয়ে সত্যতা নির্ধারণের একটি ভুল প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
৩. বিশেষজ্ঞদের প্রতি অনাস্থা (Distrust in Expertise):
বৈজ্ঞানিক তথ্য, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা বা বিশেষজ্ঞদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে সাধারণ মানুষ অনেক সময় কাল্পনিক বা ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব (Conspiracy Theories)-কে বেশি বিশ্বাস করে।
Post-truth যুগের বাস্তব উদাহরণ
জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার (Climate Change Denial): বিশ্বের ৯৭% জলবায়ু বিজ্ঞানী গবেষণা ও প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক লাভ বা ব্যক্তিগত অনুভূতির কারণে অনেক গোষ্ঠী এটিকে "গুজব" বা "চক্রান্ত" বলে এড়িয়ে যায়।
ভ্যাকসিন সংক্রান্ত গুজব (Anti-vaccine Movement): বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আবেগী ও ভীতিজনক গুজবের কারণে অনেকে প্রতিষেধক টিকা গ্রহণে অস্বীকার করে।
রাজনৈতিক নির্বাচন ও ফেক নিউজ: রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা নিজেদের নীতিকে সঠিক প্রমাণ করতে তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে ইমোশনাল মেসেজিং তৈরি করা হয়, যা ভোটারদের প্রভাবিত করে।

সত্যের রাজনীতিকীকরন
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault, 1926–1984)-র মতে, সত্য কোনো নিরেট, নিরপেক্ষ বা চিরন্তন বাস্তব বস্তু নয় যা মানুষ আবিষ্কার করে। বরং সত্য হলো একটি সামাজিক উৎপাদন (Social Construction), যা ক্ষমতার অনুশাসন ও কাঠামোর মধ্য দিয়ে সমাজ কর্তৃক তৈরি হয়।
ফুকোর মতে, প্রতিটি সমাজের নিজস্ব 'Regime of Truth' বা 'সত্যের শাসনব্যবস্থা' থাকে। এটি এমন এক ধরনের ব্যবস্থা যা নির্ধারণ করে:
১. কোন ধরনের বক্তব্যকে 'সত্য' হিসেবে গ্রহণ করা হবে আর কোনটিকে 'মিথ্যা' বলে বাতিল করা হবে।
২. সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার নিয়ম ও কৌশলগুলো কী হবে।
৩. কারা সত্য বলার অধিকার পাবে (যেমন: বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, বিচারক, বা বিশেষজ্ঞ)।
৪. কীভাবে সত্য অনুমোদিত (sanctioned) ও প্রচারিত হবে।
ফলে, যে বক্তব্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন ও নিয়ম মেনে আসে, সমাজ তাকেই 'সত্য' বলে মেনে নেয়। ফুকো তাঁর 'Madness and Civilization', 'The Birth of the Clinic', এবং 'Discipline and Punish' বইগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সমাজ ও ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সাথে সত্যের সংজ্ঞা বদলে গেছে:
ক. ডিসকোর্স বা বাচনভঙ্গি (Discourse)-র ভূমিকা
'ডিসকোর্স' হলো চিন্তাভাবনা ও যোগাযোগের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা ভাষা। সমাজ বা ক্ষমতা যে ডিসকোর্স তৈরি করে, তার ভেতরে থেকেই মানুষ সত্যকে উপলব্ধি করে। যেমন, ১৮ শতকের আগে পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের 'ঈশ্বর বা শয়তানের ভর করা ব্যক্তি' হিসেবে দেখা হতো—তখন সেটাই ছিল সত্য। কিন্তু আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিসকোর্স আসার পর মানসিক রোগকে 'চিকিৎসাগত সমস্যা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলো। এখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষমতা একটি নতুন 'সত্য' তৈরি করেছে।
খ. প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন (Institutional Validation)
যে তথ্য বা দাবি প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, হাসপাতাল বা বিজ্ঞানাগার থেকে অনুমোদিত হয়, সমাজ সেটাকে সত্য বলে ধরে নেয়। যেসব জ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকে (যেমন: আদিবাসী জ্ঞান, লোকজ চিকিৎসা, বা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা), ক্ষমতা সেগুলোকে 'অ-বৈজ্ঞানিক' বা 'অ-সত্য' বলে প্রান্তিক করে রাখে।
গ. স্বাভাবিকীকরণ বা নরম্যালাইজেশন (Normalization)
ক্ষমতা ডিসকোর্সের মাধ্যমে সমাজে কিছু আচরণকে 'স্বাভাবিক' (Normal) এবং কিছু আচরণকে 'অস্বাভাবিক' (Abnormal) হিসেবে সাব্যস্ত করে। যা স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজ তাকেই 'সত্য ও গ্রহণযোগ্য' বলে মান্য করে।

১৯৭০-এর দশকে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক প্রচারণা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নলকূপের ভূগর্ভস্থ পানিকে 'একমাত্র নিরাপদ ও আধুনিক সত্য' হিসেবে জনমনে স্বাভাবিক করা হয়েছিল, যেখানে খোলা জলাশয়ের ভূপৃষ্ঠের পানিকে চিহ্নিত করা হয় অনিরাপদ হিসেবে। তবে পরবর্তীতে অগভীর পানিতে আর্সেনিক দূষণ ও অতিরিক্ত উত্তোলনে মাটির নিচের পানির স্তর নেমে যাওয়ার সংকট দেখা দিলে 'গভীর নলকূপ' সেই সত্যের স্থলাভিষিক্ত হয়; আর বর্তমানে পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে নদী-নালার ভূপৃষ্ঠের পানিকে আধুনিক শোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরায় টেকসই ও সুপেয় 'নতুন সত্য' হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও স্বাভাবিকীকরণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, সত্য হলো এমন এক ব্যবস্থা যা ক্ষমতা দ্বারা উৎপাদিত হয়, সুরক্ষিত হয় এবং সমাজের ওপর শাসন বজায় রাখতে ব্যবহৃত হয়। তাই ফুকোর দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশ্নটা "সত্য কী?" হওয়া উচিত নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত "কার স্বার্থে এবং কোন ক্ষমতার বলে এটি সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?"

তাই সব শেষে এ কথা বলা যায় যে, নিজের জানা/মানা সত্যকে চরম বা একমাত্র মনে না করে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুধাবন করা জরুরি। পরম সত্য (Absolute Truth) অনুসন্ধানের বস্তু হলেও, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সত্য বহুলাংশে আপেক্ষিক (Relative)। সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটাতে সত্যের এই বহুমাত্রিকতাকে গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ ।

দর্শনের আলোকে সত্য
‘সত্য’ শব্দটি বৈদিক ও ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে। এর আক্ষরিক অর্থ যা বিদ্যমান বা বাস্তব, তা-ই সত্য। বাংলা একাডেমি ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ ও ‘বাংলা উচ্চারণের নিয়ম’ গ্রন্থে ‘সত্য’ শব্দটির প্রয়োগ ও উচ্চারণ ব্যাখ্যা করেছে। এতে দেখা যায়, ‘সত্য’ শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে:
বিশেষণ (Adjective): প্রামাণিক, যথার্থ, বা বাস্তব (যেমন: ‘ঘটনাটি সত্য।‘)
বিশেষ্য (Noun): সত্যতা, বাস্তব সত্তা, বা সততা (যেমন: ‘সত্যের জয় হয়।‘)
সাধারণ দৃষ্টিতে সত্যকে একটি একক ও অখণ্ড সত্তা মনে হলেও, দর্শন, প্রজ্ঞানশাস্ত্র (Epistemology) এবং আধুনিক বিজ্ঞানে সত্য বহুমাত্রিক। প্রিজমের আলো বিচ্ছুরণের মতো সত্যেরও আছে বহু রূপ।
সাধারণ কথায় সত্য বলতে আমরা বুঝি এমন কিছু যা বাস্তব বা সঠিক। তবে দর্শনে সত্য কেবল কোনো তথ্যের সঠিকতা নয়, এটি উপলব্ধির একটি ধারা। একটি একক আলোর রশ্নি যেমন প্রিজমের ভেতর দিয়ে গেলে সাতটি ভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়, ঠিক তেমনি সত্যও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও কাঠামোর ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
দর্শনে 'সত্য' বলতে সাধারণত কোনো উক্তি, বিশ্বাস বা ধারণার সাথে বাস্তবতার বা যুক্তির সঙ্গতিকে বোঝায়। জ্ঞানবিদ্যায় (Epistemology) জ্ঞান হলো Justified True Belief বা "যুক্তিসঙ্গত সত্য বিশ্বাস" । অর্থাৎ, কোনো বিষয় সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস তখনই জ্ঞানে পরিণত হয়, যখন তা বস্তুনিষ্ঠভাবে সত্য প্রমাণিত হয়।
দার্শনিক আলোচনায় সত্যকে ব্যাখ্যা করার জন্য মূলত তিনটি প্রধান তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়:

আবার, হাবারমাস (Jürgen Habermas, 1981) তাঁর জ্ঞান ও সত্যের শ্রেণিবিন্যাসে জগতকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। যথা: বস্তুগত জগত (Objective World), আত্মনিষ্ঠ/ব্যক্তিগত জগত (Subjective World) এবং সামাজিক/মানক জগত (Normative/Social World)। এই শ্রেণিবিন্যাসটি মূলত দর্শন (Epistemology / জ্ঞানতত্ত্ব) এবং সামাজিক বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রদর্শনের আধুনিক শ্রেণিবিন্যাস থেকে এসেছে।

প্রাত্যহিক উদাহরণ
উদাহরণ ১: অন্ধের হাতি দেখা (Perspective and Subjective Truth)
প্রাচীন পরিচিত গল্প 'অন্ধ ও হাতি' সত্যের বহুমাত্রিকতার সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ।
যে অন্ধ ব্যক্তি হাতির পা স্পর্শ করেছে, তার কাছে হাতি একটি 'স্তম্ভের' মতো।
যে ব্যক্তি কান স্পর্শ করেছে, তার কাছে হাতি একটি 'পাখার' মতো।
এখানে প্রত্যেকে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে সত্যি বলছে, কিন্তু কারও সত্যই সম্পূর্ণ সত্য নয়। মানুষের ব্যক্তিগত বা সামাজিক সত্যও এভাবে গঠিত হয়।
উদাহরণ ২: আধুনিক যুগের 'পোস্ট-ট্রুথ' (Post-Truth) ও ডিজিটাল মাধ্যম
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সত্য তৈরি হতে দেখা যায়। একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনাকে দুটি ভিন্ন সংবাদমাধ্যম নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের ‘সত্য’ উপস্থাপন করে। এখানে কোনটা সত্য তা ব্যক্তিমানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে।
ধর্মীয় সত্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য
ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে সত্য মানবীয় যুক্তি, ইন্দ্রিয়লব্ধ পর্যবেক্ষণ বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নির্ভর নয়। এটি সৃষ্টিকর্তা, ওহী বা ঐশ্বরিক বাণী (Divine Revelation) এবং সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত। ধর্মতত্ত্বে (Theology) সত্য হলো শাশ্বত ও মহাজাগতিক (Eternal Order), যা সমস্ত বিশ্বলোক চরাচর পরিচালনা করে। তা মানুষের নৈতিক জীবন যাপন ও ন্যায়-অন্যায়ের বিধি-নিষেধ নিয়েও কথা বলে।
অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক সত্য (Scientific Truth) হলো প্রকৃতি ও বিশ্বজগতের এমন কিছু নিয়ম বা তথ্য, যা অনুমান বা বিশ্বাস নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। এটি মানুষের ব্যক্তিগত মতামত বা অনুভূতির ওপর নির্ভর করে না। বৈজ্ঞানিক সত্য তাই সবার জন্য সমান। যেকোনো জায়গায় যে কেউ একই নিয়মে পরীক্ষা করলে একই ফলাফল পাবে। তাছাড়া, বিজ্ঞান কখনো নিজের ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা করে না। তাই, ভবিষ্যতে যদি নতুন ও আরও নিখুঁত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বৈজ্ঞানিক সত্য নিজেকে সংশোধন ও উন্নত করে নিতে পারে। যেমন, হাতের কলমটি ছেড়ে দিলে তা নিচে পড়বে, কারণ পৃথিবীর অভিকর্ষ বল একে টানছে। অথবা, সাধারণ বায়ুমণ্ডলে পানিকে তাপ দিলে তা ঠিক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটতে শুরু করবে।
বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য এবং ধর্মীয় সত্য মানবজ্ঞানের দুটি ভিন্ন ধারা। বিজ্ঞান জগতের কার্যকারণ বা "কীভাবে" (How) ঘটে তার উত্তর খোঁজে, ধর্ম সেখানে অস্তিত্বের উদ্দেশ্য, অর্থ বা "কেন" (Why)-এর অনুসন্ধান করে।

সত্যের যাচাই দার্শনিক কার্ল পপারের মতে, বৈজ্ঞানিক সত্যের বৈশিষ্ট্য হলো একে 'ভুল প্রমাণের যোগ্য' (Falsifiable) হতে হবে। এটি বস্তুগতভাবে প্রমাণ বা ভুল প্রমাণ করার বিষয় নয়; এটি আত্মিক উপলব্ধি ও শাস্ত্রীয় মানদণ্ডে যাচাইযোগ্য।
বাস্তব উদাহরণ
বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য: আইজ্যাক নিউটন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির যে ধারণা বা 'সত্য' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পরবর্তীতে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর 'আপেক্ষিকতা তত্ত্ব' (Theory of Relativity) দিয়ে তার সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করেন এবং নতুন বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক সত্য সর্বদা জ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে বিকশিত হয়।
ধর্মীয় সত্য: সব প্রধান ধর্মে বলা হয়েছে, "মানুষ হত্যা মহাপাপ" বা "দরিদ্রকে সাহায্য করা পুণ্য"। এটি এক চিরন্তন নৈতিক ও ধর্মীয় সত্য। হাজার বছর ধরে সমাজের বা বিজ্ঞানের যত উন্নতিই হোক না কেন, এই নৈতিক সত্যগুলোর কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
আধুনিক 'পোস্ট-ট্রুথ' (Post-truth) বা সত্য-উত্তর যুগ
Post-truth বা সত্য-উত্তর যুগ এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে বোঝায়, যেখানে জনমত গঠনের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য বা সত্যের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ, বিশ্বাস এবং অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে "Post" মানে সত্যের সমাপ্তি নয়, বরং সত্যের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া (Irrelevance of Truth)।
২০১৬ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারি 'Post-truth' শব্দটিকে "Year of the Word" হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমান একাদশ শতাব্দীতে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসারের সাথে আমরা এ যুগে প্রবেশ করেছি। অর্থাৎ, সত্যের স্থান যখন আবেগ এবং অন্ধ বিশ্বাস দখল করে নেয়, তখনই পোস্ট-ট্রুথ যুগের সূচনা হয়।
Post-truth যুগের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. ইকো চেম্বার ও কনফারমেশন বায়াস (Echo Chambers & Confirmation Bias):
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম আমাদের কেবল সেই তথ্যগুলো দেখায়, যা আমাদের আগে থেকে বিদ্যমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে। ফলে মানুষ নিজ বিশ্বাসের বাইরের সত্যকে সহজে অস্বীকার করে।
২. ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার (Misinformation & Disinformation):
ইন্টারনেটের যুগে কোনো তথ্য কতটুকু সত্য, তার চেয়ে সেটি কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বা লাইক-শেয়ার পাচ্ছে তা দিয়ে সত্যতা নির্ধারণের একটি ভুল প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
৩. বিশেষজ্ঞদের প্রতি অনাস্থা (Distrust in Expertise):
বৈজ্ঞানিক তথ্য, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা বা বিশেষজ্ঞদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে সাধারণ মানুষ অনেক সময় কাল্পনিক বা ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব (Conspiracy Theories)-কে বেশি বিশ্বাস করে।
Post-truth যুগের বাস্তব উদাহরণ
জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার (Climate Change Denial): বিশ্বের ৯৭% জলবায়ু বিজ্ঞানী গবেষণা ও প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক লাভ বা ব্যক্তিগত অনুভূতির কারণে অনেক গোষ্ঠী এটিকে "গুজব" বা "চক্রান্ত" বলে এড়িয়ে যায়।
ভ্যাকসিন সংক্রান্ত গুজব (Anti-vaccine Movement): বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আবেগী ও ভীতিজনক গুজবের কারণে অনেকে প্রতিষেধক টিকা গ্রহণে অস্বীকার করে।
রাজনৈতিক নির্বাচন ও ফেক নিউজ: রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা নিজেদের নীতিকে সঠিক প্রমাণ করতে তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে ইমোশনাল মেসেজিং তৈরি করা হয়, যা ভোটারদের প্রভাবিত করে।

সত্যের রাজনীতিকীকরন
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault, 1926–1984)-র মতে, সত্য কোনো নিরেট, নিরপেক্ষ বা চিরন্তন বাস্তব বস্তু নয় যা মানুষ আবিষ্কার করে। বরং সত্য হলো একটি সামাজিক উৎপাদন (Social Construction), যা ক্ষমতার অনুশাসন ও কাঠামোর মধ্য দিয়ে সমাজ কর্তৃক তৈরি হয়।
ফুকোর মতে, প্রতিটি সমাজের নিজস্ব 'Regime of Truth' বা 'সত্যের শাসনব্যবস্থা' থাকে। এটি এমন এক ধরনের ব্যবস্থা যা নির্ধারণ করে:
১. কোন ধরনের বক্তব্যকে 'সত্য' হিসেবে গ্রহণ করা হবে আর কোনটিকে 'মিথ্যা' বলে বাতিল করা হবে।
২. সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার নিয়ম ও কৌশলগুলো কী হবে।
৩. কারা সত্য বলার অধিকার পাবে (যেমন: বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, বিচারক, বা বিশেষজ্ঞ)।
৪. কীভাবে সত্য অনুমোদিত (sanctioned) ও প্রচারিত হবে।
ফলে, যে বক্তব্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন ও নিয়ম মেনে আসে, সমাজ তাকেই 'সত্য' বলে মেনে নেয়। ফুকো তাঁর 'Madness and Civilization', 'The Birth of the Clinic', এবং 'Discipline and Punish' বইগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সমাজ ও ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সাথে সত্যের সংজ্ঞা বদলে গেছে:
ক. ডিসকোর্স বা বাচনভঙ্গি (Discourse)-র ভূমিকা
'ডিসকোর্স' হলো চিন্তাভাবনা ও যোগাযোগের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা ভাষা। সমাজ বা ক্ষমতা যে ডিসকোর্স তৈরি করে, তার ভেতরে থেকেই মানুষ সত্যকে উপলব্ধি করে। যেমন, ১৮ শতকের আগে পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের 'ঈশ্বর বা শয়তানের ভর করা ব্যক্তি' হিসেবে দেখা হতো—তখন সেটাই ছিল সত্য। কিন্তু আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিসকোর্স আসার পর মানসিক রোগকে 'চিকিৎসাগত সমস্যা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলো। এখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষমতা একটি নতুন 'সত্য' তৈরি করেছে।
খ. প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন (Institutional Validation)
যে তথ্য বা দাবি প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, হাসপাতাল বা বিজ্ঞানাগার থেকে অনুমোদিত হয়, সমাজ সেটাকে সত্য বলে ধরে নেয়। যেসব জ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকে (যেমন: আদিবাসী জ্ঞান, লোকজ চিকিৎসা, বা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা), ক্ষমতা সেগুলোকে 'অ-বৈজ্ঞানিক' বা 'অ-সত্য' বলে প্রান্তিক করে রাখে।
গ. স্বাভাবিকীকরণ বা নরম্যালাইজেশন (Normalization)
ক্ষমতা ডিসকোর্সের মাধ্যমে সমাজে কিছু আচরণকে 'স্বাভাবিক' (Normal) এবং কিছু আচরণকে 'অস্বাভাবিক' (Abnormal) হিসেবে সাব্যস্ত করে। যা স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজ তাকেই 'সত্য ও গ্রহণযোগ্য' বলে মান্য করে।

১৯৭০-এর দশকে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক প্রচারণা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নলকূপের ভূগর্ভস্থ পানিকে 'একমাত্র নিরাপদ ও আধুনিক সত্য' হিসেবে জনমনে স্বাভাবিক করা হয়েছিল, যেখানে খোলা জলাশয়ের ভূপৃষ্ঠের পানিকে চিহ্নিত করা হয় অনিরাপদ হিসেবে। তবে পরবর্তীতে অগভীর পানিতে আর্সেনিক দূষণ ও অতিরিক্ত উত্তোলনে মাটির নিচের পানির স্তর নেমে যাওয়ার সংকট দেখা দিলে 'গভীর নলকূপ' সেই সত্যের স্থলাভিষিক্ত হয়; আর বর্তমানে পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে নদী-নালার ভূপৃষ্ঠের পানিকে আধুনিক শোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরায় টেকসই ও সুপেয় 'নতুন সত্য' হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও স্বাভাবিকীকরণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, সত্য হলো এমন এক ব্যবস্থা যা ক্ষমতা দ্বারা উৎপাদিত হয়, সুরক্ষিত হয় এবং সমাজের ওপর শাসন বজায় রাখতে ব্যবহৃত হয়। তাই ফুকোর দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশ্নটা "সত্য কী?" হওয়া উচিত নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত "কার স্বার্থে এবং কোন ক্ষমতার বলে এটি সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?"

তাই সব শেষে এ কথা বলা যায় যে, নিজের জানা/মানা সত্যকে চরম বা একমাত্র মনে না করে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুধাবন করা জরুরি। পরম সত্য (Absolute Truth) অনুসন্ধানের বস্তু হলেও, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সত্য বহুলাংশে আপেক্ষিক (Relative)। সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটাতে সত্যের এই বহুমাত্রিকতাকে গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ ।
‘সত্য’ শব্দটি বৈদিক ও ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্য থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে। এর আক্ষরিক অর্থ যা বিদ্যমান বা বাস্তব, তা-ই সত্য। বাংলা একাডেমি ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ ও ‘বাংলা উচ্চারণের নিয়ম’ গ্রন্থে ‘সত্য’ শব্দটির প্রয়োগ ও উচ্চারণ ব্যাখ্যা করেছে। এতে দেখা যায়, ‘সত্য’ শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে:
বিশেষণ (Adjective): প্রামাণিক, যথার্থ, বা বাস্তব (যেমন: ‘ঘটনাটি সত্য।‘)
বিশেষ্য (Noun): সত্যতা, বাস্তব সত্তা, বা সততা (যেমন: ‘সত্যের জয় হয়।‘)
সাধারণ দৃষ্টিতে সত্যকে একটি একক ও অখণ্ড সত্তা মনে হলেও, দর্শন, প্রজ্ঞানশাস্ত্র (Epistemology) এবং আধুনিক বিজ্ঞানে সত্য বহুমাত্রিক। প্রিজমের আলো বিচ্ছুরণের মতো সত্যেরও আছে বহু রূপ।
সাধারণ কথায় সত্য বলতে আমরা বুঝি এমন কিছু যা বাস্তব বা সঠিক। তবে দর্শনে সত্য কেবল কোনো তথ্যের সঠিকতা নয়, এটি উপলব্ধির একটি ধারা। একটি একক আলোর রশ্নি যেমন প্রিজমের ভেতর দিয়ে গেলে সাতটি ভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়, ঠিক তেমনি সত্যও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও কাঠামোর ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
দর্শনে 'সত্য' বলতে সাধারণত কোনো উক্তি, বিশ্বাস বা ধারণার সাথে বাস্তবতার বা যুক্তির সঙ্গতিকে বোঝায়। জ্ঞানবিদ্যায় (Epistemology) জ্ঞান হলো Justified True Belief বা "যুক্তিসঙ্গত সত্য বিশ্বাস" । অর্থাৎ, কোনো বিষয় সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস তখনই জ্ঞানে পরিণত হয়, যখন তা বস্তুনিষ্ঠভাবে সত্য প্রমাণিত হয়।
দার্শনিক আলোচনায় সত্যকে ব্যাখ্যা করার জন্য মূলত তিনটি প্রধান তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়:

আবার, হাবারমাস (Jürgen Habermas, 1981) তাঁর জ্ঞান ও সত্যের শ্রেণিবিন্যাসে জগতকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। যথা: বস্তুগত জগত (Objective World), আত্মনিষ্ঠ/ব্যক্তিগত জগত (Subjective World) এবং সামাজিক/মানক জগত (Normative/Social World)। এই শ্রেণিবিন্যাসটি মূলত দর্শন (Epistemology / জ্ঞানতত্ত্ব) এবং সামাজিক বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রদর্শনের আধুনিক শ্রেণিবিন্যাস থেকে এসেছে।

প্রাত্যহিক উদাহরণ
উদাহরণ ১: অন্ধের হাতি দেখা (Perspective and Subjective Truth)
প্রাচীন পরিচিত গল্প 'অন্ধ ও হাতি' সত্যের বহুমাত্রিকতার সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ।
যে অন্ধ ব্যক্তি হাতির পা স্পর্শ করেছে, তার কাছে হাতি একটি 'স্তম্ভের' মতো।
যে ব্যক্তি কান স্পর্শ করেছে, তার কাছে হাতি একটি 'পাখার' মতো।
এখানে প্রত্যেকে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে সত্যি বলছে, কিন্তু কারও সত্যই সম্পূর্ণ সত্য নয়। মানুষের ব্যক্তিগত বা সামাজিক সত্যও এভাবে গঠিত হয়।
উদাহরণ ২: আধুনিক যুগের 'পোস্ট-ট্রুথ' (Post-Truth) ও ডিজিটাল মাধ্যম
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন সত্য তৈরি হতে দেখা যায়। একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনাকে দুটি ভিন্ন সংবাদমাধ্যম নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের ‘সত্য’ উপস্থাপন করে। এখানে কোনটা সত্য তা ব্যক্তিমানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে।
ধর্মীয় সত্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য
ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে সত্য মানবীয় যুক্তি, ইন্দ্রিয়লব্ধ পর্যবেক্ষণ বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নির্ভর নয়। এটি সৃষ্টিকর্তা, ওহী বা ঐশ্বরিক বাণী (Divine Revelation) এবং সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত। ধর্মতত্ত্বে (Theology) সত্য হলো শাশ্বত ও মহাজাগতিক (Eternal Order), যা সমস্ত বিশ্বলোক চরাচর পরিচালনা করে। তা মানুষের নৈতিক জীবন যাপন ও ন্যায়-অন্যায়ের বিধি-নিষেধ নিয়েও কথা বলে।
অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক সত্য (Scientific Truth) হলো প্রকৃতি ও বিশ্বজগতের এমন কিছু নিয়ম বা তথ্য, যা অনুমান বা বিশ্বাস নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। এটি মানুষের ব্যক্তিগত মতামত বা অনুভূতির ওপর নির্ভর করে না। বৈজ্ঞানিক সত্য তাই সবার জন্য সমান। যেকোনো জায়গায় যে কেউ একই নিয়মে পরীক্ষা করলে একই ফলাফল পাবে। তাছাড়া, বিজ্ঞান কখনো নিজের ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা করে না। তাই, ভবিষ্যতে যদি নতুন ও আরও নিখুঁত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বৈজ্ঞানিক সত্য নিজেকে সংশোধন ও উন্নত করে নিতে পারে। যেমন, হাতের কলমটি ছেড়ে দিলে তা নিচে পড়বে, কারণ পৃথিবীর অভিকর্ষ বল একে টানছে। অথবা, সাধারণ বায়ুমণ্ডলে পানিকে তাপ দিলে তা ঠিক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটতে শুরু করবে।
বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য এবং ধর্মীয় সত্য মানবজ্ঞানের দুটি ভিন্ন ধারা। বিজ্ঞান জগতের কার্যকারণ বা "কীভাবে" (How) ঘটে তার উত্তর খোঁজে, ধর্ম সেখানে অস্তিত্বের উদ্দেশ্য, অর্থ বা "কেন" (Why)-এর অনুসন্ধান করে।

সত্যের যাচাই দার্শনিক কার্ল পপারের মতে, বৈজ্ঞানিক সত্যের বৈশিষ্ট্য হলো একে 'ভুল প্রমাণের যোগ্য' (Falsifiable) হতে হবে। এটি বস্তুগতভাবে প্রমাণ বা ভুল প্রমাণ করার বিষয় নয়; এটি আত্মিক উপলব্ধি ও শাস্ত্রীয় মানদণ্ডে যাচাইযোগ্য।
বাস্তব উদাহরণ
বিজ্ঞানভিত্তিক সত্য: আইজ্যাক নিউটন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির যে ধারণা বা 'সত্য' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পরবর্তীতে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর 'আপেক্ষিকতা তত্ত্ব' (Theory of Relativity) দিয়ে তার সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করেন এবং নতুন বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক সত্য সর্বদা জ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে বিকশিত হয়।
ধর্মীয় সত্য: সব প্রধান ধর্মে বলা হয়েছে, "মানুষ হত্যা মহাপাপ" বা "দরিদ্রকে সাহায্য করা পুণ্য"। এটি এক চিরন্তন নৈতিক ও ধর্মীয় সত্য। হাজার বছর ধরে সমাজের বা বিজ্ঞানের যত উন্নতিই হোক না কেন, এই নৈতিক সত্যগুলোর কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
আধুনিক 'পোস্ট-ট্রুথ' (Post-truth) বা সত্য-উত্তর যুগ
Post-truth বা সত্য-উত্তর যুগ এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে বোঝায়, যেখানে জনমত গঠনের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য বা সত্যের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ, বিশ্বাস এবং অনুভূতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে "Post" মানে সত্যের সমাপ্তি নয়, বরং সত্যের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া (Irrelevance of Truth)।
২০১৬ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারি 'Post-truth' শব্দটিকে "Year of the Word" হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমান একাদশ শতাব্দীতে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসারের সাথে আমরা এ যুগে প্রবেশ করেছি। অর্থাৎ, সত্যের স্থান যখন আবেগ এবং অন্ধ বিশ্বাস দখল করে নেয়, তখনই পোস্ট-ট্রুথ যুগের সূচনা হয়।
Post-truth যুগের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. ইকো চেম্বার ও কনফারমেশন বায়াস (Echo Chambers & Confirmation Bias):
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম আমাদের কেবল সেই তথ্যগুলো দেখায়, যা আমাদের আগে থেকে বিদ্যমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে। ফলে মানুষ নিজ বিশ্বাসের বাইরের সত্যকে সহজে অস্বীকার করে।
২. ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার (Misinformation & Disinformation):
ইন্টারনেটের যুগে কোনো তথ্য কতটুকু সত্য, তার চেয়ে সেটি কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বা লাইক-শেয়ার পাচ্ছে তা দিয়ে সত্যতা নির্ধারণের একটি ভুল প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
৩. বিশেষজ্ঞদের প্রতি অনাস্থা (Distrust in Expertise):
বৈজ্ঞানিক তথ্য, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা বা বিশেষজ্ঞদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে সাধারণ মানুষ অনেক সময় কাল্পনিক বা ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব (Conspiracy Theories)-কে বেশি বিশ্বাস করে।
Post-truth যুগের বাস্তব উদাহরণ
জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার (Climate Change Denial): বিশ্বের ৯৭% জলবায়ু বিজ্ঞানী গবেষণা ও প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক লাভ বা ব্যক্তিগত অনুভূতির কারণে অনেক গোষ্ঠী এটিকে "গুজব" বা "চক্রান্ত" বলে এড়িয়ে যায়।
ভ্যাকসিন সংক্রান্ত গুজব (Anti-vaccine Movement): বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আবেগী ও ভীতিজনক গুজবের কারণে অনেকে প্রতিষেধক টিকা গ্রহণে অস্বীকার করে।
রাজনৈতিক নির্বাচন ও ফেক নিউজ: রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা নিজেদের নীতিকে সঠিক প্রমাণ করতে তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে ইমোশনাল মেসেজিং তৈরি করা হয়, যা ভোটারদের প্রভাবিত করে।

সত্যের রাজনীতিকীকরন
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault, 1926–1984)-র মতে, সত্য কোনো নিরেট, নিরপেক্ষ বা চিরন্তন বাস্তব বস্তু নয় যা মানুষ আবিষ্কার করে। বরং সত্য হলো একটি সামাজিক উৎপাদন (Social Construction), যা ক্ষমতার অনুশাসন ও কাঠামোর মধ্য দিয়ে সমাজ কর্তৃক তৈরি হয়।
ফুকোর মতে, প্রতিটি সমাজের নিজস্ব 'Regime of Truth' বা 'সত্যের শাসনব্যবস্থা' থাকে। এটি এমন এক ধরনের ব্যবস্থা যা নির্ধারণ করে:
১. কোন ধরনের বক্তব্যকে 'সত্য' হিসেবে গ্রহণ করা হবে আর কোনটিকে 'মিথ্যা' বলে বাতিল করা হবে।
২. সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার নিয়ম ও কৌশলগুলো কী হবে।
৩. কারা সত্য বলার অধিকার পাবে (যেমন: বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, বিচারক, বা বিশেষজ্ঞ)।
৪. কীভাবে সত্য অনুমোদিত (sanctioned) ও প্রচারিত হবে।
ফলে, যে বক্তব্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন ও নিয়ম মেনে আসে, সমাজ তাকেই 'সত্য' বলে মেনে নেয়। ফুকো তাঁর 'Madness and Civilization', 'The Birth of the Clinic', এবং 'Discipline and Punish' বইগুলোতে দেখিয়েছেন কীভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সমাজ ও ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সাথে সত্যের সংজ্ঞা বদলে গেছে:
ক. ডিসকোর্স বা বাচনভঙ্গি (Discourse)-র ভূমিকা
'ডিসকোর্স' হলো চিন্তাভাবনা ও যোগাযোগের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা ভাষা। সমাজ বা ক্ষমতা যে ডিসকোর্স তৈরি করে, তার ভেতরে থেকেই মানুষ সত্যকে উপলব্ধি করে। যেমন, ১৮ শতকের আগে পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের 'ঈশ্বর বা শয়তানের ভর করা ব্যক্তি' হিসেবে দেখা হতো—তখন সেটাই ছিল সত্য। কিন্তু আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিসকোর্স আসার পর মানসিক রোগকে 'চিকিৎসাগত সমস্যা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলো। এখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষমতা একটি নতুন 'সত্য' তৈরি করেছে।
খ. প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন (Institutional Validation)
যে তথ্য বা দাবি প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, হাসপাতাল বা বিজ্ঞানাগার থেকে অনুমোদিত হয়, সমাজ সেটাকে সত্য বলে ধরে নেয়। যেসব জ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকে (যেমন: আদিবাসী জ্ঞান, লোকজ চিকিৎসা, বা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা), ক্ষমতা সেগুলোকে 'অ-বৈজ্ঞানিক' বা 'অ-সত্য' বলে প্রান্তিক করে রাখে।
গ. স্বাভাবিকীকরণ বা নরম্যালাইজেশন (Normalization)
ক্ষমতা ডিসকোর্সের মাধ্যমে সমাজে কিছু আচরণকে 'স্বাভাবিক' (Normal) এবং কিছু আচরণকে 'অস্বাভাবিক' (Abnormal) হিসেবে সাব্যস্ত করে। যা স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজ তাকেই 'সত্য ও গ্রহণযোগ্য' বলে মান্য করে।

১৯৭০-এর দশকে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক প্রচারণা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নলকূপের ভূগর্ভস্থ পানিকে 'একমাত্র নিরাপদ ও আধুনিক সত্য' হিসেবে জনমনে স্বাভাবিক করা হয়েছিল, যেখানে খোলা জলাশয়ের ভূপৃষ্ঠের পানিকে চিহ্নিত করা হয় অনিরাপদ হিসেবে। তবে পরবর্তীতে অগভীর পানিতে আর্সেনিক দূষণ ও অতিরিক্ত উত্তোলনে মাটির নিচের পানির স্তর নেমে যাওয়ার সংকট দেখা দিলে 'গভীর নলকূপ' সেই সত্যের স্থলাভিষিক্ত হয়; আর বর্তমানে পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে নদী-নালার ভূপৃষ্ঠের পানিকে আধুনিক শোধন প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরায় টেকসই ও সুপেয় 'নতুন সত্য' হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও স্বাভাবিকীকরণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, সত্য হলো এমন এক ব্যবস্থা যা ক্ষমতা দ্বারা উৎপাদিত হয়, সুরক্ষিত হয় এবং সমাজের ওপর শাসন বজায় রাখতে ব্যবহৃত হয়। তাই ফুকোর দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশ্নটা "সত্য কী?" হওয়া উচিত নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত "কার স্বার্থে এবং কোন ক্ষমতার বলে এটি সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?"

তাই সব শেষে এ কথা বলা যায় যে, নিজের জানা/মানা সত্যকে চরম বা একমাত্র মনে না করে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুধাবন করা জরুরি। পরম সত্য (Absolute Truth) অনুসন্ধানের বস্তু হলেও, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সত্য বহুলাংশে আপেক্ষিক (Relative)। সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটাতে সত্যের এই বহুমাত্রিকতাকে গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ ।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



