somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কার্ল মার্ক্স (১৮১৮–১৮৮৩): অধ্যবসায়ের চির অনুপ্রেরণা

১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়েকজন চিন্তাবিদ মানবসমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন, কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) তাদের অন্যতম। বর্তমান দুনিয়ার অজস্র বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্ক্স অবশ্য-পাঠ্য।


মার্ক্স ছিলেন অসাধারণ পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীল এক মানুষ। সারাজীবন তিনি অভাব-অনটন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, বাসস্থান পরিবর্তন এবং শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে গেছেন। তা সত্ত্বেও তিনি কখনো নিজের কাজ ছেড়ে দেননি। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও কীভাবে নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে হয়—মার্ক্সের জীবন তার উদাহরণ ।

প্রথম জীবন (১৮১৮–১৮৪৯)
কার্ল মার্ক্স ১৮১৮ সালে জার্মানির ট্রিয়ার (Trier) শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড আগ্রহ । তিনি বন (Bonn) ও বার্লিন (Berlin) বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা করেন।

তার ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবেন। কিন্তু তৎকালীন জার্মান সরকার তার সমাজ সংস্কারমূলক ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা পছন্দ করেনি। ফলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পাননি। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি সাংবাদিকতাকে বেছে নেন এবং 'রাইনিশে সাইতুং' (Rheinische Zeitung) নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক হন। পত্রিকায় সাধারণ মানুষের অধিকার ও সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখার কারণে সরকার তার পত্রিকা বন্ধ করে দেয় এবং তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।

এরপর মার্ক্স প্যারিসে যান। সরকারের নজরে পড়ায় তাকে সেখান থেকেও বের করে দেয়া হয়। এরপর তিনি ব্রাসেলসে (বেলজিয়াম) আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস মিলে ১৮৪৮ সালে 'কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো' (The Communist Manifesto) প্রকাশ করেন। সরকারের চোখ রাঙানি ও এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিতাড়িত হওয়া সত্ত্বেও মার্ক্স তাঁর লেখালেখি ও গবেষণা থামাননি।

লন্ডনে চরম অনটন ও সাধনা (১৮৪৯–১৮৬৪)
১৮৪৯ সালে মার্ক্স লন্ডনে যান। লন্ডনে কাটানো এই সময়টি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং সৃষ্টিশীল সময়। লন্ডনে তার কোনো স্থায়ী আয় ছিল না। পরিবার নিয়ে তিনি লন্ডনের সোহো (Soho) নামক একটি নোংরা ও ঘিঞ্জি এলাকার দুটি ছোট ঘরে বাস করতেন ।
এ সময় মার্ক্সের আয় বলতে ছিল বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখে পাওয়া অল্প কিছু টাকা। অভাবের কারণে প্রায় তাদের অনাহারে থাকতে হতো। ঘরের আসবাবপত্র, থালাবাসন এমনকি নিজেদের জামাকাপড় বন্ধক রেখে তাদের খাবারের টাকা জোগাড় করতে হয়েছে । সঠিক চিকিৎসা ও পুষ্টির অভাবে এখানে মার্ক্সের চার সন্তানের অকালমৃত্যু ঘটে।

• ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরি
অভাবে থাকলেও মার্ক্সের মূল আশ্রয় ছিল লাইব্রেরি। তিনি প্রতিদিন 'ব্রিটিশ মিউজিয়াম রিডিং রুমে' (British Museum Reading Room) যেতেন । সেখানে সকাল ৯টা থেকে রাত পর্যন্ত টানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা ও নোট তৈরি করতেন। এখানে তিনি অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং গণিতের হাজার হাজার বই ও সরকারি রিপোর্ট (Blue Books) বিশ্লেষণ করেন। টানা প্রায় দুই দশক ধরে তিনি প্রতিদিন নিয়মিত লাইব্রেরিতে গিয়ে এই পরিশ্রম করেন, যা আজকের দিনের জ্ঞান পিপাসুদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ।

'দাস ক্যাপিটাল' বা ‘পুঁজি’ রচনা (১৮৬৪–১৮৭৭)
লন্ডনে দীর্ঘদিনের অপুষ্টি, কাজের চাপ এবং অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে মার্ক্সের শরীর ভেঙে পড়ে। তিনি লিভারের সমস্যা, চোখের ইনফেকশন এবং ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হন। এ সময় তার শরীরজুড়ে যন্ত্রণাদায়ক ফোড়া দেখা দেয় । এই ফোড়ার কারণে তিনি সোজা হয়ে চেয়ারে বসতে পারতেন না। শরীর থেকে রক্ত ও পুঁজ বের হতো এবং যন্ত্রণা হতো। অনেক সময় তিনি টেবিলে শুয়ে লিখতেন, আবার কখনো যন্ত্রণার কারনে দাড়িয়ে লেখার চেষ্টা করতেন।

• 'দাস ক্যাপিটাল' প্রকাশ (১৮৬৭)
এই শারীরিক যন্ত্রণা এবং দারিদ্র্যের মধ্যেই ১৮৬৭ সালে 'দাস ক্যাপিটাল' (Das Kapital- Volume 1) প্রকাশ পায় । এটি ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গভীর বিশ্লেষণ। অসুস্থতা নিয়ে কাজ করার সময় মার্ক্স তার বন্ধু এঙ্গেলসকে ঠাট্টা করে লেখেন, "আমার এই ফোড়াগুলোর যন্ত্রণা ধনপতিদের (বুর্জোয়াদের) সারা জীবন মনে রাখতে হবে।"

শেষ জীবন (১৮৭৭–১৮৮৩)
জীবনের শেষ দিনগুলোতেও মার্ক্স দমে যাননি। ১৮৮১ সালে স্ত্রী জেনি মার্ক্সের মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তার নিজের স্বাস্থ্য আরও খারাপ হতে থাকে। এতেও তিনি নতুন বিষয় শেখা বন্ধ করেননি। রাশিয়ার তৎকালীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বোঝার জন্য তিনি রুশ ভাষা শেখেন। কয়েক মাসের মধ্যে তিনি রাশিয়ান সরকারি রিপোর্ট ও বই পড়া শুরু করেন।

শেষ দিন পর্যন্ত তিনি 'দাস ক্যাপিটাল'-এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডের তথ্য ও পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন (যা পরবর্তীতে তার মৃত্যুর পর এঙ্গেলস সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন)। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ লন্ডনে নিজ পড়ার টেবিলে চেয়ারে বসা অবস্থায় তার মৃত্যু হয় ।

মার্ক্সের চিন্তা বা মতাদর্শের সঙ্গে কেউ একমত হতে পারেন আবার নাও হতে পারেন, কিন্তু জ্ঞান অর্জনের প্রতি তার নিষ্ঠা ও অক্লান্ত পরিশ্রম চিরকালের অনুপ্রেরণা ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জগন্নাথবাসীগণ, আমার কথা শুনছেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

জগন্নাথবাসীগণ,
আপনাদের গরু কোরবানি যদি হযরত জাবের (রাঃ)-এর মতো
নবীজীর সম্মানে হয়ে থাকে, তাহলে মোবারকবাদ।
আর, শুধু প্রতিবাদ দেখাতে একটি অবলা পশুকে হত্যা করে থাকলে,
তার জন্যে খোদার দরবারে বিচার দিলাম।
...বাকিটুকু পড়ুন

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

লক্ষ্মীপুরের সুপারি থেকে উপকূলের অর্থনীতি: কৃষিজ সম্পদই পারে গ্রামীণ ভাগ্য বদলাতে

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮


বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে এমন কিছু নির্দিষ্ট ফল, ফসল বা মৎস্য সম্পদ প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়, যা শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটায় না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে জোরালো প্রভাব ফেলে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

”আমার রাজনীতির রূপরেখা” -- জিয়াউর রহমান

লিখেছেন প্রামানিক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
আমি তখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। এটা আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম চাকরি নিয়েছিলাম ব্রিটিশ আমলের প্রকাশিত দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। আজাদ পত্রিকাটি ব্রিটিশ আমলে মুসলমানের পক্ষের একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×