আমি একজন কয়েদী। আমার দুই বছরের সশ্রম কারাদন্ড হয়েছে। এখানে আমার মত হাজার হাজার কয়েদী আছে। মোটামোটি দক্ষ জনশক্তি বলতে পারেন। বাংলাদেশী কিন্তু পরবাসে কারা ভোগ। নিজের ইচ্ছায় কারা ভোগ করছি। আমার দুই বছরের হলেও এখানে অনেকে তিন বা পাচঁ বছরের অধিকও আছে । দেশের কারাগারের সাথে এখানের কারাবাসের পার্থক্য হল শুধু মাত্র একটা বিষয়। আর সেইটা- বাংলাদেশের কারাগারে মাস গেলে পরিবারের কাছে টাকা যায় না। আর এখানে মাস শেষ হলে মোটা অংকের টাকা যায়।
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সবাই অনেক পরিশ্রম করে এখানে। এতই পরিশ্রম করে যে নিজের কথায় ভুলে যায়। কেউ কেউ আবার এই পরিশ্রমের চাপে দুর্ঘটনার শিকার হয়। কেউ হাত পা হারায়, আবার কেউ কেউ বা নিজের জীবনটাই দিয়ে বসে।
কত জনকে আমি দেখেছি নিরবে গোপনে চোখের জল ফেলতে। কিন্তু কখনো কাউকে বুঝতে দেয়নি। এখানে সবাই একই রকম। সবাই কাঁদে, কিন্তু কেউ কাউকে বুঝতে দেয় না।
নিজের আপনজন কখনো বুঝতে চায় না কতটা পরিশ্রম করি!!! কেনই বা নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে এই পথ চলা!! জীবনের এই সুন্দর রংগিন সময়টাকে কেন এইভাবে আমরা বিলিয়ে দিচ্ছি!!!
হুম। আপনি হয়ত এখন বুঝতে পারছে আমি বা আমরা প্রবাসী কর্মজীবি মানুষ।
দেশ পরিবার, মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান সবাইকে রেখে একাকী অসনীয় জীবন কাটায় শুধুমাত্র পরিবারের সবার মুখে একটু হাসি দেখার জন্য। ওরা শুখে আছে এইটা দেখার জন্যই।
আমার বা আমাদের এই ত্যাগে যে শুধু মাত্র আমার বা আমাদের পরিবার উপকৃত হয় তা নয় বরং গোটা জাতি উপকৃত হয়। আমার প্রানের দেশ সুন্দর ভাবে সামনে এগিয়ে যাবার শক্তি পায়।
কিন্তু দেশের মানুষের কাছে আমরাই সব থেকে বেশি উপেক্ষিত। দেশে আমরাই সব থেকে সুবিধা বঞ্চিত। যাও কয়েকটা সুযোগ সুবিধা সরকার দিয়েছে তাও সরকারি আমলা নামক পাপের কামলাদের কারিশমায় আমরা সেইটা থেকে অনেক হয়রানির শিকার হই। অনেক সময় বঞ্চিত হই।
কিছু করার নাই, সবই নসীব। কথায় আছে- “যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর।“ যেমন ধরেন কিছু দিন আগে দেখলাম নেটে দেশের মেয়েরা প্রবাসীদের কিভাবে তিরস্কার করল!!!! আবার বাংলাদেশ এয়ারপোর্টে কর্মরত একজন বলল- “প্রবাসীরা বালের কামলা।“ আমার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহীত প্রবাসীদের আয়ের উপর টেক্স বসাচ্ছেন। “লাভের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে বর্তমান সরকারের নৌকা।“
যাই হোক-
আর দুই দিন পর ঈদ। ঈদের আনন্দে সবাই মেতে আছে। লোক দেখানো আনন্দ পরিবারকে আমরাও দেখাচ্ছি। কিন্তু আমি জানি আমার ভিতর এক অচেনা ঝড়। কতটা কষ্টে বুকের ভিতরটা মোচড়ে উঠে। চোখ দিয়ে পানি বের হয় না, মরুভুমির উত্তপ্ত নোনা বাতাসে শুকিয়ে যায়।
মাঝে মাঝে মা-বাব, স্ত্রী সন্তানের কথা মনে হলে নিজের বেচেঁ থাকাটা অর্থহীন হয়ে উঠে। আমরা প্রবাসীরা কষ্টের উপর কষ্ট বিছিয়ে বানাই জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত। প্রতিটা মুহুর্তে অপেক্ষায় থাকি কখন দেশে যাব। রক্তের মানুষগুলিকে, ভালবাসার মানুষগুলিকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিতকার কেদেঁ বুকের কষ্টগুলেকে মুছে ফেলব।
আর বলব – খুশির জিন্দেগী আমিও চাই। আট দশটা মাষের মত স্বাভাবিক ভাবে বাচঁতে চাই। বিদেশ নামক কারাবাস আর চাই না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


