সকালের শুরুটা সেদিন অদ্ভুত রকমের! কাঠফাটা রোদ। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই ঝুম বৃষ্টি! এমন বৃষ্টিতে ভেজার বা দু'চার লাইন কবিতা লিখবে- সেই ছেলে নয় বেঞ্জো। জানালার বাইরে বৃষ্টি দেখে আবার দিলো ঘুম। এ ঘুম যেন চির-নির্জনতার! একা একলা নিশ্চিন্ত এবং চুপচাপ একটি ঘুম, যেন এ পৃথিবীতে একটিই দায়িত্ব ঘুম, ঘুম.......। এদিকে তার মোবাইল নামক যন্ত্রটি কতোবার যে বেজে উঠছে টেরই পেল না। ঘুম ভাঙলো কলিংবেলের কর্কশ শব্দে। বাসায় কেউ নেইও যে গিয়ে খুলে দেবে। যাবে যাবে করছে বেঞ্জো এই সময় দেখলো মোবাইলটি আবার বেজে উঠছে। কে.. আরে? পার্ল? ইশ... ১১টি মিসকল?
বেঞ্জোঃ হ্যালো, পার্ল?
পার্লঃ তুমি দরজা খুলবা, নাকি আমি চিরতরে তোমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ
করে দেব?
বেঞ্জোঃ মানে কি?
পার্লঃ হ্যাঁ, এটাই মানে। আমি তোমার বাসার দরজার সামনে।
বেঞ্জোঃ (দরজা খুলে)... আসলে বুচ্ছ আমার মনেই ছিলো না। এই কানে ধরলাম,
আমি এমন ভুল জীবনেও করবো না। আসলে ঘুমের মধ্যে কোন কিছুই
মাথায় ছিল না।
পার্লঃ আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিবা, নাকি এই ভেজা শরীরে তোমার দরজার
সামনে দাড়িয়েই রাখবা?
বেঞ্জোঃ (হাসি দিয়ে)... আসো আসো। সরি কেমন?
পার্লঃ আংকেল-আন্টি কোথায়?
বেঞ্জোঃ আব্বু-আম্মু খালামনির বাসায় গেছে। তোমার জন্য টাওয়েল আনি?
পার্লঃ না, তুমি দাঁড়িয়েই থাকো। পাগল...
রুমটা তো বেশ গোছালো দেখছি। ভালোই, তা আপনার ঘুম কি শেষ
হয়েছে না আরো ঘুমাবেন?
বেঞ্জোঃ কি যে বলোনা। আসলে জানো তো সকালে এতো বৃষ্টি ছিল! আমাদের
আজ ছবির হাটে দেখা করার কথা। আর আমি ভুলেই গেলাম। আমি
অনেক সরি পার্ল, প্লিজ।
পার্লঃ আমি তোমাকে কিছু বলেছি? আমি রাগ করেছি কেউ দরজা কেন খুলছে
না- এই জন্যে।
বেঞ্জোঃ সেটার জন্যেও সরি।
পার্লঃ আর একবার সরি বলবা, মাটিতে পুঁতে ফেলবো!
বেঞ্জোঃ সরি, আর সরি বলবো না।
পার্লঃ আবার? ফাজলামি করবা আমার সাথে?
বেঞ্জোঃ না ঠিক আছে। চলো বারান্দায় গিয়ে একটু বসি।
পার্লঃ হুম, চলো..।
(অনেকক্ষণ চুপ থেকে)
পার্লঃ আকাশটা আবার মেঘ করেছে। বাতাস হবে মনে হয়..
বেঞ্জোঃ হুম, হতে পারে। হবেই মনে হয়। আচ্ছা, তুমি একটু বসো- আমি আসছি।
পার্লঃ কেনো, কই যাবা?
বেঞ্জোঃ বসোই না। আমি আসছি কিছুক্ষন পরে।
চুলোয় চা বসিয়ে বেঞ্জো আবার ফিরে আসলো বারান্দায়। না পার্লের কাছে না। তার থেকে একটু দূরে, পেছনে। পার্ল টের পাচ্ছে না যে, তার রূপে তার মধ্যে কি এক অভাবনীয় ব্যাপারে, বেঞ্জো অবাক হয়ে তাকিয়েই আছে। এলোমেলো বাতাস, পার্লের চুলগুলো উড়ছে। মেয়েটি মনে মনে কেন জানি হাসছে। কেন হাসছে? কে জানে! হাসুক না, ও হাসলেই তো পৃথিবী হাসে। ইজি চেয়ারটায় বসে খোলা বারান্দায় পার্ল দোল খাচ্ছে। অদ্ভুত সুন্দর একটি গন্ধ একটি আবেশ যেন বেঞ্জোকে গ্রাস করে নিয়ে যায়। এ মুহূর্তে বেঞ্জো প্রস্তুত নয় পার্লের চোখের দিকে তাকানোর। কারন পার্লের চোখের মাঝেই সবচেয়ে বেশি বিশেষত্ব খুজে নিয়েছে বেঞ্জো। তার ধূসর চোখ জোড়ায় এ মুহূর্তে হার মেনে নিতে রাজি নয় বেঞ্জো।
দেখতে দেখতেই আবার বৃষ্টি...।
পার্লঃ এই কি করো? চা বানাও? (দৌড়ে এসে)
বেঞ্জোঃ হ্যাঁ, বারান্দায় চলো। এখানে কেনো আসলা?
পার্লঃ বৃষ্টি হচ্ছে তো পাগল! ওখানে কিভাবে চা খাবা?
বেঞ্জোঃ আমার খুব ইচ্ছে বুঝলে, একদিন খুব আয়োজন করে বৃষ্টিতে ভিজবো;
সাথে এককাপ চা। বৃষ্টির পানি চায়ের কাপে এসে পড়বে। গরম চায়ে
টুপ টুপ করে আকাশ থেকে আসা ঠাণ্ডা পানি! গরম চা আর আকাশের
পানি একসাথে গিলবো। চলো প্লিজ।
পার্লঃ হুম, চলো...।
আজকের আকাশটা কি ইচ্ছে মতো কাঁদছে? এতো বৃষ্টি কেন? যেন সব ধুয়ে ফেলতে চায়। পার্ল এক মনে কোথায় যেন তাকিয়ে আছে, হাতে চায়ের কাপ। বেঞ্জো শুধু উপভোগই করছিল। এমন সুন্দর হবার কথা কি ছিল আজ? আজ তো বরং পার্ল তার সাথে রাগ করার কথা ছিল। সকালে ঘুমটা ভাঙেনি, এতে কি প্রকৃতির খেয়াল ছিল? কে জানে? পার্লের ডান হাতটা ধরলো বেঞ্জো, তার হাতটি সহ বাড়িয়ে দিলো বারান্দা থেকে একটু বাইরের দিকে। চায়ের কাপে বৃষ্টির ফোঁটা। এতো সুন্দর লাগছিল দৃশ্যটি, এতো সুন্দর! চা মুখে নিয়ে মনে হচ্ছিল জীবনটা কতোই না সুন্দর, কতোই না!
পার্লঃ তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাসো? জানতে ইচ্ছে করছে, বলবা?
বেঞ্জোঃ এত্তগুলা।
পার্লঃ মানে?
বেঞ্জোঃ যতোগুলো বৃষ্টির ফোঁটা দেখছো, তত্তগুলা!
পার্লঃ বাড়িয়ে বলতেছো, না?
বেঞ্জোঃ না, কমিয়েই বললাম। কারন তোমার জন্য আমার আবেগ আর
ভালোবাসা যাই বলো- তার পরিমান আমি ঠিক বলতে পারবো না
এটুক বলবো অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। অনেক বেশি হারিয়ে
যাই তোমার চোখে। সেই কতদিন হয়ে গেলো! তোমার চোখ আমাকে
কোথায় যেন নিয়ে যায়, আমার আর কিছুই তো করার থাকে না।
তখন আমি বাধ্য হয়ে যাই তোমাকে ভালোবাসতে।
পার্লঃ আচ্ছা, জীবন কি গল্পের মতো না গল্প থেকেই জীবন? ভালোবাসা কি
গল্পে থাকে নাকি জীবন থেকে চুরি হয়, বলবে?
বেঞ্জোঃ তোমার সিরিয়াস প্রশ্ন! ব্যাপার কি? এটা বল যে গল্প মানুষের সৃষ্টি
আর জীবন জীবনের মতো। হয়তো সুন্দর, না হয় তৃষ্ণার্ত কাক! আর
ভালোবাসা তো এ জগতের ব্যাপার না। এটি সাধনার বিষয়, পবিত্র
অনুভুতি আর অনুভবের বিষয়।
পার্লঃ আজকের বৃষ্টিটা একটু অন্যরকম লাগছে, যদিও আমার মনে হয় আজ
রাগ করার কথা ছিল, কি বল?
বেঞ্জোঃ এখন আমাকে কি সরি বলাতেই চাচ্ছো? না, আমি এখন সরি বলবো
না, শুধুই উপভোগ করবো। জীবনটা যদি এই মুহূর্ততেই পার করে দেয়া
যেত! যদি আর কখনো ভালোবাসায় ক্লান্তি না আসতো।
পার্লঃ তোমার কি অনেক ভালো লাগছে, বেঞ্জো?
বেঞ্জোঃ হুম...অনেক বেশি। আমার একটি স্বপ্নের দিন কাটছে। আজ আকাশের
মন ভালো। মনে হয় শুধু তোমার আর আমার জন্যে এতো ঘটা
করে বৃষ্টি আসলো জীবন যে এতোই সুন্দর, ভাবিনি, সত্যিই ভাবিনি।
পার্লঃ আমাকে তো জিজ্ঞেস করলে না, আমার কেমন লাগছে?
বেঞ্জোঃ (হাসি দিয়ে)...দুঃখিত! সরি তো বলতে পারছি না।
পার্লঃ এ সময়টা আসলেই ভালো লাগার মতো, অনেক ভালো লাগার। তবে
একটু পাগলামিও হয়তো।
বেঞ্জোঃ কিছু কিছু পাগলামি জীবনটার মানে বোঝায়, জীবনের মানে দাঁড়
করায়। তা হতে পারে বেঁচে থাকো আনন্দে, সজীব চোখে। বেঁচে থাকো
বৃষ্টিতে আর এই চায়ের কাপে। কবিতার মতো বলতে চেয়েও পারলাম
না। সামনে যে তুমি দাঁড়িয়ে!
পার্লঃ মানে কি? বলো, আমি কি করলাম তোমাকে?
বেঞ্জোঃ তোমাকে দেখে আমার কবিতার দৌড় বড় জোর দু'লাইন, তারপর আমার কাছে
তুমি শুধুই গল্প, শুধুই গান। তুমি শুধুই তুমিময়......
"You fill up my senses like a night in the forest,
like the mountains in springtime, like a walk in the rain,
like a storm in the desert, like a sleepy blue ocean.
You fill up my senses, come fill me again"
-অনিক হোসাইন
................................................
(একদা লিখেছিলাম, সময় মনে নেই)
বনশ্রী, ঢাকা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



