প্রি-মেরিডিয়ান
অ্যালার্ম বাজবার আগেই ঘুম ভেঙে গেল; সকাল ৮:২৫। অ্যালার্ম বাজবে ৮:৩৫ এ। মাথায় কোন অসমাপ্ত প্রসঙ্গ রেখে বা টেনশন নিয়ে ঘুমুলে এরকম হয় আমার। কাল রাতে কি কোন টেনশন নিয়ে বিছানায় গিয়েছিলাম? কি টেনশন? ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। ছাড়া ছাড়া স্বপ্নে তলিয়ে গেলাম।
...প্রায় ধ্বসে পড়া এক প্রাসাদের চাতালে বসে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর চিকেন উইংস খাচ্ছি। হু হু করে বাতাস বইছে আপেল গাছের পাতায় সুরুষ সুরুষ আওয়াজ তুলে। এখন মনে হয় সন্ধ্যা হচ্ছে। নাকি ভোর হচ্ছে? সুবেহসাদিক? তুমি এরই মধ্যে একবার এসে ডেকে গেছো। আবার এসে ডাকতেই উঠে পড়লাম, তোমার পিছু পিছু হেঁটে এসে দাড়ালাম রেলিং দেয়া বারান্দায়। ও মা! বারান্দা কোথায়! এতো মেঘনা ব্রীজের রেলিং! নীচে নৌকো চলছে কতশত। বেশিরভাগই পালতোলা। কত যান্ত্রিক নৌকোও চলছে। একপাড়ে সিমেন্টের কারখানা। ঘুম ভেঙে গেল আবার। এ্যাই সেরেছে ৯:১৮ বেজে গেছে! কখন যে অ্যালার্ম বেজেছে, শুনতেই পাইনি।
ঝড়ের বেগে ঢুকলাম বাথরুমে। বাতি জ্বলছে! রাতে মনে হয় বাতি নিভাতে ভুলে গেছি। এছাড়া আর কি! ঘরে তো আর কেউ নেই। তুমি থাকলে এখনি ধমক খেতে হতো! যাক বেঁচে গেছি! কমোডে বসে বসে ভাবছি আজ বেশি দেরী হয়ে গেল, অফিসে পৌঁছুতে পৌঁছুতে কমপক্ষে সাড়ে দশটা বেজে যাবে। হঠাৎই মনে পড়ল, রাতে খাওয়া হয়নি। সবুজ ভাইয়ের সাথে চিকেন আর ফ্রাইস খেয়েছিলাম রাত ন'টার দিকে। ফ্রিজে রান্না করা তেমন কিছুই ছিল না আর খিদেটাও মরে গিয়েছিল তাই রাতে আর কিচেনে ঢুকিইনি। স্বপ্নে চিকেন খাওয়ার মাজেজা এবার পরিষ্কার হলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ল্যাপটপের ডালাটি তুললাম; ল্যাপটপ চালু হতে হতেই ইউটিউবে বাজতে শুরু করল '...তোমার ছোট তরী নেবে কি?' কাল রাতে মান্না দে আর মাকসুদের কিছু গান ডাউনলোড করেছিলাম, মান্না দে'র 'সব তোমারি জন্যে' শুনতে ইচ্ছে করছে। গান ফেলে বিবিসি'র ওয়েদার ওয়েবসাইটে ঢুকলাম আগে। যাক আজকে বৃষ্টি হবে না, ছাতা নিয়েও বেরুতে হবে না। বাহ্ গানটা তো খারাপ লাগছে না '...আমার ছোট তরী যাবে কি?'
কাপড় পরে তৈরী হতে হতে মনে পড়ে গেল কক্সেস বাজার থেকে তোমাকে নিয়ে ফিরবার কথা। চট করে মনটা খারাপ হয়ে গেল। এখনো কি তোমার মনে পড়ে সেই দিনক'টির কথা? ফিরবার পথে তোমার সে-কি মন খারাপ! মেঘনা ব্রীজে এসে পৌঁছুতেই বললে, 'আবার হানিমুনে যাওয়া যায় না?' বুক থেকে গলার দিকে কেমন যেন ভার ভার লাগছে। গ্যাস্ট্রিকটা মনে হয় আবার চেপে ধরছে। গ্যাভিস্কনের একটি ক্যাপলেট মুখে পুরে দরজায় চাবী ঘোরালাম। ৯:৫৭। নতুন জুতো কিনতে হবে; আধাঘন্টা করে দু'বেলা হাঁটবার জন্য এ জুতো জোড়া মোটেও ভালো নয়। ঠুলির মত করে চোখে সানগ্লাস লাগালাম। এত আলো আমার সহ্য হয় না, পৃথিবীটা বড় বেশি উজ্জ্বল আজ। নেমে পড়লাম পথে।
আমার বাসার সামনেই বাচ্চাদের একটা স্কুল আছে। স্লামালাঈকুম। চমকে তাকিয়ে দেখি স্কুলের একটি বাচ্চা সালাম দিল, সাথে আরো কয়েকটি বাচ্চা। কারোরই বয়স বছর ছয়ের বেশি হবে না, এরই মধ্যে পাক্কা মুসলমান হয়ে গেছে! এ এলাকার স্কুলগুলোর শেতাঙ্গ বাচ্চারাও সালামালাইকুম, যাজাকাল্লা, খিতা খবর বে, বালানি ইত্যাদি শিখে ফেলে। ওলাঈকুম বলে দ্রুত পা বাড়ালাম। গলির পেরিয়ে এসে পড়লাম বড় রাস্তায়, মিশে গেলাম জনস্রোতে।
পোস্ট-মেরিডিয়ান
অফিসে ঢুকেই সোজা কিচেনে চলে গেলাম - এক কাপ কফি আর পাইন্ট গ্লাসের এক গ্লাস পানি নিয়ে এলাম ডেস্কে। ব্যবহার করা টিস্যু পড়ে আছে। কাল সন্ধ্যায় বিনে ফেলে যাইনি হয়তো। ডুবে গেলাম কাজে।
ঠিক বারোটায় স্যান্ডুইচওয়ালা এসে হাঁক পাড়ল "গুড আফটারনুন, স্যান্ডুইচেস। স্যুপ অফ দ্যা ডে ইস হাঙ্গেরিয়ান বীফ স্যুপ"। এক কাপ স্যুপ নিয়ে এলাম - দেড় টাকা করে বেচে। বীফ স্টু'র মত লাগলো, ভালোই। অফিসে মন বসছে না, বাইরে বেশ মেঘ-রোদের লুকোচুরি চলছে। খিদেও লেগেছে বেশ; আবার মনে পড়ল কাল রাতের পর এখন পর্যন্ত কফি আর স্যুপ ছাড়া পেটে কিছু পড়েনি। জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে বেরুলাম খাবারের খোঁজে।
তারপর সন্ধ্যে পর্যন্ত সেই একটানা কাজ। গুগোল আজ মিসিং লিঙ্কের আবিষ্কার উপলক্ষে এক আজব লোগো লাগিয়েছে। এক ফাঁকে একটু মিসিং লিঙ্কের ওয়েবসাইটেও ঢু মারলাম। মানুষের আদি পূর্বপুরুষের সন্ধান পাওয়া গেছে জার্মান দেশে। নাম ইডা বা আইডা। চারপেয়ে অদ্ভূত প্রাণী, তবে মানুষের মতই সামনের দিকে চোখ, ঘোড়া বা কুকুরের মত দুইপাশে নয়। ৪৭ মিলিয়ন বছর ধরে এই প্রানীটিই বিবর্তিত হতে হতে আজকের মানুষে পরিনত হয়েছে। ইডা থেকে মানুষ! বানর থেকে মানুষ তত্বের চেয়ে ভাল। বানর তো এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাহলে বিবর্তিত হলোটা কে? উত্তর ইডা।
অফিস থেকে বেরিয়ে গেলাম নব প্রতিষ্ঠিত বাংলা ক্লাবে। আসছে শনিবার ফিল্ম দেখানো হবে, তাই প্রস্তুতি চলছে। আমার বন্ধু মিল্টন ভাইও এসে যোগ দিলেন। এগারটার দিকে তিনি টেনে নিয়ে গেলেন তাঁর বাসায়, ওখানেই রাতে খাওয়া সারলাম - ভাত, ভেড়ার মাংস ভূনা আর কাকরোল-আলু-চিংড়ীমাছের একটা প্রিপারেশন। খেতে খেতে ভানুর কৌতুক শুনছিলাম! হাসতে হাসতে মাঝে মাঝে খাওয়া থামাতে হচ্ছিল। মিল্টন ভাই নামিয়ে দিয়ে গেলেন বাসায়।
আবার সেই চারদেয়াল! আবার নিজের সাথে কথোপকথন। মাঝরাত পেরিয়ে যাচ্ছে। কাপড় ছেড়ে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথটাবের কল ছেড়ে র্যাডক্সের বাথ সোক ঢেলে দিলাম খানিকটা। ফেনা ওঠার পর নেমে পরলাম; চোখ বন্ধ করে কিছু না ভেবে শুয়ে থাকতে চেষ্টা করছি। পারছি না, মিছিল করে একে একে ভাবনা উঠে আসছে। দাদুর কথা মনে পড়ছে - সাইকেল নিয়ে বেরুতে গেলে দাদু পিছে পিছে চলে আসতেন গেইট পর্যন্ত, এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন; পেছন থেকে বলতে থাকতেন, "সাবধানে যা সাবধানে যা"। জিমি দৌড়তো সাইকেলের পেছনে পেছনে। দাদু ক্ষেপতেন, "দ্যাখ দ্যাখ নাপাক কুত্তাটারেও লগে লয়া যায়। ঐ, কুত্তা লয়া যাস কৈ, ঐডারে ফালায়া দিয়া আহিস, নাইলে একদিন ঐডাই তরে খাইব।" কত কথাই না বলতেন মানুষটা! "ভাই ভাই ঠাই ঠাই, দুই ভাইয়ে মিল্লা মিশ্যা থাইক্যো দাদা।" "আমারে অত আদর দেহান লাগব না, এত্তিবেলা মৈরা গেলে হালায় দিয়া আইব কোন জঙ্গলে।" "কৈ যাস?" কোচিং এ যাই "কইয়া যাইতে পারস না?" "আচ্ছা কৈলাম, যাই।" "যাওন নাই আহো। আল্লার হাতে সপর্দ কৈরা দিলাম। ফি আমানিল্লাহ। গাড়ী-ঘোড়া দেইক্কা যাইয়ো দাদা।" আচ্ছা দাদু যেন কত তারিখে মারা গিয়েছিলেন? মনে পড়ছে না! আম্মাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। আম্মা জিনিসপত্র কোনটা কোথায় রাখেন মনে রাখতে পারেন না, হারিয়ে ফেলেন প্রায়ই, কিন্তু তারিখ ভুলেন না সহজে।
আমার খুবই শখ ছিল কৃষ্ণচূড়া গাছের! অলস বলে নিজে উদ্দ্যোগ নিইনি কখনো। আমি চলে আসবার পর আম্মা লাগিয়েছেন একটা চারা, এবছর নাকি ফুলে ফুলে আগুন হয়ে গেছে! গরম বেশি পড়লে নাকি কৃষ্ণচূড়া বেশি ফোটে। কতবার আমার ঘুড়ি আটকে গিয়েছিল মাঠের কোণার কৃষ্ণচূড়া গাছটায় - একবার আটকালেই একটা টাকা শেষ! আরেকটা জিনিসকে ভয় পেতাম, মাঠের কোথায় পানি জমে থাকলে দেখা যেত ঘুড়ি গোত্তা খেয়ে ঠিক ঐখানটাতেই পড়েছে। আমিও পড়েছি, নব্বই ডিগ্রী গোত্তা খেয়েই পড়েছি, ঠিক যেখানটাতে পড়লে ফেরার আর পথ থাকে না।
শরীরটা এখন অনেক হালকা লাগছে। বাথরুমে একটা লাইফসাইজ আয়না আছে। নগ্ন শরীরে দাড়ালাম নিজের চোখে চোখ রেখে। হাসলাম? আজ আর বাতি নিভাতে ভুললাম না। দিন শেষ হলো আরেকটি। এখন ঘুমদেবের সাথে ধস্তাধস্তি। আমি ভালোই আছি। তুমি?
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মে, ২০০৯ বিকাল ৩:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


