somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি শবে বরাতের গল্প

২৯ শে এপ্রিল, ২০১৮ দুপুর ২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“কোরআনে নাই, হাদীসে নাই, আরবে নাই, আযমে নাই, কোথাও নাই। সব বে‘দাত।” হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে চললেন মেজকাকু।

মেজকাকু এরকমই। কখন কী বলে, কী বলতে কী বলে, আগামাথা ধরতে পারি না। মতিগতি বুঝা বড় দায়। এখন কী নিয়ে খেপলেন, সেটাও আন্দাজ করতে পারছি না। জিজ্ঞেস যে করবো, তাও সাহসে কুলোচ্ছে না। এমনিতে মেজকাকুর চেহারা-সুরত দেখতে ঝাঁটার কাঠির মাথায় আলুর দম মনে হলেও হাবভাব কিন্তু সুমো কুস্তিগীরদের মতো। কখন ঝাঁপটে ধরে আছড়ে মারে, সে ভয়ে কাছেও ঘেঁষি না খুব একটা। তারপরেও কাকুর কথাগুলো মাটিতে পড়ার আগেই খপাৎ করে ধরে নিয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ব্যাপার কী, কাকু? কোরআনে-হাদীসে, আরবে-আযমে কী নাই?”

“কথা শেষ করার আগে প্রশ্ন করলে বুঝবি কী, হ্যাঁ? শবে বরাত, শবে বরাত।” চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন মেজকাকু।

“বুঝো ঠ্যালা! কাকু আবার কবে থেকে ধর্ম-কর্ম নিয়ে রিসার্চ শুরু করলো!” মনে মনে ভাবছি আমি। এর মধ্যেই কানের কাছে গমগম করে উঠলো, “আমাদের শায়খ হুজুর বলেছে কুরআন-হাদীসে কোথাও শবে বরাত নাই। এমনকি নবির দেশ আরবেও নাই। এসব এ দেশের পেটপুজারী বেদাতী মোল্লাদের বানানো। প্রমাণ চাস তো আমি ইউটিউব থেকে কয়েকশ’ লেকচার দেখাতে পারি।”

অবশেষে পূর্ণদৈর্ঘ্য বেদাত কাহিনীর হাকীকত বুঝতে পারলাম। কথায় বলে কুত্তার পেটে ঘি… না থাক, এসব কথা মুখে না আনাই ভালো। ডিজিটাল হুজুর আর ইউটিউব যে কাকুর মাথার গ্যাস্ট্রিকের জন্য দায়ী, সেটা বুঝে নিলাম। এখন দরকার দাওয়াই। স্পেশাল থেরাপি।

“কাকু, নামায-রোযাও তো কোরআন-হাদীসে নাই। এগুলাও কী বেদাত?” শুরুটা বুমেরাং থেরাপি দিয়ে।

“ইয়ে মানে… না। তাইলে কেমনে কী হলো?” আকস্মিক বজ্রপাতে মুখ থুবড়ে পড়া বকের মতো অবস্থা!

“শোনেন, কুরআন-হাদীসে নামায রোযা না থাকলেও সালাত সাওম আছে। তেমনি শবে বরাত না থাকলেও সহিহ হাদীসে ‘নিসফ শাবান’ বা অর্ধ শাবান শব্দটি উল্লেখ আছে। মানে হলো নামায রোযা শবে বরাত এগুলো সব ফার্সী শব্দ। তাই কোরআন-হাদীসে থাকার কথাও না।

রাসুল (দ.) বলেন, অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ পাক সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। অতঃপর মুশরিক এবং হিংসুক ছাড়া গোটা সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন।[১] শাবান মাসে আল্লাহর কাছে বান্দাহর আমলনামা পেশ করা হয়।[২] রাসুল (দ.) আর্ধ শাবানের রাত কবর জেয়ারত করেছেন।[৩]

ইবনে তাইমিয়া (র.) বলেন, ১৫ শাবান রাতের ফযীলত সম্পর্কে একাধিক মারফু[৪] হাদীস ও সাহাবীর উক্তি আছে, এবং এগুলোর সমর্থনে আসলাফের উক্তি আছে যেগুলো সুনান, মুসনাদ এমনকি সহীহ শিরোনামে সংকলিত হাদীসগ্রন্থসমূহে রয়েছে। এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফযীলত ও মর্যদা প্রমাণিত হয়। সালফে সালেহীনের কেউ কেউ এ রাতে নফল সালাতে যত্নবান হতেন। [৫]

আরো ইন্ট্রেস্টিং ব্যাপার হলো ইউটিউব শায়খদের সর্বগুরু আলবানীও (র.) শবে বরাতের ফযীলত বিষয়ক একটি হাদীসকে সহীহ বলেছেন।[৬] গুরুও কথাও মানে না। এরই নাম গুরুমারা বিদ্যা!

আর শোনেন, আরবের কথা বললেন না? সেখানে তো অনেক কিছুই হয়। সিনেমা, ডিস্কো, ক্যাসিনো। আরব যেমন নবির দেশ, তেমনি নবির বড় বড় শত্রুও কিন্তু আরবীয়ই ছিলো। সেজন্য আরব আরব বলে রব না তুলে কুরআন হাদীস দেখেন।”
“বুঝলাম। কিন্তু শবে বরাতের নামে হালুয়া-রুটি উৎসব, আতশবাজি, রাতভর শোরগোল করা কি ঠিক?” মেজকাকুর গলা খাদে নেমে এলো।

“শবে বরাত ইবাদতের জন্য। কেউ যদি ইবাদতের বদলে অনৈসলামিক কাজ করে, পটকাবাজি-আতশবাজি করে কিংবা হালুয়া-রুটির উৎসব করে, সেটা তার দোষ। আপনি মসজিদে যান নামায পড়তে, চোর যায় জুতা চুরি করতে, সেজন্য আপনাকেও জুতাচোর বলবো?” বলতে বলতে আলতো করে কেটে পড়লাম। বলা তো যায় না, কিঞ্চিত মাইন্ড খেয়ে কাকু যদি আবার হ্যাঁচকা টান মেরে কান ছিঁড়ে নেবার চেষ্টা করে!

১. সহীহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫, রাবী: মুয়ায বিন জাবাল
২. মুসনাদে আহমদ: ২১৭৫৩, নাসাঈ: ২৩৫৭
৩. তিরমীযী: ৭৩৯, ইবনে মাযাহ: ১৩৮৯
৪. সরাসরি রাসুল (দ.) থেকে বর্ণিত
৫. মাজমুউল ফাতওয়া, ৩/১৩১-১৩২
৬. সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহীহাহ ৩/১৩৫ হা: ১১৪৪
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে এপ্রিল, ২০১৮ বিকাল ৩:০৬
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা: (দ্বিতীয় পর্ব)

লিখেছেন মৃত্যুঞ্জয়, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০০

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

দ্বিতীয় পর্ব: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বিভাজন এবং অসম প্রতিযোগিতা

একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবদাস, কালজয়ী উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যের পটভূমি

লিখেছেন মেহবুবা, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৮


প্রথম ১৯২৮ সনে নির্বাক "দেবদাস" মুক্তি পায় ফনী বর্মা এবং তারকবালা অভিনীত ছিল সেটি। এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া এবং যমুনা বড়ুয়া অভিনীত সবাক দেবদাস মুক্তি পায় ১৯৩৫ সনে। তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কেমনের দিনে

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫



মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্ণতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি, যার অর্থ খারাপ বা অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়া এবং ভালো বা সৎ মানুষকে রক্ষা করা। এটি মূলত সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×